ঢাকা সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪

পাঠ্যপুস্তকে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স প্রসঙ্গ অন্তর্ভুক্তিকরণ

পাঠ্যপুস্তকে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স প্রসঙ্গ অন্তর্ভুক্তিকরণ

গোলটেবিল বৈঠক। ছবি: সমকাল

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ০৯ নভেম্বর ২০২৩ | ২৩:১৫ | আপডেট: ০৯ নভেম্বর ২০২৩ | ২৩:১৫

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সকে মানব সভ্যতার জন্য ১০টি স্বাস্থ্য হুমকির মধ্যে অন্যতম একটি স্বাস্থ্য হুমকি হিসেবে ঘোষণা করেছে। বর্তমানে প্রতি বছর ১২ লাখ ৭০ হাজার মানুষ অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের কারণে মারা যাচ্ছে । এভাবে চলতে থাকলে ২০৫০ সালে মারা যাবে এক কোটি মানুষ। অপ্রয়োজনে বা ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া  অ্যান্টিবায়োটিক স্বেচ্ছায় সেবন, ফুল কোর্স সম্পন্ন না করা, প্রাণী ও মৎস্য খাদ্য বা চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের প্রধানতম কারণ। আসন্ন এই মহামারির হাত থেকে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সচেতনতার বিকল্প নেই। বর্তমান প্রজন্ম যাতে নিজেরা সচেতন হয়ে বাবা-মাসহ আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের সচেতন করতে পারে– এ লক্ষ্যেই ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় ‘মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলামে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের বিষয় অন্তর্ভুক্তি’ প্রসঙ্গে গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ ইউসুফ।  
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর human এবং veterinary medicine উভয় ক্ষেত্রেই National Regulatory Authority হিসেবে দায়িত্ব পালন করে থাকে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর National Centre for Antimicrobial Consumption (AMC) Surveillance in Bangladesh হিসেবে ২০১৯ সাল থেকে Antimicrobial Consumption (AMC) Surveillance for human medicine পরিচালনা করে আসছে। এই Surveillance report থেকে দেখা গেছে বাংলাদেশে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের ব্যবহার বাড়ছে। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের সঙ্গে রেজিস্ট্যান্স সম্পর্কিত। নেদারল্যান্ড, ডেনমার্কের মতো দেশ যেখানে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কম, সেখানে রেজিস্ট্যান্স কম। কিন্তু যেখানে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বেশি যেমন পর্তুগাল, স্পেন–সেসব দেশে রেজিস্ট্যান্স বেশি। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, যত বেশি অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার তত বেশি রেজিস্ট্যান্স হয়।
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধের গুণগতমান নিশ্চিত করা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ২টি ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরি এবং ৮টি বিভাগে ৮টি মিনি ল্যাব রয়েছে। যেখানে প্রতিনিয়ত বাজার থেকে ওষুধের নমুনা উত্তোলন করে পরীক্ষা ও বিশ্লেষণ করা হয়।  এ ছাড়া নকল-ভেজাল, আনরেজিস্টার্ড, মেয়াদোত্তীর্ণ অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ঔষধ উৎপাদন, বিক্রয় ও বিপণনকারীদের বিরুদ্ধে ঔষধ আদালত, মোবাইল কোর্টে মামলা দায়ের করা হয়। ঔষধ ও কসমেটিকস আইন ২০২৩ মোতাবেক প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রয়কারীদের ২০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। মানুষের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ৩৪ ধরনের অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ঔষধ প্রাণী চিকিৎসায় বাতিল করা হয়েছে, যেন প্রাণী চিকিৎসায় অপব্যবহারের কারণে মানুষের জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ ওষুধগুলো রেজিস্ট্যান্স না হয়ে যায়। এর পাশাপাশি স্কুলের শিক্ষার্থীদের মাঝে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। যেমন– অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বিষয়ে কমিক্স বই ‘টিনু-মিনু ও সুপার বাগ’, ‘ট্যাপা-গোপীর চিন্তাভাবনা’, coloring book ‘The Invention of Penicillin’, কমিক্স পোস্টার ইত্যাদি। কমিক্স বইয়ের মাধ্যমে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের ভয়াবহতা সম্পর্কে সহজ ভাষায় শিশুদের বুঝানো হয়েছে। এ ছাড়া প্রাণীদের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি হলে তা মানুষের শরীরেও ছড়াতে পারে– বিষয়টি কমিক্স বইয়ের মাধ্যমে বুঝানো হয়েছে। এই বইগুলো বাংলাদেশের মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে বিতরণের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে সম্মতি প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়া ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কক্সবাজার মডেল স্কুল, ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজ এবং চট্টগ্রামে ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজের এক হাজার শিক্ষার্থীকে নিয়ে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বিষয়ে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। 
পাঠ্যপুস্তক প্রতিটি শিক্ষার্থীর কাছেই গুরুত্বপূর্ণ। পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত বিষয়াদি প্রতিটি মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ঘটায়, জীবনযাত্রাকে পরিবর্তন করে। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বিষয়টি শুধু সচেতনতামূলক সভা করে রোধ করা সম্ভব নয়। এটা রোধে প্রয়োজন সচেতনতা, অভ্যাস ও দায়িত্বশীলতা। দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন নিজের পরিবারের প্রতি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি– সর্বোপরি সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি। প্রতিটি পর্যায়ের মানুষেরই বিভিন্ন ধরনের ভূমিকা রয়েছে। যেমন, জনগণের দায়িত্ব ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ঔষধ সেবন না করা, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধের পূর্ণ কোর্স সম্পন্ন করা, ঔষধ ব্যবসায়ীদের দায়িত্ব প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ঔষধ বিক্রি না করা, ফিজিশিয়ানদের দায়িত্ব সঠিক ডায়াগনসিস করে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ঔষধ প্রেসক্রাইব করা, প্রাণী ও মৎস্য পালনকারীদের দায়িত্ব ভেটেনারিয়ান বা মৎস্য চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া প্রাণী ও মৎস্য পালনে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করা, ঔষধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠনের দায়িত্ব পরিবেশে অ্যান্টিবায়োটিকের zero discharge নিশ্চিত করা, এমনকি সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব হাসপাতাল বা ইন্ডাস্ট্রির অ্যান্টিবায়োটিক সমৃদ্ধ বর্জ্যের safe disposal নিশ্চিত করা। এই বিষয়গুলো বিভিন্নভাবে বিভিন্ন ধরনের মানুষকে বুঝানো যতটা কঠিন, তার চাইতে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্তকরণের মাধ্যমে ছোটবেলা থেকেই অভ্যাসে পরিণত করা অত্যন্ত কার্যকর।

