ঢাকা মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪

সমকাল ও ব্লাস্টের উদ্যােগে গোলটেবিল বৈঠক

ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষায় আইন প্রণয়ন জরুরি

ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষায় আইন প্রণয়ন জরুরি

ছবি: মাহবুব হোসেন নবীন

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৩ | ২২:০১

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষার বিষয়ে আইন ও নীতিমালা থাকলেও বাংলাদেশে এখনও এই আইন প্রণয়ন না হওয়ায় ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পাচ্ছেন না বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, বিভিন্ন সময় ভুক্তভোগী মামলা করলে এবং সাক্ষ্য দিলে হুমকি-ধমকি ও হামলার শিকার হন; যার কারণে পরবর্তী সময়ে ভুক্তভোগী মামলা তুলে নিতে বাধ্য হন কিংবা সাক্ষী আদালতে উপস্থিত হন না। ফলে বিচার বিলম্বিত হয়। এই আইন হলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। 
গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সমকালের সভাকক্ষে ‘ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়ন : ন্যায়বিচারে অভিগম্যতা প্রেক্ষিত’ শীর্ষক আয়োজিত  গোলটেবিল আলোচনায় তারা এসব কথা বলেন। ‘বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)’ ও ‘সমকাল’ এর আয়োজন করে। সার্বিক সহযোগিতায় ছিল ‘ইউএসএআইডি’ ও ‘উইনরক ইন্টারন্যাশনাল’

 

মো. নিজামুল হক 
সুরক্ষা আইনগুলো কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে প্রয়োগ করা আসলে শক্ত। কারণ, আমাদের দেশে যারা সাক্ষ্য দিতে আসেন, তারা কোথাও সুরক্ষিত নন। তারা বিভিন্ন সময় বন্ধু, শত্রু, সমাজ, আদালত এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই এসব বাধা অতিক্রম করে এগোতে হয়। এ দেশে একজন সাধারণ মানুষ মামলা করলে সেই মামলার শেষ পর্যন্ত পৌঁছাতে এবং রায় পেতে কত পরিশ্রম লাগে, সেটি ভুক্তভোগী, আইনজীবী, বিচারক এবং মানুষ হিসেবে আমি জানি। ২০১০ সালে যুদ্ধাপরাধী বিচার ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান থাকাকালে আমি প্রথম শুনি যে, এ দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিষয়ে সাক্ষ্যদাতাদের সুরক্ষা দরকার হবে। এই কথাটি বাইরের একজনের কাছে শুনি। তিনি আইনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। তিনি বাস্তববাদী মানুষ। তিনি বলেছিলেন, ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে সরকার যে যুদ্ধ শুরু করেছে, তা রায়ের মাধ্যমে শেষ হবে না। এ মামলার ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সুরক্ষায় আইন করা দরকার।’ সবাই একমত হয়েছিলাম এই আইন করার বিষয়ে। আইন মন্ত্রণালয়ে খসড়াও প্রণয়ন করা হয়েছিল। তারপর সেই আইনের আর কোনো খবর নেই। এটিই হলো বাস্তবতা। 
যারা এই মামলাগুলোতে সাক্ষ্য দিয়েছেন, তারা কি খুব সুরক্ষিত আছেন? না। তারা ভয়ের মধ্যে আছেন। কিছু মানুষ হয়তো নিজেদের মানুষের ওপর নির্ভর করে সুরক্ষিত আছেন। যিনি শক্তিশালী, তিনি এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারছেন। যিনি দুর্বল, তিনি সাক্ষ্য দেওয়ার পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারেন না। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোতে যারা সাক্ষী ছিলেন, তাদের সুরক্ষা নিয়ে আদালত চিন্তিত ছিলেন। তাদের প্রত্যেককে আমরা বলেছি, বাড়ি ফিরে গিয়ে নিকটবর্তী থানার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে। অন্যদিকে, থানাগুলোকেও সাক্ষীদের সুরক্ষা দিতে নির্দেশনা দিয়েছিলাম। এই নির্দেশনার কারণে আইন না থাকলেও সাক্ষীদের কিছুটা সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৫৩টি মামলার রায় দেওয়া হয়েছে। সাক্ষী সুরক্ষা আইন অবশ্যই দরকার। তবে এই আইন করতে গেলে এটি বিবেচনা করতে হবে যে সাক্ষী সুরক্ষা মানে কি শুধু সাক্ষ্য দেওয়ার সময় সুরক্ষা, নাকি পরেও সুরক্ষা দেওয়া হবে, কত দিন সেটি দেওয়া হবে। আইনের গভীরতা হিসেবে নিরাপত্তার সময় নির্ধারণ করতে হবে। সব মামলায় যে রায়ের পরেও সুরক্ষা দিতে হয়, বিষয়টি এমন নয়। যেসব মামলায় সাক্ষীদের মামলা-পরবর্তী সময়ে নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকবে, সেটি বিবেচনা করে দিতে হবে। কোনো আইনেই এ বিষয়টি বলা নেই। ক্ষেত্রবিশেষে মামলার তদন্ত কর্মকর্তাদেরও নিরাপত্তা বিধান করতে হবে। মামলার রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে গুরুত্ব বিবেচনা করে ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের মামলা-পরবর্তী নিরাপত্তা বিধান করা যেতে পারে। 

