গত ২৭ ফেব্রুয়ারি সমকাল ও ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের 'স্ট্রেংদেনিং পলিটিক্যাল ল্যান্ডস্কেপ' প্রকল্পের আয়োজনে 'শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে ছাত্র রাজনীতির ভূমিকা' শীর্ষক অনলাইন গোলটেবিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে অর্থায়ন করে ইউএসএআইডি ও ইউকেএইড। ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে এসে জাতীয় রাজনীতিতে যুক্ত নেতারা আলোচনায় অংশ নেন। কথা বলেন বর্তমান সময়ের প্রধান প্রধান ছাত্র সংগঠনের নেতারা। লেজুড়বৃত্তির কারণে ছাত্র রাজনীতির মান অবনমনের কথা বলেন গণমাধ্যমকর্মীরা। আলোচকরা বলেন, ছাত্ররাজনীতি হোক ছাত্র অধিকারকেন্দ্রিক। শিক্ষার্থীরা অধিকারের আন্দোলনে পাশে থাকলে অতীতের গৌরব ফিরে পাবে ছাত্ররাজনীতি। এজন্য ছাত্র সংগঠনগুলোকে হানাহানি বন্ধ করে পারস্পরিক সহাবস্থানে বিশ্বাসী হতে হবে। ছাত্ররাজনীতিকে কলুষমুক্ত করতে মূল দলগুলোকে ছাত্র সংগঠনকে লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতিকে পারস্পরিক সহনশীল করতে তারা কী করতে চান।
শেখ রোকন

'শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে ছাত্র রাজনীতির ভূমিকা' শীর্ষক আলোচনায় সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি। আমরা খুব আনন্দিত যে, আজকের আলোচনায় প্রায় সব দলের সাবেক ও বর্তমান ছাত্রনেতারা অংশ নিয়েছেন। খুব উপযুক্ত সময়ে আলোচনা হচ্ছে। আমরা দেখছি, নানা আন্দোলন হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতর ও বাইরের নানা ইস্যুতে আন্দোলন হচ্ছে। আমরা জানি, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ সর্বক্ষেত্রে ছাত্র রাজনীতি বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশকে পথ দেখিয়েছে। মূল রাজনীতি ছাত্রনেতাদের সামনে রেখে এগিয়ে গেছে। একুশ শতকে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। আমরা অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের কথা বলছি। ছাত্র রাজনীতি কী ভূমিকা রাখতে পারে, এ বিষয়ে আমরা আলোচনা করব।


