ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

গল্প

মা ও গোলাপ

মা  ও  গোলাপ

.

গল্প লিখেছেন রিক্তা রিচি ছবি এঁকেছেন রজত

প্রকাশ: ২৩ নভেম্বর ২০২৩ | ২২:৩৫

গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায় সিঁথির। আজকাল প্রায়ই এমন হয়। বুকটা ভার ভার লাগে। খুব কষ্ট হয় তার। ছোট্টমোট্ট মেয়াটা বাবাকে জড়িয়ে ধরে। লেপ্টে থাকে বাবার গায়ের সঙ্গে। বাবার গায়ে মায়ের গন্ধ খোঁজে! কষ্ট লুকাতে চায়। বুকের ভার ভার ভাবটাও কমাতে চায়। তবে সে বাবাকে এটা বুঝতে দিতে চায় না যে, এই মাঝ রাতে তার মাকে দরকার। বড্ড দরকার। মাকে ছাড়া যে সব তার কেমন শূন্য শূন্য লাগে। সব থেকেও যেনো কিছুই নেই তার! 
এই তো সেদিন, ঘুম ঘুম চোখে দেখলো মাকে নিয়ে হাসপাতাল দৌড়াচ্ছেন বাবা। অথচ তার কিছুক্ষণ আগেই মায়ের সঙ্গে পুতুল পুতুল খেললো, চড়ুইভাতি খেললো, একসঙ্গে খাবারও খেলো। তারপর মা গান শুনিয়ে ঘুম পাড়ালেন তাঁর আদুরে মেয়েটাকে। হঠাৎ কী যেন হলো। কান্না আর হইচই শুনে ঘুম ভাঙলো সিঁথির। দেখলো, ঘরজুড়ে ছোটাছুটি, চিৎকার, কান্না আর ডাকাডাকি। মাকে নিয়ে বাবা যাচ্ছেন হাসপাতালে। মা চোখ খুলছেন না। তখনও সবকিছু বুঝে উঠতে পারছিলো না সিঁথি। ভয়ে গুটিয়ে গেলো। নানু এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। ঘুমাতে বললেন। কিছুতেই ঘুম আসছে না তার। কী করে ঘুম আসে মাকে ছাড়া? এরই মধ্যে ফোনে নানু বাবার সঙ্গে কথা বলে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। ছোট্ট সিঁথির বুকটাও হু-হু করে উঠলো। টলোমলো চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো। নানু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলেন, গ্রামে যেতে হবে, উঠো। সিঁথি উঠতে পারছে না। তার শরীর ভার হয়ে আছে। তবু সে শরীরটাকে টেনে তুলে জানালায় গিয়ে দাঁড়ালো। দেখলো, সাইরেন বাজিয়ে সাদা রঙের একটি গাড়ি এসে গেটের সামনে দাঁড়ালো। গাড়ির কফি কালারের গ্লাসের ভেতর ঝাপসা দেখা যাচ্ছে মাকে। গাড়িতে ঘুমাচ্ছেন মা। সিঁথি যেন নড়তে পারছে না জায়গা থেকে। বুক ফেটে যাচ্ছে।   মুখ থেকে কথা বের হচ্ছে না। নানু সিঁথি ও সাবিলকে গাড়িতে উঠালো। সাবিল সিঁথির ছোট ভাই। বয়স আড়াই। আর সিঁথির আট। 
নানু কাঁদছেন। বাবার চোখে পানি। সিঁথি চুপচাপ, শান্ত। সাবিল ঘুমাচ্ছে তানজিল চাচ্চুর কোলে। ভোর সাড়ে ৫টায় গাড়ি নানুবাড়িতে পৌঁছলো। বাড়ির সবাই কান্নাকাটি করছে। উঠোনে মাকে শুইয়ে রেখেছে। দূর থেকে মাকে দেখতে আসছে। কেউ কেউ সিঁথিকে এসেও জড়িয়ে ধরছে, কাঁদছে। সাবিল তখনো ঘুমাচ্ছে। এদিকে মাকে ওরা গোসল করিয়ে সাদা কাপড় পরিয়ে  উঠোনে নিয়ে এলো। সিঁথি দূর থেকে দেখছে। 
