প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন-২০১৩ ও বিধি অনুযায়ী জাতীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে দেশের কোনো কোনো স্থানে এসব কমিটি অচল হয়ে আছে। আইনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারের কথা উল্লেখ থাকলেও তার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন দেখা যায় না। ফলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সমাজের মূলধারা থেকে পিছিয়ে পড়ছেন। তাদের উন্নয়নে দরকার জাতীয় নীতিমালা, কর্মপরিকল্পনা, আইন ও বিধি বাস্তবায়ন এবং কমিটি কার্যকর করতে গতি বাড়ানো। শুধু সরকার নয়, সবাইকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে হবে। পিছিয়ে থাকা এই মানুষগুলোকে পথ দেখানোর দায়িত্ব সবার। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতায় গত ১৬ ফেব্রুয়ারি 'প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষাবিষয়ক কমিটির কার্যকারিতা, চ্যালেঞ্জ এবং করণীয়' শীর্ষক অনলাইন গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকরা এসব কথা বলেন। বৈঠকটি যৌথভাবে আয়োজন করে সমকাল, ইংরেজি দৈনিক বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, প্রতিবন্ধী নারীদের জাতীয় পরিষদ, জাতীয় তৃণমূল প্রতিবন্ধী সংস্থা ও এডিডি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ। বৈঠকে আলোচকরা প্রতিবন্ধী  ব্যক্তিদের অধিকার আদায়ে গঠিত কমিটি সক্রিয় করা, কার্যক্রম মনিটরিং, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিবন্ধীবিষয়ক কাজের জন্য আলাদা পদ তৈরি, বরাদ্দ বাড়ানো, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি শনাক্তে স্বাস্থ্য বিভাগের প্রশিক্ষণ, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের সমন্বয় ও জবাবদিহিতার ব্যবস্থা রাখার দাবি জানান

