পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এমনকি জনপ্রতিনিধি সবখানেই নারী ও পুরুষের মধ্যে অনেক বৈষম্য বিদ্যমান। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। ভোটারদেরও অর্ধেকই নারী। এ হিসাবে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে উপজেলা পরিষদে, এমনকি জাতীয় সংসদে নারী জনপ্রতিনিধিদের সংখ্যা শতকরা পঞ্চাশ ভাগ হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তব অবস্থা এর ধারেকাছেও নেই। এর মধ্যেই যেসব নারী জনপ্রতিনিধি রয়েছেন, তারাও সঠিকভাবে মূল্যায়িত হচ্ছেন না। তাদের যথাযথভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। পুরুষ জনপ্রতিনিধিরা তাদের দেখেন অলংকার হিসেবে। যদিও নারীরা এ পর্যন্ত এসেছেন নিজেদের যোগ্যতায়। দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নিতে নারীদের সঠিক ক্ষমতায়ন প্রয়োজন। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটিতে, সরকার ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাসহ গুরুত্বপূর্ণ সব স্থানে নারীদের সঠিক ও পুরুষের সমপরিমাণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে সরাসরি নারীদের বেশি করে মনোনয়ন দিতে হবে। তবে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন কেবল নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নিশ্চিত হয় না। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নারীরা কতটা স্বাধীনভাবে অংশ নিতে পারছে, তার ওপর নারীর ক্ষমতায়ন নির্ভর করে। তাই সঠিক ক্ষমতায়নের জন্য রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নারীর স্বাধীন অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। গত ১৩ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত 'নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন বিষয়ক জাতীয় সংলাপ'-এ তৃণমূল ও জাতীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিরা এসব কথা বলেন। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম জুমে অনুষ্ঠিত এই সংলাপে তৃণমূল পর্যায়ের নারী জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে নারী সংসদ সদস্যরা মতবিনিময় করেন। ডেমক্রেসিওয়াচ ও সমকাল যৌথভাবে এ সংলাপের আয়োজন করে। সহযোগিতায় ছিল খান ফাউন্ডেশন, প্রিপ ট্রাস্ট ও রূপান্তর। সুইস এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কোঅপারেশনের অর্থায়নে এবং হেলভেটাস সুইস ইন্টারকোঅপারেশনের কারিগরি ও ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত অপরাজিতা কর্মসূচির আওতায় এ অনলাইন সভা অনুষ্ঠিত হয়।

শেখ রোকন
বিজয়ের মাসে আমরা নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিয়ে কথা বলছি। মহান মুক্তিযুদ্ধকালে লাখো নারী নির্যাতিত-নিপীড়িত হয়েছেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশেও নারীরা কম অগ্রসর হননি। গত তিন দশকে আমরা একটানা নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা পেয়েছি। বর্তমান সংসদে স্পিকার হিসেবেও পেয়েছি একজন নারী। এমন উদাহরণ বিশ্বের আর কোথাও সম্ভবত নেই। কিন্তু তারপরও নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন কতটা জটিল ও কঠিন, স্থানীয় সরকার পর্যায়ের নারী জনপ্রতিনিধি ও নেত্রীদের বক্তব্য শুনে বুঝতে পারা যায়। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন কেবল নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নিশ্চিত হয় না; বরং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তারা কতটা স্বাধীনভাবে অংশ নিতে পারছে, তার ওপর নির্ভর করে। সমকাল সে লক্ষ্যে প্রকাশনার শুরু থেকে একক ও যৌথভাবে নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।

ফওজিয়া খোন্দকার
'অপরাজিতা' প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হচ্ছে স্থানীয় শাসন ব্যবস্থার আওতায় নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন। দেশের ছয় বিভাগের ১৬ জেলার ৬২ উপজেলার ৫৪১টি ইউনিয়নে স্থানীয় পর্যায়ের নারী জনপ্রতিনিধিদের সচেতনাতা বৃদ্ধিতে তারা কাজ করে যাচ্ছেন। তৃণমূল নারীরা সংসদ সদস্যদের সঙ্গে বিনিময়ের সুযোগ পাচ্ছেন। এভাবে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক দল ও নির্বাচনী কাঠামোগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়বে।



