এক নিভৃত পল্লির মেয়ে অয়ন্ত মাহাতো। বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলার রায়গঞ্জ উপজেলার সোনাখাড়া ইউনিয়নের গোতিথা গ্রামে। পড়ছে বিষমডাঙা গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে সপ্তম শ্রেণিতে। ছোটবেলা থেকেই তার ফুটবলের প্রতি দারুণ ঝোঁক; বাধা হয় তার খেলার সঙ্গীর অভাব। কোনো মেয়ে তার সঙ্গে খেলে না। শুরুটা হয় পাশের বাড়ির ছেলেদের সঙ্গে খেলে। কখনও সঙ্গী না পেয়ে বাড়ির আঙিনায় একা একা খেলে। হঠাৎ তার নড়বড়ে দরজায় কড়া নাড়ে অপার সুযোগ।

তখন স্কুলে স্কুলে শুরু হয়েছে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব জাতীয় গোল্ড কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট। ছেলেদের পাশাপাশি এখানে মেয়েদের দল আছে। এখানে দারুণভাবে লেগে পড়ে অয়ন্ত। পাশের বাড়ি দেখতে যায় টেলিভিশনে খেলা। তার ইচ্ছে হয় টিভির সেই মেয়েগুলোর মতো করে সাজার, জার্সি, বুট পরে লাল-সবুজের পতাকা বুকে ধারণ করে খেলার। মাহাতো সমাজের প্রথম অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সুশান্ত কুমার মাহাতোর নজর কাড়ে তার খেলা। তিনিই প্রথম অয়ন্তর খেলার সঙ্গী মোট ৩৫টি মেয়েকে উপহার দেন বল, ট্র্যাকসুট, জার্সি, বুটসহ খেলার অন্যান্য সামগ্রী।

পরের বছর শীতের সময় রায়গঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান ইমরুল হোসেন তালুকদারও দেন একই উপহার। প্রতিদিন সকালে স্থানীয় নিমগাছি মাঠে সিরাজগঞ্জ জেলা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী প্রমীলা ফুটবল একাডেমির উদ্যোগে চলে প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষক নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে বেড়ানোর মতো শ্রম দিয়ে চলেছেন মেয়েগুলোর মুখের দিকে তাকিয়ে। অয়ন্ত বুকে গভীর স্বপ্ন লালন করে মাঠে খেলতে যায়। অনেক বাধা-বিপত্তি তো আছেই। স্থানীয়দের অনেকেই মেয়েদের খেলা পছন্দ করেন না; শুনতে হয় নানা কটু কথা। তারপরও থেমে নেই অয়ন্ত।

সে খেলে স্ট্রাইকার হিসেবে। কখনও পাশের কর্নার থেকে লম্বা কিক করে গোলরক্ষককে করে পরাস্ত, আবার কখনও কয়েকজনকে কাটিয়ে একাই বল জড়ায় প্রতিপক্ষের জালে। বাফুফে-ইউনিসেফ আয়োজিত ট্যালেন্ট হান্ট বাছাই প্রতিযোগিতায় অনূর্ধ্ব-১২ জাতীয় মহিলা ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে অয়ন্ত মাহাতোর কৃতিত্বে ৩-০ গোলে নওগাঁ জেলাকে হারিয়ে রাজশাহী বিভাগীয় চ্যাম্পিয়ন হয় সিরাজগঞ্জ। সম্প্রতি বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে বিভাগীয় পর্যায়ের খেলায় নওগাঁ জেলাকে তার নৈপুণ্যে একমাত্র গোলে হারায় সিরাজগঞ্জ। অয়ন্তর বাবা বরীষা মাহাতো স্থানীয় নিমগাছি বাজারে মসলার দোকানদার। পলিথিনের ছাউনি মাথার ওপর দিয়ে দোকান পরিচালনা করেন। এক বুক স্বপ্ন নিয়ে মেয়েকে ফুটবলার হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন। মা শেফালী রানী মাহাতো গৃহিণী। তিনি মাঠে দিনমজুরের কাজ করেন। দু'জনকেই শুনতে হয় নানা কথা। কোনো কথায় কান না দিয়ে তাঁরা মেয়েকে খেলার জন্য প্রস্তুত করে তুলছেন তিলে তিলে।