অহন কান্দন থামা। অত কান্দনের দরকার নাই।
বিনিকে বলল মা। বিনি থামল না। কেঁদেই চলল। অবশ্য জোরে নয়। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। চোখের পানি গড়ে গাল বেয়ে। মাঝে মধ্যে হাতের উল্টো পিঠে চোখ মোছে। চোখ কচলায়। মাথা নিচু করে রাখে। কারও দিকে তাকায় না।
এবড়োখেবড়ো রাস্তা। খুব ঝাঁকি হচ্ছে। মা এক হাতে ধরে আছে ওকে। অন্য হাতে জামা-কাপড়ের ব্যাগ।
রিকশাটা চালাচ্ছে বিনির বাবা। ওরা ফিরছে বস্তিতে। গিয়েছিল ফুটপাত মার্কেটে। ঈদের কেনাকাটা। খুব সামান্যই। বিনির ফ্রক। স্যান্ডেল। ছোট ভাইটার জামা-প্যান্ট। আর টুকিটাকি।
মা তো অনেক কিছুই কিনতে চায়। কিন্তু বাবার হাতে টাকা-পয়সা নেই। মেজাজ গরম। মার্কেটে সারাক্ষণই গজগজ করেছে। নিজে কিছু নেয়নি। বলেছে, পরে দেখা যাবে।
মাও তেমন কিছু নেয়নি। বাবা একটা শাড়ি এনে দিয়েছে। দিন কয়েক আগে। কোনো এক বড়লোকের বাড়ি থেকে। দানের শাড়ি। খুব সুন্দর। জংলাডুরে ছাপা। মায়ের খুব পছন্দ হয়েছে। পছন্দ হয়েছে বিনিরও। মা নতুন শাড়ির ঘ্রাণ শুঁকেছে। তুলে রেখেছে ভাঁজ না ভেঙে। ঈদের দিন পরবে।
একটা শাড়ির খুব শখ বিনিরও। ছোট লাল শাড়ি। ওই যে টিভিতে ছোট্ট মেয়েটা পরে! সেই রকম লাল শাড়ি।
ঘুরে ঘুরে নাচে। সোহাগ চাঁদবদনি ধনি নাচো তো দেখি। বিনিও লাল শাড়ি পরবে। নাচবে ঘুরে ঘুরে। মাকে কতবার বলেছে। মা, একটা লাল শাড়ি
কিন্যা দ্যাও।
লাল শাড়ি কী করবি?
নাচুম। বালা নাচো তো দেখি। ঘুরে নেচেছে বিনি। দেখে হেসেছে মা। বলেছে, অত টাকা কই পামু!
বাবারে বলো।
আচ্ছা, বইলা দেখুম।
বাবাকে বলে লাভ হয়নি। বাবা চোখ পাকিয়েছে। বলেছে, অত নাচতে হইব না!
মুখ ভার করেছে মা। বিনির চোখ ছলছল হয়েছে।
লাল শাড়ির ইচ্ছেটা আবার হয়েছে বিনির। মায়ের নতুন শাড়ি দেখে। আবার আবদার করেছে মায়ের কাছে। মা বলেছে, ছোড মাইয়ারা ঈদে শাড়ি লয়? শাড়ি হইব না। তোর বাবা কইছে, ফ্রক আর স্যান্ডেল কিন্যা দিবো। ফ্রক-স্যান্ডেল লাগব না। আমারে লাল শাড়ি কিন্যা দ্যাও। জেদ করেছে বিনি।
মা মুখ ঝামটা দিয়েছে। যা, তোর বাবারে বল!
বাবাকে বলেনি বিনি। মন ভার করে ছিল। তবু আজ গিয়েছিল মা-বাবার সঙ্গে। কেনাকাটা শেষে ফিরছিল। তখনই ফুটপাতের একপাশে দেখেছিল সেই লাল শাড়ি। ছোট লাল শাড়ি। গামছা আর অন্য কাপড়ের সঙ্গে ঝুলছে। মায়ের আঁচল টানল বিনি। শাড়িটা দেখাল। মা দেখেও দেখল না। টেনে নিয়ে যেতে চাইল ওকে। বিনি এক পাও নড়ল না। শাড়ি না নিয়ে যাবে না। মা ধমকাল। হাত ধরে টানল। অনড় বিনি। বাবা বিরক্ত হচ্ছিল। চোখ কটমট করে তাকাল। তবু বিনি নড়ল না। এবার খেপল বাবা। ঠাস করে চড় মারল বিনির গালে। বিনি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। চোখে পানি টলমল।
শক্ত করে বিনির হাত ধরল বাবা। টেনে নিয়ে চলল হিড়হিড় করে। ভিড় ঠেলে ঠেলে। লোকজন দেখছিল। খুব লজ্জা লাগছিল বিনির। অভিমান হচ্ছিল বাবার ওপর। এভাবে মারল!
