ঢাকা মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪

শিশুর বিকাশে ক্রীড়াবান্ধব শিক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন

শিশুর বিকাশে ক্রীড়াবান্ধব শিক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন

গোলটেবিল

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ২৩ নভেম্বর ২০২৩ | ০৮:৪৯ | আপডেট: ২৩ নভেম্বর ২০২৩ | ০৯:২৬

শিশুরা খেলবে; খেলার মধ্যেই শিখবে। খেলার মধ্যে তারা বিতর্ক, সহমর্মিতা ও সহযোগিতা করা শিখবে। শিশু যত বেশি খেলবে, তার মেধা তত বেশি বিকশিত হবে। শারীরিক ও মানসিক বিকাশে শিশুর জন্য খেলাধুলার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আমাদের জাতীয় শিক্ষা কারিকুলাম হতে হবে শিশুবান্ধব, যেখানে খেলার ভিত্তিতে শেখার কৌশল নিশ্চিত করতে হবে। গত ৫ অক্টোবর ২০২৩ সমকাল সভাকক্ষে ‘শিশুর বিকাশে খেলার মাধ্যমে শেখার গুরুত্ব’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশ ও লেগো ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় গণসাক্ষরতা অভিযান ও সমকাল এ গোলটেবিলের আয়োজন করে 

সেলিনা হোসেন
আনন্দের মাধ্যমে শিশুদের শিক্ষা দেওয়া খুবই প্রয়োজন। আমি সারাজীবন লেখালেখি করেছি। এ পর্যন্ত প্রায় ৩৫০টি বই প্রকাশিত হয়েছে। আমার সব লেখায় আমি শিশুদের অধিকারের কথা তুলে ধরেছি। ভবিষ্যতেও তা করব। সব শিশু যাতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আদর্শ নাগরিক হিসেবে বেড়ে ওঠে, সে লক্ষ্যেই আমাদের কাজ করতে হবে।

ড. মনজুর আহমেদ
শিশুর খেলা, শিশুর কাজ এবং শিশুর কল্যাণের জন্য আমাদের কারও কোনো দ্বিমত নেই। সব শিশুর জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা কী হতে পারে, সেটি নিয়ে ভাবতে হবে। সরকার শিশুদের জন্য আরও ১০ বছর আগে একটি নীতি গ্রহণ করেছে। সেখানে শিশুর জন্য খেলাধুলার কথা বলা হয়েছে। সরকারের এ নীতি কার্যকর করতে হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক বছরের পরিবর্তে প্রাক-প্রাথমিকের মেয়াদ দুই বছর করা হচ্ছে। কিন্তু এখনও সেখানে খেলার ভিত্তিতে শেখার যে কৌশল, সেটি কি নিশ্চিত হয়েছে? আমাদের শিশুর সার্বিক বিকাশে সব জায়গায়– ঘরে ও বাইরে খেলার ভিত্তিতে শিক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে।

আনজীর লিটন

শিশুর বিকাশে গণমাধ্যমের ভূমিকা রয়েছে। সমাজের নানা ক্ষেত্রে শিশুরও অংশগ্রহণ আছে। কিন্তু এসব তথ্য গণমাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ পায় না। শিশুর অংশগ্রহণের এসব তথ্য যদি গণমাধ্যমে প্রকাশ পেত, তাতে শিশুরাও আনন্দিত হতো। নিজেদের ব্যক্তিত্ব তৈরিতে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করতে পারত। 

আমি মনে করি, শিশুদের সাংস্কৃতিক, মানসিক ও শারীরিক বিকাশে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশপ্রেম, নৈতিক শিক্ষা, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধ জাগাতে পারে গণমাধ্যম। শিশুদেরও কথা থাকে। কিন্তু সে কথা বলার জায়গা পায় না ওরা। শিশুদের বলার প্ল্যাটফর্ম তৈরির জন্য বাংলাদেশ শিশু একাডেমির একটি কর্মসূচি আছে। যার নাম ‘আমার কথা শোনো : ছোটরা বলবে, বড়রা শুনবেন’।

