পেলে, লিওনেল মেসি, ওয়েন রুনি, কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো তারকা ফুটবলার নিজেদের প্রমাণে ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপকেই বেছে নিয়েছিলেন। তাঁদেরই পথ ধরে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপে এরই মধ্যে কাতারের মরুর বুকে ঝঞ্ঝার মতো উদ্যামতা নিয়ে তারুণ্যের ঝান্ডা ওড়াতে শুরু করেছেন একদল তরুণ। টগবগে এ তরুণদের নিয়েই আজকের আয়োজন...

বিশ্বকাপ ফুটবলের সবচেয়ে বড় মাহাত্ম্যই হচ্ছে একমঞ্চে বিশ্বসেরা তারকাদের দেখার সুযোগ করে দেওয়া। তবে বিশ্বকাপ ফুটবলের আসল সৌন্দর্য হলো- এটি তারকা তৈরির মঞ্চ। ঠিক যেন রিলে রেসের ব্যাটন পরিবর্তনের মতোই। তারকাদের হাতে থাকা ব্যাটনটা আগামীর তারকাদের হাতে চলে যায় এ বিশ্বকাপের পথ ধরেই। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে বিশ্বের সামনে নিজেকে তুলে ধরেছিলেন জেমস রদ্রিগেজ। ২০১৮ বিশ্বকাপে নিজের আগমনী গান শুনিয়েছিলেন আজকের ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে। কাতারেও একদম প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে নামা একঝাঁক তরুণ তুর্কি এরই মধ্যে বিশ্বকাপের আলো নিজের দিকে টেনে নিয়েছেন। লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, লুকা মদ্রিচ, রবার্ট লেভানডভস্কি, লুইস সুয়ারেজ, ম্যানুয়েল নায়ারের মতো তারকার এটাই হতে যাচ্ছে শেষ বিশ্বকাপ। প্রকৃতি নাকি কখনও শূন্যস্থান পছন্দ করে না। এই তারকাদের শূন্যস্থান পূরণ করতে যাচ্ছেন সেসব সম্ভাবনাময় তরুণ। গর্জে উঠে নিজেদের জানান দেওয়া তরুণদের সঙ্গে পরিচিত হই চলুন-

এনজো ফার্নান্দেজ (আর্জেন্টিনা) :আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ দলে যখন ২১ বছর বয়সী এনজো ফার্নান্দেজ ডাক পান, তখন অনেকেই চোখ কপালে তুলেছিলেন। বিশ্বকাপের আগে এই মিডফিল্ডারের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা ছিল ৩ ম্যাচ মিলিয়ে সাকল্যে ৯৯ মিনিট। প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের বিপক্ষে হারায় মেক্সিকোর বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ম্যাচটি হয়ে ওঠে ডু অর ডাই। সেই ম্যাচেই বদলি হিসেবে নেমে আর্জেন্টিনার ত্রাতা হয়ে ওঠেন সেই ২১ বছর বয়সী এনজো ফার্নান্দেজ। গোল করেই রীতিমতো রেকর্ড বুকে ঢুকে গেলেন এনজো। মেসির পর দ্বিতীয় কনিষ্ঠতম (২১ বছর ৩১৩ দিন) আর্জেন্টাইন ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপে গোল করার রেকর্ড গড়েছেন এনজো ফার্নান্দেজ। সামনের ম্যাচগুলোতে আর্জেন্টিনার ভালো করার সম্ভাবনা অনেকটাই নির্ভর করছে মিডফিল্ডে কেমন পারফর্ম করছেন বেনফিকার এই তরুণ। এরই মধ্যে গুঞ্জন আছে, মেসির সাবেক ক্লাব বার্সেলোনা তাদের মিডফিল্ডে সার্জিও বুসকেটসের স্থলাভিষিক্ত করতে চায় এনজো ফার্নান্দেজকে। এই মিডফিল্ডারকে দলে পেতে আগ্রহী ইংলিশ জায়ান্ট ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডও।

পাবলো গাভি (স্পেন) :বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকেই গাভিকে নিয়ে কথা হচ্ছিল। বলা হচ্ছিল, গাভি হতে পারেন এই বিশ্বকাপে স্পেনের এক্স ফ্যাক্টর। স্পেনের হয়ে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই মাঠে নেমে গাভি প্রমাণ করেছেন- কেন তাঁকে নিয়ে এত আলোচনা। পেলের পর দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপে গোল করেছেন বার্সেলোনার এই মিডফিল্ডার। নিজের ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই কোস্টারিকার বিপক্ষে গোল করার সময় এই স্প্যানিশ ফুটবলারের বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর ১১০ দিন। গাভির খেলার ধরন অনেকটাই যেন স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি জাভি হার্নান্দেজ আর আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার সংমিশ্রণ। অসাধারণ বল কন্ট্রোল, দ্রুতগতি আর দুর্দান্ত ড্রিবলিং স্কিল মিলিয়ে গাভি এক পরিপূর্ণ অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার। নকআউট পর্বের ম্যাচে স্পেনের হয়ে একা পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন এই স্প্যানিশ ফুটবলার।

