চারপাশের উঁচু-নিচু পাহাড়, ঝরনা এবং পাহাড়ের ওপর দিয়ে ভেসে যাওয়া ভেজা তুলার মতো মেঘ আপনাকে মুগ্ধতায় ভাসাবে। হঠাৎ বৃষ্টি, ঘন কুয়াশা আপনাকে দেবে অন্যরকম আবেশ। রাঙামাটির সাজেক ভ্যালি যেন স্বপ্নময় স্থান। যেখানে গেলে মনে হয়, হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে মেঘ। লিখেছেন আজহার মাহমুদ

রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার অন্তর্গত সাজেক ইউনিয়নের একটি উপত্যকা সাজেক ভ্যালি। মাটির পাহাড় বেশি বৈচিত্র্যময়। তাই সাজেক ভ্যালি যেমন সবুজ, তেমনি মেঘ মোড়ানো এক উর্বশী। সাজেকের উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা, দক্ষিণে রাঙামাটির লংগদু, পূর্বে ভারতের মিজোরাম, পশ্চিমে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা অবস্থিত। খাগড়াছড়ি থেকে সাজেকের দূরত্ব ৭০ কিলোমিটার। সোজা রাস্তার হিসাব করলে প্রায় ২ ঘণ্টার পথ। কিন্তু এখানকার পাহাড়ি ভয়ংকর পথ অনুযায়ী আরও বেশি লাগবে। আমাদের গাড়িচালকও তেমনটাই বললেন।

খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক যাত্রায় অনুমতিপত্র নেওয়ার জন্য প্রথমে থামতে হবে দীঘিনালায়। সেখানে সেনাবাহিনীর ক্যাম্প আছে। মূলত সেনাবাহিনী পর্যটকদের নিরাপত্তায় দিনে দু'বার পর্যটকদের গাড়ি সাজেকে পৌঁছে দেয়। আমরা প্রায় সাড়ে ৯টার মধ্যেই পৌঁছে যাই দীঘিনালা ক্যাম্পে। সেখানে সেনাবাহিনীর সদস্যদের কাছে তথ্য দিতে হয় এবং একটা অনুমতিপত্র নিতে হয়। সেই অনুমতিপত্র নিয়েছি আমি। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকাটা যে কত বিরক্তির, সেদিন দেখলাম। আমাদের গাড়ি প্রায় ১১টার দিকে ছাড়ল। আমরা গান শুরু করলাম। সবুজে ঘেরা পাহাড়ি রাস্তায় সে এক অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করে। দু'দিকে যতদূর চোখ যায়- শুধু পাহাড় আর পাহাড়। একবার গাড়ি ওপরে উঠে আবার অনেক নিচে নামে। পাহাড়ি উঁচু-নিচু, আঁকাবাঁকা পথ, তার সঙ্গে কিছু ভয়ংকর ওভারটেক মাঝেমধ্যে বুকে কাঁপুনিও ধরিয়ে দেয়। কারণ রাস্তার দু'পাশেই খাদ। এ খাদগুলো কত নিচে গেছে, সেটা অনুমান করা যাবে না।

একসময় আমরা পৌঁছলাম স্বপ্নের সাজেকে। চান্দের গাড়ি থেকে নেমে রিসোর্ট ঠিক না করেই ছবি তুলেছি শুধু। তার পর রিসোর্ট খোঁজা শুরু করলাম। অনেক কষ্টে মোটামুটি মানের একটা রিসোর্ট পেলাম। এই রিসোর্টের অন্যতম সুন্দর আকর্ষণ ছিল বারান্দা থেকে বাইরের ভিউটা উপভোগ করা যায়। ৫ হাজার টাকা দিয়ে তিন বেডের একটা রুম বুকিং দিলাম। আপাতত পাহাড়ে দু'চোখে ভ্রমণের ক্লান্তি দূর করার মিশনে নামলাম। রিসোর্টের ঠান্ডা পানিতে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়লাম দুপুরের খাবার খেতে।

কংলাক ঝরনা :সাজেকে বেড়াতে এসে অনেকেই কংলাক ঝরনায় যেতে ভুলে যান। আবার অনেকেই বিশ্রাম ও সময় স্বল্পতার কারণে যেতে পারেন না। আমরা সেই ভুলটা করলাম না। বিশ্রাম দূরে রেখে পা বাড়ালাম কংলাক ট্রেইলে।

সাজেকের রুইলুইপাড়ার দুই নম্বর হেলিপ্যাড থেকে সোজা নেমে গেলাম ট্রেইল ধরে। পুরো পথটা গহিন বনের মতো! সরু পথটা ক্রমাগত জঙ্গলের দিকে যাচ্ছে। কোনো রকম পা ফেলে ফেলে পথ শেষ করতে হচ্ছে। শরীরটাও সামান্য ক্লান্ত। পুরোটা পথ ঘনজঙ্গল আর বড় বড় গাছে ভরা। পাহাড়ের গায়ে সবুজ আর হলুদ জুম ক্ষেতের দৃশ্য দেখতে বেশ সুন্দর লাগছে। সেই সঙ্গে আকাশের সাদা মেঘের দৃশ্য তো আছেই।