বিশ্ব শিশু দিবস ও শিশু অধিকার সপ্তাহে আমরা এ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে শিশুদের জন্য কথা বলার জায়গা করে দিয়েছি। গণমাধ্যম যদি সহযোগিতা করত, বিষয়টি নীতিনির্ধারকরা জানতে পারতেন। কিন্তু গণমাধ্যমে প্রচার হয় না বলেই নীতিনির্ধারকরা জানেন না এখনকার শিশুদের ইচ্ছার কথা, সমস্যার কথা। এসব তথ্য প্রচার পেলে নীতিনির্ধারকরা শিশুদের নিয়ে ভাবতে পারতেন। 
শিশুদের কল্যাণে এ ভাবনার জায়গা থেকে আমি বলতে চাই, বর্তমান সময়ের শিশুদের জন্য নানামুখী প্রতিবন্ধকতা আছে। তার একটি হচ্ছে খেলতে না পারা। খেলার মাঠ না থাকা। প্রয়োজনীয় পরিবেশ না থাকা। খেলা শুধু খেলা নয়, খেলার মাধ্যমেও শেখা যায়। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি খেলার মাধ্যমে শিশুদের শেখার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ইউনিসেফ, সেভ দ্য চিলড্রেনসহ অনেক বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সময়ের প্রয়োজনে আজকের দিনে এসে শিশুদের খেলার পরিবেশ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে আমাদের। এই লক্ষ্য নিয়ে ‘চলো খেলি’ নামে একটি কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারি আমরা। সমন্বিতভাবে এই কার্যক্রমের আওতায় ‘মাঠেও খেলি, ঘরেও খেলি’ শীর্ষক প্রতিপাদ্য নিয়ে দেশব্যাপী একটি ক্যাম্পেইন করা যেতে পারে; যা শিশুর বিকাশে খেলার গুরুত্বকে তুলে ধরতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। শিশুর বিকাশে ক্রীড়াবান্ধব শিক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন। প্রয়োজন খেলার উপকরণ। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি এমন একটি উদ্যোগ নিতে চায়। এ জন্য সবার অংশগ্রহণে প্রয়োজন সমন্বিত নীতিমালা। আমি মনে করি, সব চাওয়াকে পূর্ণ করে শিশুরা থাকুক হাসিতে; শিশুরা থাকুক খুশিতে।

তপন কুমার দাশ

পৃথিবীর নানা দেশে খেলাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম চলমান। আমাদের দেশেও বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক, সেভ দ্য চিলড্রেনের মতো প্রতিষ্ঠান শিশুদের নাচ, গান ও খেলার মাধ্যমে প্রাক-শৈশব স্তরে শিশুদের জন্য শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে। প্রি-প্রাইমারি স্কুল কার্যক্রমও শিশুদের খেলার মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে চালু করা হয়েছে। এ কারিকুলামে খেলার মাধ্যমে শিশুর বিকাশ হবে– এটাই বলা আছে। কিন্তু বাস্তবে এখনও অনেক বিদ্যালয়ে এ প্রক্রিয়া যথাযথ অনুশীলন করা হচ্ছে না। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাস্তরে নানা ক্ষেত্রেই এ পদ্ধতির যথাযথ অনুসরণ সম্ভব হচ্ছে না। বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনগুলোর অবস্থা অনেকটাই করুণ। এর মধ্যে আশার আলো হচ্ছে, বেসরকারি কিছু সংস্থা দেশের উত্তরাঞ্চলসহ কয়েকটি জেলায় শিশুদের খেলার মাধ্যমে পড়াশোনার ধারণা বিস্তরণের উদ্যোগ নিয়েছে। এখানে অভিভাবকদেরও সংযুক্ত করা হয়েছে। শিশু একাডেমিও সারাদেশে শিশুদের খেলাধুলার মাধ্যমে পড়াশোনার ধারণা বিস্তরণের উদ্যোগটি নিতে পারে।


শাহীন ইসলাম

ইসিসিডি কার্যক্রমের অংশ হিসেবে লেগো ফাউন্ডেশন ও সেভ দ্য চিলড্রেনের সহায়তায় গণসাক্ষরতা অভিযান ‘চ্যাম্পিয়নিং প্লে’ নামে একটি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। শূন্য থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুদের শিখন উপযোগী খেলার উপকরণ প্রদান ও খেলাধুলার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশে সহায়তা করার লক্ষ্যে গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা উপজেলার সরকারি বিদ্যালয় এবং কমিউনিটি পর্যায়ে পরিচালিত কয়েকটি শিক্ষাকেন্দ্র ও ঢাকার কিছু বেসরকারি বিদ্যালয়ে কর্মসূচিটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমিও এই কর্মসূচির সঙ্গে সম্পৃক্ত। কর্মসূচিটি শূন্য থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুদের জন্য মানসম্পন্ন খেলাভিত্তিক কার্যক্রমের মাধ্যমে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সহায়তা করছে। এই বয়সী শিশুর পরিচর্যাকারীদের সেবা প্রদানের পাশাপাশি কর্মসূচিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খেলা একীভূতকরণ প্রক্রিয়া জোরদার করার জন্য জাতীয় পর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদার, স্থানীয় সরকার, স্থানীয় শিক্ষা কর্তৃপক্ষ এবং প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে কাজ করছে। এ কর্ম-অভিজ্ঞতা দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ

