আমরা যারা আশির দশকে আর্ট কলেজে ঢুকেছিলাম, তাদের মনে এস এম সুলতানকে ঘিরে কিছু বিভ্রান্তি কাজ করত। অনেক শিক্ষক তখন মনে করতেন, সুলতানকে ঘিরে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে তা স্রেফ একটা তৈরি করা লিজেন্ড ছাড়া আর কিছু নয়। ব্যক্তি সুলতান ও তাঁর শিল্পকর্ম একসঙ্গে দেখার সুযোগ হয় প্রথম ১৯৮৬ সালে, আহমদ ছফার তত্ত্বাবধানে যখন প্রথম প্রদর্শনী গ্যেটে ইনস্টিটিউটে হলো। প্রদর্শনীর ছবি ও শিল্পীকে দেখে আমাদের মনে তাঁর লিজেন্ড ভাবমূর্তি নিশ্চিতভাবে স্থাপিত হলো।
যে বিষয়টি আমাদের সবচেয়ে আকৃষ্ট করেছিল তা আশির দশকের একটি প্রবণতা। আশির দশকে চিত্রকরদের একটা প্রবণতা ছিল মানব-অবয়বে ফিরে যাওয়া। সময় শিল্পীদলের আন্দোলন ছিল ওটা। মূলত সত্তরের দশকে এর সূচনা। তখন বিমূর্তকে প্রত্যাখ্যান করে মানব-অবয়বী কলার এ প্রবর্তন যাঁরা করেছিলেন সুলতান ছিলেন তাঁদের অন্যতম এবং তাঁর চিত্রকর্মে আমরা সেই কলা পূর্ণ বিকশিত দেখতে পেলাম। তাঁর চিত্রকর্ম আমাদের সামনে চিন্তা-কল্পনার দুয়ার খুলে দিয়েছিল।
দ্বিতীয়জন ছিলেন কামরুল হাসান, যিনি মানব-অবয়বের কাছে ফিরে গিয়েছিলেন। কামরুলের চিত্রকলায় রাজনৈতিক সমালোচনামূলক আবহ ধরা পড়ত, আর সুলতানের চিত্রকলায় ধরা পড়ত ভিশনারি, বাংলায় যাকে বলা চলে কল্পদৃষ্টি। মূর্ত আর বিমূর্তকে নিয়ে তখন একটা তর্ক চলছিল। সেই তর্ক ছাপিয়ে যাঁদের মূর্ত কাজ, মানব-অবয়বধর্মী কাজ আলোচিত হচ্ছিল, তাঁদের ভেতর প্রধান শিল্পীদের একজন হিসেবে আমরা সুলতানকে পেয়েছিলাম। তবে সেদিন সেই গ্যেটে ইনস্টিটিউটে আমরা সুলতানের একটি ব্যাপারে অবাক হয়েছিলাম, তা হলো- মানুষকে উদ্দেশ করে তিনি যে বক্তব্য রাখেন সেটি ছিল ইংরেজিতে।
তখন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আমরা। সুলতানের চিত্রকর্ম দেখার পর আমরা সম্ভবত প্রথম সচেতনভাবে চিন্তা করতে শুরু করলাম চিত্রকলা, নিজস্বতা সম্বন্ধে। আজ পেছনে ফিরে আমি দেখতে পাই, সুলতানের দুটো আলাদা ইমেজ তৈরি হয়েছিল আমাদের মনে। এক ছিল তাঁর বিরাট ব্যক্তিত্ব, আরেকটা ছিল তাঁর বিপুল আয়তনের চিত্রকর্মের মাধ্যমে ফুটে ওঠা স্বতন্ত্র চিত্রকর সত্তা। আমাদের মগ্ন করে রাখল তাঁর বিপুল পেশিসমৃদ্ধ শক্তিশালী কিষান-কিষানি। মনে পড়ল মাইকেলেঞ্জেলোর ডেভিডের কথা। গাঁয়ের যে ভূমিপুত্র, যারা একেবারে মাটির মানুষ, সুলতান যেন তাঁদের আকাশের উচ্চতায় ওঠালেন।
অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক বলেছিলেন, সাধারণ মানুষকে অসাধারণ করে দেখাই সুলতানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