মুস্তাফিজ শফি
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা এই সমাজেরই মানুষ। তাদের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে আমাদের অনেক কিছু করার আছে। আমরা এই মুহূর্তে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে দাঁড়িয়ে। এ সময়ে প্রতিবন্ধীবান্ধব সমাজ গঠন না হলে স্বাধীনতা অর্থবহ হবে না। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সবাইকে কাজ করতে হবে। আমরা প্রতিবন্ধীবান্ধব সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চাই। সমকাল দীর্ঘদিন ধরে এসব কাজ করছে। সমকাল শুধু সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে দায়িত্ব শেষ করতে চায় না, সমাজের জন্যও কিছু কাজ করছে। সেই জায়গা থেকে আমরা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করছি এবং ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
মো. শফিকুল ইসলাম
এডিডি ইন্টারন্যাশনাল ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় তিন বছর ধরে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের আওতায় আমরা চেষ্টা করেছি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইনে যেসব জেলা, উপজেলা ও শহর কমিটি রয়েছে, সেগুলোকে কীভাবে আরও কার্যকর করা যায়। এসব কমিটির মাধ্যমে জাতীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কেন্দ্র থেকে শুরু করে কীভাবে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাস্তবায়ন করতে পারি, সেসব বিষয় নিয়েই মূলত এ প্রকল্পের একটি বড় অংশ কাজ করেছে। এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে সচেতনতাও তৈরি করা হচ্ছে। দেশের তিনটি জেলার প্রায় ১২টি উপজেলায় কাজ করছি। সাড়ে চার হাজার প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত আছেন। এই প্রকল্পের বাইরেও এডিডি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ আটটি জেলায় কাজ করছে। কিছু কিছু চ্যালেঞ্জও আছে। সবার সম্মিলিত চেষ্টায় সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সুরক্ষায় সবাই যেন একযোগে কাজ করতে পারেন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সুরক্ষায় গঠিত কমিটিগুলো যতই কার্যকর থাকবে, ততই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কল্যাণ হবে। প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকারকে সুরক্ষিত করতে হলে তাদের সংগঠনকে (ডিপিও) প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করার প্রক্রিয়া থাকতে হবে। তাই প্রতিবন্ধিতা বিষয়টি পরিকল্পনায় যুক্ত করার জন্য সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করতে হবে।
গোলাম ফারুক হামিম
প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন-২০১৩-এ এমন কিছু নেই, যাতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারের বিষয় রাখা হয়নি। আইনে তাদের বিকশিত হওয়ার ও মতপ্রকাশের সুযোগ রয়েছে। এটি একটি সুন্দর আইন। আইন বাস্তবায়নে সরকার জাতীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চারটি কমিটি করেছে। কমিটিগুলোর ভূমিকা আইনে বিস্তারিত আছে। আমাদের প্রকল্পের আওতায় বগুড়া, রংপুর ও পটুয়াখালীতে আইন-সংক্রান্ত সচেতনতা তৈরি হয়েছে। পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক সব উপজেলা ও ইউনিয়নে এ বিষয়ে চিঠি ইস্যু করেছেন। একই সঙ্গে আমাদের কর্ম এলাকার থানাগুলোতে এখন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এসব এলাকায় কমিটিগুলোর সক্রিয়তা অনেক বেশি বেড়েছে। প্রকল্প এলাকায় কমিটির সভাগুলো নিয়মিত হচ্ছে। অগ্রগতির পেছনে সংশ্নিষ্ট প্রশাসনের সংবেদনশীলতা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারের বিষয়ে তাদের মনন বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে এই অগ্রগতির পাশাপাশি সীমাবদ্ধতার কারণে কিছু সমস্যাও হচ্ছে। ইউএনও ও জেলা প্রশাসক পদাধিকারবলে অনেক কমিটির সভাপতি। ফলে কমিটির সভা কোথাও কোথাও দেরিতে শুরু হয়। কমিটির সভায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে আলোচনা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অধিকারের বিষয়গুলো আলোচনার তেমন সুযোগ থাকে না। যেসব ভবনের সভাকক্ষ দোতলা কিংবা তিনতলায় থাকে, সেখানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ওঠানামায় সমস্যা হয়। সম্মিলিত প্রয়াসের মধ্য দিয়েই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য আমরা একটি সুন্দর বিশ্ব গড়তে পারব।
শিবানী ভট্টাচার্য্য