অ্যাডভোকেট রোখসানা খন্দকার
নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে ১০ বছর ধরে 'অপরাজিতা প্রকল্প' পরিচালনা করছি। প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপ পার হয়ে এখন তৃতীয় পর্যায়ে আছি। দেশের ছয়টি বিভাগের ১৬টি জেলায় এ প্রকল্পের কাজ চলছে। আর্থিকভাবে সহযোগিতা করছে সুইস এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কোঅপারেশন (এসডিসি)। এক দশক ধরেই 'অপরাজিতা' নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের কথা বলছে। আমরা প্রায় সময় বলি, নারীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে। শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। কিন্তু সব সময় আমরা নারীদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কথা বলে থাকি, তাহলে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হবে না। এ ক্ষেত্রে নারীকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। দেশের অর্ধেক নারী। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে রেখে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। এসডিজি পূরণে সব ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। তবে উন্নয়ন সম্ভব। বিদ্যমান গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯০-এর খ-এর খ(২) অনুচ্ছেদে কেন্দ্রীয় কমিটিসহ রাজনৈতিক দলের সব স্তরের কমিটিতে অন্তত ৩৩ শতাংশ পদ নারী সদস্যদের জন্য সংরক্ষণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং ২০২০ সালের মধ্যে সে লক্ষ্য অর্জনের কথা বলা হয়েছে। অথচ এখনও তা পূরণ হয়নি। স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নারীরা ক্ষমতা-কাঠামোর সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পান। এ ধরনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নারীদের জন্য সাধারণ আসনে নির্বাচন করার সুযোগ দিতে হবে।
আরোমা দত্ত
এখন মেয়েরা যেভাবে কথা বলছেন, এটা ১০/১৫ বছর আগে এভাবে বলা যেত না। স্বপ্ন না থাকলে কখনও কিছু অর্জন করা যায় না। আমরা নারীরা ঘরেও আছি, মাঠেও আছি। রাজনীতিতেও আছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি ১৯৯৬ সালে নারীদের জন্য ৩৩ শতাংশ পদ সংরক্ষণের কথা চিন্তা না করতেন, তাহলে এখন এ পরিবর্তন হতো না। মাঠ পর্যায় থেকে যতক্ষণ নারীর ক্ষমতায়ন হবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত সমতা আসবে না। সংসদের মতো স্থানেও তৃণমূলের মতো লড়াই করতে হয়। পুরুষ সহকর্মীরা বলে, আপনাদের অনেক সুযোগ, এমনিতেই অনেক কিছু দিয়ে দেয়। না, কেউ কিছু দেয় না; নারীদের লড়াই করে সবকিছু অর্জন করতে হয়। তৃণমূল থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে নারীনেত্রীদের জনগণের জন্য কাজ করার সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো একটা বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এ ক্ষেত্রে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুসারে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটিতে কমপক্ষে ৩৩ শতাংশ পদে নারীদের রাখার যে বিধান রয়েছে, তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।