মুস্তাফিজ শফি
সমকাল ও ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল এ ধরনের বৈঠক প্রায়ই করে থাকে। সমকাল চায়, রাজনীতি ও রাজনীতিকদের মান উন্নয়ন হোক। তার মাধ্যমে দেশ ও জাতির উন্নতি ঘটুক। ছাত্র রাজনীতির সুবর্ণ অতীত রয়েছে। ভাষা আন্দোলনে ছাত্র রাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে ছাত্রদের এবং ছাত্র রাজনীতির কী ভূমিকা ছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। নব্বইয়ের গণআন্দোলনে আমারও কিঞ্চিৎ অংশগ্রহণ ছিল। আমরা তখন দেখেছি, ছাত্র রাজনীতি কোন জায়গায় গিয়েছিল। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে ছাত্র রাজনীতি কোথায় দাঁড়িয়ে! আমরা চাই, আমাদের ছাত্র রাজনীতি সেই সুবর্ণ অতীতের ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের হীরকরেখা তৈরি করুক।
শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায় হোক ছাত্র রাজনীতির মূল কেন্দ্র। অবশ্যই ছাত্র রাজনীতি থেকে জাতীয় নেতা তৈরি হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যেমন ছাত্রদের অধিকারের কথা বলা হবে, তেমনি জাতীয় প্রয়োজনের কথাও বলা হবে। তরুণ নেতারা বলতে বলতে জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্বের জন্য তৈরি হবে। এভাবেই দেশ এগিয়ে যাবে। আজ বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। শতবর্ষের প্রাক্কালে আমরা থাকব না; আজকের তরুণ নেতৃত্ব থাকবে। তারা বায়ান্ন, একাত্তরের পর আরও হীরকরেখা তৈরি করবেন। আপনারা শুধু লেজুড়বৃত্তি করবেন না। আপনাদের অধিকার আদায়ের বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট করে বলুন। শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করবেন না। আপনারা নতুন কর্মসূচি তৈরি করুন। তাতে সমকাল পাশে থাকবে।
প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্র সংগঠনগুলো সেই জায়গায় নেই। পত্রিকার পাতায় তাদের নিয়ে শুধু নেতিবাচক খবর ছাপা হয়। আমরা সেই জায়গা থেকে বেরোতে চাই। বের হওয়ার কাজ মাঠ পর্যায়ে আপনাদের করতে হবে; ছাত্রনেতাদের করতে হবে। আপনারা ইতিবাচক কাজ করুন, সমকাল সঙ্গে যুক্ত হবে। ছাত্র রাজনীতির বাইরে যারা আছেন, তারাও অভিনন্দিত করবেন। সমকাল ছাত্র সংগঠনের ইতিবাচক খবর ছাপতে আগ্রহী। সমকাল শুধু সংবাদ প্রকাশে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না। গত ১৬ বছরে সমকাল চেয়েছে গণতন্ত্রের উন্নয়ন; একটি মুক্তবুদ্ধি ও বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজ। ছাত্র রাজনীতিকরা চাইলে এবং আগামীতে যথাযথ ভূমিকা পালন করলে আমরা এমন বাংলাদেশ পাব।
অসীম কুমার উকিল
আমাকে কথা বলার সুযোগ দেওয়ায় ধন্যবাদ। ছাত্র আন্দোলনের কর্মী-সংগঠক হিসেবে বলব, ছাত্ররা তাদের দাবি আদায় করে নেবে। একে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ছাত্র রাজনীতির এখনকার সংকট হলো, বর্তমান পরিস্থিতিতে ছাত্র রাজনীতিকে সংজ্ঞায়িত করা। ষাটের দশকের নেতারা মনে করেন, তাদের সময়ের মতো ছাত্র রাজনীতি হওয়া উচিত। আশির দশকের নেতারা মনে করেন, তাদের সময়ের মতো রাজনীতি হওয়া দরকার। কিন্তু আসল প্রয়োজন হলো, বর্তমান সময় ও বাস্তবতা অনুযায়ী রাজনীতি হওয়া। এর ব্যত্যয় থাকার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্র রাজনীতি দানা বেঁধে ওঠেনি। কোটাবিরোধী আন্দোলন সফল হয়েছিল। কারণ ছাত্ররা তাদের নিজের দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছিল। এ ছাড়া আর কোনো বিষয়ে তারা আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। ছাত্রদের নিজেদের দাবি নিয়ে মাঠে থাকতে হবে। তাহলে দাবি পূরণ হবে। ভূমিকা রাখতে পারবে। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাবে।
ছাত্রজীবনে নব্বইয়ের দশকে আমরা ১০ দফা নিয়ে আন্দোলন করেছিলাম। সব দফা যে পূরণ হয়েছে, তা নয়। কিছু দাবি পূরণ হয়েছে। চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বেড়েছে। সেশনজট কমেছে। হল সংকট কিছুটা হলেও দূর হয়েছে।
ছাত্র রাজনীতিকে মূল পথে রাখতে এখানে মূল দলেরও ভূমিকা রয়েছে। তারা ছাত্র রাজনীতিকে কীভাবে দেখতে চায়; কীভাবে গড়তে চায়, তা দেখার রয়েছে। এ ক্ষেত্রে মূল দলগুলোকেও আন্তরিক হতে হবে।
আরেকটি বিষয় হলো, ক্যাম্পাস পরিবারেরও ভূমিকা রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবে! কিন্তু ছাত্রদের হল খুলবে না! এভাবে চলতে পারে না। শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতি দুই-ই একসঙ্গে চলতে হবে। শিক্ষক রাজনীতিও ছাত্র রাজনীতির জন্য একটি 'ফ্যাক্টর'। একজন হল প্রভোস্টের অনেক দায়িত্ব। ছাত্রদের দেখভালের দায়িত্ব তাদের। তারা সেভাবে ঝুঁকি নিতে চান না। এ বিষয়টিও দেখতে হবে।
শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী
বাংলাদেশে স্বাভাবিক রাজনীতি নেই। একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি চলছে। ছাত্র রাজনীতির যে হাল, তা স্বাভাবিকতার মধ্যে পড়ে না। বিশ্ববিদ্যালয়, হল দখল করে রাখা হয়েছে। কোটাবিরোধী ও নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন করা হয়েছে। ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদের ভোটের অধিকার হরণ করা হয়েছে জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় নির্বাচনগুলোর মতো। রাতের বেলায় ভোট হয়ে যাচ্ছে। এতে ছাত্রদের ব্যবহার করা হচ্ছে, যা ছাত্র রাজনীতির মানকেই ধ্বংস করছে।
১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দুই দফা তফসিল ঘোষণা করেও সে সময়ে নির্বাচন করা যায়নি বিরোধী সংগঠনগুলোর কারণে। আজ যারা মানুষের ভোটের অধিকার হরণ করেছে, তারাই তখন সন্ত্রাস করে নির্বাচন বানচাল করে দিয়েছিল। ছাত্রদের সম্পৃক্ত করে রাজনীতি করার সুযোগ তারা নিজেরা নেয়নি, অন্যদেরও দেয়নি।
বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে জিম্মি করে রাখা হয়েছে, যেন ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে না পারে; আন্দোলন করতে না পারে। স্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে ছাত্ররা একত্রিত হয়ে তাদের অধিকার আদায়ে আন্দোলন করতে পারে, যা দেশকে পথ দেখাবে। দেশের বর্তমান যে রুদ্ধ অবস্থা, তা থেকে উত্তরণ ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে মুক্ত ছাত্র রাজনীতি খুবই জরুরি।
ডানা এল ওল্ডস
বিশ্বজুড়েই রাজনৈতিক আন্দোলনে ছাত্রদের শক্তিশালী, গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশেও তার ব্যতিক্রম নয়। ভাষা আন্দোলনে এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে ছাত্রদের গুরুত্ব ও বিস্তারিত ভূমিকার কথা সবারই জানা। বাংলাদেশে ভবিষ্যতের রাজনীতিতে ছাত্রদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মনে করি, দেশের ভালোর জন্য ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত। রাজনীতিবিষয়ক জ্ঞানের সৌকর্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে স্ট্রেংদেনিং পলিটিক্যাল ল্যান্ডস্কেপ (এসপিএল) প্রকল্পের আওতায় ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল শিগগিরই একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে যাচ্ছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক আন্দোলনের ভবিষ্যৎ এই ছাত্ররাই। দেশের জনগোষ্ঠীর বড় অংশই শিক্ষার্থী। ছাত্ররা রাজনীতিতে কীভাবে গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে পারে, সে ব্যাপারে ইউএসএআইডি ও ইউকেএইড সহায়তা করতে চায়। সবাইকে এখানে পেয়ে আমি খুবই খুশি। শিক্ষার্থী এবং রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ভবিষ্যতের অগ্রাধিকারভিত্তিক পরিকল্পনায় ইতিবাচক আলোচনাকে এসপিএল সমর্থন করে। তরুণ রাজনীতিবিদরা আগামীতেও রাজনীতিতে ভ্যানগার্ডের ভূমিকায় থাকবেন। আপনারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করছেন। ইতিবাচক প্রতিযোগিতা, সম্পৃক্ততা, সহনশীলতা, সহাবস্থানের চর্চার মাধ্যমে মূল রাজনীতিকে সমৃদ্ধ করার সুযোগ করে দেওয়া এবং এই চর্চাগুলো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
নূর ই জান্নাত মুন
বাংলাদেশ ও বিশ্ব ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে তরুণ সমাজ ও ছাত্রদের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। রাজনীতিতে তরুণদের ভূমিকার তাৎপর্য বিবেচনা করে ইউএসএআইডি ও ইউকেএইডের অর্থায়নে পরিচালিত স্ট্রেংদেনিং পলিটিক্যাল ল্যান্ডস্কেপ (এসপিএল) প্রকল্পের আওতায় তরুণ নেতাদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য ইয়াং লিডারস ফেলোশিপ প্রোগ্রাম ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে। এ কাজের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ৩৭৪ জন তরুণ নেতা নেতৃত্ববিষয়ক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং প্রশিক্ষণ শেষে তারা নিজ নিজ দল ও জেলাতে ইতিবাচক গণতান্ত্রিক চর্চা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে পারস্পরিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের তরুণদের একটি বড় অংশের মধ্যে রাজনীতিতে সরাসরি অংশগ্রহণে এক প্রকার উদাসীনতা বা অনাগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু তরুণদের এমন উদাসীনতা দেশ ও সমাজের অগ্রযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। রাজনীতিতে মেধাবী তরুণ ও ছাত্রদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে তাতে দেশ বিভিন্নভাবে উপকৃত হবে। যেমন আমাদের জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ার গুণগত পরিবর্তন আনতে; বর্তমান শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সময়োপযোগী কৌশল তৈরিতে সাহায্য করবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যতের যোগ্য নেতা তৈরি করবে।
