গণসাক্ষরতা অভিযান ও সমকালের যৌথ আয়োজনে গত ২৮ ডিসেম্বর 'প্রাক-প্রাথমিক স্তরে এমএলই :কর্ম-অভিজ্ঞতা ও করণীয়' শীর্ষক অনলাইন গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতি হিসেবে স্বাগত ভাষণ দেন গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী। প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট ফজলে হোসেন বাদশা। সমকালের সহকারী সম্পাদক শেখ রোকন অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন। অনুষ্ঠানে সম্মানিত আলোচকরা তাদের আলোচনায় বলেন, সরকারিভাবে পাঁচটি আদিবাসী ভাষায় প্রাথমিকের তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তক দেওয়া হলেও সেগুলো পড়ানোর মতো কোনো শিক্ষক নেই। তাই সরকার যে উদ্দেশ্যে এই কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে তার লক্ষ্য অনেকাংশেই পূরণ হচ্ছে না। এ জন্য আদিবাসী শিশুদের তাদের নিজ নিজ ভাষার দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক দরকার। প্রয়োজনে শিক্ষাগত যোগ্যতায় কিছুটা ছাড় দিয়ে হলেও প্রতিটি ভাষার শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। দেশে প্রায় ৫৭টি আদিবাসী ভাষা আছে। পর্যায়ক্রমে প্রতিটি ভাষারই পাঠ্যবই রচনা করতে হবে যেন আদিবাসী শিশুরা মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষালাভ করতে পারে। একই সঙ্গে সারাদেশে মাল্টিল্যাটারাল এডুকেশন (এমএলই) কার্যক্রম আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে।
শেখ রোকন
ভাষা হচ্ছে নদীর মতো। নদীর যেমন শাখা নদী, উপনদী থাকে এবং সেগুলোও নদীর মূলধারা বয়ে যাওয়ার জন্য সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। তেমনি ভাষার প্রবহমানতার জন্য সব ভাষা, সব উপভাষা সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। সমকাল সবার ভাষা সুরক্ষার জন্য সব সময়ই সোচ্চার। এ ধরনের সব উদ্যোগে সমকাল সব সময়ই পাশে আছে, থাকবে।


রাশেদা কে চৌধুরী

জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীতে তার প্রতি জানাই শ্রদ্ধাঞ্জলি। করোনায় যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। আজকে আমরা মুজিববর্ষ পালন করছি। এ বর্ষে শিক্ষা ব্যবস্থাকে নানাভাবে নানা চোখে দেখার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখানে উপস্থিত সবাই বহুভাষিক শিক্ষা নিয়ে জানি। দেশে বহুভাষিক শিক্ষাদান কার্যক্রম এগিয়ে নিতে অনেক আগেই কাজ শুরু করা হয়েছে। এ কাজকে আরও বেগবান করতে হবে। একটা কথা মনে রাখতে হবে, মাতৃভাষা শিক্ষা আর মাতৃভাষায় শিক্ষা দুটির মধ্যে তফাত আছে। আমাদের দেশে প্রায় ৫৭টি আদিবাসী নৃগোষ্ঠীর মানুষ রয়েছে। তার মধ্যে ৫টি ভাষায় আমরা পাঠ্যবই পেয়েছি। বহুভাষিক শিক্ষাকে আরও কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, তা নিয়েই আজকের এ আলোচনা। কাউকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বলার কোনো অধিকার আমার আছে বলে আমি মনি করি না। তাই আদিবাসী বলতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। তারা আমাদের দেশেরই নাগরিক। তারা আমাদের দেশের বৈচিত্র্য বাড়িয়েছেন। এর আগে আমরা যখন বহুভাষিক শিক্ষার কথা বলেছিলাম তখন সরকার আমাদের দিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল- আদিবাসীদের ভাষায় বই, টেক্সট, কনটেক্সট, কারিকুলাম, এডুকেশন ম্যাটেরিয়ালস কোথায় পাওয়া যাবে। তখন আমরা একটা মেলা করেছিলাম। সেখানে সব শিখন উপকরণ জোগাড়ের ব্যবস্থা হয়েছিল। তারপর সরকার এটা নিয়ে অনেক কাজ করেছে। এর পথ ধরেই আমরা আদিবাসী শিশুদের জন্য ৫টি ভাষায় সরকারিভাবে বিনামূল্যে পাঠ্যবই পেয়েছি। বহুভাষিক শিক্ষা সারাদেশে কীভাবে আরও বাড়ানো যায় তা নিয়ে আজকের আলোচনায় নানা মত উঠে আসবে বলে আশা করছি।

