এই দু’বছর আগেও বাবিকে বলতাম, তুই যেদিন কথা বলবি, সেদিন আমি আর কারও সঙ্গে কথা বলব না। আমরা মা-ছেলে আমাদের এতদিনের জমানো গল্পগুলো করব। বাবির বয়স আজ ১২ বছর। বাবির কথা কয়েকটা শব্দ বলার পর আর এগোয়নি। আমার আশা আস্তে আস্তে স্তিমিত হয়ে এসেছে। তবু প্রতিদিন আমরা দু’জন ঘুমানোর আগে নিজের ভাষায় গল্প করি। আমি কথা বলি, বাবি হাসে। নিজের বালিশটা মায়ের বালিশের সঙ্গে মিশিয়ে নেয়। কপালটা মাকে এগিয়ে দেয় চুমু দেওয়ার জন্য। তারপর মায়ের কোলের মধ্যে ঢুকে ঘুমিয়ে পড়ে। আমার চোখ টলটল করে ওঠে প্রতিদিন। ভাবতে থাকি– আমি যখন প্রেগন্যান্ট ছিলাম, তখন ব্যালকনিতে বসে দেখতাম। টুইন বাচ্চা পেটে নিয়ে ৯ মাস বাসাতেই ছিলাম। সামনের বাড়িটাতে ‘আলোকিত শিশু’ বলে একটা স্পেশাল স্কুল ছিল। সেখানে মায়েরা তাদের বাচ্চাদের নিয়ে আসতেন। বসে বসে দেখতাম, কথা বলতাম। তখনও ভাবিনি আমাকেও বসতে হবে এমন অনেক স্কুলের বারান্দায়।

ভেবেছিলাম যুদ্ধটা জিতে গিয়েছি আমি। পাঁচ বছরের চিকিৎসার পর জন্ম হয়েছিল বাবি আর তিস্তার। জন্মের পর যখন বাবিকে সামনে নিয়ে এলো নার্স কুমুদিনি দি, তখন ও চোখ কুঁচকে তাকিয়েছিল। মনে হলো আমাকে বলছে, মা আমি তো তোমার মধ্যে ঘুমাচ্ছিলাম কেন ডেকে তুললে আমাকে এ অসময়ে! আমি ওর নাম রেখেছিলাম অনিন্দ্য অরুণাভ। নামটা কেবল স্কুলের খাতায় আর জন্মসনদে। আমিও মাঝে মধ্যে ভুলে যাই। মায়ের আদরের বাবি হয়েই থাকবে সে। এত একটা ভালো নামের তার আর দরকার হবে না।

জন্মের সময় এত ফুটফুটে ছিল যে, বিশ্বাসই হতো না সে আমার ছেলে। মনে হতো এই দেবশিশু আমার কাছে কয়েকদিনের জন্য থাকতে এসেছে। কখনও কোনোদিনও তাকে কাজলের টিপ পরাইনি আমি। মা বলতেন, অন্তত পায়ের নিচে একটু কাজল দিয়ে রাখ। না, তাও রাখিনি। বোনের চেয়ে আগেই সে হাঁটতে শিখেছিল। দাঁত যেদিন দেখলাম বিশ্বাসই হয়নি বাবির দাঁত উঠেছে। একদিন নখ কাটতে গিয়ে একটু রক্ত বেরিয়েছিল। কষ্টটা মনে আছে এখনও। প্রথম যেদিন টিকা দিল– দেখিনি আমি। তারপর শরীরে কত দাগ নিয়ে সে স্কুল ফিরেছে। নিজেও মেরেছি অনেকবার। তার শরীরের লাল দাগগুলো আমার বুকে একটা একটা স্থায়ী ক্ষত তৈরি করেছে। এর কোনো নিরাময় নেই, উপশম নেই। মাঝে মধ্যেই সেখান থেকে রক্ত ঝরে।
এই তো গত সপ্তাহে ওর বাবা মেয়ে তিস্তাকে নিয়ে কক্সবাজার গেল। দু’জন যখন বের হলো, বাবিও তখন যাওয়ার জন্য বের হলো। টেনে ভেতরে এনে দরজা বন্ধ করলাম। তারপর দুটো দিন স্তব্ধ। মেয়ের পাঠানো হাসিমুখের ছবি আমাকে বিহ্বল করে দিয়েছে। মেয়ের হাসিমুখ দেখে আমার তো খুশি হওয়া উচিত। ও কত আনন্দ করছে! ও তো যায় না কত জায়গায় ভাইয়ের জন্য।

বাবি একেবারে হতাশ করেনি আমাকে– নিজে নিজে টয়লেটে যাওয়া, জামাকাপড় সে পরতে শিখেছে। আর শিখেছে সারাটা দিন স্কুল ও স্পেশাল টিচারের সময়ের বাইরে কম্পিউটারে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে। কম্পিউটারের অ্যাড আর রান্নার রেসিপির সঙ্গে ওর কান্না-হাসি চলে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটায় ওখানে। ও জানে মা-বাবা, বোনকে একটু সময় দিতে হবে। তাদের আরও অনেক কাজ আছে।

বাবি বড় হচ্ছে। আমাদেরও বয়স হচ্ছে। আমাদের এই কান্না-হাসির দোল দোলানো পৌষ-ফাগুনের পালা একদিন ফুরোবে। তখন কে থাকবে বাবির জন্য? কে দেখবে? যে দেশ, সমাজে আমরা বাস করি সেখানে ওর মতো অবুঝ শিশু কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে! সরকারি বা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান আছে এমন! না নেই। আমাদের মতো মা-বাবাকে একটু শান্তি দিতে পারে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। আমি সরকার ও ব্র্যাকের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানকে আহ্বান জানাচ্ছি, প্রাপ্তবয়স্ক অটিস্টিক মানুষের জন্য আবাসিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার। কেবল ব্যক্তি উদ্যোগ এ ধরনের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান চালানোর মতো যথেষ্ট নয়।

বাবি এখন যে স্পেশাল স্কুলে যায়, সেখানে ভর্তি করে বাবির শিক্ষককে বলেছিলাম, ওকে শুধু ভালোবাসবেন। দেখবেন কেউ যেন আঘাত না করে। আমার আর কোনো প্রত্যাশা নেই। সত্যি আর কোনো প্রত্যাশা নেই। কেবল আমি যখন থাকব না, তখন যেন বাবির মাথার ওপর একটা ছাদ থাকে, একটা মেঘের ছায়া থাকে। আর কেউ যেন আঘাত না করে।