ছেলেমেয়েরা আগে বাইরে খেলাধুলা করত; যা খুশি খেলাধুলা করত, যা খুশি আঁকত। কিন্তু দিন দিন এসব খেলাধুলা, আঁকাআঁকি গৃহবন্দি হয়ে পড়েছে। খেলার জন্য এখন মাঠ নেই। প্রযুক্তির মাধ্যমে ছেলেমেয়েরা ঘরে খেলছে। এখন অভিভাবকরাও খেলাকে খেলা হিসেবে দেখে। কিন্তু খেলার সঙ্গে যে শিক্ষার সম্পর্ক, সেটা আমরা ভুলে গেছি। খেলা ও শিক্ষাকে আলাদা করে দেখার যে প্রবণতা, সেটা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। শিশুকে খেলার মাধ্যমে শেখাতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষার সব স্তরে, বিশেষ করে প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে খেলার মাধ্যমে শিক্ষা এবং শিশুর সার্বিক বিকাশের উদ্যোগ নিতে হবে।

ড. মো. আবদুল হালিম

প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা একজন শিশুর ভবিষ্যতের ভিত্তি তৈরি করে দেয়। স্বাধীনতার পর যে শিক্ষা কমিশনের কারিকুলাম প্রস্তাব করা হয়েছে, সেটি ৫০ বছর পরে এসে বাস্তবায়ন করেছে। আমাদের সমাজে যারা শিক্ষক হতে চান, তাদেরই শিক্ষক বানাতে হবে। তাদের মর্যাদা এবং বেতন বৈষম্য– সেটিও দূর করতে হবে। শিক্ষকরা জাতিকে গড়ে তোলেন; কিন্তু তাদের যখন বেতন-ভাতার জন্য রাস্তায় নামতে হয়, তখন আর শিক্ষার পরিবেশ থাকে না। আবার অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ালেখার জন্য যে পরিবেশের দরকার, সেই পরিবেশই নেই। আর খেলাটা যদি হয় শিক্ষার মাধ্যম, তাহলে আমাদের সে পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। জোর করে কখনও পড়াশোনা হবে না।

অধ্যাপক নাজমুল হক

শিশু যত বেশি খেলবে, তার ভবিষ্যৎ তত বেশি উজ্জ্বল হবে। আমরা আমাদের শিশুদের কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করাই। কিন্তু সেখানে খেলার সুযোগ নেই। তাদের বিকাশটা হচ্ছে না। দেশের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যারিস্টার, আমলা যারা হচ্ছেন– তাদের অধিকাংশই গ্রাম থেকে উঠে আসছেন। আর কিন্ডারগার্টেন ইংরেজি মিডিয়ামের শিশুরা বড় হয়ে বিদেশে চলে যাচ্ছে। দেশ তাদের প্রতি এত টাকা খরচ করছে, কিন্তু তারা দেশে থাকছে না কেন! কারণ, তারা সেভাবে গড়ে উঠছে না। তাদের স্কুলগুলোয় খেলনা দিয়ে ভরে দেয়। তারা দেশের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করবে। খেলার উপযোগী করে শিশুদের সিলেবাস প্রণয়ন করতে হবে।

মোহাম্মদ শাহ আলম

সিসিমপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, টেলিভিশন ও ডিজিটালি কাজ করছে। শিশুর কাজ শিশু খেলবে। আমাদের শিশুর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। খেলাকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। একটি হচ্ছে ফ্রি প্লে, আরেকটি প্লে ইন দ্য রুলস। যত ছোট শিশু, তত ফ্রি প্লে; আর শিশু বড় হলে রুলসের মধ্যে আসে। যত বেশি ফ্রি প্লে, তত বেশি শিশুর মেধা বিকাশ হবে। তাদের জন্য ফ্রি-প্লেয়িংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