ফজলে হোসেন বাদশা

আদিবাসীদের ভাষায় পাঠ্যবই এনসিটিবি থেকে দেওয়া হলেও তা পড়ানোর মতো কোনো শিক্ষক নেই। আদিবাসীদের মধ্য থেকেই এ বই পড়ানোর জন্য শিক্ষক দিতে হবে। পৃথিবীতে বর্ণমালা নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। যেসব ভাষার বর্ণমালা নেই, সেসব ভাষায় তারা কীভাবে এ সমস্যার সমাধান করেছে তার উদাহরণ আমরা এশিয়াতেই দেখতে পাই। কেবল প্রাথমিক নয়, প্রাথমিক থেকে আরও উচ্চস্তরেও আদিবাসীদের নিজস্ব ভাষায় পাঠ্যবই রচনা করা যায় কিনা তা দেখতে হবে।  আমাদের সংবিধানে শিক্ষা অধিকার হিসেবে নেই, আছে মূলনীতি হিসেবে। আমাদের কতগুলো মৌলিক বিষয় অধিকার হিসেবে সংবিধানে নেই। অথচ অপ্রয়োজনীয় অনেক বিষয় দুটি সামরিক সরকারের আমলে সংবিধানে ঢোকানো হয়েছে। এটা বিজয়ের মাস। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত এই সংবিধানে দেশের সব নাগরিকের বৈষম্য কমাতে ব্যবস্থা থাকতে হবে। আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করতে যাচ্ছি। এর মধ্যেই আমাদের আদিবাসী শিশুদের শিক্ষাদান কাজে আরও এগিয়ে যেতে হবে।  এ বিষয়ে আসলে আমরা পথ খোঁজার জন্য আজ পথে নেমেছি। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নয়, আমরা আদিবাসী শব্দটিই বলি। গত ১০ বছর ধরে সংসদীয় ককাস গঠন করে আমরা সংসদের ভেতরেই বারবার আদিবাসী শব্দটি বলছি।  এ প্রসঙ্গে একটি কথা বলি। আমার জন্ম যে গ্রামে সে গ্রামের নাম হরগ্রাম। হর শব্দটির অর্থ মানুষ। এটি একটি সাঁওতালি শব্দ। অথচ আমার জন্মের পর আমার গ্রামে আমি কোনো সাঁওতাল পরিবারকে বসবাস করতে দেখিনি। আমার এ বাংলাদেশ বাঙালি, সাঁওতাল, চাকমা, মারমা, ব্যোম, মুরং, গারো- সবার। তাদের সবার অধিকারকে স্বীকার করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাব। সবাই মিলে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আমরা বহুভাষিক শিক্ষার বিস্তারে উদ্যোগ নেব। ইদানীং সবকিছু অস্বীকার করার একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আর তাই আজ বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যে হাতুড়ি মারা হয়। যারা এটি করে, তারা উন্মাদ ছাড়া আর কিছু নয়।
জুরানা আজিজ

নওগাঁতে যেটি করা হয়েছে, আমাদের মূল শিক্ষাধারায় এ ধরনের গবেষণা হওয়া অত্যন্ত জরুরি। নওগাঁতে কর্ম এলাকার অভিজ্ঞতায় দুই উপজেলায় ৭০৬ জন আদিবাসী শিশুকে নিয়ে কাজ করে দেখা গেছে, তারা ভাষাভীতি দ্রুত কাটিয়ে উঠেছে। তাদের আচরণগত পরিবর্তন হচ্ছে এবং বিদ্যালয়ে আদিবাসী শিশুদের উপস্থিতি বেড়েছে। এ ঘটনা থেকে প্রতীয়মান- বহুভাষিক শিক্ষা নিশ্চিত করা গেলে আদিবাসী শিশুদের ঝরে পড়া উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কমে যাবে। প্রতিটি ক্লাসে একজন আদিবাসী শিক্ষক থাকছেন, সেখানে আদিবাসী শিশুরা তাদের জিজ্ঞাসাগুলোর উত্তর সহজেই জানতে ও বুঝতে পারছে। কোনো শব্দ, বাক্য শিশুদের বুঝতে সমস্যা হলে শিক্ষক তা আদিবাসী শিশুদের নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করছেন। বাঙালি শিশুরাও তা শিখছে। এর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো বাংলা ভাষার সমৃদ্ধ করাও। ক্লাসের অভিজ্ঞতা হলো, বাঙালি শিশুরাও তাদের আদিবাসী সহপাঠীদের নানাভাবে সহযোগিতা করছে। অভিভাবকদের সঙ্গেও স্কুলের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়েছে। স্কুল পরিচালনা কমিটি, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক সবার সমন্বিত সহযোগিতা এখন দরকার। দুই উপজেলায় ৪০০ আদিবাসী শিশুকে আমরা টার্গেট করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত ৩০৬ জনকে পাওয়া গেছে। এই নওগাঁর অভিজ্ঞতাকে সারাদেশের রোল মডেল হিসেবে আমরা দেখছি।
মঞ্জুশ্রী মিত্র