মায়ের মুখটা কেমন অদ্ভুত রকমের সুন্দর হয়ে গেলো! অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো সিঁথি। তারপর মাকে নিয়ে হাঁটা ধরলো বাবা-মামাসহ কয়েকজন। সিঁথি আর স্থির থাকতে পারলো না। আকাশ-বাতাস ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে বললো, মামুনি, আমাকে নিয়ে যাও, আমাকে ছেড়ে যেও না। তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না...!
তারপর থেকে প্রতি রাতে ঘুমের ঘোরে ভয়ে সিঁথি মামুনি মামুনি বলে ডাকতে থাকে আর চিৎকার করতে থাকে। ঘুম ভেঙে যায়। বাবাকে জড়িয়ে ধরে। বাবা হুহু করে কেঁদে ওঠেন। সিঁথি চুপ হয়ে যায়। দিনভর মাকে খোঁজে। মা চুল বেঁধে দিতেন, স্কুলের জামা পরিয়ে দিতেন, গোসল করাতেন, খাইয়ে দিতেন, পড়তে বসাতেন, ঘুম পাড়িয়ে দিতেন। কিন্তু এখন মা নেই। সিঁথির ছোট্ট হৃদয় তোলপাড় হয়ে যায়। কোথায় গেলেন মা! ভাবতেই থাকে। কেন তাকে নিয়ে গেলো না। কেন হারিয়ে গেলো দূরের ওই বনে! এসব প্রশ্ন তার মাথায় খেলতেই থাকে।
একদিন সিঁথি ঘুমের ঘোরে মাকে দেখতে পেলো। মা এক ফুলবাগানে ঘুরছেন আর গাছে পানি দিচ্ছেন। গোলাপ, জবা, বেলী, রজনীগন্ধ্যা, শিউলি, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকাসহ কত্তো কত্তো ফুল সে বাগানে। মায়ের পরনে সাদা গাউন। মাথায় ধবধবে সাদা ওড়না। পেছন থেকে মামুনি, মামুনি বলে ডাকছে সিঁথি। কিন্তু মা তাকে ধরতে আসছেন না। বুকে জড়িয়ে নিচ্ছেন না। আদর করছেন না। খুব যত্ন করে ফুলগাছে পানি দিচ্ছেন। সিঁথি একটু একটু করে সামনে এগোলো। যখনই পেছন থেকে মায়ের ওড়না ধরতে যাবে, কোত্থেকে যেন ভয়ংকর এক কালো ডানাওয়ালা পাখি বিকট আওয়াজ করে তাকে তাড়া করলো। ভয়ে ওর ঘুম ভেঙে গেলো।
পরদিন রাতে স্বপ্নে আবার মা এলেন। তখনও মা ফুল গাছে পানি দিচ্ছেন। মায়ের মুখ থেকে ভেসে আসছে রুপালি আলো। মা যেন সিঁথিকে দেখছেনই না। বাগানের গেট খোলা পেয়ে মা, মা ডেকে সামনের দিকে এগোতে থাকলো। হঠাৎ ভয়ংকর এক পিঁপড়া কামড়ে দিলো তার পায়ে। অমনি বিকট চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেলো। ঘুম ভাঙতেই সিঁথি বুঝতে পারলো সে স্বপ্ন দেখছিলো। স্বপ্নে তো মা আছেন। বাস্তবে বিছানায় মা নেই! বাবা অনেক কষ্ট করছেন। তাদের সব কিছু করে দিচ্ছেন। তবু মাকে ভুলতে পারছে না সিঁথি।   আনমনা হয়ে থাকে। কারও সঙ্গে খেলে না। পড়তে বসে না। সাবিলের সঙ্গে দুষ্টুমি করে না। নানু চুল আঁচড়ে দিতে কিংবা জামা পরিয়ে দিতে এলেও খুব একটা সাড়া দেয় না।
বৃহস্পতিবার রাতে সিঁথি নানুর কোলেই ঘুমিয়ে পড়েছে। নানু তাকে শুইয়ে দিয়েছেন বিছানায়। গভীর ঘুমে সে। স্বপ্নে মা এসেছেন। সেই একই ফুল বাগানে। ফুলগাছে পানি দিতে দিতে মা দেখলেন, সিঁথি একপাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। মুহূর্তেই তাকে জড়িয়ে ধরলেন, কপাল-গাল-চিবুকে আদর করলেন। মা দেখলেন বাগানে নতুন একটি গোলাপ পাপড়ি মেলে খুব সুন্দর করে ফুটেছে! 

আরও পড়ুন

×