কোত্থেকে একদল ভূত এসে আশ্রয় নিয়েছে শিমুলতলীর পুরোনো হিজল গাছে। গাছটার নিচ দিয়ে কারও যাওয়ার জো নেই। এমনকি সন্ধ্যার পর গ্রামের কেউ ঘর থেকে বের হলেই পড়ে ভূতের খপ্পরে! এই তো সেদিন শান্তর বাবা শহর থেকে ফিরছিলেন। গ্রামে পৌঁছাতে একটু রাত হয়ে গিয়েছিল। ওমা অমনি সাদা কাপড় পরা এক ভূত তাকে ভেংচি কেটে দিলো। শান্তর বাবা ভয়ে লাগালো ছুট!

গত কালের কথা, রহিমা বু চেয়ারম্যান বাড়ি থেকে কাজ করে বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা গড়িয়ে এলো। বুকে থু-থু দিয়ে হিজল গাছ পেরুতে না পেরুতেই ভূতগুলো ঝিঁঝিঁ পোকার মতো চ্যাঁও চ্যাঁও ডেকে উঠলো। রহিমা বু পড়ি-মরি দৌড় দিতে গিয়ে চেয়ারম্যান বাড়ি থেকে আনা সব খাবার ফেলে এলেন। অথচ রহিমা বুর ছেলেটা ভালো খাবারের আশায় মায়ের পথ চেয়ে বসেছিলো। তার ভাগ্যে আর খাবার জুটলো না!

এভাবে আর চলতে দেওয়া যায় না। তোরা কী বলিস?

অবশ্যই আর চলতে দেওয়া যায় না। অপুর কথায় সহমত পোষণ করলো আবির।

শিগগিরই এর একটা বিহিত করতে হবে- অপু বলে উঠলো।

অপু, আবির, সাকি আর রিহান বিকেলে বসে আছে স্কুল মাঠে।

আবির বলে, কীরে সাকি তুই কোনো কথা বলছিস না কেন? তুই হলি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী।

সাকি বলে, কী করতে চাস?

রিহান বলে, এই বিপদ থেকে শিমুলতলী গ্রামের মানুষকে রক্ষা করতে হবে।

সাকি বলে, আমাদের উচিত শিপলু মামার সঙ্গে দেখা করা। তোরা আমাকে যতই জ্ঞানী বলিস না কেন, শিপলু মামা হচ্ছেন বুদ্ধিমান। বুদ্ধিমান আর জ্ঞানীর পার্থক্য অনেক।

রিহান বলে, যে জ্ঞানী সেই বুদ্ধিমান।

রিহান বলে, মোটেও তা নয়। যিনি জ্ঞানী তিনিই বুদ্ধিমান নন। কেন সেই প্রবাদটি পড়িসনি?

'গ্রন্থগত বিদ্যা আর পরহস্তে ধন।
নহে বিদ্যা নহে ধন হলে প্রয়োজন।'

বইয়ে মুখ গুঁজে পড়ে থাকলে জ্ঞানী হওয়া যায়, বুদ্ধিমান নয় বুঝলি? শিপলু মামা এসএসসিতে ফেল করলেও তিনি অনেক বুদ্ধিমান।

তারপর সবাই দলবেঁধে শিপলু মামার কাছে গিয়ে বললো ভূতের বাড়াবাড়ির কথা। সব শুনে শিপলু মামা বলেন, বিষয়টা নিয়ে আমিও ভেবেছি। তবে পরীক্ষা করছিলাম তোদের ভেতর গ্রামের প্রতি ভালোবাসা আছে কিনা?

আমরা কি পরীক্ষায় পাস, মামা?

অবশ্যই!

তোদের কথা দিলাম, আগামীকাল রাত থেকে গ্রামে কোনো ভূত থাকবে না।

সবাই আশ্বস্ত হলো শিপলু মামার কথায়।

এদিকে শিপলু মামা তার পরিকল্পনা মতো সন্ধ্যা নামতেই হিজল গাছ তলায় গিয়ে বাঁশি বাজাতে থাকলেন।

ভূতেরা তো অবাক। কেউ ভয়ে এখানে আসে না, আর এ গাছ তলায় বসে বাঁশি বাজাচ্ছে লোকটা! ভূতরানী কিছুটা হকচকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, অ্যাঁই মাঁনুষ, তুঁমি এঁখানে বঁসে বাঁশি বাঁজাচ্ছে কেঁনো? শিপলু মামা বলেন, শোনো ভূত, আমি মানুষ হলেও

আমার একটা নাম আছে। আমি শিপলু, আমাকে নাম ধরে ডাকবে; কেমন?

ভূতরানী চমকে গেলেন শিপলু মামার সাহস দেখে। তিনি ফের বলেন, তাঁ শিঁপলু, বাঁশি বাঁজাও কেঁনো; জাঁনো না, আঁমরা শঁব্দে বিঁরক্ত হঁই?

মামা বলেন, এটা যেই সেই বাঁশি না, ভূত ধরা বাঁশি। বাঁশি বাজিয়ে তোমাদের ধরবো। এর আগেও অনেক ভূত বন্দি করেছি। বলতে পারো ভূত ধরাই আমার কাজ! ভূতের ডিমের অমলেট আমার ভীষণ প্রিয়!

ভূতরানী অবাক হয়ে বলেন, তুমি ভূত ধরো?

মামা বলেন, হ্যাঁ, দেখবে?

রানী বলেন, দেখাও।

তাহলে আমার সঙ্গে যেতে হবে কাজল দিঘির পাড়ে- মামা বলেন।

আমি রাজি। এই বলে ভূতরানী ও তার দলবল শিপলু মামার সঙ্গে চললো কাজল দিঘির পাড়ে।

পূর্ণিমা রাত, চাঁদের আলোর পুরোটাই যেন পড়লো কাজল দিঘির টলটলে জলে।

শিপলু মামা দিঘির পাড়ে নিয়ে বলেন, দেখো, ওই দিঘিতে সব ভূত বন্দি করে রেখেছি।

কৌতূহলী হয়ে দিঘির জলে উপুড় হয়ে দেখে ভূতরা। চাঁদের আলোয় দিঘির পানিতে ভূতেরা দেখে তাদেরই অবয়ব। কিন্তু বুঝতে পারে না। মনে করে জলে দেখা যাচ্ছে অন্য কোনো ভূত। ভয়ে ভূতদের মুখ শুকিয়ে আসে। মামা বলেন, কী হলো, এসো

এবার তোমাদের জাদু দিয়ে বন্দি করি দিঘির জলে।

ভূতেরা বলে, না-না; দয়া করো। বন্দি করো না। আমাদের ক্ষমা করো।

শিপলু মামা বলেন, ক্ষমা করা যায় এক শর্তে। আর তা হচ্ছে এক্ষুনি শিমুলতলী গ্রাম ছেড়ে যাবে তোমরা। শর্ত মেনে চটজলদি শিমুলতলী গ্রাম ছাড়ে ভূত বাহিনী।

এরপর থেকে শিমুলতলীর কেউই আর কোনোদিন ভূত দেখেনি!