ফাহমিদা বেগম মুন্নী
আমিসহ আমার মতো যারা আছেন, আমাদেরকে সবাই 'মহিলা মেম্বার' হিসেবেই বেশি চেনেন। এটা শুধু আমার কথা নয়, সারাদেশে সাড়ে পাঁচ হাজারের ওপর ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে, সেগুলোতে যে ১৬ হাজারের ওপর মহিলা মেম্বার রয়েছেন, তাদের সবার কথা। আমাদের যথাযথভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, ঠিকমতো মূল্যায়ন করা হয় না। আমাদের কেউ বা দেখেন 'অলংকার' হিসেবে, কেউ বা হয়তো দেখেন 'আপদ' হিসেবে, এমনকি অনেকে হয়তো প্রতিপক্ষও মনে করতে পারেন। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই সাধারণ আসনের নির্বাচিত মেম্বার বা চেয়ারম্যানরা আমাদের সম্মানের চোখে দেখেন। তারা বলেন, আমাদের নাকি তেমন দক্ষতা নেই, আমরা নাকি নিজেদের যোগ্যতা সেভাবে প্রমাণ করতে পারি না বা নিজেদের দায়িত্ব-কর্তব্য ভালো করে বুঝি না। কিন্তু আমরা যারা মহিলা মেম্বার আছি, নিজেদের বাড়ি থেকে শুরু করে পদে পদে আমরা কতটা বাধার সম্মুখীন হই, কীভাবে নানা বাধা মোকাবিলা করেও আমরা সমাজের জন্য, এলাকার জন্য কাজ করে যাচ্ছি- এসব খবর ক'জন ঠিকমতো রাখেন? ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থায়ী কমিটি ও অন্যান্য কমিটিতে মহিলা মেম্বারদের রাখতে হবে।
মেহের আফরোজ চুমকি
তৃণমূলের প্রতিনিধিরা শুধু ঘরের কাজ করছেন না। নারীরা ঘর থেকে বের হয়েছেন। রাজনীতি করছেন। জনগণের জন্য কাজ করছেন। প্রতিটি কমিটিতে নারীর অংশগ্রহণ রয়েছে। তবে পুরুষরা কমিটিগুলোতে এমন সব নারীকে রাখতে পছন্দ করেন, যারা কথা বলবেন না, কোনো প্রতিবাদ করবেন না। এ জন্য নারীদের প্রস্তুত হতে হবে। নিজেদের অধিকার সম্পর্কে বলতে হবে। নারীদের নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে। পুরুষ সহকর্মীদের বাধার মুখেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাহস করে নারীদের তৃণমূলে ক্ষমতায়ন করেছেন। এর ফল এখন পাওয়া যাচ্ছে। নারীরা সরাসরি চেয়ারম্যান হচ্ছেন, ভাইস চেয়ারম্যান হচ্ছেন। তবে পুরুষরা অনেক এগিয়ে গিয়েছেন। তাই নারীদের আরও বেশি যোগ্য হতে হবে। সংবিধানে পুরুষ-নারীদের সমঅধিকারের কথা বলা হয়েছে। কোটা দেওয়া হয়েছে। এটা অপমানজনক নয়। এটা পিছিয়ে থাকা নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য জরুরি। সংরক্ষিত আসন থেকে ধীরে ধীরে নারীরা মূল স্রোতে আসবে। চেষ্টা করতে হবে। হয়তো নেতৃবৃন্দ নাও চাইতে পারেন। তবে মনোনয়নের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আরপিও ৩৩ শতাংশ বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী নিজ হাতে মহিলা শ্রমিক লীগ, যুব মহিলা লীগ তৈরি করেছেন। নারীকে যোগ্য হয়ে তার অধিকার তৈরি করে নিতে হবে। জায়গা কেউ কাউকে দেয় না; যোগ্য হয়ে আদায় করে নিতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভীরু। কিছু হলেই ধর্মের নামে কিছু একটা করে নারীদের আরও পিছিয়ে রাখতে চায়। কিছু শব্দ আছে, যা নারীবিদ্বেষী। এসব শব্দচয়ন থেকে বের হতে হবে। পুরুষরাও যখন নারীর অধিকার চাইবে, তখন সফলতা আসবে।
শিরীন আখতার
বাংলার নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া বলেছিলেন, ক্ষমতায়নের প্রয়োজনে নারীরা চাকরি করবে। কিন্তু তখন তিনি ভাবেননি যে, স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে, মেম্বার পদে নির্বাচন করবেন! তিন দশক ধরে দেশ নারীদের দ্বারা শাসিত হচ্ছে। অসংখ্য নারী প্রতিনিধিত্ব করছেন। এগুলো দিয়েই বোঝা যায়, নারীর ক্ষমতায়ন বেড়েছে। তবে এ ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াটা জরুরি। সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারি বলেই একটি গুরুত্বপূর্ণ দলের 'সাধারণ সম্পাদক' পদে কাজ করছি। নারী রাজপথে আসেন। কথা বলতে চান। তখন বিভিন্ন বাধার মুখোমুখি হন নারী। সেই বাধা অতিক্রম করাই তখন নারীর কাজ। এ জন্য কাজ করে চলেছে 'অপরাজিতা'। নারীর নেতৃত্ব বিকাশ, ক্ষমতায়নে প্রয়োজন সংগঠন। নারীরা যত বেশি সংগঠনে জড়িত হবেন, ততই তাদের মনোবল বাড়বে। তত শক্তিশালী হবেন। সরাসরি নির্বাচন প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে গেলে পুরুষরা বাধা দেন। তাদের বাধা ডিঙিয়ে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সংগঠনে অংশগ্রহণের গুরুত্ব অনেক। তৃণমূল থেকে রাজনীতি করে উঠে এলে কেউ বাধা দিতে পারবে না। এ ছাড়া যখন দেখে, মেয়ে একা নয়, তার অনেক শক্তি আছে; তখন তাকে অন্যভাবে চিন্তা করে। তা না হলে শুরুতেই একটি মেয়ে সম্পর্কে নেতিবাচক আচরণ শুরু করে পুরুষরা। 