ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

গল্প

ফিলিস্তিনি খাদিজার গল্প

ফিলিস্তিনি খাদিজার গল্প

ছবি এঁকেছেন তন্ময় শেখ

গল্প লিখেছেন আমীরুল ইসলাম

প্রকাশ: ১৬ নভেম্বর ২০২৩ | ২১:৪৮

এখন অনেক রাত। চারদিকে নীরব নিস্তব্ধ। তখন আমার ফিলিস্তিনি একটি মেয়ের গল্প মনে পড়লো। মেয়েটির নাম খাদিজা। বয়স বারো বছর। ফুটফুটে শিশু। সে থাকে সাকি গ্রামে। তার বাবা মোহাম্মদ আলী। তিনি গ্রামপ্রধান। গ্রামের স্কুলে প্রাথমিক লেখাপড়া শেষ হয়েছে খাদিজার। 
খাদিজার মনে অনেক স্বপ্ন। সে শহরে যাবে। লেখাপড়া করবে। মানুষের ইতিহাস সম্পর্কে সে অনেক কিছু জানতে চায়। তার চাচা শহরে থাকেন। একদিন তিনি গ্রামে এলেন। খাদিজা চাচাকে বললো– চাচা, আমি এবার শহরের ইশকুলের ভর্তি ফরম তুলবো। চাচা বললেন– ঠিক আছে, তোমাকে শহরে পড়াশোনা করাবো মামণি। ছোট্ট খাদিজার চোখে জল এলো। মনে হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো চাচা হচ্ছেন তার চাচা।
কিছুদিনের মধ্যে বাবা খুব অস্থির হয়ে গেলেন। গ্রামের অদূরে ইসরায়েলি সৈন্য দল এসে পড়েছে। ওরা ফিলিস্তিন দখল করতে চায়। বড় ভয়ংকর ও নিষ্ঠুর সেনা দল। ওরা সব জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়। ওরা মানবতার শত্রু। বাবা পাঁচিলের পাশে মাটির তলায় একটা ঘর বানালেন। ওপরে কাঠের পাটাতন। একটা মই। বাবা বললেন– মেয়েরা সবাই সুড়ঙ্গ ঘরে থাকবে। খাদিজা মৃদুস্বরে বলল, বাবা আমরাও যুদ্ধ করব। আমাকে একটা অস্ত্র দাও। 
বাবা বললেন– পাগল মেয়ে আমার। 
খাদিজা সুড়ঙ্গ ঘরের প্রবেশমুখে বসে রইলো। সেখানে আলো পাওয়া যায় একটু বেশি। খাদিজা বসে বসে বই পড়ে। 
ইসরায়েলি সেনা দল এলো জিপ গাড়িতে। তারা মেশিনগানের গুলি ছুড়তে লাগলো। বাড়িঘরে আগুন জ্বালিয়ে দিলো। সারি বেঁধে গ্রামবাসীকে দাঁড় করিয়ে ওরা গুলি চালিয়ে দিলো। একদিনেই ওরা তছনছ করে ফেলল ‘সাকি’ গ্রাম। খাদিজারা সুড়ঙ্গ ঘরে সব জানতে পারে না। শুধু চিৎকার আর কান্নার ধ্বনি। গুলির শব্দ শোনে। বাবা-চাচা কারও কোনো খবর পায় না। পরদিন সকালে খাদিজা বের হয়ে গেল। বাতাসে পোড়া গন্ধ। শান্ত গ্রাম। ইসরায়েলি সৈন্যরা গ্রামে তাঁবু গেড়েছে। এই গ্রাম কি তাহলে ওদের দখলে চলে গেল? বুকটা হা হা করে ওঠে খাদিজার। কোনো কোনো বাড়িতে এখনও আগুন জ্বলছে। বাড়ির উঠোন পেরিয়ে বিশাল আকাশের দিকে তাকালো খাদিজা। মেঘলা আকাশ, আড়ালে লাল সূর্য। বুকভরে শ্বাস নিলো। হঠাৎ দেখে ওর সামনেই একটা লাইট মেশিনগান পড়ে আছে। ইসরায়েলিদের অস্ত্র। হয়তো কেউ ফেলে রেখে গেছে। অস্ত্রটা হাতে নিলো খাদিজা। নেড়েচেড়ে দেখল। এবার সে যুদ্ধ করবে ইসরায়েলি পশুদের সঙ্গে। খাদিজা তখন অস্ত্র হাতে পুড়ে যাওয়া বাড়িঘরের আড়ালে আড়ালে এগিয়ে যেতে লাগল। খেজুর গাছগুলো বিষণ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একসময় ইসরায়েলি ক্যাম্পের কাছাকাছি সে পৌঁছে গেল। ক্যাম্প লক্ষ্য করে সে মেশিনগান তাক করল। অমনি সে টের পেল, কয়েকজন ইসরায়েলি সৈন্য তাকে বন্দি করে ফেলেছে। মেশিনগানটা কেড়ে নিলো। তারপর টেনেহিঁচড়ে খাদিজাকে নিয়ে গেল ক্যাম্পের ভেতর। তারপর কী হলো আমি তা জানি না। এমন অনেক খাদিজা তার মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে গিয়ে জীবন উৎসর্গ করেছে এবং করছে। শিশুকালেই প্রাণ ঝরে পড়েছে। কেউ কি তাদের পাশে দাঁড়াবে না? 

আরও পড়ুন

×