অনেক কষ্টে হাঁটতে হাঁটতে নিচে আসার পর মিলল শীতল জলের ঝিরিপথ। অন্য সব ঝিরির মতো এটাও পাথরে ঠাসা। দীর্ঘ পথ পাহাড় বেয়ে নামার পর ঝিরিটা দেখে মন্দ লাগল না। দুটি পাহাড়ের মাঝখানে বয়ে যাওয়া ঝিরির পথ ধরে কিছুদূর হেঁটে গেলাম। আরও সামনে ছোট-বড় পাথর ডিঙিয়ে পানির স্রোত বয়ে যাচ্ছে ওপর থেকে অনবরত। দু'পাশে জঙ্গলঘেরা গভীর খাড়া পথ বেয়ে উঠছি। কিছুদূর যেতেই কানে এলো ঝরনার তীব্র আওয়াজ। সেই শব্দ হাঁটার গতি যেন বেড়ে গেল আমাদের। উঁচু-নিচু পাহাড় বেয়ে নামতেই বড় পাথর ডিঙিয়ে চোখ পড়ে দীর্ঘ ঝরনার দিকে।

উঁচু পাহাড়ে খাঁজ বেয়ে ওপর থেকে দু'ভাগে পড়ছে ঝরনা। তীব্র শব্দ ঘিরে রেখেছে এই অচেনা পরিবেশ। সুনসান নীরব পাহাড়ের মধ্যে একমাত্র শব্দ যেন এই জলের ধারা। অনবরত ওপর থেকে বয়ে আসা এই পানির স্রোত বন্দি করে নিল সবার নজর। পুরোটা পথের ক্লান্তি দূর করলাম এই জলের স্রোতে। নিচ থেকে ওপরের দিকে তাকাতে ঝরনাটাকে বড়ই বিস্ময় মনে হলো। মেঘে ঢাকা এমন একটা বিস্তৃত ভ্যালির বুকে এমন ঝরনা সত্যিই মনোমুগ্ধকর। পৃথিবীর আলো এখানে খুব কমই পড়ে বলে মনে হয়। বিকেল হতে হতে আলো যেন বিদায় জানাতে থাকল ঝরনার ওপর থেকে। পাহাড়ের দেয়াল আটকে দিচ্ছে সূর্যের আলোকরশ্মি। আলোর সময় ফুরানোর আগেই এই দীর্ঘ ঝরনাকে পেছনে ফেলে রওনা হলাম।

সাজেকের রাত :ফিরতে ফিরতে সূর্য বিদায় নিয়েছে। সূর্য অস্ত যাওয়াটাও দেখতে পেয়েছি। বেশ সুন্দর একটা দৃশ্য। এর পর আমরা সাজেকের ১ নম্বর হেলিপ্যাডে বসলাম। সময় যত গড়ায়, হেলিপ্যাডে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। সেই সঙ্গে মশার পরিমাণও বাড়তে থাকে। ঠান্ডা আবহাওয়ায় হেলিপ্যাডে বসে থাকতে বেশ ভালো লাগছে। তবে অল্প সময় পর আমরা সবাই মিলে চা পান করলাম। বাঁশের চা বলে এটাকে। পান করলাম, তবে খুব একটা যে স্বাদ পেয়েছি তা নয়। এর পর আমরা ঠিক করলাম আমরা ব্যাম্বু চিকেন খাব। তাই অর্ডার দিলাম একটা হোটেলে। ঘণ্টা দুয়েক পর বোধ হয় আমরা খাবারটা পেয়েছিলাম। অসাধারণ একটা খাবার ছিল। এখনও মুখে লেগে আছে সেটা।

এর পর আমরা আবারও হেলিপ্যাডে গিয়ে বসলাম। প্রায় রাত ৯টা বাজে। হেলিপ্যাডে মানুষ অনেক। সবাই গোল করে বসে আড্ডা দেন আর গান করেন। আমরাও কিছু সময় বসে ছিলাম। যাঁরা গাচ্ছেন তাঁদের গান শুনছিলাম। এটাও এক অন্যরকম অনুভূতি। আড্ডা দিতে দিতে রাত ১২টা পেরিয়ে গেল। রাতের সাজেক এক অন্যরকম সৌন্দর্য। সব ভ্রমণপ্রিয়রা রাতে একে একে বেরিয়ে আসছেন রুম থেকে। কারও হাতে গিটার, কেউ আবার প্রিয়জনের হাত ধরে হাঁটছেন। কেউ হইচই, কেউ গান, কেউ আড্ডা দিচ্ছেন। হেলিপ্যাডে দাঁড়িয়ে আনমনে পাহাড়ের গভীর খাদের দিকে তাকিয়ে থাকতেও অদ্ভুত সুন্দর লাগছে।

