প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে দেশব্যাপী গণটিকাদান কার্যক্রম আজ শনিবার শুরু হচ্ছে। কর্মসূচি আগেই ঘোষণা করা হলেও এরই মধ্যে দুটি পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রথমে এক কোটি মানুষকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য ঘোষণা করা হলেও তা দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি কমিয়ে ৩২ লাখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ছয় দিনব্যাপী এ কার্যক্রমে ১৮ বছর ও তার বেশি বয়সী সবাইকে টিকাদানের আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু নতুন লক্ষ্যমাত্রা ২৫ বছর ও তার বেশি বয়সীরা টিকা পাবেন।

সারাদেশে চার হাজার ৬০০ ইউনিয়ন, এক হাজার ৫৪টি পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশনের ৪৩৩টি ওয়ার্ডে ১৫ হাজারের বেশি কেন্দ্রে এই বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি চলবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রতি কেন্দ্রে দিনে ৬০০ ডোজ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের কেন্দ্রে দিনে ৪০০ থেকে ৬০০ ডোজ করে টিকা দেওয়া হবে। নির্ধারিত কেন্দ্রগুলোতে গতকাল শুক্রবার বিকেলের মধ্যে টিকা পৌঁছে গেছে।

সংশ্নিষ্টদের মতে, গণটিকাদান কার্যক্রম নিয়ে সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ টিকা উৎপাদন করে না। পুরোটাই আমদানিনির্ভর। সুতরাং চুক্তি অনুযায়ী টিকা না পেলে কার্যক্রম হোঁচট খেতে পারে। ভারত থেকে চুক্তি অনুযায়ী টিকা না পেয়ে সংকট তৈরি হয়েছিল। কোভ্যাক্সও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী টিকা দেয়নি। সুতরাং ভবিষ্যতেও এ ধরনের সংকট হতে পারে। এ কারণে মজুদ থাকার ওপর ভিত্তি করে টিকাকরণের পরিকল্পনা গ্রহণ করছে সরকার।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেছেন, এই টিকাকরণ একটি পাইলট প্রকল্প। নিজেদের সক্ষমতা যাচাই করা যাবে। কারণ, দেশে ১৪ কোটি মানুষকে টিকার আওতায় আনতে হলে ব্যাপকভিত্তিক টিকাকরণ করতে হবে। এতে স্বাস্থ্য বিভাগ কতটুকু সক্ষম, তা বোঝা যাবে।

এদিকে, চলমান টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে সরকারের সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এক সপ্তাহে ১৮ বছর ও তার বেশি বয়সী এক কোটি মানুষকে টিকাকরণের ঘোষণা দিয়েছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তা কমিয়ে ৩২ লাখ করা হলো। বয়সসীমায়ও পরিবর্তন আনা হলো। টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রায় পরিবর্তন আনার বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। আবার এক মন্ত্রী ১৮ বছর বয়সীদের টিকা ছাড়া চলাচল অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে বলে বক্তব্য দিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে সংশ্নিষ্টদের পরিকল্পনা ও সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট হয়েছে। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে টিকাদান কর্মসূচি হোঁচট খেতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে পূর্ব অভিজ্ঞতা ভালো নয়। বিশেষ করে চুক্তি অনুযায়ী ভারত থেকে টিকা আসেনি। এতে করে টিকাদান কর্মসূচি হোঁচট খায়। প্রথম ডোজ পাওয়া সাড়ে ১৩ লাখের মতো মানুষের দ্বিতীয় ডোজের টিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ওই অভিজ্ঞতার কারণে টিকা নিয়ে সরকার ঝুঁকি নিতে চাইছে না। বর্তমানে এক কোটি ডোজের মতো মজুদ আছে। এক সপ্তাহে এক কোটি মানুষকে সেই টিকা দিয়ে দিলে তাদের দ্বিতীয় ডোজের প্রয়োজন হবে। কিন্তু সময়মতো টিকা না এলে আবার অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। এ কারণে মজুদ থাকা টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ সমন্বয় করে ছয় দিনে ৩২ লাখ মানুষকে টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে চলতি সপ্তাহে টিকার বড় অঙ্কের একটি চালান আসবে।

টিকা দেওয়া হবে যেভাবে :গতকাল রাজধানীর মহাখালীর বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস (বিসিপিএস) মিলনায়তনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে গণটিকাদান কর্মসূচির বিস্তারিত জানাতে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম টিকাদানের নতুন রোডম্যাপ ঘোষণা করেন। সে অনুযায়ী, আজ শনিবার দেশের সব ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে টিকাদান কার্যক্রম শুরু হবে। আগামীকাল রোববার ও পরদিন সোমবার ইউনিয়নের যেসব ওয়ার্ডে শনিবার টিকাদান চালু ছিল, সেসব ওয়ার্ড ও পৌরসভার বাদ পড়া ওয়ার্ডে টিকা দেওয়া হবে। তবে আজ শনিবার থেকে সোমবার টানা তিন দিন সিটি করপোরেশন এলাকায় টিকাদান কার্যক্রম চলবে। আগামী রবি ও সোমবার দুর্গম এবং প্রত্যন্ত এলাকায় টিকাদান কার্যক্রম চলবে। আগামী মঙ্গল, বুধ ও বৃহস্পতিবার ৫৫ বছরের বেশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে টিকাদান কার্যক্রম চালানো হবে। টিকাদান কার্যক্রমে ৩২ হাজার ৭০৬ টিকাদানকারী ও ৪৮ হাজার ৪৫৯ স্বেচ্ছাসেবী যুক্ত থাকবেন।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে টিকাদানের পরিসর বৃদ্ধির কথা জানিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, এরই অংশ হিসেবে আগামী ৭ থেকে ১২ আগস্ট ছয় দিনে সারাদেশের ১৫ হাজারের বেশি টিকাদান কেন্দ্রে প্রায় ৩২ লাখ মানুষকে প্রথম ডোজের টিকা দেওয়া হবে। ইউনিয়ন, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন এলাকায় ছয় দিনের বিশেষ ক্যাম্পেইনের টিকাদান আলাদাভাবে পরিচালিত হবে। পঁচিশোর্ধ্ব যারা নিবন্ধন করতে পারেননি, তারাও এ সময় টিকা নিতে পারবেন। ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সী জনগোষ্ঠী, নারী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনগোষ্ঠী এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন।