 

সভাপতির বক্তব্য


মেজর জেনারেল মোহাম্মদ ইউসুফ 
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে আমরা অনেক প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সংস্থা একসঙ্গে কাজ করছি। এর মধ্যে ডঐঙ, ঋঅঙ, টঝঅওউ, ঋষবসরহম ঋঁহফ সহ অনেকেই। তবে এ বিষয়ে একটি মাইলফলক হলোু গত ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ তারিখে ঔষধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩ আইন পাস হয়েছে। যেখানে ৪০ ধারায় বলা আছে, প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করলে ২০,০০০ টাকা জরিমানা করা হবে। এই আইনটা আগে ছিল না বলে কেউ ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করলে শাস্তি দেওয়া যেত না।
বর্তমানে বাংলাদেশে ২ লাখ রেজিস্টার্ড ফার্মেসি আছে, যেখানে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে অ্যান্টিবায়োটিক ক্রয়ের ইনভয়েস এবং বিক্রি করলে তার রেকর্ড রাখতে হবে। আমরা পরে সেগুলো চেক করব। কেউ অমান্য করলে তাঁকে আমরা শাস্তি দিতে পারব। তবে এর পাশাপাশি বেশি জরুরি জনসচেতনতা। তরুণ জনগোষ্ঠীকে সচেতন করলে তা দীর্ঘমেয়াদে কাজে দেয়। যে কারণে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স প্রসঙ্গটি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাঠ্যবইয়ে আমরা অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করছি।
ইতোমধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় বিভিন্ন স্কুলে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বিষয়ে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান করেছি। শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করতে তাদের জন্য বিভিন্ন ধরনের অ্যাওয়ারনেস ম্যাটেরিয়াল, যেমনু কমিকস বই, কমিকস পোস্টার, অ্যান্টিবায়োটিক কালারিং বই ইত্যাদি বিতরণ এবং চিত্রাঙ্কনের আয়োজন করা হয়েছে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজের অষ্টম থেকে দশম শ্রেণির ২৫০ জন শিক্ষার্থীর মাঝে দুটি সার্ভে করা হয়েছে। অ্যাওয়ারনেস প্রোগ্রাম করার আগে একটি এবং পরে আর একটি। সার্ভে থেকে দেখা গেছে, অ্যাওয়ারনেস ম্যাটেরিয়ালগুলো শিক্ষার্থীদের অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের মতো কঠিন একটি বিষয় অতি সহজে বোঝাতে খুবই কার্যকর ছিল। যেখান থেকে আমরা অনুধাবন করেছি, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বিষয়টি পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে অত্যন্ত কার্যকর। আমরা মনে করি, কারিকুলামে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করলে শিক্ষার্থীরা ছোটবেলা থেকেই এর ভয়াবহতার বিষয়ে জানবে, সচেতন হবে। স্বেচ্ছায় দোকান থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাওয়া থেকে বিরত হবে। আমাদের আজকের প্রোগ্রামের মূল উদ্দেশ্য, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স নিয়ে পাঠ্যবইয়ে এনসিটিবি অন্তত একটি অধ্যায় রাখুক। এ বিষয়ে আমরা একটি ধারণাপত্র স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠাব। তার পর তারা তা শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও পরে এনসিটিবিতে পাঠাবে। এ বিষয়ে সবার সহযোগিতা চাই।
অ্যান্টিবায়োটিক খারাপ কিছু নয়। তবে এর নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য বিষয়টি কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এটা বেসিক জিনিস। জানা থাকলে শিক্ষার্থীরা চারপাশে জ্ঞানের আলো ছড়াতে পারবে। দেশ-সমাজ উপকৃত হবে। প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক কেনা যাবে না। এটা তারা নিজেরা জানুক, বাবা-মাকে জানাক। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ধীরে ধীরে অন্যান্য শ্রেণির পাঠ্যবইয়েও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স নিয়ে ধারণা দেওয়া যেতে পারে। একটা সময় গিয়ে আমরা এর সুফল পাব। পাশাপাশি মাদ্রাসা ও ইংলিশ মিডিয়ামেও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের বিষয়টি রাখতে হবে। এ ছাড়া শিক্ষকদেরও বিষয়টি জানাতে হবে। তাদের প্রশিক্ষণে বিষয়টি রাখা উচিত। বিষয়টিকে মাউশি ও এনসিটিবি যেন গুরুত্বসহকারে দেখেু এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
অধ্যাপক ডা. মো. ইসমাইল খান