গ্লোরিয়া ঝর্ণা সরকার 
ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষা আইনটি স্থায়ী কমিটিতে আনা হয়েছিল এবং এই আইনের বিষয়ে আলোচনাও হয়েছিল। আমরা এখনও শেষ পর্যায়ে যেতে পারিনি। মানব পাচারের ক্ষেত্রে রুদ্ধদ্বার বিচার না করে বিশেষ আদালতের বিচার করা যেতে পারে। আমাদের বিচার অঙ্গনে বিচারকের অভাব রয়েছে। সেখানে নতুন কোনো বিচারককে নিয়োগ না দিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের খণ্ডকালীন হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। সঠিকভাবে পরিকল্পনা করে এগোলে আরও গুছিয়ে আইন প্রণয়ন করা সম্ভব। বিভিন্ন জায়গায় আমাদের অনেক ফান্ড রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকার থেকে থোক বরাদ্দ দিয়ে স্থায়ী একটি বিশেষ ফান্ড করা যেতে পারে। সেখান থেকে যে মুনাফা আসবে, সেখান থেকে আস্তে আস্তে ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সুরক্ষায় ব্যবহার করা যেতে পারে। শুরুতে হয়তো সবাইকে এর আওতায় আনা সম্ভব হবে না। বিশেষ পরিস্থিতির শিকার যারা, তাদের শুরুর দিকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। এরপর ধীরে ধীরে সবাইকে এর আওতায় আনা যেতে পারে। এ ছাড়া দেশের সচেতন নাগরিক এবং এ বিষয় নিয়ে কাজ করা বিদেশি বন্ধুরা মিলে যদি একটি সাধারণ ফান্ড তৈরি করার বিষয়ে কাজ করতে পারেন, তাহলে সরকারের ওপর চাপ কমবে। সরকার তো এই বরাদ্দ দেবেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বিষয়ে আন্তরিক। এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র সচিব, সুরক্ষা সচিবসহ সংশ্লিষ্ট সবাই মিলে সিস্টেমের মধ্যে থেকে যদি প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি আকারে তুলে ধরা যেতে পারে, আমি নিজে সেই স্মারকলিপি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেব।


