রংপুর জেলা শহর থেকে ২৩ কিলোমিটার পশ্চিমের একটি উপজেলা বদরগঞ্জ। এই উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে দেশের চারটি নদী- যমুনেশ্বরী, চিকলী, করতোয়া ও ঘৃলাই। নদীবেষ্টিত উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোয় নাগরিক সুবিধা পৌঁছলেও স্থানীয়দের প্রধান পেশা কৃষি। বাঙালির আধিক্য থাকলেও ১৫৫০ সাল থেকে (মতান্তরে ১৩৩৩ সাল) ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী তথা সাঁওতাল, ওঁরাও, পাহান, তুরি, রাজবংশীসহ নানা গোষ্ঠীর মানুষের বসবাস এখানে। তবে শিক্ষা ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ পিছিয়ে। কৃষিজমিতে হালচাষ, পাহাড়ে কাঠ কেটে কিংবা লাকড়ি সংগ্রহ করে জীবনযাপন করে তারা।

আর্থিকভাবে অসচ্ছল থাকায় বেশিরভাগ পরিবারের শিশুরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। তবে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ ও উন্নয়ন প্রচেষ্টায় তাদের জীবন এখন পাল্টে যাচ্ছে। অনেকে নানা কর্মমুখী ও কারিগরি প্রশিক্ষণ নিয়ে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে জীবনমানেরও উন্নয়ন ঘটাচ্ছেন। তাঁদেরই একজন বদরগঞ্জ উপজেলার সুবর্ণা পাহান। সাত ভাইবোনের মধ্যে তিনি ষষ্ঠ। বাবা সুভাষ চন্দ্র পাহান কৃষিজমিতে কাজ করেন। অর্থাভাবে সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারেননি। সরকারি স্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে ২০১৯ সাল থেকে সংসারেই সময় দিয়ে আসছিলেন সুবর্ণা। কিন্তু এখন তিনিই পরিবারের আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছেন। গত জানুয়ারিতে লোকাল গভর্নমেন্ট সাপোর্ট প্রজেক্ট ৩ (এলজিএসপি-৩)-এর আওতায় রংপুর কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (টিটিসি) ২৪ দিনের সেলাই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এ প্রশিক্ষণেই বদলে গেছে তাঁর জীবন। গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় বর্তমানে হেলপার হিসেবে তিনি কাজ করছেন।

সুবর্ণা পাহান সমকালকে বলেন, 'চাকরি করব ভাবিনি। বাড়িতে ছিলাম। একদিন কয়েকজন স্যার বাড়িতে আসেন। তাঁদের কথামতো ট্রেনিং নিয়েছি। পরে একটি কোম্পানি ঢাকার আবদুল্লাহপুরে চাকরি দিয়েছিল। সেখানে ১৫ দিন কাজ করেছি। কিন্তু এখন বেশি বেতন পাওয়ায় গাজীপুরের লিবার্টি গার্মেন্টে কাজ শুরু করেছি। এখন ভালো আছি।'

এই ভালো থাকা শুধু সুবর্ণা পাহানের নয়, কারিগরি প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর রংপুরের মিঠাপুকুর, পীরগঞ্জ ও বদরগঞ্জ উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ১৫৬ জনের জীবন বদলে গেছে। তাঁরা এখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন বা নিজেরাই উদ্যোক্তা। তাঁদের মধ্যে ওঁরাও উপজাতির ১১৬ জন, পাহান ১৫ জন, সাঁওতাল ৮ জন এবং সনাতন উপজাতি ৮ জন। মোট নারী ৩৯ জন।

রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার মহদীপুর গ্রামের ২১ বছরের যুবক পলাশ লাখরা। দুই বছর আগে তাঁর বাবা মারা যান। মা মালতি মিঞ্জি অন্যের জমিতে কাজ করে গত দুই বছর একাই সংসার চালিয়েছেন। তবে এখন মালতি মিঞ্জির কষ্ট অনেকটাই কমে এসেছে, তাঁর বড় ছেলে পলাশ লাখরাও সংসার খরচে ভূমিকা রাখছেন।
পলাশ লাখরা সমকালকে বলেন, 'বাবা মারা যাওয়ার পর দুই ভাইকে নিয়ে মা অসহায় হয়ে পড়েছিলেন। মা অন্যের জমিতে কাজ করে সংসার চালাতে পারছিলেন না। এখন আমি নিজেই বেতন-ওভারটাইমসহ মাসে ১৩ হাজার টাকা পাই, তাতে সংসার চালাতে মায়ের কষ্ট অনেকটা কমে এসেছে।' চাকরি পাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'বন্ধুদের মাধ্যমে জানতে পারি সরকারি উদ্যোগে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তখন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং মোবাইল ফোন সার্ভিসিংয়ের ওপরে এক মাসের প্রশিক্ষণ নিই। বর্তমানে গাজীপুরের ভোগরা বাইপাস এলাকায় আইটেল মোবাইল কোম্পানিতে চাকরি করছি।'

২০২০-২১ অর্থবছরে মিঠাপুকুর উপজেলার দূর্গাপুর, মির্জাপুর, ইমাদপুর, বালারহাট, ভাংনি, গোপালপুর, বড় হযরতপুর, পায়রাবন্দ, কাফ্রিখাল; পীরগঞ্জ উপজেলার পাঁচগাছিয়া, বড় দরগাহ এবং বদরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর, লোহানীপাড়াসহ মোট ১৩ ইউনিয়নে ওয়ার্ড সভার আয়োজন করা হয়। সভায় উপস্থিত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ তাঁদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণের প্রস্তাব দেন। পরে এলজিএসপি ৩-এর আওতায় ওই ১৩টি ইউনিয়নের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ১৫৬ জন কর্মহীন যুবক-যুবনারীকে বিভিন্ন ট্রেড অর্থাৎ রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড এয়ারকন্ডিশনিং, ওয়েল্ডিং অ্যান্ড ফেব্রিকেশন, মোবাইল ফোন সার্ভিসিং, অটোমেকানিকস উইথ ড্রাইভিং, কম্পিউটার অপারেটর (স্ব্বনির্ভর) ইত্যাদি কোর্সে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

রংপুরের জেলা প্রশাসক মো. আসিব আহসান সমকালকে বলেন, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ নানা কারণে পিছিয়ে আছেন। তাই তাঁদের কারিগরি প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারের পলিসি অনুযায়ী জেলা প্রশাসন বরাবরই সচেষ্ট। এ লক্ষ্যে এলজিএসপি-৩ প্রকল্পের আওতায় ১৫৬ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। পরে তাঁদের নিয়ে রংপুরে চাকরি মেলার আয়োজন করা হয়। মেলায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৩৫ জনকে চাকরি দিয়েছে আরএফএল কোম্পানি। আরও যাঁরা আছেন তাঁরাও বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করেছেন। কেউ কেউ উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছেন। এটি অত্যন্ত ইতিবাচক। তিনি আরও বলেন, 'ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বেশিরভাগই কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। এ জন্য কৃষিনির্ভর উদ্যোগ এ সম্প্রদায়ের জন্য বেশি উপযোগী হতে পারে।'