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স করোনার চেয়েও বড় থ্রেট মানবসভ্যতার জন্য। এসডিজির গোল ৩ গুড হেলথ অ্যান্ড ওয়েল বিয়িং ও ৪ কোয়ালিটি এডুকেশন। গোল দুটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এডুকেশন যদি গুড হেলথে এ ভূমিকা না রাখে, তবে সেই এডুকেশন অর্থহীন। আমি মনে করি, কারিকুলাম একদিকে, আর সমস্যা আরেক দিকে হলে চলবে না। কারিকুলামে কী সংযোজন করা হবে, আর কী হবে নাু এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে এমবিবিএস কারিকুলাম, নার্সিং কারিকুলাম কী হবে, তা নির্ভর করে বাংলাদেশের হেলথ সমস্যার ওপর। এটি কখনও অন্য কোনো দেশের হেলথ প্রবলেমের ওপর নির্ভর করবে না। ঔষধ আমাদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 
প্রতিটি ঘরেই শিশু আছে। নলেজ, এটিচুড, প্র্যাকটিস ডেভেলপ করেই শিশুকাল থেকে। পেরেনিয়ালিজম হলো অস্তিত্ববাদ, যা ছোট থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত সবারই জানা দরকার। আর এসেনসিয়ালিজম হলো যেমন ডাক্তার জানে রোগতত্ত্ব নিয়ে, সেটা তার জানার প্রয়োজন। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সম্পর্কে সচেতন হওয়া পেরেনিয়াল বিষয়, যেটা মানুষের বেঁচে থাকার জন্য জানা জরুরি। শুধু অ্যাওয়ারনেস প্রোগ্রাম করেই বিষয়টিকে প্র্যাকটিসে পরিণত করা যাবে না। প্র্যাকটিসে পরিণত করতে হবে এডুকেশনের মাধ্যমেই।
মো. সাইদুর রহমান
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স এখন বড় হুমকি। এ নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। ঔষধ ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের সচেতনতা দরকার। আমাদের সন্তানদের সচেতন করতে হবে। পাঠ্যবইয়ে যেন স্বাস্থ্যের বিষয়গুলো আসে। আমাদের সুস্থ-সবল শিক্ষার্থী তৈরি করতে হবে। জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বইয়ে আনতে হবে। তখন শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি তাদের পরিবার, সমাজ ও সামগ্রিকভাবে আমাদের দেশ ও জাতির সত্যিকারের উপকার হবে।
হোসেন আলী খন্দকার
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫, ১৮, ৩৭ ও ৪৩ ধারাতে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত নির্দেশনা আছে। ১৮ ধারাতে বাংলাদেশের নাগরিকদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কমিউনিকেবল ডিজিজের মধ্যে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্বাস্থ্যক্ষেত্রে সচেতনতা বৃদ্ধিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রাইমারি ও মাধ্যমিক শিক্ষাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখন শিক্ষার্থীদের যেটা শেখানো হবে, সেটা ১০ থেকে ২০ বছর পর সুনাগরিকের মধ্যে দেখতে পাবো। এনসিটিবি পাঠ্যপুস্তক যেভাবে ডিজাইন করে, শিক্ষার্থীরা সেভাবেই শেখে। অস্ট্রেলিয়ার একটি শিশু বিস্কিট খাওয়ার পর পরিবেশে বিস্কিটটির খোসা ফেলে না। কারণ তারা পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে ছোটবেলা থেকেই এটা শেখে। কিন্তু বাংলাদেশের একটি শিশু বিস্কিট খেলে, সে খোসাটি আশপাশেই ফেলবে, ডাসবিন খুঁজবে না। কারণ এই শিক্ষাটা তারা ছোটবেলা থেকে পায়নি। এমনকি আমাদের দেশে বড়দেরও এই অভ্যাস নেই। আমাদের শিশুদের পেছনে ইনভেস্টমেন্ট করতে হবে। কীভাবে এখন থেকেই পাঠ্যপুস্তকে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স ইস্যুটা ডিজাইন করলে ভবিষ্যতে সচেতনতাটি অভ্যাসে পরিণত হবেু এ বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। এখানে এনসিটিবির বিরাট ভূমিকা রয়েছে।
অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান
সারা বিশ্বের মানচিত্রে যদি লক্ষ্য করা হয় তবে দেখা যাবে, বাংলাদেশে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের ব্যবহার বাড়ছে। ২০১৯ সালে সারাবিশ্বে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের সঙ্গে সম্পর্কিত মৃত্যুর সংখ্যা ৪৯.৫ লাখ, যা মাঝে ১২.৭ লাখ সরাসরি রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়েছে। এমনকি মহাকাশ থেকে শুরু করে অ্যান্টার্কটিকাতেও পাওয়া যাচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের উপস্থিতি। 
২০২১ সালের ২১ নভেম্বর বিশ্ব অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল সচেতনতা সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারের পরিমাণ ও ধরন নিয়ে অ্যান্টিবায়োটিক কনজামশন বিষয়টির ওপর পরিচালিত সার্ভিল্যান্স সম্পর্কে আলোকপাত করেছিলেন। এতে দেখা যায়, ২০১৫ সালে প্রতি এক হাজার জনে ১৮ দশমিক ৪৮ জন, ২০১৬ সালে ২৪ দশমিক ১১ জন, ২০১৭ সালে ২১ দশমিক ২৬ জন অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ছিল। তবে ২০১৮ সালে এটি কমে ২০ দশমিক ০৭ হলেও আবার ২০১৯ সালে সেটি বেড়ে ২৪ দশমিক ৭২ জনের মাঝে অ্যান্টিবায়োটিক কনজামশন লক্ষ্য করা যায়। আর ২০২০ সালে ২৫ দশমিক ৩৪ জনের মাঝে অ্যান্টিবায়োটিক কনজামশনের তথ্য জানা যায়। কিন্তু ২০২১ সালে অর্থাৎ কভিড-পরবর্তী সময়ে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের পরিমাণ বেড়ে হয় ৫২। এটি প্রাথমিক ফলাফল, যা বর্তমানে রিভিউ করা হচ্ছে।