'চরিত্র খারাপ' বলে আখ্যায়িত করা হয়। এসবে থমকে যাওয়া যাবে না। এগিয়ে যেতে হবে নারীকে। তবে তাকে স্বচ্ছ থাকতে হবে। নিজেদের অধিকার নিশ্চিত করতে, ক্ষমতায়নে আওয়াজ তুলতে হবে। ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিষদের নারীদের যেসব দায়িত্ব রয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে জানতে হবে। দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রতিটি মুহূর্তে পুরুষ ও প্রশাসনের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে হবে। বাস্তব পরিস্থিতিতে দাঁড়ালেই নিজের অবস্থান ও করণীয় সম্পর্কে জানা যাবে। এ জন্য প্রয়োজন দৃঢ়তা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার সাহস ও নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকতে হবে। তবে নারীনেত্রীদের অবশ্যই তাদের কার্যক্রমে স্বচ্ছ থাকতে হবে, লক্ষ্যে অবিচল থাকতে হবে। যেমন- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার লক্ষ্যে অটুট ছিলেন বলেই নানা বাধা ও ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে আজ পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে পেরেছেন। সব বাধা পেরিয়ে গেলেও একটি বাধা আছে, তা হলো ধর্মান্ধ শক্তি। তারা বলে, নারীদের ঘরে থাকতে হবে, বেশি পড়াশোনা করা যাবে না এবং পর্দানশীল হতে হবে। নারীরা তো পর্দাহীন হয়ে ঘোরেন না। পর্দার মধ্যে থেকেই কাজ করছেন। তাদের এসব বলার মূল কারণ হলো, নারীদের স্তব্ধ করে দেওয়া। সব বাধা পেরিয়ে নারীরা এগিয়ে যাবে।
রফিকুল ইসলাম
ব্যক্তিগতভাবে আমি একজন পুরুষ হলেও আমার নিরাপত্তার জন্য হলেও নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন জরুরি। গত ৪৯ বছরে নারীর ক্ষমতায়নে এ পর্যন্ত যত নীতিমালা হয়েছে, সবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ১৯৯৭ সালে আইনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার কাঠামোর সব পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি, ২০১১ সালের জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতির মাধ্যমে নারীদের জন্য সমান সুযোগ ও সমতা সৃষ্টি ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুসারে ২০২০ সাল নাগাদ রাজনৈতিক দলের সব কমিটিতে ৩৩ শতাংশ পদ নারীদের জন্য সংরক্ষণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত আছে। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের লক্ষ্যমাত্রা ৫ দশমিক ৫ অনুযায়ী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনের সব পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু কোনো অজ্ঞাত কারণে এসব নীতিমালা বা অঙ্গীকারের চূড়ান্ত রূপ দিতে পারেনি। আমাদের রাজনৈতিক কাঠামো নারীর ক্ষমতায়নের সহায়ক নয়। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাও তাদের রাজনীতিতে আসার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাধীনতার ৪৯ বছর পরও আমরা এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে পারিনি, যাতে নারীরা নির্বিঘ্নে ও নির্ভয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বে আসতে পারেন। এখনও নারীরা ব্যাপকভাবে বঞ্চিত, নিগৃহীত, নির্যাতিত ও অবহেলিত। এই বঞ্চনা ও নিগ্রহের অন্যতম কারণ হলো, সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাষ্ট্রীয় থেকে পারিবারিক পর্যায় পর্যন্ত নারীদের ব্যাপক পশ্চাৎপদতা। আর এই পশ্চাৎপদতা কার্যকরভাবে অবসান করতে হলে প্রয়োজন নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন। একই সঙ্গে নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোকে অঙ্গীকার পূরণ করতে হলে তৃণমূল পর্যায় থেকে নারী নেতৃত্ব গড়ে তোলার ওপর জোর দিতে হবে।
আয়েশা বেগম
নারী জনপ্রতিনিধিদের যথাযথ মর্যাদা ও ভূমিকা নিশ্চিত করার জন্য জনগণকে আরও সচেতন হতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থায়ী কমিটি ও অন্যান্য কমিটিতে মহিলা মেম্বারদের রাখা হোক। সঙ্গে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও পদক্ষেপ নিতে হবে যেন মহিলা জনপ্রতিনিধিরা সত্যিকারে এলাকার জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হয়ে কাজ করতে পারেন।