ড. এম এহসানুর রহমান

শিশুর মেধাবিকাশের স্তরগুলো কী কী, তা আর্লি লার্নিং স্ট্যান্ডার্ডে নির্ধারণ করা আছে। যে স্ট্যান্ডার্ড তৈরি হয়েছে এবং বর্তমানে শিশু ও নারীবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে তা বাস্তবায়িত হচ্ছে। আমাদের দেশের নগর ও গ্রামের শিশুরা ভিন্ন পরিবেশে বড় হয়। তাদের বিকাশেও নানা পার্থক্য আছে। এ ছাড়া দেশের দুর্যোগ-দুর্বিপাকে শিশুর বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এ সময় তারা অনেকে মনস্তাত্ত্বিক ট্রমায় ভুগতে পারে। তাই শিশুর জন্য কোন পরিবেশে, কোন বয়সে, কোন খেলাটা জরুরি– সেটি নির্ধারণ করে দিতে হবে। এতে করেই শিশুর যথাযথ বিকাশ সম্ভব হতে পারে।

প্রফুল্ল চন্দ্র বর্মণ

মায়ের পেটে ভ্রুণ তৈরি হওয়ার পরবর্তী হাজার দিন, মানে গোল্ডেন থাউজেন্ড ডেইজ হচ্ছে শিশুর বিকাশে অতীব গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়েই শিশুর সোশ্যাল ইমোশনাল এবং কগনিটিভ ডেভেলপমেন্টের বেশির ভাগই সম্পাদিত হয়। সুতরাং এ বয়সে শিশুর সঙ্গে সব আচরণই হতে হবে পরিকল্পিত। দেশের প্রাক-প্রাথমিক কারিকুলামটি শিশুদের পড়ালেখায় খেলাধুলাকে বিবেচনায় রেখে প্রণয়ন করা হয়েছে। শিশুর জন্মের পর থেকে শুরু হয় খেলা। তারা তখন থেকেই খেলতে খেলতে শিখতে থাকে। ২০১৫ সাল থেকে ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে প্লে-ল্যাব নামে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেছে। ৩০৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বর্তমানে প্লে-ল্যাব কর্মসূচি শুরু করেছে। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কীভাবে খেলার মাধ্যমে শেখানো যায়, সেটি নিয়েও আমরা সরকারের সঙ্গে কাজ শুরু করেছি। শিশু যেভাবেই খেলুক, তাতেই তারা শিখবে। খেলার মাধ্যমে তাদের মধ্যে সামাজিক দক্ষতা ও নেতৃত্ব গড়ে উঠবে। একজন শিশুর বিকাশে তার অভিভাবকের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে তাদের এই খেলার মাধ্যমে পড়ার বিষয়টি বোঝানো হয়েছে।

মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা

গল্প, কবিতা, ছড়া, গান এগুলো বিনোদনের পাশাপাশি শিক্ষার ক্ষেত্র। শিশুকে খেলার মাধ্যমে শেখাতে হবে। প্রকৃতির শিক্ষাই হচ্ছে মূল শিক্ষা। আমাদের শিশুদের প্রকৃতির শিক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে। সমতলের পাশাপাশি পাহাড়ের শিশুদের জন্যও শিক্ষার সব পরিবেশ ও সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

জেরিন মাহমুদ

আমরা এখন ৭০টি স্কুলে কাজ করি। এসব স্কুলে খেলার ছলে শিশুদের শেখানো হয়। নানা চরিত্রের মাধ্যমে শিশুদের শেখানো হয়। শিশুদের খেলার ছলে বর্ণ, ফুল, পাখিসহ নানা কিছুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। শিশুর শিখন হতে হবে আনন্দের মাধ্যমে। শিশুরা সেই আনন্দ খুঁজে পায় খেলায়। তাই শিশুর শিখন হোক খেলার মাধ্যমেই। 

মাহমুদা আক্তার

শিশুর বিকাশে বাড়িতে মাকে সর্বপ্রথম সচেতন হতে হবে। শিশুর ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। তাকে খেলার মাধ্যমে শেখাতে হবে, খেলার ভিত্তিতেই ধীরে ধীরে লেখাপড়ায়ও উৎসাহিত করতে হবে।