২০১১ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রথমবারের মতো অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বিষয়টি সামনে আনে। তখন আমরা দেখতে পাই ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তকে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ও রেজিস্ট্যান্স বিষয়ে কিছুই ছিল না আমাদের দেশে। এরপরে আমরা এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র দেখার চেষ্টা করি। ২০০১ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ১০ বছরের প্রশ্নপত্র বিশ্লেষণ করে দেখতে পাই, মাইক্রোবিয়াল সম্পর্কে ১০ দশমিক ৩ থেকে ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ পর্যন্ত প্রশ্ন হিসেবে আসে। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল সম্পর্কে শূন্য দশমিক ৯ থেকে দুই দশমিক পাঁচ শতাংশ প্রশ্নপত্র এলেও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বিষয়ে কোনো কিছুই ছিল না। বর্তমানে দেশে নবম ও দশম শ্রেণির বইয়ে অ্যান্টিবায়োটিক প্রোডাকশন বিষয়ে উল্লেখ করা আছে। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির বইয়ে ধরে নেওয়া যেতে পারে তেমন কিছু উল্লেখ নেই। এর পরে আমরা গণমাধ্যমের পরিস্থিতি বোঝার জন্য দেশের প্রথম সারির দুটি ইংরেজি ও দুটি বাংলা পত্রিকা বিশ্লেষণ করি। সেখানেও আসলে অ্যান্টিবায়োটিক ও অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বিষয়ে উল্লেখ করার মতো তেমন কিছু ছিল না। একইরকমভাবে একটিমাত্র ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় দুই ঘণ্টা অ্যান্টিবায়োটিক শব্দটি উচ্চারণ করা হলেও রেজিস্ট্যান্স সম্পর্কে কিছুই ছিল না। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বিষয়টি শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্তি খুব জরুরি। আশা করি, বাংলাদেশের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সম্পর্কিত সাধারণ বিষয়াদি খুব দ্রুতই অন্তর্ভুক্ত করা হবে। 
ফরহাদুল ইসলাম
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বিষয়টি অন্তর্ভুক্তকরণের বিষয়টি অত্যন্ত উপযুক্ত সময়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। বাংলাদেশের শিক্ষা কারিকুলামে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে। আমরা ক্লাস সিক্সে অণুজীব, ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস সম্পর্কে ধারণা দিয়েছি, ক্লাস সেভেনে আর একটু ডিটেইল দিয়েছি, ক্লাস এইটে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েছি, নাইনে কিছু অ্যাক্টিভিটি দিয়েছি। আমরা মূল্যায়নেও পরিবর্তন এনেছি। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল বিষয়টি খুব সহজভাবেই শিক্ষার্থীদের বোঝানো সম্ভব। ইতোমধ্যে স্বাস্থ্যবিষয়ক নানা বিষয় পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। হাত ধোয়ার ওপর আমরা জোর দিয়েছি। আমরা শিক্ষকদেরও প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। আমরা পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছি। গুণীজনদের পরামর্শেই কাজ হচ্ছে। আগামী বছর নবম, দশম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জনের সুযোগ আছে। যে দাবি আছে, তা নোট নিচ্ছি আমরা। তবে সচেতনতা প্রাইমারি লেভেল থেকেই নিতে হয়। আপনাদের পরামর্শগুলো আমরা গ্রহণের চেষ্টা করব।
ড. এ কিউ এম শফিকুর আজম
শুধু পাঠ্যবইয়ে বা কারিকুলামের ভেতর সীমাবদ্ধ না রেখে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। শুধু শিক্ষার্থী নয়, তাদের বাবা-মা এবং চারপাশের মানুষকেও সচেতন করতে হবে। আমরা জানি, আমাদের নতুন কারিকুলামে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এতে করে আমাদের সন্তানরা আরও বেশি ইনোভেটিভ হবে। তারা নিজেদের সমস্যার সমাধান যেন নিজেরাই বের করতে পারে এমনভাবে পাঠ্যক্রম সাজানো হয়েছে।
অধ্যাপক সানিয়া তাহমিনা 
শুধু হিউম্যান হেলথ নয়, এটি সবার স্বাস্থ্যের জন্য জরুরি বিষয়। প্রাণী স্বাস্থ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার হলে তার প্রভাব পড়ে মানব স্বাস্থ্যেও। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স নিয়ে কাজ করছে। ফলে আমরা এখন পরিস্থিতি সম্পর্কে জানি।
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স কমাতে আইপিসি (ইনফেকশন প্রিভেনশন অ্যান্ড কনট্রোল) খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি হাসপাতালে চিকিৎসক যদি জানেন অপারেশনের পর রোগীর ইনফেকশন হবে না, তিনি তো অ্যান্টিবায়োটিক দেবেন না। তাতেই অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার অনেকটা কমে যাবে।