নেটস বাংলাদেশ ২০০৫ সাল থেকে বহুভাষিক শিক্ষা নিয়ে কাজ করছে। ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে আমরা উত্তরাঞ্চলের নওগাঁ জেলার মহাদেবপুর ও ধামইরহাট উপজেলা দুটিতে আদিবাসী শিশুদের মাঝে তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষাদান কার্যক্রমের প্রকল্প থেকে আমাদের যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তাতে দেখেছি, শিশুরা এতে খুব দ্রুত শিখছে। আমরা চাই প্রত্যেক শিশু যেন তার মায়ের ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষার সংযোগ ঘটিয়ে ভালোভাবে শিখন ফল অর্জন করতে পারে। প্রথম থেকে এ পর্যন্ত ৬ হাজার আদিবাসী এতে লাভবান হয়েছে। এ ক্লাসগুলোতে আদিবাসী শিশুদের উপযোগী করে ক্লাসের পাঠদানগুলো তৈরি করা হয়। মায়ের ভাষায় শিখতে পারলে এই শিশুরা মাথা উঁচু করে শিখতে পারবে এবং নিজের মতো করে বাঁচতে পারবে।

অধ্যাপক এ কে এম রিয়াজুল হাসান

চাকমা, মারমা, গারো, ত্রিপুরা ও সাদ্রী ভাষায় এখন আমরা এনসিটিবি থেকে বই দিচ্ছি। যেসব বই দেওয়া হয়েছে আগামীতে সেগুলোর আরও ট্রাইআউট ও ইফেকটিভনেস যাচাই আমরা করব। তিনি বলেন, আদিবাসী ভাষায় পাঠ্যবইয়ের চাহিদা যাচাই আগে দরকার কেননা, কোন কোন ভাষার বই আগে দরকার তা জানা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিখন সামগ্রী না থাকায় শুধু পাঠ্যবই তেমন কাজে আসবে না। প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ করা প্রয়োজন বইগুলো পড়াতে। এ বিষয়ে আমরা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও সরকারকে বোঝাতে চেষ্টা করছি। একই সঙ্গে সাপ্লিমেন্টারি রিডিং ম্যাটেরিয়াল (এসআরএম) ডেভেলপেরও চেষ্টা করছি।

ড. মনজুর আহমদ


কোনো কোনো নৃগোষ্ঠীকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে অভিহিত করে আমরা নিজেরাই ক্ষুদ্র মানসিকতার পরিচয় দিচ্ছি। বহুভাষী শিক্ষা এক সময় সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। এখন তা হয়েছে। আরও অনেক কিছুই করার বাকি আছে।  ৫টি আদিবাসী ভাষায় বই হয়েছে। আরও বহু কিছুই করার রয়ে গেছে। এ নিয়ে আরও গবেষণা চলছে। আদিবাসী শিশুদের শেখানোর মূল কৌশল হিসেবে তাদের নিজ নিজ ভাষার সহকারী অথবা সহযোগী শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। প্রাক-প্রাথমিকের বইয়ের কথাও আজকের আলোচনায় বলা হচ্ছে। আসলে এই স্তরের জন্য বইপত্র খুব জরুরি কিছু নয়। বই থাকতে পারে, তবে খেলাধুলার মাধ্যমে শিক্ষাদানই তাদের জন্য বড় কথা। প্রাক-প্রাথমিক স্তরে শিক্ষকদের জন্য বইপত্র থাকতে হবে।
অধ্যাপক সৌরভ শিকদার