সুলতানের কিছু বিষয় আমরা জানি। শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর আগ্রহে তিনি কলকাতায় গেলেন চিত্রকলা বিষয়ে পড়াশোনা করতে। পড়া তিনি শেষ করলেন না, তৃতীয় বর্ষেই বেরিয়ে গেলেন ভারতবর্ষ ভ্রমণে। ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ হলে সুলতান পাকিস্তানে চলে এসেছিলেন, তার আগমুহূর্তে তিনি ছিলেন কাশ্মীর আর সেই সময়টায় তিনি মূলত ল্যান্ডস্কেপ আঁকতেন। যে সুলতানকে আমরা চিনি, সেই সুলতানে তিনি বিবর্তিত হলেন আরও পরে। তাঁর মানব-অবয়বী কাজগুলোর আড়ালে একটা আদর্শিক ভাবনা কাজ করেছিল। তিনি তাঁর দৃশ্যশিল্পগুলোর মধ্যে মালিকানার প্রশ্ন উত্থাপন করলেন। ভূমির মালিকানা কার। যিনি কর্ষণ করছেন ভূমি তার। সুলতানের চিত্রকলায় এই বিষয়টি সবচেয়ে সুচারুরূপে ব্যাখ্যা করেছিলেন বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, একটি গ্রন্থে, গ্রন্থটির নাম দেশজ আধুনিকতা :সুলতানের কাজ।
সুলতান একটি চমৎকার বক্তব্য উপস্থাপন করেছিলেন। তাঁর বিশ্বাস- ভূমি যাঁরা কর্ষণ করবেন, চাষ করবেন, এর মালিকানা তাঁদেরই। তবে এই মালিকানা প্রতিষ্ঠার মধ্যখানে একটি যুদ্ধ রয়েছে। সুলতান যুদ্ধংদেহী কৃষকদের দেখিয়েছেন, কিন্তু প্রতিপক্ষ দেখাননি। যুদ্ধে রক্তপাত দেখাননি। তিনি যুদ্ধ দেখাতে চাননি, চেয়েছেন উত্থানটুকু দেখাতে এবং দেখিয়েছেন। কৃষকদের উত্থানপর্বের পর ভূমির মালিকানা বিষয়ে তাঁর যে মতবাদ তা জয় পেল। সুলতান বলতেন সম্পদকে এক ধরনের সামাজিক মালিকানায় আসতে হবে। তাহলে মানুষ যে শক্তি পাবে, তাঁর আঁকা অবয়বগুলোয় ওই যে পেশি, তা সেই শক্তির প্রতীকায়ন। কবি ইকবালের সমাজবাদী ধারণা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন সুলতান। ইকবালের ইসলামধর্মী ভাবনাপথ যেমন ছিল, আবার স্বতন্ত্র সমাজবাদী ভাবধারাও ছিল। ইকবাল তাঁর কবিতায় বলেছিলেন- 'ফসলের জন্মদাতাই যখন তার ফসল ভোগ করতে পারল না, তার প্রতি কণায় আগুন জ্বালিয়ে দাও।' এমন বাক্য থেকে কবি নজরুলও প্রেরণা নিয়েছেন। সুলতানও অনুপ্রেরিত হয়েছিলেন। তাঁর চিত্রকলায় কৃষকদের উত্থানপর্বে আর দৃশ্যশিল্পে নির্মিত মর্ত্যের স্বর্গদৃশ্যের ভেতর তাঁর আদর্শ মূর্ত।
সুলতানের ওপর চিত্রসংগ্রাহকদের চাপ ছিল। অনেকে তাঁকে বাধ্য করেছে কিছু ছবি আঁকতে। এমনকি অনেক সময় অসমাপ্ত অনেক ছবিও নিয়ে এসেছে তাঁর কাছ থেকে, ঢাকায় এনে লাখ লাখ টাকায় বিক্রি করেছে। সেই সব সময়ে সুলতান, কখনও কলমের আঁচড়ে, এমন কিছু ছবি এঁকেছিলেন- যেগুলো তাঁর পরিচয়বাহক নয়। সুলতান যেটুকু সত্য সমালোচনার শিকার হয়েছিলেন, সেই সমালোচনাগুলো হয়েছিল মূলত সেইসব ছবিকে ঘিরে। মানুষের এমন ক্ষুদ্রতার ফেরে যেটুকু দুর্বলতা তাঁর প্রকাশ হয়ে পড়েছিল, এর বাইরে মূল পরিচয়টি ব্যক্ত করেছেন অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক।
অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক বলেছিলেন, সুলতান বাংলার মানুষের কাছে একটি বার্তা পাঠিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষের প্রতি স্বতঃউৎসারিত ভালোবাসা ছিল সেই বার্তার মূল। তাঁর ভেতর এই প্রেরিত প্রতিনিধি বা বার্তাবাহক মূর্তিটি ছিল প্রবল। কী তাঁর ব্যক্তিত্বে, কী চিত্রকলায়। এবং শহর ছেড়ে তিনি ফিরে গাঁয়ে গিয়েছিলেন; তাঁর চিত্রে মর্ত্যের যে স্বর্গ তিনি এঁকেছিলেন, সেই স্বর্গের অধিবাসীদের কাছে।