আবু সাঈদ খান
ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সুরক্ষায় একটি সমন্বিত আইন প্রয়োজন। তাদের জন্য প্রয়োজনে ‘সেইফ হোমের’ ব্যবস্থা করা যেতে পারে। শুধু নারী ও শিশুই নয়, পুরুষরাও এ ধরনের অপরাধের ভুক্তভোগী হতে পারেন। সে ক্ষেত্রে পুরুষদেরও সেইফ হোমে রাখতে হবে। ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের বাড়ি থেকে শুরু করে সব জায়গায় সুরক্ষা দিতে হবে। তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। সর্বোপরি বিদ্যমান অন্যান্য আইনের সঙ্গে সংগতি রেখে এই আইন প্রণয়ন করতে হবে। 

 

 

তাজুল ইসলাম 
যখন একজন ভুক্তভোগী একটি অপরাধের শিকার হন, তখন তিনি মানসিক অস্থিরতা এবং ট্রমার মধ্য দিয়ে যান। এ কারণে অনেক সময় ভুক্তভোগী বিচার চাইতে যান না। এ ছাড়া অপরাধীও নানা ধরনের হুমকি-ধমকি দিয়ে ভুক্তভোগীকে মামলা করতে নিরুৎসাহিত করেন। বিশ্বের অনেক দেশেই ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সুরক্ষায় আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৮২ সালে, যুক্তরাজ্যে ১৯৯৯ সালে, অস্ট্রেলিয়ায় ১৯৯৪ সালে, পাকিস্তানে ২০১৭ সালে ও শ্রীলঙ্কা ২০১৪ সালে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইন করেছে। ভারত ২০১৮ সালে ‘উইটনেস প্রটেকশন স্কিম’ নামে একটি নীতিমালা করেছে। পাশাপাশি দেশটির সিআরপিসি অথবা পেনাল কোডে এ বিষয়ে কিছু সুরক্ষা রয়েছে। ২০০৬ সালে বাংলাদেশের আইন কমিশন প্রথম এ বিষয়ে একটা খসড়া প্রস্তাবনা দেয়। এতে ঘৃণ্য এবং বড় ধরনের অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষা দিতে বলা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে আইন কমিশন এ খসড়াকে আরও আধুনিকায়ন করে। এ ছাড়া অনেক মামলায় উচ্চ আদালত ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষায় আইন প্রণয়নের বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দেন। বাস্তবতার বিবেচনায় দেখা যায়, ভুক্তভোগীরা অনেক ক্ষেত্রে তাদের আইনগত কোনো সুরক্ষা না থাকায় তারা কোনো বিচার পাচ্ছেন না। ঢাকা কোর্টের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের ২০০২ থেকে ২০১৬ সালের প্রায় আট হাজার মামলা নিয়ে একটি জাতীয় দৈনিক গবেষণা করেছিল। এতে দেখা যায়, ৫৫ শতাংশ মামলায় এফআইআরে নাম থাকা সব সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের সবার দাবি, সমন্বিত ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষা বিল করতে হবে। 

এস এম রেজাউল করিম
অনেক মামলায় ভুক্তভোগীরা আসামিদের তুলনায় কম শক্তিশালী থাকায় নানা ধরনের হয়রানির শিকার হন। দেখা যায়, চার্জশিটে উল্লেখ করা সাক্ষীরা আসামিদের হামলার ভয়ে সাক্ষ্য দিতে আদালতে যেতে পারেন না। অনেক সময় বাধ্য হয়ে ভুক্তভোগীরা মামলা তুলে নিতেও বাধ্য হন। তাদের সুরক্ষার বিষয়ে আইন করে তার সঠিক প্রয়োগ করলে এমন পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব। 

 

 

 