আদিবাসী শিশুদের শিক্ষাদানের বিষয়ে অন্তত সাতটি গবেষণার সঙ্গে আমি যুক্ত ছিলাম। সাদ্রী ভাষায় ক্লাসে কথা বলা হলে তার অন্তত ৩০ শতাংশ বাঙালি শিক্ষার্থীও বুঝতে পারবে। তবে চাকমা, মারমা ও গারোদের মান্দি ভাষায় পড়ানো হলে তা বোঝা যাবে না। আমার পরামর্শ হলো, তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত যে বইগুলো হয়েছে, তা আগামীতে যাচাই হওয়া উচিত। প্রয়োজনীয়তা যাচাই করতে হবে, কতজন শিক্ষক লাগবে, কত শিক্ষার্থী আছে, কতটি ভাষায় বই দরকার। আমরা বারবার বলেও এ কথাগুলোর বাস্তবায়ন করাতে পারছি না। শিক্ষক প্রশিক্ষণ দরকার। সাপ্লিমেন্টারি মেটেরিয়াল ডেভেলপ করা দরকার। কেউ যেন বাদ না পড়ে যায়। যেসব ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে, সেদিকে আগে নজর দেওয়া দরকার।

শহিদুল ইসলাম

নেটস্‌ বাংলাদেশ ২০০১ সাল থেকে কাজ করছে। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শিক্ষা মানবাধিকারের বিষয়টি ফোকাস করে আমরা কাজ করছি। মাতৃভাষায় আদিবাসী শিশুদের জন্য শিক্ষা গ্রহণের বিষয়টি তাদের জন্য কোনো সুযোগ নয়, এটি অধিকার। এ জন্য দরকার রাজনৈতিক অঙ্গীকার। সরকারের ভেতর থেকে এই অঙ্গীকার করা এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতর থেকে কাজেকর্মে তার প্রতিফলন পাওয়া দরকার। কেবল অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বসে থাকলে চলবে না। এর জন্য কাজ করতে হবে। নওগাঁয় যে অভিজ্ঞতা আমরা পেয়েছি, এনজিওর মাধ্যমে এ ধরনের গবেষণা আরও হতে পারে। এর জন্য জনগণের চাওয়াও থাকতে হবে। বেসরকারি সংস্থাগুলোকে তাদের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও কর্মপ্রচেষ্টা দিয়ে এ ধরনের মহান কর্মযজ্ঞকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এ থেকে আমাদের পিছিয়ে আসার কোনো সুযোগ নেই। আমরা যদি আমাদের মধ্য থেকে আদিবাসী ভাষাগুলো ক্রমে হারিয়ে যেতে দিই তা হবে আমাদের জন্য লজ্জার। গুরুত্ব না দিলে এই প্রান্তিক মানুষ এক সময় হারিয়ে যাবে। তাদের সঙ্গে হারিয়ে যাবে তাদের ভাষাগুলোও। হারিয়ে যাবে তারা আমাদের মানচিত্র থেকে, আমাদের উন্নয়ন থেকে- এমনকি আমাদের প্রজন্ম থেকেও। আদিবাসীরা মনে করে এবং তারা বিশ্বাস করে, যে জমি তারা হারিয়েছে, তা আর কোনোদিন ফিরে পাবে না। তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি হারিয়ে গেলে তারা অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়বে। এ ধরনের আলোচনা আয়োজনের জন্য সমকাল ও গণসাক্ষরতা অভিযানকে ধন্যবাদ জানাই।
যোগেন্দ্র নাথ সরেন

আদিবাসীরা শিক্ষাদীক্ষায় পিছিয়ে থাকায় তাদের মাঝে যোগ্য শিক্ষক পাওয়া খুব সহজ কাজ হবে না। চাইলেও শিক্ষক মিলবে না। তবু যারা নওগাঁর এই প্রকল্পে কাজ করেছেন, তাদের স্থায়ী করা হোক এবং এক হাজার ২০০ টাকা সম্মানীর বদলে তাদের পুরোপুরি বেতন দেওয়া হোক। এই শিক্ষকদের স্থায়ী করাটা খুব জরুরি। আদিবাসীরা নিজেরাও বোঝেন এবং তারা সব সময়ই বলেন, তারা পিছিয়ে আছেন। আর এই পিছিয়ে থাকাতেই যত সমস্যা। এ থেকে বের হতে হবে। সাদ্রী ভাষার (ওরাঁও) পাঠ্যবই তারা বাংলা বর্ণমালা ব্যবহার করে পড়াচ্ছেন। তবে বাংলায় সব শব্দ হুবহু সাদ্রীর মতো করে উচ্চারণ করা যায় না। তাই এই শিক্ষকরা তাদের নিজ নিজ উচ্চারণ মতো শিশুদের শিখিয়ে থাকেন। এতে শিশুদের মধ্যে শেখার ক্ষেত্রেও রকমফের হয়ে যাচ্ছে। তাই প্রতিটি ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা দরকার, যেন শিশুরা তাদের মতো করে সঠিক উচ্চারণে শিখতে পারে।
মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা

অনেক প্রকল্প চলেছে, বহু পাইলটিং দেখেছি, আর দেখতে চাই না। এখন মূল কাজ বাস্তবায়ন দেখতে চাই। আদিবাসী সব শিশু যেন মাতৃভাষায় পড়তে পারে, সেই সুযোগ চাই। সরকারের বহু উন্নয়ন প্রকল্প আমরা দেখেছি, পাইলটিং আর অব্যবস্থাপনায় সেসব সফল হয় না। এনসিটিবি থেকে পাঁচটি ভাষায় পাঠ্যবই দিয়েই দায়িত্ব শেষ করা হয়েছে। এসব ভাষার শিক্ষক পদায়ন করা হয়নি। পড়ানোর লোক না থাকলে শুধু বই দিয়ে রেখে লাভ কী? সেগুলো শিশুদের শেখাবেন কারা? এসব কাজ করা না গেলে যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এই শুভ উদ্যোগ, তা মুখ থুবড়ে পড়বে। চাকমা পাংখুয়া, কুনি, রাহান, রেমিট্রা- এসব ভাষায় অতি স্বল্প ভাষাভাষী রয়েছে। তারা মারা গেলে এসব ভাষা হারিয়ে যাবে। তাহলে এসব ভাষার কী হবে? এসব ভাষাও যদি মারা যায়, তাহলে আমরা দেশ থেকে বৈচিত্র্য হারাব। জাতীয় সংস্কৃতি নীতিতে বলা হয়েছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আদিবাসী ভাষা ইনস্টিটিউট করা হবে। তা কি আজও হয়েছে? সিলেট, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, রাঙামাটি- এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আদিবাসী ভাষা ইনস্টিটিউট তৈরি করতে হবে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আঞ্চলিক কালচারাল ইনস্টিটিউটগুলোতে বরাদ্দ দিতে হবে পর্যাপ্ত।
মেহেরুন নাহার স্বপ্না
পাঁচটি আদিবাসী ভাষায় বই হয়েছে। আরও দুটি ভাষায় বই তৈরির বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যান্য যেসব আদিবাসী ভাষা রয়েছে সেগুলোর বই তৈরির উদ্যোগ এখনই নিতে হবে। আরও যেসব আদিবাসী ভাষা রয়েছে, সেগুলোরও বই তৈরির উদ্যোগ এখনই নিতে হবে। বই তৈরির আগে প্রতিটি ভাষার সুনির্দিষ্ট কারিকুলাম তৈরি করা দরকার।


শিরিন আকতার

এনসিটিবি প্রাথমিক থেকে টারশিয়ারি পর্যন্ত কম্পিটেন্সি বেজড শিক্ষাক্রম তৈরির কাজ শুরু করেছে। যারা আদিবাসী স্কুলে পাঠদান করছেন, এসব বিষয়ে তাদেরও মতামত ও অভিজ্ঞতা নেওয়া দরকার। আদিবাসী ও বাঙালি শিশুদের মধ্যে শিক্ষার বৈষম্য দূর করতে আইনগত প্রক্রিয়া দরকার। 'কনভেনশন এগেইনস্ট ডিসক্রিমিনেশন'- এ বাংলাদেশ র‌্যাটিফাই করেনি। আমি মনে করি, এটি র‌্যাটিফাই করা দরকার। ইউনেস্কো বাংলাদেশ থেকে আমরা শিশুদের ও শিক্ষাদানের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য গণসাক্ষরতা অভিযানের সঙ্গে নানা কাজ করছি। গবেষণাও করছি। কভিড সংক্রমণের কারণে এ কাজগুলো নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এখন আবার একটু চিন্তা করা দরকার। এনসিটিবি থেকে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।
ড. আহসান আলী

ওরাঁওদের ভাষা ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। সরকার থেকে ওরাঁওদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, তাদের পাঠ্যবইও হয়ে যাবে। আমরা তা বিশ্বাস করি। সাঁওতালসহ সমতলের আদিবাসীদের দিকেও সরকারকে সমভাবে নজর দিতে হবে। আদিবাসীদের অর্থনৈতিক বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। পেটে ক্ষুধা থাকলে আদিবাসী শিশুরা তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শ্রমঘন কাজে নিযুক্ত হয়ে যাবে। এতে তারা ঝরে পড়বে স্কুল থেকে। তাদের সুরক্ষা দিতে হবে।