ঐতিহাসিকভাবেও আমরা দেখেছি, তরুণদের মাঝে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে ছাত্র সংগঠনগুলোই বড় ভূমিকা রেখেছে এবং সেই চেষ্টার ফসল হিসেবেই আমরা পেয়েছি বাংলায় কথা বলা ও স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের নাগরিক হওয়ার অধিকার।
তবে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে ২০২১ সালে এসে এই সময়ের তরুণ ও ছাত্রদের স্বপ্ন ও চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই অন্য প্রজন্ম থেকে ভিন্ন। ছাত্র সংগঠনগুলোর উচিত হবে, এই পরিবর্তিত স্বপ্ন ও প্রত্যাশার জায়গাগুলো চিহ্নিত করা ও সাধারণ ছাত্রদের অধিকার নিশ্চিতে আরও জোরদার ভূমিকা রাখা; এবং এ ধরনের উদ্যোগ বর্তমানে তরুণদের একটি বড় অংশের মাঝে রাজনীতিতে সরাসরি অংশ নেওয়ার ব্যাপারে যে উদাসীনতা বা অনাগ্রহ আছে, তা অনেকাংশে কমিয়ে আনবে।
এই গোলটেবিল আলোচনার উদ্দেশ্য হচ্ছে, ছাত্র সংগঠনগুলোকে উদ্বুদ্ধ করা যেন তরুণ ও ছাত্রদের অধিকারকেন্দ্রিক কাজগুলোকে ছাত্র রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা হয় এবং সাধারণ তরুণদের রাজনীতিতে আরও সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয়। এ ছাড়াও বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতিতে তরুণদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে এসপিএল প্রজেক্ট নতুন একটি উদ্যোগ হাতে নিতে যাচ্ছে, যার মধ্য দিয়ে প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের মাধ্যমে মূলধারার ছাত্র সংগঠনগুলোকে নতুন সদস্য সংগ্রহে উদ্বুদ্ধ এবং এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সহায়তা প্রদান করা হবে। পাশাপাশি দেশের মেধাবী তরুণদের রাজনীতির জ্ঞান অর্জনের সুযোগ করে দেওয়া হবে। এ লক্ষ্যে এসপিএল প্রকল্প পলিটিকস ম্যাটারস শিরোনামে একটি ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম খুব শিগগিরই উদ্বোধন করতে যাচ্ছে। ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল আশা করে, এ উদ্যোগগুলো বাংলাদেশের তরুণদের মাঝে রাজনীতি বিষয়ে আরও আগ্রহ বাড়াতে সাহায্য করবে।
রাশেদ মেহেদী
ছাত্র সংগঠনগুলোতে গণতান্ত্রিক চর্চায় ঘাটতি রয়েছে। বায়ান্ন থেকে একাত্তর পর্যন্ত ছাত্রদের যত আন্দোলন হয়েছে, তাদের দমনে পাকিস্তানের সামরিক জান্তারা গুন্ডাতন্ত্র তৈরি করেছিল। তা বাংলাদেশেও বদ্ধ হয়নি। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর সামরিক সরকারের উত্থানে আবার ছাত্রদের হাতে অস্ত্র উঠে আসে। শিক্ষার্থীদের নিয়ে 'হিজবুল বাহার' ভ্রমণের নামে সরাসরি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সামরিক জান্তা আইয়ুবশাহির মতো গুন্ডাবাহিনী তৈরি করা হয়। তা করেছিলেন সেই সময়ের সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান। পরবর্তী সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও একই পথে হেঁটেছেন। তিনি আরেকটি ফ্যাসিবাদী ছাত্র সংগঠন তৈরি করেছিলেন। ১৯৯১-এর পট পরিবর্তনে যে নতুন পথচলা শুরু হয়, তখন নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। ১৯৯২-৯৩ সালে যারা রাষ্ট্র্রক্ষমতায় ছিলেন, তাদের ছাত্র সংগঠন অন্যদের ক্যাম্পাস থেকে বের করে দিয়েছিল। সে কারণেই সংঘর্ষ হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আবার যারা ক্ষমতায় এসেছেন, সেই দলের ছাত্র সংগঠনেরও একই ধরনের সন্ত্রাসী চরিত্র দেখা গেছে। রাজনীতি ষাটের দশকের সেই গৌরবময় ঐতিহ্য হারিয়েছে। পেশাজীবী আন্দোলন, শ্রমিক আন্দোলন- কিছুই জাতীয় রাজনীতির বাইরে নয়। ছাত্র রাজনীতিও এর ব্যতিক্রম নয়। রাজনীতির অর্থ যদি হয় ক্যাডার বাহিনী তৈরি, তাহলে ছাত্র রাজনীতি কখনোই পরিশুদ্ধ হবে না। ছাত্র রাজনীতিকে লেজুড়বৃত্তি ছাড়তে হবে।
সাইফ মাহমুদ জুয়েল
ছাত্র রাজনীতির এখন পড়ন্ত বেলা। অথচ ছাত্র রাজনীতির সমৃদ্ধি ছিল। কিছু ছাত্র সংগঠন যেমন লেজুড়বৃত্তিক, আবার কিছু আদর্শবাদী সংগঠনও রয়েছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দেশমুক্তির আন্দোলন। নিঃসন্দেহে ছাত্র সংগঠনের মূল দায়িত্ব ছাত্রদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া। কিন্তু মূল সমস্যা হলো, সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করা হয়। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় একটি সংগঠনকে ক্যাম্পাসে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাই বাকিরা অসহায় হয়ে পড়ে। ছাত্রদল সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে পাশে দাঁড়াতে পারে না। কারণ, ছাত্রদল যোগ দিলে তাদের পুলিশ গুলি করবে, গুম করবে। এ কারণে ছাত্রদলকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক আন্দোলনে শুধু নৈতিক সমর্থন দিতে হয়।