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল স্টুয়ার্ডশিপ সম্পর্কে আমাদের ধারণা খুব কম। অনেক বিজ্ঞজন ভাবেন, ডোন্ট ইউজ অ্যান্টিবায়োটিক। অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া তো দোষের না। সঠিক সময়ে, সঠিক ডোজে রোগীকে দিতে হবে। প্রতিটি জিনিস সঠিকভাবে করতে হবে। প্রয়োজন ছাড়া খাব না। তবে প্রয়োজনে খাব না, তা নয়। এতে মৃত্যুঝুঁকি আছে। কিছু ব্যাকটেরিয়াল ডিজিজ আছে যেমন ব্লাডে ইনফেকশন, যেটিকে আমরা সেফসিস বলি, এ ক্ষেত্রে অ্যান্টবায়োটিক দিতে দেরি করলে রোগীর ক্ষতি হতে পারে। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের বিষয়টি এখনকার শিক্ষার্থীদের পড়াতে পারলে ভবিষ্যতে অনেক সুফল পাবে জাতি।
অধ্যাপক মো. নাজমুল ইসলাম
গত ২০ বছরে আমরা স্বাস্থ্যসেবায় অনেক এগিয়েছি, যার ফলে আমরা অনেক সংক্রামক-অসংক্রামক রোগ মোকাবিলা করতে পেরেছি। তবে এখন আমাদের অ্যান্টিবায়োটিক রেজিট্যান্স খুবই ভাবাচ্ছে। এ নিয়ে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে পাঠ্যপুস্তকে এর অন্তর্ভুক্তি এখন সময়ের দাবি।
অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের প্রভাব, অপব্যবহার, কীভাবে দিন দিন অ্যান্টিবায়োটিক মাটি-পানির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে, এ বিষয়গুলো নিয়ে শিশুদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। বিষয়টি শিক্ষা কারিকুলামে অন্তর্ভুক্তি অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ। স্কুল একটি শিক্ষা কাঠামো। সেখানে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে পারলে আমরা একটি সুস্থ জাতি পাবো। শুধু মাধ্যমিকে নয়, প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাতেও কিন্তু অ্যান্টি মাইক্রোবিয়াল বিষয়টি অন্তর্ভুক্তি করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে শিশুরা ধীরে ধীরে এ বিষয়ে জেনে বেড়ে উঠবে। ফলে উপকৃত হবে তার পরিবার ও সমাজ। এর ফলে সামগ্রিকভাবে উপকার হবে দেশেরই।
শুধু স্কুলের শিক্ষা কারিকুলামই নয় আমাদের কিন্তু মাদ্রাসা কারিকুলামেও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের বিষয়ে জানাতে হবে। এখনই যদি আমরা উদ্যোগ নিই তবে সেটির ফলাফল এক সময় পরে গিয়ে পাবো। আর তা দীর্ঘমেয়াদে আমাদের দেশের জন্য উপকার বয়ে আনবে। এ ছাড়া কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থায়ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল বিষয়ে সচেতনতামূলক শিক্ষার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এর পাশাপাশি শিক্ষকদের যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় সেখানেও এ বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।
অধ্যাপক তাহমিনা শিরিন
যেহেতু সেকেন্ডারি এডুকেশনে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বলা হচ্ছে, তাই বিষয়টি পুরোপুরি পর্যায়ক্রমে হতে হবে এবং অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে কোন তথ্য শিক্ষার্থীদের জানানো হবে তা ঠিক করতে হবে। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার নিষেধ নয়, যৌক্তিক হতে হবে। এটাই জানাতে হবে শিক্ষার্থীদের। পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করার আগে এ বিষয়ে নানা পক্ষের বিশেষজ্ঞ মতামত নেওয়া যেতে পারে। 
মোহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেন খান  
ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত দেশগুলোতে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমছে। একই সঙ্গে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সও কমছে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার বেশি। আমাদের দেশে অ্যান্টিবায়োটিকের ফুল কোর্স সম্পন্ন করার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জনগণের ধারণা নেই, অ্যান্টিবায়োটিক ডিসপোজাল সম্পর্কেও জ্ঞান কম। মাধ্যমিক কারিকুলামে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স ইস্যুটা সংযোজন করা জরুরি। এটা ধাপে ধাপে সংযোজন করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা অনন্দ নিয়ে পড়তে এবং বুঝতে পারে।
মো. মামুনুর রশিদ 
