ঢাকা মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪

এক দুঃখী মেয়ের গল্প

গল্প

এক দুঃখী মেয়ের গল্প

লিখেছেন দীলতাজ রহমান এঁকেছেন রজত

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ০৭ ডিসেম্বর ২০২৩ | ২৩:৪৮

তুলির খুব দুঃখ। এইটুকুন একটা মেয়ে দুঃখের যেন শেষ নেই! দুঃখের কথা জানতে পেরে খেলার সঙ্গীদেরও এখন তার জন্য অনেক দুঃখ। তুলি আগে ওদের সবার সঙ্গে স্কুলে যেতো। মাত্র তো ক্লাস ফোরে উঠেছিল। তাতেই স্যার বলতেন, তুলির হাতের লেখা সবচেয়ে ভালো। ক্লাসে ও-ই ভালো রচনা লেখে। হাতের লেখাটা অবশ্য মা-ই তাকে সুন্দর করে লিখতে শিখিয়েছেন। তুলি পুকুরে সাঁতার কেটে গোসল করতো। বিকেলে খেলতে যেতো। রঙিন ফিতেয় মা চুল বেঁধে সাজিয়ে দিতেন।
অথচ এখন তুলি শুধু ঘরের কাজ নিয়েই থাকে। মা কোথাও যেতে দেন না। স্কুল দূরে থাক, ঘরেও পড়তে দেন না। মা বলেন, লেখাপড়া অনেক হয়েছে! এখন কাজ শেখো। তুলি মাকে খুব ভয় পায়। কারণ, মা এখন খুব বকাবকি করেন। মাঝে মধ্যে গায়েও হাত তোলেন। বাড়ির সবাই তুলিকে নিয়ে কী যেনো বলাবলি করে। কিন্তু তুলি কাছে গেলে অন্য কথায় চলে যায়। তবে তাদের কথার রেশ তুলির কানে বাজতে থাকে– আহারে, যখন নিজের ছেলেমেয়ে হয়নি...।
দুপুরে খাটে ঘুমান তুলির মা আর ছোটবোন পুতুল। পুতুলকে মা সোনার পুতুল বলে ডাকেন। সোনার পুতুলকে আদর করতে তুলির ভালো লাগে। কিন্তু মা পুতুলকে তুলির কাছে দিতে চান না। বলেন, তুই ওকে ফেলে দিবি। ও ব্যথা পাবে। ওকে আমি রাখি, তুই কাজগুলো সেরে ফেল।
মাটিতে পাটি পেতে শুয়ে থাকে তুলি। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলে খেলার সঙ্গীদের ছোটাছুটি, হইচই শুনতে পায় সে। মা গভীর ঘুমে তলিয়ে থাকেন। পাশে সোনার পুতুলও। কিন্তু ঘুম আসে না তুলির। এমনি এক দুপুরে মাকে ঘুমে রেখে খেলতে গিয়েছিল তুলি। ফিরে আসার পর এমন পিটুনি দিয়েছিলেন যে পুরো পাড়া জেনে যায়। এরপর থেকে কেউ তাকে খেলার জন্য ডাকতে আসে না। তুলি ভাবে, আর কারও মা তো এমন নয়। তাহলে আমার মা কেন এমন হয়ে গেলেন? তাহলে কি এই মা আমার আপন মা নয়! বাবাও আমার বাবা নয়! সোনার পুতুল; সেও আমার বোন নয়?
তাহলে কে আমি? তুলির গায়ে কাঁটা দেয়। কেমন ভয় ভয় করে। মাকে, বাবাকে, সোনার পুতুলকে মনে মনে আরও আঁকড়ে ধরে!
বন্ধ ঘরে জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে তুলি। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে যাচ্ছে। সূর্যের সোনার মতো রংটা আগুনের মতো তার মুখ ঝলসে দিচ্ছে। তবু সে দাঁড়িয়ে আছে। দেখছে সবাই আগের মতো মাঠের দিকে একে একে খেলতে ছুটছে। তার দিকে কারও চোখ পড়লে চোখ সরিয়ে নিচ্ছে। কেউ তার কাছে আসছে না। তুলি বোঝে, ওরা এলে মা যদি বকে, তাই কেউ আসছে না। আনমনা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ তুলি শিউলির কণ্ঠ শুনতে পেলো। চাপা কণ্ঠে শিউলি ডাকছে, তুলি, অ্যাই তুলি, এদিকে আয়। 