ড. কাজী জাহেদ ইকবাল
আমরা যখন আইন অধ্যয়ন করি, তখন তার কাছাকাছি অন্য আইনগুলো অধ্যয়ন করি না। আমাদের দেখা দরকার যে অন্য আইনগুলো এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হচ্ছে কিনা অথবা অন্য আইনে এ বিষয়ে কী বলা আছে। কারণ সাক্ষী সুরক্ষার কথা কিছু আইনে আছে। এখন যদি সাক্ষী সুরক্ষার বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ একটি আইন হয়, তাহলে অন্যান্য আইনে এ বিষয়ে কী বলা আছে, তার সঙ্গে যেন সাংঘর্ষিক না হয়। এ বিষয়ে খুব সতর্ক হতে হবে। অন্যদিকে, আমরা যদি জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ পেতে ‘সিভিল প্রসিডিওরের’ মধ্যে দিয়ে যাই, তাহলে এটি দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে পড়ে যায়। এ জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ আদায়ে এ দীর্ঘসূত্রতা কীভাবে দূর করা যায়, সে বিষয়ে সংস্কার আনা যেতে পারে। সর্বোপরি, দর্শনগত জায়গাটা নির্দেশ করে এ আইন করতে হবে। তা না হলে দিনশেষে এটি শুধু একটি আইন হবে ঠিকই, কিন্তু তা অকার্যকর হবে।

 

আয়েশা আক্তার
লিঙ্গ-নির্বিশেষে সকল ভুক্তভোগী ব্যক্তি ও সাক্ষীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা উচিত। মানব পাচার অপরাধটি প্রকৃতিগতভাবেই বাংলাদেশের নাগরিক কর্তৃক ভিন্ন দেশে অথবা ভিন্ন দেশের নাগরিক কর্তৃক বাংলাদেশে সংঘটিত হতে পারে। তাই চূড়ান্ত ভুক্তভোগী ব্যক্তি ও সাক্ষীর সুরক্ষা আইন প্রণয়নের সময় আইনটিতে অতিরাষ্ট্রিক প্রয়োগের বিধান রাখা উচিত। মানব পাচারের শিকার ভুক্তভোগী ব্যক্তি ফৌজদারি আদালতের পাশাপাশি যেন দেওয়ানি আদালতের মাধ্যমেও তাদের প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারেন, সেদিকটি বিশেষ বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিপূরণের হার নির্ধারণের সময় যেন ভুক্তভোগী ব্যক্তির হারানো আয় এবং আয় উৎপাদন সক্ষমতার ক্ষতিকে বিবেচনায় নেওয়া হয়, সেদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি ভুক্তভোগী ব্যক্তি ও সাক্ষীর সুরক্ষায় ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন, তহবিলের উৎস, ক্ষতিপূরণ প্রদানের পদ্ধতি– এ বিষয়গুলোরও উল্লেখ সুস্পষ্টভাবে থাকতে হবে। মানব পাচারের শিকার ভুক্তভোগী ব্যক্তি ও সাক্ষীদের সংবেদনশীলতা বিবেচনা করে রুদ্ধকক্ষ বিচারের বিধান রাখা উচিত। 

নিগাত সীমা
মামলার দীর্ঘসূত্রতার কারণে ভুক্তভোগী ও সাক্ষী অনেক সময় সাক্ষ্য দিতে আসতে চান না। আরেকটা বিষয় হলো, ভুক্তভোগী দরিদ্র এবং আসামি শক্তিশালী হলে একটি মামলা হওয়ার পর দুই পক্ষের মধ্যে আপসের একটি ব্যাপার ঘটে। তখন দেখা যায়, আপসের কারণে মামলা শেষ হয়ে যায়। অনেক সময় আমরা মানব পাচারের মামলা করছি; কিন্তু আপসের কারণে এ মামলা বেশিদূর এগোয় না। রিক্রুটিং এজেন্সি থেকে শুরু করে প্রভাবশালীরা টাকা-পয়সা দিয়ে ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর মুখ বন্ধ করে দেন। আবার দেখা যায়, একজন মানুষ সাক্ষ্য দিতে আসবে, কিন্তু তার কাছে কোনো টাকা-পয়সা থাকে না। কোনো তহবিল না থাকলে দূর-দূরান্ত থেকে কেউ সাক্ষ্য দিতে আসতে চান না। শুধু মানব পাচার মামলা নয়, অনেক মামলার ক্ষেত্রেই এটি হচ্ছে। মামলার আইনজীবীর ফি দেওয়া হলেও সাক্ষীকে আনা-নেওয়ার খরচ দেওয়া হয় না। আমরা অনেক মামলায় দেখেছি যে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা অন্যস্থানে বদলি হয়ে গেলে নিজের খরচে এসে সাক্ষ্য দিতে হয়। বদলির কারণে সাক্ষী না পাওয়া অন্যতম একটি কারণ। একজন ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করে নিয়ে আসার পর পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন করতে হবে। এ বিষয়ে সরকারের একটি উদ্যোগ প্রয়োজন। নারী-পুরুষ সবাইকে এই পুনর্বাসনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে তাদের জন্য তহবিলের ব্যবস্থা করতে হবে। 


