গ্রামের বাড়ি বরিশাল। নাম সুবাস বাবু। কারওয়ান বাজারে দুই দশক ধরে ফুটপাতে জ্বালানি কাঠের লাকড়ি বিক্রি করেন। এলাকার একজনের মাধ্যমেই এখানে আসেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলে লিখছেন ফরিদুল ইসলাম নির্জন

কাঠের লাকড়ি বিক্রির কথা মাথায় কীভাবে এলো?
এলাকাতে কৃষিজমি চাষ করতাম। তা দিয়ে ভালোভাবে চলতে পারতাম না। ভাবতাম কিছু একটা করা দরকার। কিন্তু কী করব, তা বুঝে উঠতে পারছিলাম না। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পরামর্শ করি। তাঁরা ঢাকায় আসার কথা বলেন। কিন্তু কোনো পরিচিত ছাড়া ঢাকায় এসে কী করব। তারপর খুঁজতে খুঁজতে মনে পড়ে একজনের কথা। আমাদের এলাকার একজন লোক কারওয়ান বাজারে লাকড়ির ব্যবসা করতেন। তাঁকে ফোন দিয়ে মনের সব দুঃখের কথা বলি। তিনি আমাকে ঢাকায় আসতে বলেন। আমি ঢাকায় চলে আসি। অনেক স্বপ্ন নিয়েই আসি। সিনেমাতে দেখতাম ঢাকায় টাকা ওড়ে। আমি সেই টাকা ধরার জন্য আসি। কিন্তু প্রথমে এসেই হতাশ হই। যার মাধ্যমে আসি, আমাকে রেখে তিনি চলে যান। এলাকা থেকে এসেছি টাকা আয়ের জন্য। এখন ফিরে যাওয়া ঠিক হবে না। যেভাবে হোক টাকা আয় করতে হবে। নিজেই সিদ্ধান্ত নিই, লাকড়ি ব্যবসা করব। ধীরে ধীরে শুরু করি।

ঢাকা নগরীতে বেশিরভাগ গ্যাসে রান্না হয়। তাহলে আপনার এই লাকড়ি কারা ব্যবহার করেন?
এটা সঠিক। বেশিরভাগ গ্যাসে রান্না হয় ঢাকা শহরে। বিয়ে বাড়ি বা যেকোনো বড় অনুষ্ঠানে লাকড়ি দিয়ে রান্না করে থাকেন অনেকে। তাঁরা মূলত এটা কেনেন। ঢাকা শহরে এমন অনেক জায়গায় অনুষ্ঠান হয় প্রতিদিন। যেখানে এই লাকড়ির দরকার হয়। পরিচিত হওয়ার কারণে বিভিন্ন মানুষ আগে থেকেই অর্ডার দেন। তাঁদের অর্ডার অনুযায়ী সরবরাহ করে থাকি।

প্রতিদিন যা বিক্রি হয় তা দিয়ে সংসার চালাতে পারেন?
প্রতিদিন বিক্রি হয় না। সপ্তাহে তিন দিন, কখনও চার দিন। তবে সিজনের সময় বেশি চলে। বিয়ে, শিক্ষা সফর, আকিকাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সরবরাহ করে থাকি। আয় হয়, তবে আগের মতো নয়। কয়েক মাস অসুস্থতার জন্য ব্যবসা বন্ধ রাখি; যা পুঁজি ছিল চিকিৎসা করতেই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু জীবনযাপনের জন্য তো টাকা দরকার। পরিবারকে কী খাওয়াব, সন্তানদের কীভাবে পড়াশোনার জোগান দেব? তাই অসুস্থ শরীর নিয়েই বসে থাকি কিছু আয়ের জন্য।

আপনার সংসারে সদস্যসংখ্যা কতজন? তাঁরা কোথায় থাকেন?
দুই ছেলে, এক মেয়ে। এক ছেলে অনার্সে পড়ে। বউ ও সন্তান সবাই গ্রামের বাড়িতে থাকে। কারণ যা আয় করি, তা দিয়ে এই শহরে থাকা সম্ভব নয়। এই শহরে পরিবার নিয়ে থাকতে গেলে কুঁড়েঘর ভাড়া নিয়ে থাকতে হবে। কিন্তু এই শহরে তো কেউ কুঁড়েঘর ভাড়া দেবে না। তাই নিজে মেসে থাকি। কষ্ট করি নিজেই। সন্তানদের পড়াশোনা করাই। তারা উচ্চশিক্ষা শেষে চাকরি করুক। আমার মতো যেন এমন রাস্তায় লাকড়ি বিক্রি না করতে হয়। সবাইকে সুখে রাখার জন্য বরিশালে রেখেছি, নিজে এখানে কষ্ট করি।

আপনি কোথা থেকে সংগ্রহ করেন এই লাকড়ি?
শহরের অনেক জায়গা থেকে মানুষ আসেন। কেউ ফার্নিচারের ওয়ার্কশপ, কোথাও দালানকোঠা তৈরির পর বাতিল হওয়া টুকরা কাঠ এভাবেই বিক্রি করতে আসেন। তখন আমি ক্রেতা হয়ে কিনে নিই। এসব কিনে বেশি লাভবান হওয়া যায়। কিন্তু অন্য দোকান থেকে কিনে লাভ কম হয়। তাঁরা দাম একটু বেশি ধরেন। সবসময় তো আর বাসা থেকে বিক্রি করতে আসেন না কেউ।
তাই লাভ কম হলেও বাধ্য হয়েই দোকান থেকে কিনতে হয়।

ক্রেতাদের সঙ্গে একটি স্মরণীয় ঘটনা...
অনেক ঘটনা হয়। তার ভেতর মনে পড়ে একটি ঘটনা। তা হলো- বাকিতে লাকড়ি বিক্রি। একটা বিয়ের অনুষ্ঠান। বাবুর্চি অনেক লাকড়ি অর্ডার করেন। পরিচিত বাবুর্চি ছিলেন। তিনি এসে বেশি লাকড়ি নিয়ে যান। অর্ধেক টাকা বিয়ের অনুষ্ঠানের পরে দেবেন। আমি সরলমনে দিয়ে ফেলি। যেদিন নেন তার কয়েকদিন পরও তিনি পাওনা টাকা দেওয়ার জন্য আসেন না। আমি ফোন দিই, তিনি ধরেন না। তাঁকে মুখে চিনলেও বাসা তো চিনি না। আমার যে আয়, তার ভেতর থেকে কেউ এভাবে প্রতারণা করলে চলব কীভাবে। ফোন না ধরাতে কেঁদে ফেলি। কয়েকদিন পর লোকটি আসেন। জানা যায়, বিয়ে নিয়ে একটা গন্ডগোল হয়। পরে তাঁকে থানাতে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। তাই তিনি আসতে পারেননি। ছাড়া পেয়ে চলে এসেছেন তার কাছে। পরে অবশ্য তিনি সব টাকা পরিশোধ করেছেন।

সবশেষে যা বলতে চান?
সবশেষে বলতে চাই, সবাই ভালো থাকুক। আমার সন্তানগুলো সবাই যেন শিক্ষিত হয়ে চাকরিতে যোগদান করে। আমি যেন এলাকায় সবার কাছে ফিরে যেতে পারি। সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে পারি।