তুলি পা টিপে টিপে হেঁটে শিউলির সামনে দাঁড়ায়। শিউলি তুলির বড় চাচার মেয়ে। দু’জন একই বয়সী। শিউলি বলে, একটু বাইরে আসবি? তোর সঙ্গে কথা আছে। তুলি বললো, দরজা খুললে শব্দ হবে। মার ঘুম ভাঙলে বকবেন। 
শিউলি বলে, তোর সঙ্গে যে খুব দরকারি কথা আছে। আমি তোকে না বলে থাকতে পারছি না। তারপর ফিসফিস করে কী যেন বললো। 
শিউলির কথা শুনে তুলির কাত করে রাখা মাথাটা কখন সরে আসে জানালা থেকে সে বুঝতেই পারে না। বাইরে তখনও সূর্যের চারপাশ ঘিরে আগুনের মতো রং হইচই করছে। বড় চাচির ডাকে শিউলি কখন চলে গেছে টের পায় না তুলি।
সে এখন কী করবে, ভাবতে ভাবতে মায়ের খাটের কোনায় এসে দাঁড়ায়। তারপর একবার মা, আরেকবার সোনার পুতুলের দিকে তাকায়। বাবার মুখখানা মনে টেনে এনে শিউলির সব কথা মিথ্যে ভাবতে চায়। কিন্তু কারও জন্যই তার এখন আর কোনো টান হচ্ছে না। এই ঘর, বাড়ির চেনা উঠোন সবই তার কাছে অচেনা মনে হচ্ছে। কেবলই শিউলির আঙুল তুলে দেখানো ওই যে কালো গাঁয়ের মুচিপাড়ার পথ তাকে টানছে।
হঠাৎ সিটকিনি খোলার শব্দে ঘুম ভাঙে তুলির মা মহুয়া বেগমের। সোনার পুতুলের শরীরের সঙ্গে লেপটে থাকা শাড়ির আঁচল ছাড়িয়ে বসে দেখেন দরজা খোলা। খাটের নিচে রাখা মোড়াটা সামনে দেখে বুঝতে পারেন, তুলি ওটার ওপর দাঁড়িয়ে দরজা খুলে বাইরে গেছে। মহুয়া বেগম রাগে কটমট করেন। রাগ চেপে তুলিকে খুঁজতে থাকেন। বাড়ির সামনে পাশের বাড়ির এক বুড়োকে দেখে জানতে চাইলেন– চাচা, তুলিকে দেখেছেন?
লোকটি বললেন, তুলি তোমার বড় মেয়ে?
মহুয়া বেগম দাঁতে দাঁত চেপে যেনো রাগ ধরা না পড়ে এমনভাবে বললেন– হ্যাঁ, আমার বড় মেয়ে!
বুড়ো বললেন, আমি তো ওই দূরের গাঁ থেকে ফিরলাম। এই তো বড় রাস্তা থেকে সামনে আরেকটা সরু রাস্তা, ওই রাস্তা দিয়ে তুলিকে দৌড়ে যেতে দেখলাম। আমাকে বললো, দাদু, মুচিপাড়ার গ্রাম কতোদূর? আমি বললাম, তুই তো মুচিপাড়ায় গিয়ে সারতে পারবি না দাদু! এখনই সব অন্ধকারে ঢেকে যাবে। এই শেষ বেলায় তোকে কে একা একা পাঠালো? কিন্তু কার কথা কে শোনে?
সূর্য ডুবে গেছে। আকাশের কোনায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এক-আধটু আবীরও মুছে যাওয়ার অপেক্ষায়। দূরের কালো গ্রামের মুচিপাড়ার সরু আলপথ আর মহুয়া বেগমের অনাদরের ফুটফুটে মেয়েটি তুলি একসঙ্গে অন্ধকারে মিশে গেলো। ওটাই যে দুঃখী মেয়েটির গ্রাম! 

আরও পড়ুন

×