বয়সসীমা ও টিকাদানের সংখ্যার পরিবর্তন সংক্রান্ত সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মহাপরিচালক বলেন, ১৮ বছর বয়সীদের অধিকাংশের জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। এতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। তাই টিকাদানের বয়স ১৮ বছর না করে ২৫ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সীরা যারা আগে থেকে সুরক্ষা ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করেছেন, তারা নিবন্ধিত কেন্দ্রে গিয়েই এসএমএস পাওয়ার ভিত্তিতে টিকা নিতে পারবেন।

মহাপরিচালক বলেন, টিকার বৈশ্বিক জোট ও টিকা উৎপাদনকারী বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশেও টিকা উৎপাদনের প্রস্তুতি চলছে। সুতরাং টিকা নিয়ে সংকট হবে না।

অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, দেশে ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ১৪ কোটি মানুষকে টিকা দিতে হবে। সুতরাং এত সংখ্যক মানুষকে টিকা দিতে হলে বড় আকারে ক্যাম্পেইন করে উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে হবে। অন্যথায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে সবাইকে টিকাদান সম্ভব হবে না।

সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানাসহ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সমন্বয়ে টিকাদান কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে গঠিত টাস্কফোর্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কভিড-১৯ টিকাদানে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের চেয়ে বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে।

সমন্বয়ের তাগিদ বিশেষজ্ঞদের :বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, সংবাদ সম্মেলন করে এক সপ্তাহে এক কোটি মানুষকে টিকা দেওয়ার কথা বলা হলো। কিন্তু এখন সেটি কমিয়ে ৩২ লাখে আনা হলো। তাহলে আগে ওই ঘোষণা কেন দেওয়া হয়েছিল? কেন পরিকল্পনা করা হয়নি? এসব প্রশ্ন উঠবে। আবার এক মন্ত্রী বললেন, টিকা ছাড়া চলাফেরা করা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। সরকার কী সব নাগরিকের টিকা নিশ্চিত করতে পেরেছে? তাহলে এ ধরনের অবান্তর বক্তব্য কেন দেওয়া হলো?

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ সমকালকে বলেন, সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া কোনো কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। কী পরিমাণ টিকার মজুদ আছে, কী পরিমাণ টিকা আসবে- এর আলোকে টিকাদান পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। কিন্তু আগে থেকে ঘোষণা দিয়ে পরে পিছিয়ে যাওয়া, সঠিক পরিকল্পনার মধ্যে পড়ে না। এ ধরনের ঘটনা জনমনে ভুল বার্তা দেবে। সুতরাং সংশ্নিষ্টদের মধ্যে আরও সমন্বয় প্রয়োজন।

সরকারের কেনা, উপহার পাওয়া এবং কোভ্যাক্সের মাধ্যমে পাওয়া টিকা মিলিয়ে এ পর্যন্ত দেশে এসেছে দুই কোটি ৫৬ লাখ ৪৩ হাজার ৯২০ ডোজ টিকা। সরকারের টিকাদান টাস্কফোর্সের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৪০ শতাংশ নাগরিককে টিকা দিতে ১৩ কোটি ১৮ লাখ ডোজ, ৬০ শতাংশকে টিকা দিতে ২০ কোটি ডোজ এবং ৮০ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে টিকা দিতে ২৮ কোটি ডোজ টিকা লাগবে। কিন্তু সরকার এখন পর্যন্ত ২১ কোটি ডোজ টিকা নিশ্চিত করতে পেরেছে বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টিকাদান টাস্কফোর্সের এক সদস্য সমকালকে বলেন, দেশে যে হারে টিকাদান কার্যক্রম চলছে, তাতে চলতি বছরের মধ্যে ২০ শতাংশ জনগোষ্ঠী টিকার আওতায় আসতে পারে। এই হারে কর্মসূচি চললে নির্ধারিত জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনতে আরও তিন বছর লাগবে।

বর্তমানে দেশে অ্যাস্ট্রাজেনেকা, মডার্না, ফাইজার ও সিনোফার্মের টিকা দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটির দুই ডোজ করে নিতে হচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রথম ডোজ নিয়েছেন এক কোটি ২৮ লাখ ৯ হাজার ৭৯৭ জন। প্রথম ডোজ গ্রহণকারী ব্যক্তিদের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন ৪৪ লাখ ৪৩ হাজার ৫১৭ জন।