এ বিভাগে আইনগত সমস্যা নিয়ে পাঠকের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সাদিয়া আরমান

আমি নিপা আক্তার (ছদ্মনাম)। আমার স্বামীর নাম মাসুদ। আমাদের দু'জনেরই গ্রামের বাড়ি গাজীপুর। আশুলিয়ায় থাকি। মাসুদ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা ছিলেন। আমিও একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছি। আমাদের দুই মেয়ে। তাদের একজন স্কুলে, অপরজন কলেজে পড়ছে। কয়েক বছর অসুস্থতার পর করোনাকালে মাসুদের মৃত্যু হয়। তিনি বাড়িতে ও ব্যাংকে বেশ কিছু সম্পত্তি রেখে গেছেন।

মাসুদরা চার ভাই। তাঁরা আমাকে ও আমার সন্তানদের ওই সম্পত্তির অংশ দিতে রাজি নন। মাসুদ কিছু সম্পত্তি আমার ও সন্তানদের নামে হেবা দলিল করেছিলেন। আমার শ্বশুর মারা গেছেন, শাশুড়ি বেঁচে আছেন। মাসুদের ভাইয়েরা এখন আমাদের নামে থাকা সম্পত্তি, এমনকি ব্যাংকের টাকাতেও নিজেদের অধিকার দাবি করছেন।  এ বিষয়ে আইনি পরামর্শ চাই।

উত্তর :মুসলিম সম্পত্তি আইনে মৌখিকভাবে ঘোষণা করে সম্পত্তি উপহার দেওয়াকে হেবা বলে। বাংলাদেশে রেজিস্ট্রেশন আইন পাস হওয়ার পর মৌখিকভাবে যদি কেউ কাউকে সম্পত্তি উপহার দেয়, তা রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। আপনি বলেছেন, আপনার স্বামী কিছু সম্পত্তি আপনার ও মেয়েদের নামে হেবা ও হেবার রেজিস্ট্রেশন করে গেছেন। এই হেবা করা সম্পত্তি অবশ্যই আপনি এবং আপনার মেয়েরাই শুধু পাবেন। আপনার স্বামীর ভাইয়েরা এখান থেকে কোনো অংশ পাবেন না। এ সম্পত্তি ওয়ারিশ সূত্রে বণ্টনযোগ্য সম্পত্তি থেকে আগেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

আপনার স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর সার্বিক সম্পত্তি থেকে এই হেবা করা সম্পত্তি বাদ দিয়েই বাকি বণ্টনযোগ্য সম্পত্তি ফারাইজ আইনে যার যার অংশ অনুযায়ী আপনি এবং আপনার মেয়েসহ সব উত্তরাধিকারী পাবেন। কাজেই হেবার সম্পত্তি বাদ দিয়ে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বাকি সম্পত্তি বণ্টনের কাজটা করতে হবে।
আপনার স্বামী ব্যাংকে যদি টাকা রেখে আপনাকে নমিনি করে থাকেন তাহলে প্রয়োজনীয় কাগজাদি দেখিয়ে স্ত্রী হিসেবে আপনার পরিচয়ের প্রমাণ দেখালে (জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, কাবিননামা ইত্যাদি) ব্যাংক আপনার হাতে অর্থটা হস্তান্তর করতে পারে।

অন্যদিকে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্তও নিতে পারেন, আপনার শুধু টাকা তোলার অধিকার আছে, সব ওয়ারিশ মিলেই এই অর্থের হকদার। তা হলে আপনাকে আদালতে উত্তরাধিকার মামলা করতে হবে এবং মামলার ডিক্রি পাওয়ার পর উত্তরাধিকার সনদ নিয়ে ব্যাংকে দাখিল করতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় তিন মাস লাগতে পারে। সব ওয়ারিশান মিলে উত্তরাধিকার মামলা করতে পারেন, তবে আপনার স্বামীর ভাইয়েরা যদি আপনার সঙ্গে সহযোগিতা না করেন, তাহলে একাই মামলা করে অন্যদের বিবাদী করতে পারেন। ব্যাংকে রাখা অর্থ প্রাপ্তির পর সে টাকা ফারাইজ আইন অনুযায়ী আপনি স্ত্রী হিসেবে আট ভাগের এক ভাগ, দুই কন্যা মিলে তিন ভাগের দুই ভাগ, শাশুড়ি ছয় ভাগের এক ভাগ পাবেন। আর আপনার স্বামীর ভাইয়েরা অবশিষ্টাংশ পাবেন।

এখন আপনার স্বামীর অন্য সম্পত্তির প্রসঙ্গে আসা যাক। এই সম্পত্তি সব ওয়ারিশানের মধ্যে ফারাইজ আইন অনুযায়ী বণ্টন হবে। মুসলিম ফারাইজ আইনে যদি ছেলেসন্তান না থাকে, তাহলে মেয়েরা অংশীদার হয়। আপনার স্বামীর মৃত্যুর পর আপনি, দুই মেয়ে আর মাসুদের মা- এই তিনজন অংশীদার আছেন। আপনার স্বামীর ভাইয়েরা অংশীদার নন, তাঁরা অবশিষ্টাংশভোগী। এই সম্পত্তিও অংশীদার হিসেবে আপনি পাবেন আট ভাগের এক ভাগ, দুই কন্যা মিলে তিন ভাগের দুই ভাগ আর মাসুদের মা ছয় ভাগের এক ভাগ। বণ্টনযোগ্য সম্পত্তি হতে আপনি, আপনার দুই মেয়ে এবং আপনার শাশুড়ির ভাগটা সরিয়ে নেওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকবে সেটি সমানভাবে আপনার স্বামীর ভাইয়েরা পাবেন।

তবে বাস্তবে আপনাকে আপনার ও আপনার মেয়েদের সম্পত্তি আদায় করতে হলে আদালতের শরণাপন্ন হতে হবে বলেই মনে হচ্ছে। একটা শঙ্কা আছে, আপনার স্বামীর ভাইয়েরা অন্যায়ভাবে আপনার ও আপনার মেয়েদের অংশ বিক্রি করে ফেলতে পারেন। তাই যত তাড়াতাড়ি আপনি আদালতের শরণাপন্ন হবেন ততই ভালো।