সুমাইয়া সেতু
ছাত্র ইউনিয়ন কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করে না। ছাত্র ইউনিয়ন একটি ছাত্র-গণসংগঠন। ক্ষমতাসীন যে দলগুলো থাকে, তাদের ছাত্র সংগঠনগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ে দখলের রাজনীতি করতে দেখি। তাতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ব্যাহত হয়। আজকাল ছাত্র রাজনীতির সংজ্ঞা দাঁড়িয়েছে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, হল দখল ও দুর্বৃত্তায়ন। আগে বুঝতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক ছাত্র রাজনীতি করার সুযোগ রয়েছে কিনা। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররা তাদের অধিকারের কথা বলায় বহিস্কার করা হয়েছে। গোপালগঞ্জে ছাত্ররা কৃষকের ধানের দাম নিয়ে দাবি তোলায় তাদের বহিস্কার করা হয়েছে। বর্তমান যে প্রশাসন, তারা ছাত্র রাজনীতিবান্ধব নয়।
জিডিটাল নিরাপত্তা আইনের বিরুদ্ধে শাহবাগে ছাত্রদের আন্দোলনে হামলা হয়েছে; সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ৯টি মামলা করা হয়েছে। ছাত্র রাজনীতির বর্তমান চিত্রের কারণে আদর্শবাদী সংগঠনগুলোর প্রতিও সাধারণ ছাত্ররা আকৃষ্ট হচ্ছে না। তারা ছাত্র রাজনীতি বলতেই নেতিবাচক বিষয়কে বুঝছে। তারা ভয় পাচ্ছে। যৌক্তিক আন্দোলনেও হামলা ও বাধা দেওয়া হচ্ছে। তাই পরিবারও সন্তানদের ছাত্র রাজনীতিতে আসতে দিতে রাজি নয়।
ইব্রাহিম খান জুয়েল
বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলো দমন-পীড়নের শিকার। এরশাদের শাসনামলে ডাকসুসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচন হয়েছে। এর পর আর হয়নি। ২০১৯ সালে ডাকসুতে নির্বাচন হলেও তা প্রশ্নমুক্ত নয়। ক্যাম্পাসভিত্তিক রাজনীতি করতে পারছি না। অন্যান্য সংগঠন বাধা দিচ্ছে।