নুর নাহার
আমরা যেসব মহিলা মেম্বার বা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান আছি, তাদের যথাযথভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। চেয়ারম্যান বা পুরুষ সদস্যরা ঠিকমতো মূল্যায়ন করেন না। যদিও আমরা জনগণের ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছি। আমাদের অনেকে সংরক্ষিত আসনে মেম্বার, তারা সরাসরি নির্বাচনে আগ্রহী। কিন্তু সাধারণ আসনে নির্বাচনের ক্ষেত্রে দলীয় সমর্থন বা দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার হার খুব কম। আমরা চাই, আমরা দাবি করছি, সব দলই নারীদের সাধারণ আসনে মনোনয়ন বা সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে যেন আরও এগিয়ে আসে।

উম্মে সাজিয়া সুলতানা
ইউনিয়ন পরিষদগুলো হতে পারে তৃণমূল পর্যায়ের জনগণের সেবা ও কল্যাণে নিবেদিত কার্যকর প্রতিষ্ঠান। এই কল্যাণকর প্রতিষ্ঠানে নারীদের অংশগ্রহণ পুরুষদের সমান হওয়া উচিত। কারণ, সরকারের পরিকল্পনা অনুসারে আগামীর বাংলাদেশে সমাজের সব ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ সমান সুযোগ পাবে। সে লক্ষ্যে তৃণমূল থেকেই নারীদের ক্ষমতায়ন শুরু করতে হবে।



রিজিয়া পারভিন
বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে, ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ গড়তে তৃণমূলে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে ২০৩০ সালের মধ্যে নারী-পুরুষের মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। ২০২৫ সালের মধ্যে সব দলে ৩০ শতাংশ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ নারী প্রতিনিধি নিশ্চিত করতে হবে। সরাসরি চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্য পদে ৩০ শতাংশ নারী সদস্যকে মনোনয়ন দিতে হবে।


বানেছা বেগম
বর্তমান সরকার নারীর উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান নারীর ক্ষমতায়নে কাজ করছে। ওয়ার্ডগুলোতে ৩/৪টায় নারীদের মনোনয়ন দিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর উপজেলা ইউনিট কমিটিতে নারীদের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে কেন মনোনয়ন দেওয়া হবে না? রাজনীতিতে নারীদের ক্ষমতায়ন হলে দলগুলো আরও জনবান্ধব হবে। জনপ্রতিনিধি হিসেবে নারীদের নির্বাচিত হওয়ার হার বাড়বে। এলাকার উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হবে।

শামীমা হক রোজী
নারী ও পুরুষের মধ্যে অনেক বৈষম্য আছে। ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিষদগুলোতে নারী প্রতিনিধিদের অন্য চোখে দেখা হয়। তাদের তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় না। প্রতিপক্ষ মনে করে বিরোধিতা করা হয়। এ ধারণা থেকে বের হতে হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে সরাসরি পদে নারীদের মনোনয়ন দেওয়া উচিত। সরকারি দপ্তরগুলোতে নারী সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হোক। তাদের প্রাপ্য মর্যাদা দিতে হবে। পদগুলোতে নারীদের ৫০ শতাংশ পদে সরাসরি মনোনয়ন দিতে হবে।