রুমা সুলতানা
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ২০২০ সালে অপরাধের ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সুরক্ষার আইনটি নিয়ে একটি খসড়া প্রণয়ন করা হয়। তখন ৭৫০ জন ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর মধ্যে জরিপ করে দেখা যায়, ৬৯ শতাংশ ভুক্তভোগী ও সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে ফেরার সময় কোনো না কোনোভাবে তারা হয়রানির শিকার হয়েছেন। ৭৯ শতাংশ ভুক্তভোগী ও সাক্ষী মনে করেন যে, তাদের সুরক্ষায় অবশ্যই একটি আইন হওয়া দরকার। ২০২০ সালে আমরা ২৫টি ধর্ষণ মামলা বিশ্লেষণ করি। সেখানে দেখা যায়, অধিকাংশ মামলার চার্জশিট ছয় থেকে সাত মাসের মধ্যে হয়ে গেলেও চার থেকে পাঁচ বছরেও সেই মামলাগুলোর বিচার শেষ হয়নি। এর কারণ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ভুক্তভোগী ও সাক্ষী নিয়মিত হাজিরা না দেওয়ায় মামলাগুলো ঝুলে আছে। এর অন্যতম একটি মূল কারণ হচ্ছে, তাদের কোনো না কোনোভাবে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। শুধু ধর্ষণ কিংবা নারীরা নয়, প্রান্তিক পর্যায়ের নারী-পুরুষ সবার ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য। অনেক সময় অনেকে মামলাই করেন না। কেননা, মামলা করার আগেই নানা ধরনের হুমকি-ধমকি দিয়ে তাদের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়। যদিও বা মামলা হয়, তাহলে সেই মামলা তুলে ফেলতে হয় কিংবা মামলার শুনানিতে ভুক্তভোগী কিংবা সাক্ষী উপস্থিত হতে পারেন না। এর কারণে মামলার রায় হতে অনেক দেরি হয় কিংবা অনেক ক্ষেত্রে রায় হয়ও না। 
বাংলাদেশ জাস্টিস অডিটের জরিপ অনুযায়ী, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালে ৭৭ শতাংশ মামলা ঝুলে আছে। জরিপে বলা হয়েছে, এই মামলাগুলো সময়মতো শেষ না হওয়ার তিনটি মূল কারণের মধ্যে একটি হচ্ছে বিচারিক আদালতে সময় মতো সাক্ষী উপস্থিত না হওয়া । ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষা আইন না থাকায় এবং আদালতে তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত না হওয়ায় অপরাধ দমনে দ্রুত বিচার ট্রাইবুনাল গঠন করা হলেও  দ্রুত  বিচার সম্ভব হচ্ছে না। উচ্চ আদালতের বিভিন্ন মামলার রায় যেমন, ক্রিমিনাল আপিল মামলা নং ৭২৫৩/২০১৯-এই মামলায় সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়নের বিষয়ে সরকারের কাছে প্রত্যাশা রয়েছে।