সাজেকের সকাল :সাজেকের ভোরের সঙ্গে কোনো কিছুরই তুলনা হয় না। সারারাত আড্ডা দিয়ে ভোর সাড়ে ৪টার দিকে হেলিপ্যাডে গিয়ে অবস্থান করলাম। হেলিপ্যাডে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে হিমশীতল একরাশ বাতাস এসে ছুঁয়ে যায়। শরীর, স্নিগ্ধ করে মন। কুয়াশার চাদরে পাহাড় যেন নিজেকে লুকানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু পাহাড় পারে না তার সৌন্দর্য লুকাতে। কুয়াশা ভেদ করে চোখ খুঁজে নেয় তার সৌন্দর্য। সেই সঙ্গে মেঘের সাদা ভেলা যেন আমাদের হাতের কাছে চলে আসবে। নিজ চোখে না দেখলে সেটা বুঝানো মুশকিল। সূর্য উদিত হওয়ার দৃশ্যটাও সুন্দর। তাই দাঁড়িয়ে রইলাম তার অপেক্ষায়। চারদিকে দেখতে থাকলাম প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য। এভাবে কেটে গেল বেশ কিছুক্ষণ। সূর্যিমামা উঠে পড়ল। তার রক্তিম আলো পাহাড়ের গায়ে পড়তেই আড়মোড়া ভাঙে সবুজ পাহাড়। হেসে ওঠে সূর্যের সঙ্গে। কী অদ্ভুত দৃশ্য!

ভ্র ম ণে র টু কি টা কি
কীভাবে যাবেন?
প্রথমে খাগড়াছড়ি :আপনি যদি ঢাকা থেকে আসেন তাহলে শান্তি, হানিফ, এস আলম, শ্যামলী, ইকোনো এবং ঈগল পরিবহনের এসি বা নন-এসি বাসে চড়ে সরাসরি খাগড়াছড়ি আসতে পারবেন। বাসভেদে জনপ্রতি ভাড়ার পরিমাণ নন-এসি ৫২০ টাকা এবং এসি ৮৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। চট্টগ্রাম থেকে যেতে চাইলে চট্টগ্রামের অক্সিজেন মোড় থেকে বিআরটিসি ও শান্তি পরিবহনের বাস খাগড়াছড়ি ছেড়ে যায়। সকাল ৭টা থেকে শান্তি পরিবহনের বাস ১-২ ঘণ্টা পরপর ছেড়ে যায়। এ ছাড়া বেশ কিছু লোকাল বাসও খাগড়াছড়ি যায়। নন-এসি এসব বাসের ভাড়া ১৮০ থেকে ২৫০ টাকার মধ্যে। চট্টগ্রাম থেকে যেতে সময় লাগবে ৪-৫ ঘণ্টা।

খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক :জিপ সমিতি ও পার্বত্য যানবাহন মালিক কল্যাণ সমিতি কর্তৃক খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক যাওয়ার ভাড়ার তালিকা করেছে। সেখানে সাজেক দিনে গিয়ে দিনে ফিরে আসার গাড়ি ভাড়া নিচ্ছে ৬ হাজার টাকা। পিকআপ ও চাঁদের গাড়ি উভয়ের ভাড়া একই। তবে সাজেকে এক দিন রাত যাপন করে ফিরতে গেলে পিকআপের ভাড়া ৮ হাজার ৩০০ এবং চাঁদের গাড়ির ভাড়া ৭ হাজার ৭০০ টাকা। সাজেকে দু'দিন রাত যাপন করে ফিরতে গেলে পিকআপের ভাড়া ১১ হাজার ১০০ এবং চাঁদের গাড়ির ভাড়া ৯ হাজার ৬০০ টাকা পড়বে। এ ছাড়া আপনি যদি একা কিংবা দু-তিনজন হন তাহলে খাগড়াছড়ি শাপলা চত্বর থেকে অনেক গ্রুপ পাওয়া যায়, সেখানে অন্য গ্রুপের সঙ্গে কথা বলে তাদের সঙ্গে শেয়ার করে যেতে পারবেন অথবা জিপ সমিতির অফিসে গেলে তারা ম্যানেজ করে দেবে অন্য কোনো গ্রুপের সঙ্গে।

কোথায় খাবেন :সাজেকে এখন ভালো খাবারের হোটেল এবং রেস্টুরেন্ট আছে। আদিবাসীদের পরিচালিত বিভিন্ন দোকানও রয়েছে। প্রায় সব ধরনের খাবার সেখানে পাবেন। তবে মানভেদে দামের তারতম্য আছে।

কোথায় থাকবেন : সাজেকে থাকার কটেজ, রিসোর্ট সহজেই পাওয়া যায়। তবে আপনি যদি শীত এবং ছুটির সময় যান, তখন আগে থেকে বুকিং করে যেতে হবে। অনেক সময় বুকিং করে না গেলে রুম পাওয়া যায় না। পাওয়া গেলেও দাম যা হাঁকাবে, তা আপনার পুরো ভ্রমণের বাজেটেও হবে না।