বিলকিস বেগম
নারীরা অনেক পিছিয়ে আছে। সব জায়গায় নারীদের তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। নারী প্রতিনিধিদের সমান সুযোগ দিতে হবে। যেসব কর্মকাণ্ডে নারী প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে কাজ অনেক বেশি স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালিত হয়েছে। যেসব এলাকার নারীনেত্রীরা তুলনামূলকভাবে এগিয়ে আছেন, সেসব জায়গায় নারীদের ক্ষমতায়নের কারণে পুরুষ সহকর্মীদের ক্ষমতা বা মর্যাদা কমে যায়নি; বরং তাদেরও সম্মান বৃদ্ধি পেয়েছে, বেড়েছে এলাকার মর্যাদা। কাজেই অধিক সংখ্যায় নারী জনপ্রতিনিধিদের এগিয়ে আসার সুযোগ দিতে পারলে পুরো এলাকার উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হবে।
সৈয়দ মনিরুন নাহার ম্যারি
নারী চেয়ারম্যান হয়েও নারীদের নিয়ে কাজ করতে সমস্যায় পড়তে হয়। প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার নারী। তাও নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য সংগ্রাম করতে হচ্ছে। জনপ্রতিনিধিদের অনেকে বিভিন্ন দল করে। দলে নেতৃত্বে এদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ, তৃণমূল থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে নারীনেত্রীদের জনগণের জন্য কাজ করার সুযোগ বেশি। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটিতে কমপক্ষে ৩৩ শতাংশ পদে নারীদের রাখার যে বিধান আছে, তা যথাযথভাবে অনুসরণ করার কথা থাকলেও কোনো দলই এ বিষয়ে সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।
মীনা বেগম
নারী একজন নারী। পরিবারকে বুঝেছি। সংসারকে বুঝেছি। এরপর বাইরে বের হয়েছি। উপজেলা পরিষদে ২০১১ সাল থেকে আছি। প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হচ্ছে। আমরা চাই, সমান সমান থাকতে। ৫০ শতাংশ হলে আমাদের লড়াই করা সহজ হবে। আমরা তাহলে বাংলাদেশকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব। আপনারা খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন, সাম্প্রতিক বিভিন্ন দুর্যোগে নারী জনপ্রতিনিধিদের অধিকাংশই বসে ছিলেন না। করোনা থেকে শুরু করে বন্যা, সব ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলার ক্ষেত্রে আমরা অনেকেই তৎপর ছিলাম। যেসব ইউনিয়ন পরিষদে আমরা মহিলা মেম্বাররা ঠিকমতো কাজ করতে পেরেছি, যেসব জায়গায় আমাদের পুরোপুরি সম্পৃক্ত করা হয়েছে, সেসব ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
ফারজানা ফেরদৌস নিশা
শুধু স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা বা রাজনীতির বেলায় নয়, সমাজজীবনের অন্য ক্ষেত্রেও, পারিবারিক পর্যায়ে, অর্থনৈতিকভাবে নারী ও পুরুষের মধ্যে অনেক বৈষম্য আছে। রাজনৈতিক দলগুলোতেও নারীদের সহজে সুযোগ দেওয়া হয় না। আমাকে দায়িত্ব দেওয়ার পর বলা হলো, নারী সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দল পরিচালনা করতে পারবে না। মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদটির কাজ কী, কোনো নথিতে স্বাক্ষর নেওয়া হয় না, কোনো কাজে মতামত নেওয়া হয় না। উন্নয়ন সংস্থা অনুদান আটকে দিয়েছে বলে এখন ব্যাকডেটে নথিতে সই করার চাপ দেওয়া হচ্ছে। নারীদের ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো একটা বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এ ক্ষেত্রে আরপিও যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
আফসানা আজিজ বিন পপি
আমরা যারা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানরা দ্বিগুণ ভোট পেলেও আমরা বঞ্চিত। আমাদের কোনো বরাদ্দ দেয় না। নারী উন্নয়ন ফোরামে কেনো বরাদ্দ দেওয়া হবে না? তাহলে কেমন করে কাজ করব? নারীরা দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক। ভোটারদেরও অর্ধেকই নারী। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা বা রাজনীতির বেলায় নয়, সমাজজীবনের অন্য ক্ষেত্রেও, পারিবারিক পর্যায়ে, অর্থনৈতিকভাবে নারী ও পুরুষের মধ্যে অনেক বৈষম্য আছে। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই কাজ করতে হবে। নারীদের নিজেদেরই নিজের অধিকার আদায় করে নিতে হবে। নারীরা যেন আরও অধিক হারে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রাথমিক সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন, তা নিশ্চিত করা দরকার। দলের বিভিন্ন কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদেও নারীদের জায়গা দিতে হবে। তাহলে নারীদের ক্ষমতায়ন দ্রুত হবে। দেওয়ার কথা বলছি।