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বিষয়টি সাধারণ মানুষের কাছে অপরিচিত। বিষয়টি বোঝানোর জন্য মিডিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মিডিয়া পার্সোনালিটির ইনভলমেন্ট করতে হবে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো তুলে ধরার জন্য। এইচপিএএনপির ফিফথ সেক্টর প্ল্যানে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বিষয়টি অ্যাড্রেস করে কোনো বাজেট রাখা প্রয়োজন। শিক্ষক, ডাক্তার, নার্সু সবারই ভূমিকা আছে। বর্তমান জেনারেশনকে জেড জেনারেশন বলা হয়। এরা প্রচারণায় বিশ্বাসী, এরা এম্বিশাস। এরাই ভবিষ্যতের লিডার। এদের টার্গেট করে কারিকুলামকে আপডেট করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আমরা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বিষয়ে একটি সচেতন প্রজন্ম তৈরি করতে পারি।
অধ্যাপক জাকির হোসেন হাবিব  
আমাদের সব শিক্ষার্থী কিন্তু ডাক্তার হবে না। সে জন্য অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে কিছু বেসিক জিনিস তাদের জানতে হবে। আমরা জানি, আমাদের শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবইকে গুরুত্ব দেয়। সেখানে যদি থাকে হাত ধুয়ে খাবার খাও, তুমি স্যানিটারি ল্যাট্রিন ব্যবহার করো, তাহলে অবশ্যই অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের বিষয়টি বলা উচিত। কারণ আইপিসি একটি বড় ইস্যু।
আমরা এখন পোস্ট অ্যান্টিবায়োটিক এরাতে আছি। আমাদের হাতে কিন্তু খুব বেশি অ্যান্টিবায়োটিক নেই। গুটি কয়েক অ্যান্টিবায়োটিকের ওপর কাজ চলছে। আমাদের আইসিইউগুলোতে প্রতিনিয়ত অনেক রোগী সেফসিসে মারা যাচ্ছে।
আরেকটি বিষয়ে আমাদের সতর্ক হতে হবে, সেটা হলো হাসপাতালে রোগী দেখতে যাওয়া। এখান থেকে রোগী ও স্বজন দুই পক্ষেরই ক্ষতির আশঙ্কা আছে। কারণ আমাদের হাসপাতালগুলো মাল্টিড্রাগ রেজিস্ট্যান্সের কারখানা। তাই হাসপাতালে রোগী দেখতে যাওয়ার বিষয়ে সতর্কতা জরুরি। অনর্থক রোগীর পাশে ভিড় করা যাবে না। আর হাসপাতালে গেলেও রোগীর সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।
প্রাইমারি স্কুলে বাচ্চারা কাদামাটির মতো থাকে। তাদের যা বলা হয় তারা শোনে। কীভাবে তাদের অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের বিষয়টি জানানো যায়, তা ভাবতে হবে। পাশাপাশি হায়ার লেভেলে, কলেজ লেভেলে, মেডিকেল লেভেলেও আমাদের যাওয়া উচিত। তাদেরও বিষয়গুলো জানানো উচিত।
মো. খালিদ সাইফুল্লাহ  
বর্তমানের স্লোগান হলো বেটার হেলথ, বেটার এডুকেশন। বর্তমানে আমরা প্র্যাকটিক্যাল এডুকেশনের দিকে চলে এসেছি। পাঠ্যপুস্তকে হাত ধোয়ার বিষয়টি যখন অন্তর্ভুক্ত করা হলো তখন শিশুদের মাঝে বিষয়টি জনপ্রিয়তা পেল। এ ছাড়া এইডস, ডেঙ্গু বিষয়গুলো পাঠ্যপুস্তকে আন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে প্রণীত কমিকস বই ‘টিনু-মিনু ও সুপার বাগ’, ‘ট্যাপা-গোপীর চিন্তাভাবনা’,  পড়ষড়ৎরহম নড়ড়শ ুঞযব ওহাবহঃরড়হ ড়ভ চবহরপরষষরহ”, কমিকস পোস্টার বাংলাদেশের মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে বিতরণের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে সম্মতি প্রদান করা হয়েছে। আমরা আশা করছি, কারিকুলামে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হলে শিক্ষার্থীদের মাঝে এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি হবে।
ড. সাকিবা ইয়াসমিন অধ্যাপক
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের ভয়াবহতায় পড়তে যাচ্ছি আমরা। এটা প্রতিরোধ করতে সবার আগে আমাদের জ্ঞান বাড়াতে হবে। সচেতনতা বাড়াতে হবে। আর এটা করতে হয় ছোটবেলা থেকে। আমি মনে করি, স্কুলজীবন থেকে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের বিষয়টি পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
প্রথমে দেখতে হবে, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের বিষয়টি কীভাবে পাঠ্যবইয়ে আছে। আমরা জেনেছি, এখন আমাদের পাঠ্যবইয়ে অ্যান্টিবায়োটিকের উৎপাদন সম্পর্কে বলা আছে। কিন্তু আমাদের দরকার ব্যবহার নিয়ে সচেতন করা। এ ক্ষেত্রে কিছু বিষয় মাথায় রাখতে হবে। প্রথমে ঠিক করতে হবে আমরা কী কী বিষয় যুক্ত করব। কঠিন হওয়ায় খুব সহজভাবে বিষয়টি পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করতে হবে, যাতে গ্রামবাংলার শিক্ষার্থীরাও বুঝতে পারে। এটা পরিবেশ, প্রাণী ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে কীভাবে মানব শরীরে আসে, তাও সহজভাবে বলে দিতে হবে। পরীক্ষায় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স নিয়ে যেন প্রশ্ন আসে, তাহলে শিক্ষার্থীরা বিষয়টি পড়বে, গুরুত্ব দেবে। এটাকে পুঁথিগত বিদ্যা না বানিয়ে দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরতে হবে। পাশাপাশি যারা শিক্ষার্থীদের শেখাবেন, সেই শিক্ষকদের বিষয়টি জানাতে হবে। প্রয়োজনে তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