রদ্রিগো গোয়েজ (ব্রাজিল) :রদ্রিগো উইঙ্গার হলেও দলের প্রয়োজনে খেলতে পারেন সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবে। গোল যেমন করতে পারেন, তেমনি নিচে নেমে খেলাটা তৈরিও করতে পারেন রদ্রিগো। এমন একজন খেলোয়াড় যে কোনো দলে থাকা মানেই বাড়তি সুবিধা পাওয়া। গত মৌসুমে রিয়ালকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতানোর সবচেয়ে বেশি অবদান ২১ বছর বয়সী এই ব্রাজিলিয়ানেরই। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালে ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে ২ মিনিটের ব্যবধানে ২ গোল করে অবিশ্বাস্য এক প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখেছিলেন রদ্রিগো। এখন পর্যন্ত যত কোচের অধীনেই খেলেছেন, সব কোচই ঠান্ডা মাথার জন্য রদ্রিগোর প্রশংসা করেছেন। বয়স অনুযায়ী নাকি অনেক বেশি পরিণত রদ্রিগো। এমনকি বিশ্বকাপ শুরুর আগে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেইমার জানিয়েছিলেন, তাঁর অবসরের পর ব্রাজিলের ১০ নম্বর জার্সির যোগ্য উত্তরসূরি তিনি রদ্রিগোকেই মনে করেন। বিশ্বকাপেও ইনজুরির কারণে নেইমারের অনুপস্থিতিতে নিজের দায়িত্ব ঠিকঠাকই পালন করছেন রদ্রিগো। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে ক্যাসেমিরোর করা একমাত্র গোলটি এসেছে রদ্রিগোর অসাধারণ পাস থেকেই।

জামাল মুসিয়ালা (জার্মানি) :বিশ্বকাপ শুরুর আগে জামাল মুসিয়ালা সম্পর্কে ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি ফুটবলার লোথার ম্যাথিউস বলেছিলেন, 'মুসিয়ালা দুর্দান্ত। ওর পক্ষে ভবিষ্যতে মেসির জায়গা নেওয়া সম্ভব। আমি ওর স্টাইল পছন্দ করি। গত দুই বছরে ওর খেলা আমাকে মুগ্ধ করেছে।' স্পেনের বিপক্ষে জার্মানির ডু অর ডাই ম্যাচে মাত্র ১৯ বছর বয়সী মুসিয়ালা দেখিয়েছেন তিনি আসলে কী করতে পারেন। তাঁর করা অ্যাসিস্ট থেকেই ফুলক্রুগ গোল করে স্পেনের বিপক্ষে জার্মানির ড্র নিশ্চিত করেন। শুধু অ্যাসিস্টই নয়, জার্মানির মধ্যমাঠ একা নিয়ন্ত্রণ করেছেন মুসিয়ালা। ৮৪ শতাংশ নির্ভুল পাস, শতভাগ সম্পূর্ণ ক্রসিং, সাতটি সফল গ্রাউন্ড ডুয়েল জয়- এসবই বলে দেয় মাঠে ঠিক কতটা দুর্দান্ত এই বায়ার্ন তারকা।

অরেলিয়্যাঁ চুয়েমেনি (ফ্রান্স) :ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স কাতার বিশ্বকাপে এসেছে ইনজুরি জর্জরিত এক দল নিয়ে। ফ্রান্সের মিডফিল্ডের দুই প্রধান স্তম্ভ এনগলো কান্তে ও পল পগবা ছিটকে গেছেন বিশ্বকাপ শুরুর আগেই। তাই ফ্রান্সের মধ্যমাঠ সামলানোর দায়িত্ব এসে পড়ে ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে নামা ২২ বছর বয়সী মিডফিল্ডার অরেলিয়্যাঁ চুয়েমেনির ওপর। চলতি মৌসুমেই রিয়াল মাদ্রিদে নাম লেখানো এই ফ্রেঞ্চ মিডফিল্ডার বিশ্বকাপে খেলতে এসেছিলেন মাত্র ১৪টি আন্তর্জাতিক ম্যাচের অভিজ্ঞতা নিয়ে। তবে বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডে চুয়েমেনি নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে মিডফিল্ড নিয়ে ফরাসি দর্শকদের সব দুশ্চিন্তা দূর করে দিয়েছেন। বুদ্ধিদীপ্ত পাস আর দারুণ সব ক্রসে ফ্রান্সের আক্রমণভাগে একের পর এক বল জোগান দিয়েছেন এই রিয়াল মাদ্রিদ মিডফিল্ডার। কাতারে শিরোপা ধরে রাখার মিশনে ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশমের তুরুপের তাস চুয়েমেনি। শারীরিক শক্তির সঙ্গে দুর্দান্ত টেকনিক্যাল স্কিলের কারণে রিয়াল মাদ্রিদের মধ্যমাঠে টনি ক্রুসের যোগ্য উত্তরসূরি ভাবা হচ্ছে দারুণ প্রতিভাবান এই মিডফিল্ডারকে।

এ ছাড়াও কাতার বিশ্বকাপে দ্যুতি ছড়িয়েছেন বা ছড়াচ্ছেন আর্জেন্টিনার জুলিয়ান আলভারেজ, ব্রাজিলের ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, ফ্রান্সের এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গা, ইংল্যান্ডের জুডে বেলিংহাম, ফিল ফোডেন, বুকায়ো সাকা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনুস মুসা, স্পেনের পেদ্রি গঞ্জালেস, আনসু ফাতি, ঘানার মোহাম্মদ কুদুস, ফেলিক্স আফেনা-জিয়ান, মেক্সিকোর মার্সেলো ফ্লোরেস, জার্মানির ফ্লোরিয়ান ভির্টজসহ আরও অনেকেই। া