'আবারও গোল করতে চাই'

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০১৯     আপডেট: ০৯ অক্টোবর ২০১৯      

...

বাবা ইনসন ভূঁইয়া, মা রাজিয়া বেগমের জন্ম বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জে। কিন্তু তারা পাড়ি জমিয়েছেন ডেনমার্কে। যখন তিন বছর, তখন পরিবারের সঙ্গে ১৯৯৫ সালে প্রথমবার কিশোরগঞ্জে এসেছিলেন জামাল ভূঁইয়া। ছোটবেলা থেকে ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা ছিল জামালের; কিন্তু বাবা-মা চেয়েছিলেন ছেলে চিকিৎসক কিংবা আইনজীবী হোক। সেটা হননি জামাল। হয়েছেন ফুটবলার। অথচ এই ফুটবলার জামালকে নাও পেতে পারত বাংলাদেশ। ১২ বছর আগে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে দুর্বৃত্তের গোলাগুলির মধ্যে পড়ে চারটি গুলি লেগেছিল জামাল ভূঁইয়ার বুকে। গুলির আঘাতে গুরুতর আহত জামাল ভাবতে পারেননি আবারও পৃথিবীর আলো দেখবেন। তবে সৃষ্টিকর্তার কৃপায় সেই যাত্রায় বেঁচে যান জামাল। তার বেঁচে ফেরাটাই আশীর্বাদ হয়ে আসে বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য। গত বছর এশিয়ান গেমসে কাতারের বিপক্ষে তার করা গোলেই দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠে ইতিহাস গড়েছিল বাংলাদেশ। আগামীকাল বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে সেই কাতারের মুখোমুখি লাল-সবুজের দলটি। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার অনুশীলন শেষে বাংলাদেশ অধিনায়ক ২০২২ বিশ্বকাপের আয়োজক কাতার ম্যাচ ছাড়া আরও অনেক কিছু নিয়ে একান্ত কথা বলেছেন সমকালের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাখাওয়াত হোসেন জয়

প্রশ্ন :এশিয়ান গেমসে কাতারের সঙ্গে আপনার গোলেই ইতিহাস গড়েছিল বাংলাদেশ। আবারও সেই কাতারের মুখোমুখি হচ্ছে বাংলাদেশ।

জামাল ভূঁইয়া :কাতার এখন এশিয়ার মধ্যে এক নম্বর দল। সবাই জানে, এটা সবচেয়ে বড় ম্যাচ। ফুটবলাররা উন্মুখ হয়ে আছে এই ম্যাচটি খেলার জন্য। আমরা প্রস্তুতিও নিচ্ছে সেভাবে।

প্রশ্ন :কাতারের সঙ্গে ঐতিহাসিক জয়ের কারিগর জামাল। ১০ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে সেই জামালকে কি আবারও দেখা যাবে?

জামাল ভূঁইয়া :আমি আবারও কাতারের সঙ্গে একটা গোল করতে চাই। শেষ বছর একটা ঐতিহাসিক গোল করেছি, তাই সেটার পুনরাবৃত্তি করতে চাইছে। আরেকটি ইতিহাসের সাক্ষী হতে কে না চায়? আমার যেমন স্বপ্ন, তেমনি দলের সবারও একই স্বপ্ন।

প্রশ্ন :রক্ষণভাগের তিনজন ফুটবলার ইনজুরিতে। কাতার খেলে আক্রমণাত্মক ফুটবল। সবকিছু মিলিয়ে কাতারকে থামানোর জন্য কী পরিকল্পনা আমাদের?

জামাল ভূঁইয়া :পরিকল্পনা হচ্ছে কাউন্টার অ্যাটাকে খেলব। আমাদের মূল কাজ হলো ডিফেন্স লাইন ঠিক রাখা। এরপর সুযোগ বুঝে কাউন্টার অ্যাটাক করা। কাতারের মতো দলের বিপক্ষে আপনি সুযোগ দু-তিনটির বেশি পাবেন না। আমি মনে করি, প্রথম সুযোগেই গোল করা উচিত। তারা অনেক শক্তিশালী। ভারতের বিপক্ষে তারা লক্ষ্যে ২৯টি শট নিয়েছে। সবাই জানে, তারা আমাদের ওপর অনেক চাপ প্রয়োগ করে খেলবে। তবে এটা আমাদের হোম গ্রাউন্ড, পরিচিত মাঠ। আর ওরা তো একদিন আগে আসবে। ওরা ক্লান্ত থাকলে আমাদের জন্য ভালো হবে।

প্রশ্ন :যদি ম্যাচের আগে বৃষ্টি হয়, যেমনটি হয়েছিল ভুটানের বিপক্ষে ম্যাচে।

জামাল ভূঁইয়া :বৃষ্টি হলে অবশ্যই আমাদের জন্য সুবিধা হবে। কারণ কাতার সবসময় ভালো মাঠে খেলতে অভ্যস্ত। আমি মনে করি, মাঠ ভেজা থাকলে আমাদের জন্য ভালো হবে।

প্রশ্ন :সবাই জানে কাতারকে হারানো কঠিন। তার পরও একজন অধিনায়ক হিসেবে আপনার লক্ষ্য কী?