জ্যোতি এফ গোমেজ

আমার মনে আছে, ১৯৬০ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত ক্যাথলিক চার্চে লাতিন ভাষায় বাইবেল পড়তে হতো। সে সময়ে আমি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র। ওই সময়ে ক্যাথলিক চার্চ সিদ্ধান্ত দিল, প্রত্যেকে নিজ নিজ ভাষায় বাইবেল পড়তে ও প্রার্থনা করতে পারবে। এরপর ষাট ও সত্তর দশক থেকে বাংলায় ধর্মীয় প্রার্থনা, গান ও অন্যান্য বিষয়ের চর্চা চলল। এ কথাটি এ জন্য বললাম যে, সরকার চাইলেই আদিবাসী শিশুদের তাদের নিজ ভাষায় লেখাপড়া করানো সম্ভব। আবার বই থাকবে, তা পড়ানোর কোনো শিক্ষক থাকবে না- এটাও আসলে হয় না। তাই যে পাঁচটি ভাষার বই দেওয়া হয়েছে, সরকারি উদ্যোগে আদিবাসী শিক্ষক নিয়োগ করে আদিবাসী শিশুদের পড়াতে হবে। প্রয়োজনে শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করে হলেও আদিবাসী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া জরুরি।
তপন কুমার দাশ
আমরা চাই, প্রতিটি শিশু মাতৃভাষায় শিক্ষালাভ করবে। নেটস্‌ যেমন নওগাঁয় একটি সিস্টেম দাঁড় করিয়েছে, মাল্টিল্যাটারাল এডুকেশন নিয়ে এমন ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলোর একটি ডকুমেন্টেশন দরকার। আদিবাসী প্রতিটি শিশুও যেন তাদের নিজ নিজ বৈচিত্র্য ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করে বাঙালি শিশুদের মতো একই যোগ্যতা অর্জন করতে পারে শিক্ষালাভের মাধ্যমে।
এ জন্য আমাদের একমত ও একজোট হয়ে দাবি তুলতে হবে। ধন্যবাদ সমকালকে আমাদের এ দাবি তোলার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।
সঞ্চালক
শেখ রোকন
সহকারী সম্পাদক
দৈনিক সমকাল
সভাপতি
রাশেদা কে চৌধুরী
নির্বাহী পরিচালক
গণসাক্ষরতা অভিযান
প্রধান অতিথি
ফজলে হোসেন বাদশা
সদস্য
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি

কর্ম-অভিজ্ঞতা উপস্থাপক
জুরানা আজিজ
সহকারী অধ্যাপক, আইইআর
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আলোচক
মঞ্জুশ্রী মিত্র
সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার (এডুকেশন)
নেটস বাংলাদেশ

অধ্যাপক এ কে এম রিয়াজুল হাসান
সদস্য (প্রাথমিক শিক্ষাক্রম)
এনসিটিবি

ড. মনজুর আহমদ
প্রফেসর ইমেরিটাস
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

অধ্যাপক সৌরভ শিকদার
ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শহিদুল ইসলাম
ডিরেক্টর
নেটস্‌ বাংলাদেশ

যোগেন্দ্র নাথ সরেন
সভাপতি
আদিবাসী মুক্তিমোর্চা

মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা
নির্বাহী পরিচালক
জাবারাং কল্যাণ সমিতি

মেহেরুন নাহার স্বপ্না
ঊর্ধ্বতন কার্যক্রম ব্যবস্থাপক
সেভ দ্য চিলড্রেন

শিরিন আকতার
প্রোগ্রাম অফিসার
ইউনেস্কো বাংলাদেশ

ড. আহসান আলী
নির্বাহী পরিচালক
আশ্রয়

জ্যোতি এফ গোমেজ
উপদেষ্টা
গণসাক্ষরতা অভিযান

তপন কুমার দাশ
উপপরিচালক
গণসাক্ষরতা অভিযান

অনুলিখন
সাব্বির নেওয়াজ
বিশেষ প্রতিনিধি
দৈনিক সমকাল

বিষয় : আদিবাসী শিশুদের পাঠ্যবই পড়াতে প্রশিক্ষিত শিক্ষক অতি জরুরি

মন্তব্য করুন