মমতাজ বেগম

বেসরকারি সংস্থাগুলো সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে শিশুর শিক্ষা ও বিকাশে কাজ করছে। শিশুর শিক্ষায় শিক্ষকের গুরুত্ব আছে। একজন শিক্ষক তাঁর শিক্ষার্থীদের কীভাবে সহজে শেখাবেন, কোন কৌশল ব্যবহার করবেন– এটি তাঁর নিজস্ব বিষয়। এতে অভিভাবকের ভূমিকাটা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকের মধ্যে বেশির ভাগই তাঁর শিশুর ভালো নম্বর প্রত্যাশা করেন। তারা শিশুর পড়ালেখায় মুখস্থবিদ্যা ও পরীক্ষাটাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। তাই শিশু শিক্ষায় তার মাকেও সঙ্গে রাখতে হবে। তাঁকে জানাতে হবে শিশু কীভাবে খেলার মাধ্যমে শিখবে। অভিভাবকদেরও শিশুশিক্ষায় কাউন্সেলিং ও মোটিভিশনের দরকার আছে। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি শিশুদের ভীতি আছে। তাদের পড়ালেখায় চাপ দেওয়া হয়। পর্যাপ্ত বিনোদন ও খেলার সুযোগ দেওয়া হয় না। সে তুলনায় সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিশুরা থাকে চাপমুক্ত ও স্বাধীন। সর্বোপরি, মাকে শিশুর ক্লাসের সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে সেটি শিশুশিক্ষায় সবচেয়ে বেশি কার্যকর হবে।

নিশাত মজুমদার

আমি একদিন গ্রামের একটি স্কুলে গিয়ে এক শিশুকে জিজ্ঞেস করলাম, সে বড় হয়ে কী হতে চায়? তার স্বপ্ন কী? কিন্তু এ শিশু উত্তর না দিয়ে হাঁ করে থাকে। সে তার স্বপ্ন সম্পর্কে জানে না। এরপর আমি চার থেকে চৌদ্দ বছরের শিশুদের পাহাড়ে নিয়ে যাওয়ার প্রোগ্রাম শুরু করি। একটি চার বছরের শিশুর পাহাড়ে যাওয়ার ইচ্ছা আমাকে উদ্বেলিত করে। তার মধ্যে পাহাড়ে যাওয়ার স্বপ্নটায় উত্তেজিত রাখে। তার মধ্যে আলোচনায় থাকে সে পাহাড়ে গিয়ে কী কী দেখবে। কত রকমের ফুল, পাখি দেখবে– এ নিয়েই সে ব্যস্ত থাকে। তাকে পাহাড়ে ওঠার জন্য শারীরিকভাবে ফিট রাখতে সে নিজে নিজে তার খাবার, শরীর নিয়ে সচেতন থাকে। আসলে শিশু খেলার মাধ্যমে, দেখার মাধ্যমে শেখে। তার মধ্যে সহমর্মী, সহযোগিতা ও স্বপ্ন দেখার বাসনাটা শুরু হয় দেখার মাধ্যমে। মনোজগতের পরিবর্তন হয় খেলার মাধ্যমে, কাজ করার মাধ্যমে। আমাদের দায়িত্ব হলো শিশুর শিক্ষার এ ব্যবস্থা করে দেওয়া।

এম এ মান্নান মনির

খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুশিক্ষা আরও প্রাণবন্ত ও যথাযথ হতে পারে। আমাদের খেলাধুলার মাঠগুলো এখন বেদখল হয়ে গেছে। আমরা বিভিন্ন সময় দেখি, খেলার মাঠ উদ্ধার করতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপও নিতে হয়। ঢাকা শহরের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই খেলার মাঠ নেই। সরকারি প্রতিষ্ঠানেও খেলার মাঠ হারিয়ে যাচ্ছে। শিশুরা স্বাধীনভাবে পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে না। প্রতিবছর নতুন ক্লাসে উঠতে গিয়ে শিশুরা স্কুল থেকে ঝরে যাচ্ছে।

মো. আবুল কাশেম

খেলার মাধ্যমে শেখার বিষয়টি শুধু ফুটবল-ক্রিকেট এমনটি নয়। ছবি আঁকা, রং সিলেকশন সবই খেলা। ইতোমধ্যে সরকার প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিকক্ষে চারটি কর্নারে ভাগ করেছে। শিশুদের জন্য দেয়ালে নানা চিত্র থাকে। তাদের জন্য খেলাধুলার সরঞ্জামও সরবরাহ করা হয়েছে। শিশুদের খেলার মাধ্যমে চিন্তা ও কল্পনাশক্তি বৃদ্ধি হয়। তারা শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক দক্ষতা অর্জন করে। সে ক্লাসে বিভিন্ন চার্ট দেখে ফুল-পাখি নানা সম্পর্কে জানতে পারে। একটি শিশু যখন প্রথম স্কুলে আসে, তখন তার মধ্যে জড়তা থাকে। সে খেলার মাধ্যমে সেই জড়তাটা কাটিয়ে ওঠে। খেলার মাধ্যমেই শিখতে থাকে। 