ওয়াজেদ ফিরোজ
নারীদের ক্ষমতায়নে ডেমক্রেসিওয়াচ, খান ফাউন্ডেশন, প্রিপ ট্রাস্ট ও রূপান্তর সব সময় কাজ করে আসছে। সমাজের সব ক্ষেত্রে নারীদের সমতা বিধান গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে নারীদের অংশগ্রহণ যত বাড়বে নারীদের ক্ষমতায়ন তত জোরদার হবে। আজকের অনলাইন সংলাপে উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ এবং আগামীতে সবার সহযোগিতা থাকবে আশা রাখি।


সঞ্চালক

শেখ রোকন
সহকারী সম্পাদক
দৈনিক সমকাল

সহযোগী সঞ্চালক

ফওজিয়া খোন্দকার
উপপ্রকল্প পরিচালক
অপরাজিতা প্রকল্প

সভাপতি

আরোমা দত্ত
সংসদ সদস্য

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন

ফাহমিদা বেগম মুন্নী
সাপলেজা ইউনিয়ন পরিষদ
মঠবাড়িয়া, পিরোজপুর

প্রধান অতিথি

মেহের আফরোজ চুমকি এমপি
সভাপতি, সংসদীয় স্থায়ী কমিটি
নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়

বিশেষ অতিথি

শিরীন আখতার
সংসদ সদস্য

আলোচকবৃন্দ

অ্যাডভোকেট রোখসানা খন্দকার
নির্বাহী পরিচালক, খান ফাউন্ডেশন

রফিকুল ইসলাম
নির্বাহী পরিচালক, রূপান্তর

তৃণমূল প্রতিনিধি

আয়েশা বেগম
কুশিয়ারা ইউপি, ফেঞ্চুগঞ্জ, সিলেট

নুর নাহার
রামচন্দ্রপুর ইউপি
কাহারোল, দিনাজপুর

উম্মে সাজিয়া সুলতানা
হাইলধর ইউপি
আনোয়ারা, চট্টগ্রাম

রিজিয়া পারভিন
উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান
বাগেরহাট সদর

বানেছা বেগম
উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান
দুর্গাপুর, রাজশাহী

শামীমা হক রোজী
উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান
সিংড়া, নাটোর

বিলকিস বেগম
উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান
কমলগঞ্জ, মৌলভীবাজার

সৈয়দ মনিরুন নাহার ম্যারি
উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান
গৌরনদী, বরিশাল

মীনা বেগম
নোহালী ইউপি, গঙ্গাচড়া, রংপুর

ফারজানা ফেরদৌস নিশা
উপজেলা ভাইস প্রেসিডেন্ট
ফতুল্লা, খুলনা

আফসানা আজিজ বিন পপি
ভাইস চেয়ারম্যান
রামু উপজেলা, কক্সবাজার

ধন্যবাদ জ্ঞাপন

ওয়াজেদ ফিরোজ
নির্বাহী পরিচালক, ডেমক্রেসিওয়াচ

অনুলিখন

সাজিদা ইসলাম পারুল
স্টাফ রিপোর্টার
দৈনিক সমকাল



হাসনাইন ইমতিয়াজ
স্টাফ রিপোর্টার
দৈনিক সমকাল