সবশেষে বলছি, আমরা এ বিষয়ে একমত যে, পাঠ্যবইয়ে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের বিষয়টি যুক্ত করতে হবে। যত দ্রুত করা যায় ততই ভালো।
ড. শারমিন্দ নীলোৎপল
বাংলাদেশে অনেক শিক্ষার্থী দ্রুত ঝরে যায়। তাই ষষ্ঠ শ্রেণি নয়, তার আগেই প্রাথমিক পর্যায়েই অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের বিষয়টি পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করা জরুরি। খুব ছোট আকারে সহজভাবে বিষয়টি শিক্ষার্থীদের জানাতে হবে। তাদের সচেতন করতে হবে। ছোটবেলা থেকেই প্র্যাকটিস শুরু করাতে পারলে তা বেশি কাজে দেয়।
আমাদের শিশুদের আমরা যেহেতু গ্লোবাল সিটিজেন হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, তাই বৈজ্ঞানিক টার্মগুলো ব্রাকেটে দিতে হবে। তারা সবটুকু অল্প অল্প করে জানুক। তবে তাদের কাছে পৌঁছাতে শব্দচয়ন সাবধানে হতে হবে।
আমরা এখানে ফোকাস করছি বাংলা মিডিয়ামে। কিন্তু ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষার্থীরাও যেন অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের বিষয়টি পড়তে পারে। তাদের সিলেবাসেও বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
আরেকটি বিষয়, অ্যান্টিবায়োটিকের ডিসপোজাল। সব ওষুধের ডিসপোজাল আর অ্যান্টিবায়োটিকে ডিসপোজাল আলাদা। অ্যান্টিবায়োটিক যদি আমরা মাটিতে পুঁতে দিই তাহলেই কি শেষ? না। মাটি থেকে পানিতে যাচ্ছে, পানি থেকে ফসলে যাচ্ছে, প্রাণী খাচ্ছে। সেই প্রাণীর মাংস আমরা খাচ্ছি। ধানে যাচ্ছে, সেই ধান আমরা খাচ্ছি। তার মানে ঘুরেফিরে এটা আমার কাছেই ফিরে আসছে। আর আমরা সেইসব অ্যান্টিবায়োটিকে রেজিস্ট্যান্স হয়ে যাচ্ছি। যখন পঞ্চাশ-ষাট বছরে আমাদের কোনো রোগ হবে তখন সেইসব অ্যান্টিবায়োটিক আমাদের শরীরে কাজ করবে না। এই সচেতনতা আমাদের ছোটবেলা থেকেই করতে হবে। এটার কার্যকরী মাধ্যম পাঠ্যবইয়ে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা।
ডা. নওরোজ আফরিন
আমি দুটি বিষয়ে জোর দিতে চাই। প্রথমত, যদি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের বিষয়টি পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করতে হয় তাহলে কনটেন্ট বা মেসেজ কী হবে তা ক্লিয়ার করতে হবে। কারণ অ্যান্টিবায়োটিক ইজ আ লাইভ সেভিং ড্রাগ। তাই আমি মনে করি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের বিষয়টি পাঠ্যবইয়ে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা জরুরি।
দ্বিতীয় বিষয়, অ্যান্টিবায়োটিকের মোড়কে রেড মার্কিং করে দিয়েছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। এটা দারুণ একটা পদক্ষেপ। এতে একজন মানুষ সহজেই অ্যান্টিবায়োটিক চিনতে পারছে। আমি মনে করি, এই বিষয় দুটি পাঠ্যবইয়ে উল্লেখ করে দিতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া যাবে না তা জানাতে হবে শিক্ষার্থীদের।
ডা. অনিন্দ্য রহমান
সংক্রমণ প্রতিরোধে আমরা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করি। অর্থাৎ আমাদের যত ইনফেকশন হবে, তত অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বাড়বে। এখন আমাদের ইনফেকশন যেন কম হয় সেই দিকে নজর দিতে হবে এবং এই বার্তাটি সবার কাছে পৌঁছে দিতে হবে। তবে আমরা যত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করি তার একটি বড় অংশই সর্দি-জ্বর, কাশি বা পেটের অসুখে। আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রয়োজন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক খেলে আমাদের নিজের যেমন ক্ষতি হচ্ছে সেইসঙ্গে পরিবার এবং আশপাশে মানুষেরও ক্ষতি হচ্ছে। তাই আমি মনে করি, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের এই বিষয়গুলো পাঠ্যবইয়ে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা জরুরি।
রায়ান আমজাদ
২০১৮ সাল থেকে ১৮ হাজার রিটেল ফার্মেসি টেকনিশিয়ানকে গুড ফার্মেসি প্র্যাকটিস এবং এএমআরের ওপর প্রশিক্ষণ দিয়েছি। প্রশিক্ষণ শেষে আমরা একটা ইন্টারনাল সার্ভে করি। উদ্দেশ্য, তাদের নলেজ এবং প্র্যাকটিসে কোনো পরিবর্তন আছে কিনা সেটা দেখা। এতে দেখা গেছে, গুড ফার্মেসি প্রশিক্ষণ নেওয়া ৯৪ শতাংশ ফার্মেসি টেকনিশিয়ান অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রির সময় একটি রেজিস্ট্রার মেইনটেইন করেন এবং ৫৪  শতাংশ ফার্মেসি টেকনিশিয়ান রোগীকে পূর্ণ ডোজ ঔষধ খাওয়ার পরামর্শ দেন। এই তথ্য থেকে আমরা বুঝতে পারছি, সঠিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স নিয়ে সচেতনতা বাড়ে। বিষয়টি পাঠ্যপুস্তকে যুক্ত করলে সচেতনতা ব্যাপকভাবে বাড়ানো সম্ভব।