আমরা প্রতিবন্ধীবান্ধব সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চাই। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সুরক্ষায় আইনের মাধ্যমে চারটি কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। কমিটির মিটিংয়ে কী হবে, তা আইনে বলে দেওয়া হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বছরে তিন মাস পরপর চারটি মিটিং হওয়ার কথা। অথচ আজকের আলোচনায় উঠে এসেছে, এসব মিটিং নিয়মিত হচ্ছে না। আবার মিটিং হলেও তা খুব স্বল্প সময়ের জন্য হয়। আবার কোথাও কোথাও মিটিং দেরিতে শুরু হয় বলে অভিযোগ এসেছে। মিটিংগুলোতে আলোচনার বিষয় হয় চাহিদাভিত্তিক। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মমুখী করতে মিটিংয়ে কিছু হয় না। প্রতিবন্ধীবিষয়ক কমিটির মিটিং হতেই হবে। এটা আইন দিয়ে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। বাজেটের অভাবে মিটিং হবে না- এ যুক্তি ঠিক নয়। জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে আন্তরিক হতে হবে। শুধু সভা করলেই হবে না, রিপোর্টও করতে হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশগম্যতার সমস্যার বিষয়ও আজকের আলোচনায় কেউ কেউ তুলে ধরেছেন। শুধু সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নয়, ৪৩টি মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কাজ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়ন করা। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহায়তায় ২১১টি সেবাকেন্দ্র প্রক্রিয়াধীন। বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় কমিটি গঠনের জন্য জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন থেকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। মিটিংগুলো ভবনের দোতলা কিংবা তিনতলায় হওয়ায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা উঠতে পারেন না। ডিসি অফিসগুলো পুরোনো, ফলে তাদের মিটিংরুমগুলো উপরের তলায়। প্রতিবন্ধীবান্ধব ভবন তৈরির জন্য গণপূর্ত বিভাগকে বলা হয়েছে। ভবনগুলোতে লিফট রাখার ব্যবস্থা করার জন্যও বলা হয়েছে। সার্কিট হাউসের নিচতলায় একটি হলরুম আছে, ইচ্ছে করলে সেখানেও মিটিং করা যায়। আমাদের কমিটিগুলোতে যারা আছেন, তাদেরও দায়বদ্ধতা আছে। কমিটিগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতাও একটা বড় চ্যালেঞ্জ। বিধিমালায় একটা ছক দেওয়া আছে, সে ছক অনুযায়ী রিপোর্ট করতে হবে। তিনি সব জেলায় প্রতিবন্ধীবিষয়ক ফোকাল পয়েন্ট করার পরামর্শ দেন। তাদের কাজ হবে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন ও সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা। আমরা চেষ্টা করব, যে কাজগুলো করোনার কারণে বাধাপ্রাপ্ত ছিল, তা যেন ত্বরান্বিত হয়। তবে আগের চেয়ে কাজের গতি কিছুটা বেড়েছে। এবার ইশারা দিবস পালন হয়েছে। এখন আমরা এ বিষয়ে চিঠি করে দিয়েছি। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমানভাবে চলাচল, আইনের শাসন পাওয়া, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়েই চলতে চাই। তাদের পথ দেখানোর দায়িত্ব সবার, যেন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা পিছিয়ে না থাকে। একটা সুন্দর সমাজ ও দেশ তাদেরও দিতে চাই।
আমায়া জাবালা
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সবার আগে মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। তাহলে একটা ইতিবাচক ফল আসতে পারে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে গত তিন বছর এডিডি ইন্টারন্যাশনালের প্রকল্প চলছে। প্রকল্প এলাকাগুলোতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সুরক্ষায় অগ্রগতি দেখে আমি খুবই খুশি। জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের মিটিংগুলো মনিটর করা দরকার। মিটিংয়ের নিয়মিত রিপোর্টিং এবং ফলোআপ করা দরকার। তারপর মিটিংয়ের সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেওয়া উচিত। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ডাটা তৈরি করা দরকার। তবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মূলধারায় আনতে হলে দরকার সম্মিলিত প্রয়াস। এ ক্ষেত্রে সিভিল সোসাইটিকেও এগিয়ে আসতে হবে।
খন্দকার জহুরুল আলম