মাহবুবা আক্তার 
প্রস্তাবিত ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষা আইনের বিষয়ে বৃহত্তর পরিসরে আলোচনার প্রয়োজন। যারা ভুক্তভোগী আছেন এবং যারা দৈনন্দিন জীবনে নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছেন, তাদের সঙ্গেও আমাদের কথা বলা দরকার। আইনটি বাস্তবায়নে কতটুকু কার্যকর হবে, সেদিকটি খেয়াল রেখে আইনের ধারা প্রণয়ন করে সংসদে পাঠাতে হবে। আমার সুপারিশ হলো, আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়-দায়িত্ব আইনে সুনির্দিষ্ট করা জরুরি। এই খসড়ায় ভার্চুয়াল সাক্ষ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাহলে যারা নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে আদালতে উপস্থিত হতে পারেন না, তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা যাবে। পাশাপাশি তাদের সুরক্ষাও নিশ্চিত হবে।

 


কামরুন নাহার
ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর সুরক্ষা এবং বিচারের অভিগম্যতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমার নিজের অপরাধবোধ হচ্ছে এ কারণে যে, ২০১২ সালের একটি আইনের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা ২০২০ সালে এ আইনের একটি খসড়া বানালাম। এর সঙ্গে অনেক বড় বড় আইনজ্ঞ জড়িত থাকলেও এ বিষয়ে আমাদের এখনও সমন্বিত আইন হয়নি। তবে এ দেশে খুব ভালো একটি উদাহরণ রয়েছে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুর জন্য একটা সমন্বিত প্রটোকল রয়েছে। এ অভিজ্ঞতার আলোকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের নিয়ে কোনো প্রোগ্রাম তৈরি করা। ভুক্তভোগীও পরবর্তী সময়ে সাক্ষী হন। ভুক্তভোগীর জন্যে যে প্রটোকলটি রয়েছে, সেটি সাক্ষী সুরক্ষার উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। সুরক্ষা বলতে শুধু ভয়ভীতি থেকে রক্ষা করা, তা কিন্তু নয়। আদালত প্রাঙ্গণে নিরাপদে অপেক্ষা করার ঘরটি রয়েছে কিনা, ওয়াশরুমে নিরাপত্তা রয়েছে কিনা, শিশুকে দুগ্ধ পান করানোর জায়গা রয়েছে কিনা– এগুলোও সুরক্ষার জায়গা বলে আমি মনে করি। যেহেতু এ আইন বিল আকারে এখনও উপস্থাপিত হয়নি, সেহেতু এ বিষয়গুলো এ আইনে যুক্ত করা গেলে একটি সম্পূর্ণ ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষা আইন করা সম্ভব হবে। 


কাজী ফারাহবী রহমান
ভুক্তভোগী ও সাক্ষী আদালতে আসার পর একসময় সাক্ষ্য দেওয়ার ইচ্ছাটি হারিয়ে ফেলছেন। এর একটি বড় কারণ হলো অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী না হওয়া ও নিরাপদ স্থান না থাকা। আমাদের ডোনাররা তহবিল ও শেল্টার হোমের ব্যবস্থা করছে। এ আইন করা গেলে ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের জন্য সরকারিভাবে এ বিষয়টা নিশ্চিত করা যাবে। এতে তারা উপকৃত হবেন। 

 

 


শাহিনুর আক্তার
মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে আমরা যেটি দেখেছি, সেটি হলো– মানব পাচারের শিকার ভুক্তভোগীদের জন্য শেল্টার হোম প্রয়োজন। সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিশেষায়িত কোনো শেল্টার হোম নেই, যেখানে শুধু মানব পাচারের শিকার ভুক্তভোগীদের রাখা হবে। কেননা তারা ভুক্তভোগী হিসেবে বিশেষ সেবা পাওয়ার অধিকার রাখেন। এ সেবাটি আমরা দিতে পারছি না। নারী-পুরুষ-শিশু সবার জন্য শেল্টার হোম দরকার। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের সুরক্ষায় একটি তহবিল গঠন করা প্রয়োজন। এ তহবিল গঠনের কাজ কোন প্রক্রিয়ায় করা যায় এবং তা কীভাবে কার্যকর করা যায়, এ বিষয়ে ভাবতে হবে।