জামাল ভূঁইয়া :অবশ্যই জয়। তবে যদি এক পয়েন্ট পাই, তাহলে সেটা অবশ্যই ভালো হবে। আসলে কোচ আমাদের যেভাবে অনুশীলন করাচ্ছেন এবং যে পরিকল্পনাগুলো সাজাচ্ছেন, আমরা যদি মাঠে সেগুলোর প্রয়োগ ঠিকমতো করতে পারি, তাহলে কাতারের বিপক্ষে ভালো কিছুরই সম্ভব।

প্রশ্ন :আপনি দলীয় অধিনায়ক। কাতার ম্যাচ নিয়ে সতীর্থদের সঙ্গে কী আলোচনা হয়?

জামাল ভূঁইয়া :আমি আগেও বলছি বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য এটা বড় একটা ম্যাচ। কাতার ২০২২ বিশ্বকাপের আয়োজক। তারা সেভাবেই প্রস্তুত হচ্ছে। এমন একটি দলের বিপক্ষে খেলতে সবাই মুখিয়ে আছে। আমাদের একটাই কথা, চাপ নেব না। ম্যাচটি শুধু উপভোগ করব। সতীর্থদেরও আমি একই বার্তা দিয়ে দিয়েছি।

প্রশ্ন :১৫ অক্টোবর কলকাতায় ভারতের সঙ্গে ম্যাচ। এই ম্যাচ নিয়ে উন্মাদনাও শুরু হয়ে গেছে।

জামাল ভূঁইয়া :ভারত আমাদের প্রতিবেশী দেশ। তাদের সঙ্গে লড়াই মানেই অন্য কিছু। আমি মনে করি, সবচেয়ে মজার ম্যাচ হবে। আমি এর আগে ভারতের বিপক্ষে দু'বার খেলেছি। আমিও খুব রোমাঞ্চিত এই ম্যাচ নিয়ে। ভারত খুবই শক্তিশালী দল। তবে আপাতত আমরা কাতার ম্যাচ নিয়েই ভাবছি।

প্রশ্ন :ডেনমার্কে আপনার পরিবার। অথচ আপনি এখানে একা থাকেন। পরিবারকে মিস করেন কেমন?

জামাল ভূঁইয়া :মাঝে মাঝে একটু মন খারাপ হয়। প্রথম প্রথম তাদের (পরিবার) অনেক মিস করতাম। তবে এখন অনেকটা মানিয়ে নিয়েছি। আমি প্রতিদিন তাদের সঙ্গে ফোনে আলাপ করি।

প্রশ্ন :ডেনমার্কে একরকম কন্ডিশন, আর বাংলাদেশে অন্যরকম। শুরুতে মানিয়ে নিতে কতটুকু কষ্ট হয়েছে?

জামাল ভূঁইয়া :প্রথমে যখন ২০১১ সালে বাংলাদেশে এসেছিলাম, তখন এখানকার কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে আমাকে প্রচুর কষ্ট করতে হয়েছিল। একসময় তো মনে হয়েছিল, বাংলাদেশে মানিয়ে নিতে পারব না। তবে সময়ের সঙ্গে আস্তে আস্তে এখানকার কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছি। এখন আমার কোনো সমস্যাই হয় না; বরং বাংলাদেশের কন্ডিশনটা আমি উপভোগ করি।

প্রশ্ন :ডেনমার্ক বিশ্বকাপ খেলা দেশ। সেখানকার লীগের অবস্থাও ভালো। এত ভালো সুযোগ-সুবিধা ফেলে কেন বাংলাদেশে এসেছেন?

জামাল ভূঁইয়া :এখানে ভালো প্রস্তাব পেয়েছি। আর আমার বাবা আমাকে বলেছে যে তুমি যাও। তোমার দেশের হয়ে খেল। দেশকে কিছু দাও। আমরা সবাই এই জায়গায় আছি, তুমি ওখানে যাও। ভবিষ্যতে ভালো কিছু করতে পারব।'

প্রশ্ন :ডেনমার্কে জন্ম। প্রবাসী ফুটবলার হিসেবে বাংলাদেশে খেলার সুযোগ পেলেন। এখন তো জাতীয় দলের অধিনায়ক।

জামাল ভূঁইয়া :আমি স্বপ্নেও ভাবিনি বাংলাদেশের হয়ে খেলতে পারব। আর অধিনায়ক হওয়াটা তো আমার জন্য অনেক বড় সম্মানের। যখন দেশের জার্সি গায়ে জড়াই এবং অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরে মাঠে নামি, তখন অনেক গর্ববোধ করি। জন্ম বাংলাদেশে হয়নি ঠিকই; কিন্তু আমি এখন নিজেকে পুরোপুরি বাংলাদেশি ভাবি।

প্রশ্ন :ফুটবল নিয়ে বাংলাদেশের মিডিয়াগুলোতে অনেক ইতিবাচক ও নেতিবাচক সংবাদ আসে। এগুলো কি দেখেন?

জামাল ভূঁইয়া :না, আমি দেশি মিডিয়া অনুসরণ করি না। মিডিয়ায় কী এলো না এলো, আমি এসব নিয়ে মাথা ঘামাই না। আমার মনোযোগ শুধু ফুটবলে। আমি ফুটবলকে ভালোবাসি।

প্রশ্ন :বাংলাদেশের প্রথম কোনো ফুটবলার হিসেবে লা লিগায় ধারাভাষ্য দিয়েছেন।

জামাল ভূঁইয়া :এটা আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া। একজন বাঙালি হিসেবে বিশ্বের সেরা একটি লিগে ধারাভাষ্য দেওয়া অনেক বড় সম্মানের।