প্রতিবন্ধীবিষয়ক অধিকার ও সুরক্ষা আইন ১২ হাজার প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অংশগ্রহণে তৈরি হয়েছে। আইনে কোনো ফাঁক নেই। তবে সারাদেশে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৩০০ কমিটি আছে। এই কমিটিগুলো যদি ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করত, তাহলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবন পাল্টে যেত। কমিটিগুলোর সমন্বয়ের দায়িত্ব জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের। এই ফাউন্ডেশনের জনবল ও আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। নেই সমন্বয়। ভিয়েতনামে সচিবালয়ের বাইরে তাদের আলাদা একটি সচিবালয় আছে। তারা বিভিন্ন কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করে। গত জাতীয় নির্বাহী কমিটির আলোচনায় এগুলো খুব ইতিবাচকভাবে আলোচনা হয়েছে। কমিটিগুলোকে সক্রিয় করতে হবে, বাজেট থাকতে হবে। কিন্তু সে রকম বাজেট মন্ত্রণালয় চেয়েছে কিনা, জানি না। অর্থের বিকল্প কিছু নেই। অর্থ না থাকলে কমিটিগুলো সক্রিয় রাখা যাবে না। এখনও সব উপজেলা ও পৌরসভায় কমিটি হয়নি। আমরা চাই, যখনই কোনো পরিকল্পনা করা হবে, সেখানে প্রতিবন্ধী মানুষের কার্যকর অংশগ্রহণ থাকবে। আমাদের জাতীয় পরিকল্পনা এমন হওয়া উচিত, যা প্রতিবন্ধী মানুষকে সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় কেবল সম্পৃক্ত করবে না, তাদের সক্ষমতাকে ব্যবহার করবে। প্রতিবন্ধিতাবিষয়ক কমিটিগুলো শুধু সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কমিটি নয়, সব মন্ত্রণালয়ের কমিটি। কমিটির মিটিং আলাদা হওয়া উচিত। কমিটি সক্রিয় হোক, প্রতিবন্ধী মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে কমিটিগুলো কাজ করুক।
নাসিমা আক্তার
রংপুরে আমরা পাঁচটি উপজেলায় কাজ করছি এডিডি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের প্রকল্পের অধীনে। মিটিং করার জন্য প্রশাসনের লোকজন সময় দিতে চায় না। মিটিংগুলো সাধারণত ভবনের দোতলা-তিনতলায় হয়ে থাকে, সেখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ওঠার মতো কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই। জেলা পর্যায়ে মিটিং করার জন্য বাজেট বরাদ্দ দরকার। মিটিংয়ের বিষয়ে সরকারের কোনো মনিটরিং নেই, কোনো জবাবদিহিতা নেই। প্রতিবন্ধী ভাতার মধ্যেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে। তাদের কর্মমুখী করার কোনো উদ্যোগ নেই। কমিটিগুলোতে প্রতিবন্ধী মানুষের সমস্যা নিরসনকে দান-দয়ার মতো দেখা হচ্ছে। আমাদের মূল সমস্যা চিহ্নিত করতে হবে। তা না হলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার বাস্তবায়ন করতে পারব না।
আবু সাঈদ মো. কাওছার রহমান
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কাজ করতে গিয়ে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। প্রতিবন্ধী শনাক্তকরণে প্রথমে সমস্যায় পড়তে হয় হাসপাতালে। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এটি চিহ্নিত করে স্বাক্ষর করেন। কিন্তু অধিকাংশ হাসপাতালে প্রতিবন্ধী শনাক্তকরণ কার্যক্রমে দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকরা ব্যস্ত থাকেন অথবা তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নেই। এতে সমস্যা হচ্ছে। আবার প্রতিবন্ধী ভাতা ঘোষণার পর সুস্থ লোকও প্রতিবন্ধী হতে চাচ্ছেন। কারণ, প্রতিবন্ধী নাগরিক সুবর্ণ কার্ড পেলেই তিনি প্রতিবন্ধী ভাতা পাবেন। মাঠ পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তাও এর সঙ্গে জড়িত। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে স্বাবলম্বী হওয়ার প্রবণতা কম। তারা প্রতিবন্ধী ভাতা নিতেই বেশি আগ্রহী। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মমুখী করতে প্রশিক্ষণ দরকার, তারা যেন ভাতামুখী না হয়ে কর্মমুখী হয়। সমাজসেবা বিভাগে জনবল, পরিবহন সংকটসহ নানা সমস্যা আছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের ১৯৮৪ সালের জনবল কাঠামো পরিবর্তন করা এখন সময়ের দাবি। উপজেলা পর্যায়ে সর্বোচ্চ ১০-১২ কর্মী কাজ করছেন। জনবল বেড়েছে দুই থেকে আড়াই গুণ, কিন্তু কাজ বেড়েছে ৩০-৩৫ গুণ। উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার যাতায়াতের জন্য একটি মোটরসাইকেলও নেই। জনবল সংকট ও লজিস্টিক সংকট আমাদের জন্য বড় একটা চ্যালেঞ্জ।
নাজরানা ইয়াসমিন হীরা
করোনাকালে পাবনা ও চুয়াডাঙ্গায় ২৫ প্রতিবন্ধীর সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু তাদের মধ্যে মাত্র দু'জনের কার্ড আছে। প্রতিবন্ধী ভাতার জন্য ফরম ফিলআপ করতে দোকানে ২০০ টাকা দিতে হয়। কিন্তু এই টাকাও অনেকের দেওয়ার ক্ষমতা নেই। প্রতিবন্ধী ভাতা পাওয়ার প্রক্রিয়া আরও সহজ করা দরকার। প্রতিবন্ধীবিষয়ক আইনের বিষয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানেন না। অনেক আইনজীবীও আইনের বিষয়ে জানেন না। আইন বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা, তার একটা মনিটরিং দরকার। একটা সিস্টেমের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করতে হবে।