ফাতেমা তুজ জোহরা

বাংলাদেশের সরকারি স্কুলগুলোয় খেলার মাঠ কিছুটা আছে, কিন্তু বেসরকারি বা কিন্ডারগার্টেনগুলোয় শিশুদের বিকাশে খেলাধুলার জন্য কোনো মাঠ নেই। শিশুদের বড় একটা অংশ খেলা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এতে তাদের যান্ত্রিক একটা জীবন গড়ে উঠছে। শিক্ষকরা একটা গল্প ও কবিতা নিজেরা না পড়িয়ে শিশুদের মুখস্থ করতে বলে। স্কুলগুলোয় নাচ, গান, আবৃত্তির সুযোগও রাখে না। এতে শিশুর মেধার বিকাশ হচ্ছে না। তাই শিশুর মেধাবিকাশে তাদের সঙ্গে খেলার ছলে পড়াশোনা ও খেলাধুলার সুযোগ রাখতে হবে। 

ফারুক ওয়াসিফ

শিশুরা খেলার সময় সামাজিকতা শেখে। তারা একে অপরের সঙ্গে ঝগড়া করার সময় বিভিন্ন বিষয়ে আর্গুমেন্ট করা শেখে। তাদের প্রাথমিক শিক্ষাটা গড়ে ওঠে খেলার মাধ্যমে। শিশুর জন্য আমরা কতটুকু দিতে চাই, সেটি আমাদের অভিভাবকদের বুঝতে হবে। উন্নত বিশ্বের শাসনব্যবস্থা কেমন, সেটি বোঝা যায় তাদের স্কুলগুলো দেখে। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও শিশুবান্ধব করে গড়ে তুলতে হবে।


সূচনা বক্তব্য 

তপন কুমার দাশ
উপপরিচালক, গণসাক্ষরতা অভিযান 

মূল প্রবন্ধ

শাহীন ইসলাম
প্রকল্প পরিচালক, সেভ দ্য চিলড্রেন 

আলোচক

সেলিনা হোসেন, কথাসাহিত্যিক
সভাপতি, বাংলা একাডেমি

ড. মনজুর আহমেদ 
উপদেষ্টা, গণসাক্ষরতা অভিযান
চেয়ারপারসন, বাংলাদেশ ইসিডি নেটওয়ার্ক

আনজীর লিটন
মহাপরিচালক, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি

অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ
সদস্য, এডুকেশন ওয়াচ 

ড. মো. আবদুল হালিম
পরিচালক, আইইআর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 

অধ্যাপক নাজমুল হক
পরিচালক, টিডিআই

মোহাম্মদ শাহ আলম
নির্বাহী পরিচালক, সিসেমি ওয়ার্কশপ

ড. এম এহসানুর রহমান 
সদস্য, এডুকেশন ওয়াচ 

প্রফুল্ল চন্দ্র বর্মণ
প্রোগ্রাম হেড, ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচি, ব্র্যাক

মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা
নির্বাহী পরিচালক, জাবারাং কল্যাণ সমিতি

জেরিন মাহমুদ
সদস্য, অভিযান কাউন্সিল
প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক, চলপড়ি

মমতাজ বেগম
থানা শিক্ষা অফিসার, মোহাম্মদপুর

নিশাত মজুমদার
পর্বত আরোহী

এম এ মান্নান মনির
প্রধান শিক্ষক, ঢাকা আইডিয়াল ক্যাডেট স্কুল মহাসচিব, বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ অ্যাসোসিয়েশন

মো. আবুল কাশেম
শিক্ষক ও সাধারণ সম্পাদক
সরকারি প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি

ফাতেমা তুজ জোহরা
অভিভাবক

জোসনা আক্তার
অভিভাবক

সঞ্চালনা

ফারুক ওয়াসিফ
পরিকল্পনা সম্পাদক, সমকাল

অনুলিখন

লতিফুল ইসলাম 
নিজস্ব প্রতিবেদক, সমকাল

সমন্বয়

হাসান জাকির
হেড অব ইভেন্টস, সমকাল

আরও পড়ুন

×