অরনী সেমন্তী খান
বিরোধী বা সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন; কেউ সাধারণ শিক্ষার্থীদের কথা বলছে না। সাধারণ শিক্ষার্থীরা পেছনের কাতারে পড়ে রয়েছে। ছাত্র সংগঠনগুলো ভূমিকা রাখতে না পারার বড় সমস্য মূল দলের লেজুড়বৃত্তি। জাহাঙ্গীরনগরের বিশেষ দলের নেতারা সংঘর্ষের ঘটনায় দায়মুক্তি পেয়ে গেছে। এর কারণ অদৃশ্য শক্তি। মূল নেতাদের হাতে ছাত্রনেতারা বন্দি। মূল নেতারা ছাত্রদের দিয়ে রাতভর গেস্টরুম করান, দিনে মধুর ক্যান্টিনে হাততালি দেওয়ান। রাজনীতি দুই ধরনের- অধিকার আদায় ও তোষামোদির। এখন ছাত্র রাজনীতির নামে চলছে তোষামোদির রাজনীতি। সরকারদলীয় বা বিরোধীদলীয় হোক; ছাত্র সংগঠনগুলোকে মূল দলের লেজুড়বৃত্তি ছাড়তে হবে। ছাত্র রাজনীতির নিজস্ব অর্থায়ন থাকতে হবে। মূল দলের কাছ থেকে টাকা এলে ছাত্রনেতারা দায়বদ্ধতায় চলে আসে। সেই সুযোগে মূল দলের নেতারা ছাত্রদের দিয়ে মিছিল-মিটিং করাবেনই।
মূল দলের সঙ্গে লেজুড়বৃত্তি নয়; আদর্শভিত্তিক সংযোগ থাকতে পারে। লেজুড়বৃত্তি যতই দৃঢ় হবে, মেধাবীরা রাজনীতি থেকে ততই দূরে চলে যাবে। নিজে ভালো থাকতে দেশ ছেড়ে পালাবে।
সানজিদা আমির ইনিসি
শেষ জাকসু নির্বাচন হয়েছে ১৯৯২ সালে। এর পর অনেক আশ্বাস দেওয়া হলেও নির্বাচন হয়নি। সংসদ না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে ছাত্র প্রতিনিধিত্ব নেই। ছাত্রদের অধিকারের কথা বলার কেউ নেই। উপাচার্য ও সংশ্নিষ্টরা নির্বাচন দিতে ভয় পান। তারা ঝুঁকি নিতে চান না। সরকারও চায় না নির্বাচন হোক। ক্যাম্পাসে সক্রিয় ছাত্র সংগঠনও নির্বাচন বিষয়ে একমত হতে পারে না। ছাত্র প্রতিনিধি না থাকায় শিক্ষার্থীদের দাবি পৌঁছায় না।
সম্প্রতি গ্রামবাসীর সঙ্গে যে সংঘর্ষ হয়েছে, তা ছাত্র সংগঠনকেন্দ্রিক। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম মারফত জানা গেছে, একটি ছাত্র সংগঠনের কারণে সংঘর্ষ হয়েছে। এ জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীদেরই ভুগতে হয়েছে। তারা আবাসিক হলে থাকতে পারছে না। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের মেসেও যেতে পারছে না।