সুশান্ত কুমার দাশ
প্রতিবন্ধী সুরক্ষা আইন সাত বছরেও সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। সরকার বিভিন্ন সময় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য অনেক কিছু বললেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। আইনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। অধিকার বাস্তবায়ন করতে হলে জনপ্রতিনিধিদের সচেতনতামূলক কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। সামনে গণশুমারিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রকৃত সংখ্যা মাঠ পর্যায় থেকে তুলে আনতে হবে। তাহলে সঠিক সংখ্যা বের হয়ে আসবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে তারা কর্মমুখী হয়ে উঠবেন।
এ এইচ এম নোমান খান
২০০১ সালের আইনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কল্যাণের কথা থাকলেও অধিকারের কথা ছিল না। ২০১৩ সালের আইনে অধিকারের কথা আছে। এটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আন্দোলনের ফসল। কিন্তু সেই অধিকার প্রতিষ্ঠা এখনও হয়নি। তবে অনেকেই এখন প্রতিবন্ধীবান্ধব কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছেন। প্রাইভেট সেক্টরও এগিয়ে এসেছে। করোনাকালে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সঙ্গে আছে। যেসব জায়গায় কমিটিগুলো সক্রিয় আছে, সেখানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভূমিকা বেশি ছিল। এখন ধীরে ধীরে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য নিজস্ব একটা দায়বদ্ধতা তৈরি হয়েছে। কমিটিগুলোর দায়িত্ব ছিল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়ন করা। কিন্তু কমিটিগুলো সক্রিয় করা যায়নি।
আশরাফুন্নাহার মিষ্টি
প্রতিবন্ধী মানুষের সঙ্গে সবাই জড়িত। কিন্তু তাদের জন্য প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা যায়নি। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত হলে এর সুফল দেশের সবাই ভোগ করতে পারবেন। ২০১৩ থেকে ২০২১ সালে এসেও আমরা পুরোনো কথা বলছি। কমিটিগুলোর রিপোর্ট প্রকাশ হয় না। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বছরে একটি মিটিং হয় কিনা আমার সন্দেহ আছে। সব প্রতিবন্ধী মানুষের ভাতার প্রয়োজন নেই। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা মানবসম্পদে পরিণত হবেন- এটা কেন আমরা ভাবতে পারি না? আমরা মূল জায়গায় যাচ্ছি না, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মানবসম্পদে পরিণত না করে দয়া দেখাচ্ছি। সামাজিক সব কাজে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। জেলার কমিটিগুলোর দায়িত্ব প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমস্যার সমাধান করা। কমিটিগুলোর প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে। কমিটির সদস্যরা যদি ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করতেন, তাহলে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কারণ, এই কমিটিতে প্রায় প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা আছেন।
শিলা রানী দাস
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষার বিষয়ে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তারা একেবারেই সচেতন। কিন্তু জেলা পর্যায়ের কমিটির মিটিংয়ে উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা থাকেন না। জেলা পর্যায়ের কমিটির মিটিংয়ে উপজেলার কর্মকর্তারা থাকলে অনেক ফলপ্রসূ হবে। উপজেলা কমিটির সভার সুপারিশ যদি জেলায় পাঠানো হয়, জেলার সুপারিশ যদি অধিদপ্তরে যায়, তাহলে প্রতিবন্ধী সুরক্ষা আইন কার্যকরে সুবিধা হবে। সব এনজিও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করে না। আমাদের এলাকায় এডিডি ইন্টারন্যাশনাল ছাড়া আর কোনো সংস্থা কাজ করছে না। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য প্রতিবন্ধীবিষয়ক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার।
নুরুল ইসলাম
বর্তমান সরকার অত্যন্ত প্রতিবন্ধীবান্ধব। আমরা প্রতিবন্ধী সুরক্ষা আইন অনুযায়ী নিয়মিত কমিটির মিটিং করছি। বগুড়ায় চার হাজার প্রতিবন্ধী। আমরা অনেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে স্বনির্ভর করার চেষ্টা করছি।