রিকশার কাছে এসে থামল বাবা। বিনি পেছন ফিরে মাকে দেখতে পেল না। ভিড় ঠেলে হয় তো সঙ্গে আসতে পারেনি। বাবা ওকে একরকম দৌড় করিয়ে এনেছে।
বিনির মাকে না দেখে বাবাও বারবার পেছনে তাকাল। অপেক্ষা করল কিছুক্ষণ। বিরক্ত গলায় বলল, তোর মায়ের আবার হইল কী! তুই রিকশায় বস। আমি দেইখ্যা আসি।
বাবা যাওয়ার আগেই মা এলো। জোর হাঁটায় হাঁপাচ্ছে। কোনো কিছু বলল না। রিকশায় বসল বিনির পাশে।
বাবাও কিছু বলল না। শুধু রাগী চোখে তাকাল মা আর মেয়ের দিকে। তারপর রিকশা চালাতে লাগল।
বস্তিতে ফিরল ওরা। মা-বাবা ঘরে ঢুকল। বিনি ঢুকল না। তখনও কাঁদছিল। একটু দূরে অভিমানে দাঁড়িয়ে থাকল।
ঘরে ঢুকে ব্যাগ খুলেই অবাক বাবা। বিনির মায়ের দিকে তাকাল। তারপর জানতে চাইল, এই লাল শাড়ি পাইলা কই?
বিনির মা জবাব দিল না। আঁচলে মুখের ঘাম মুছল।
বাবার মন খারাপ হলো। বলল, শ্যাষে চুরি করলা?
না। চুরি করুম ক্যান! কিনছি। আমার কাছে টাকা ছিল। মিনমিনে গলা মায়ের।
অত টাকা কই পাইলা?
বিনির মা আবারও চুপ থাকল। বাবাও আর কিছু বলল না। কী যেন খুঁজল সারা ঘরে। পেল না। তারপর জানতে চাইল, তোমার নতুন শাড়িডা কই?
এবারও চুপ থাকল বিনির মা। বাবা জোরাজুরি করল। তখন নরম গলায় মা বলল, বেচ্যা দিছি। মাইয়াডার লাল শাড়ির খুব শখ!
বিনির বাবা কিছু বলল না। চুপচাপ বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। মেয়েকে কোলে তুলে ফিরে এলো ঘরে। তখনও কাঁদছিল বিনি। মা ওকে জড়িয়ে ধরল। কপালে চুমু দিল। আদর করল। তারপর হেসে বলল, আর কান্দিস না। থাম। তোর লাল শাড়ি আনছি। এই দ্যাখ। শাড়িটা দেখাল মা। দোকানের সেই ছোট লাল শাড়ি। খুশিতে মাকে ছড়িয়ে ধরল বিনি।
তারপর? তারপর মা তাকে শাড়ি পরিয়ে দিল। সাজিয়ে দিল লাল ফিতা আর কাজল টিপে। ছোট্ট একটা নথও ঝুলিয়ে দিল নাকে। টিভির সেই ছোট মেয়েটার মতো।
খুশিতে নেচে উঠল বিনি। দুলে দুলে। নাচতে থাকল। সোহাগ চাঁদবদনি ধনি নাচো তো দেখি।
আনন্দে হাততালি দিয়ে মা গাইল। সোহাগ চাঁদবদনি। তার চোখে চিকচিকে পানি।
মা আর মেয়ের কাণ্ড দেখল বিনির বাবা। মুখ ভরে গেল হাসিতে।
তখন বাবারও খুব গাইতে ইচ্ছে করল। বালা নাচো তো দেখি... বালা নাচো তো দেখি।