নুসরাত জাহান পুষ্পা
আবাসিক হল খুলে দেওয়ার মতো শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক আন্দোলনে ছাত্র সংগঠনকে পাশে পাচ্ছি না। ছাত্র সংগঠনগুলো বিভিন্ন দল ও উপদলে বিভক্ত। তারা ব্যক্তিস্বার্থের রাজনীতি করছে। এ কারণে তাদের সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে পাশে পাওয়া যাচ্ছে না। বরং তাদের অভ্যন্তরীণ দলাদলির কারণে সংঘর্ষে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ভুগছে। চাকসু নেই ২৮ বছর ধরে। নির্বাচন হচ্ছে না। ছাত্রদের হয়ে কথা বলার কেউ নেই। শিক্ষার্থীদের সমস্যা কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরার কেউ নেই। সেশনজট, আবাসিক হলে সিটের সমস্যা সমাধানে ছাত্র সংগঠনকে খুব প্রয়োজন হলেও পাশে পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যক্তিস্বার্থ বাদ দিয়ে তাদের এক হওয়া উচিত।



সঞ্চালক
শেখ রোকন
সহকারী সম্পাদক
সমকাল

স্বাগত বক্তা
মুস্তাফিজ শফি
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
সমকাল

আলোচকবৃন্দ
অসীম কুমার উকিল
সংস্কৃৃতিবিষয়ক সম্পাদক
আওয়ামী লীগ

শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী
প্রচার সম্পাদক
বিএনপি

ডানা এল ওল্ডস
চিফ অব পার্টি
ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল

নূর ই জান্নাত মুন
প্রোগ্রাম অফিসার
ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল

রাশেদ মেহেদী
বিশেষ প্রতিনিধি
সমকাল

সাইফ মাহমুদ জুয়েল
সাংগঠনিক সম্পাদক
ছাত্রদল

সুমাইয়া সেতু
সাংগঠনিক সম্পাদক
ছাত্র ইউনিয়ন

ইব্রাহিম খান জুয়েল
সভাপতি
জাতীয় ছাত্র সমাজ

অরনী সেমন্তী খান
তরুণ অধিকার কর্মী

সানজিদা আমির ইনিসি
শিক্ষার্থী, নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

নুসরাত জাহান পুষ্পা
শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ স্টাডিজ বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

অনুলিখন
রাজীব আহাম্মদ
স্টাফ রিপোর্টার
সমকাল

বিষয় : ছাত্র রাজনীতি হোক অধিকারকেন্দ্রিক

মন্তব্য করুন