নজরুল ইসলাম
আমার এলাকায় অনেক সমস্যার মধ্যেও জেলা ও উপজেলা কমিটির মিটিংগুলো নিয়মিত হয়। সেসব মিটিংয়ে অনেক সমস্যা উঠে আসে। সে অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। তবে করোনার কারণে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। করোনাকালে নিয়মিত মিটিং করা যায়নি। পরিস্থিতি এখন অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আমরা আবার নিয়ম অনুযায়ী মিটিং করব।


মো. অলিউল ইসলাম
পটুয়াখালীর গলাচিপায় প্রতিবন্ধিতাবিষয়ক কমিটি অনেক আগে থেকে আছে। এখানে এডিডি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ কাজ করছে। তাদের ভূমিকায় মিটিংগুলোর নিয়মিত হচ্ছে। কারণ, তারা মিটিংয়ের জন্য নিয়মিত তাড়া দেয়। সবাই সচেতন হলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার আদায়ের কমিটিগুলো সচল হবে।


সঞ্চালক

মুস্তাফিজ শফি
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
দৈনিক সমকাল

স্বাগত বক্তব্য

মো. শফিকুল ইসলাম
কান্ট্রি ডিরেক্টর
এডিডি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন

গোলাম ফারুক হামিম
হেড অব প্রোগ্রাম
এডিডি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ

আলোচক

শিবানী ভট্টাচার্য্য
অতিরিক্ত সচিব
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়

আমায়া জাবালা
টিম লিডার-গভর্ন্যান্স
ডেলিগেশন অব ইউরোপীয় ইউনিয়ন টু বাংলাদেশ

খন্দকার জহুরুল আলম
নির্বাহী পরিচালক
সেন্টার ফর সার্ভিসেস অ্যান্ড ইনফরমেশন অন ডিজঅ্যাবিলিটি (সিএসআইডি)

নাসিমা আক্তার
সভাপতি
প্রতিবন্ধী নারীদের জাতীয় পরিষদ (এনসিডিডব্লিউ)

আবু সাঈদ মো. কাওছার রহমান
উপপরিচালক
বগুড়া জেলা সমাজসেবা কার্যালয়

নাজরানা ইয়াসমিন হীরা
প্রোগ্রাম ম্যানেজার
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন

সুশান্ত কুমার দাশ
সভাপতি
জাতীয় তৃণমূল প্রতিবন্ধী সংস্থা (এনজিডিও)

এ এইচ এম নোমান খান
নির্বাহী পরিচালক
সেন্টার ফর ডিজঅ্যাবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্ট (সিডিডি)

আশরাফুন্নাহার মিষ্টি
নির্বাহী পরিচালক
উইমেন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (ডব্লিউডিডিএফ)

শিলা রানী দাস
উপপরিচালক
পটুয়াখালী জেলা সমাজসেবা কার্যালয়

নুরুল ইসলাম
বগুড়া শহর সমাজসেবা কর্মকর্তা

নজরুল ইসলাম
সমাজসেবা কর্মকর্তা, রংপুর

মো. অলিউল ইসলাম
গলাচিপা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা

অনুলিখন

জাহিদুর রহমান
স্টাফ রিপোর্টার
দৈনিক সমকাল

বিষয় : অধিকার প্রতিষ্ঠায় চাই কার্যকর কমিটি ও আইন বাস্তবায়ন

মন্তব্য করুন