 

সুপারিশ

ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষায় আইন প্রণয়ন করতে হবে।
নারী ও শিশুর সংবেদনশীলতা বিবেচনা করে ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষা আইনে  নারী-পুরুষ-শিশুসহ সকল ভিকটিম ও সাক্ষীকেই সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে।
মানব পাচারের অপরাধটি বাংলাদেশের নাগরিক কর্তৃক ভিন্ন দেশে অথবা ভিন্ন দেশের নাগরিক কর্তৃক বাংলাদেশে অথবা বাংলাদেশের নাগরিক কর্তৃক ভিন্ন দেশের নাগরিকের ওপর সংঘটিত হতে পারে বিধায় আইনে অতিরাষ্ট্রিক প্রয়োগের বিধান রাখা।
মানব পাচারের শিকার ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সংবেদনশীলতা বিবেচনা করে রুদ্ধকক্ষ বিচারের বিধান রাখা।
প্রস্তাবিত ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষা আইনে দেওয়ানি প্রতিকারের বিধান রাখে।
প্রস্তাবিত আইনে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের বিস্তারিত পদ্ধতির বিধান রাখা প্রয়োজন, যেখানে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণে ভিকটিমের হারানো আয় ও আয় উৎপাদন সক্ষমতার ক্ষতিকে বিবেচনা করা হবে।
প্রস্তাবিত আইনে ভিকটিম ও সাক্ষীদের সুরক্ষায় তহবিল গঠনের ব্যাপারে বিস্তারিত বিধান অন্তর্ভুক্ত করা।
ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষা আইনে ভার্চুয়াল সাক্ষ্য অন্তর্ভুক্ত করা।

 


সভাপতি 

মো. নিজামুল হক
চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল 
সাবেক বিচারপতি, আপিল বিভাগ, সুপ্রিম কোর্ট
 
সঞ্চালনা

আবু সাঈদ খান
উপদেষ্টা সম্পাদক, সমকাল 

বিশেষ অতিথি

গ্লোরিয়া ঝর্ণা সরকার, এমপি
সদস্য, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি

প্রবন্ধ উপস্থাপন

আয়েশা আক্তার
আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট এবং ও সিনিয়র অ্যাডভোকেসি অফিসার, ব্লাস্ট 

প্যানেল আলোচক

তাজুল ইসলাম
আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট এবং উপদেষ্টা (অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড ক্যাপাসিটি বিল্ডিং), ব্লাস্ট 

এস এম রেজাউল করিম
আইন উপদেষ্টা, ব্লাস্ট 

ড. কাজী জাহেদ ইকবাল
আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট 

নিগাত সীমা
উপপরিচালক
জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি 

রুমা সুলতানা
প্রোগ্রাম ম্যানেজার, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন 

মাহবুবা আক্তার
পরিচালক (অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড কমিউনিকেশন), ব্লাস্ট 

কামরুন নাহার
সদস্য, নারীপক্ষ

কাজী ফারাহবী রহমান
প্রোগ্রাম সহযোগী, উইনরক ইন্টারন্যাশনাল

শাহিনুর আক্তার
প্রোগ্রাম সহযোগী, উইনরক ইন্টারন্যাশনাল

অনুলিখন

মাজহারুল ইসলাম রবিন
স্টাফ রিপোর্টার, সমকাল

স্থিরচিত্র

সাজ্জাদ হোসেন নয়ন
ফটো সাংবাদিক, সমকাল

ইভেন্ট সমন্বয় 

হাসান জাকির 
হেড অব ইভেন্টস, সমকাল

আরও পড়ুন

×