অংশগ্রহণকারী আলোচকবৃন্দ

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ ইউসুফ
মহাপরিচালক, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর

অধ্যাপক ডা. মো. ইসমাইল খান 
উপাচার্য, চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

মো. সাইদুর রহমান
অতিরিক্ত সচিব, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ 
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়

হোসেন আলী খন্দকার
অতিরিক্ত সচিব, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ 
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়

অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান
চেয়ারম্যান, ফার্মাকোলজি বিভাগ 
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

ফরহাদুল ইসলাম
চেয়ারম্যান, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড

ড. এ কিউ এম শফিকুর আজম
পরিচালক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর

অধ্যাপক সানিয়া তাহমিনা
সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

অধ্যাপক মো. নাজমুল ইসলাম 
পরিচালক, রোগ নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

অধ্যাপক তাহমিনা শিরিন
পরিচালক, আইইডিসিআর

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেন খান  
যুগ্ম সচিব, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ 
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়

মো. মামুনুর রশিদ 
যুগ্ম সচিব, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়

অধ্যাপক জাকির হোসেন হাবিব  
প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আইইডিসিআর

মো. খালিদ সাইফুল্লাহ  
সহকারী পরিচালক (বিশেষ শিক্ষা) 
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর

  ড. সাকিবা ইয়াসমিন অধ্যাপক 
ফার্মেসি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

ড. শারমিন্দ নীলোৎপল
অধ্যাপক, স্কুল অব ফার্মেসি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি

ডা. নওরোজ আফরিন
সহকারী অধ্যাপক, রোগতত্ত্ব বিভাগ, নিপসম 

ডা. অনিন্দ্য রহমান
ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার, সিডিসি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

রায়ান আমজাদ
বেটার হেলথ ইন বাংলাদেশ

আরও পড়ুন

×