দ্বিতীয় পর্বের উদ্বোধন

পণ্য উৎপাদন, বিপণন ও আমদানি পর্যায়ে নকল হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ার সুপারিশ করেছেন সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তা, প্রতিরোধে সম্পৃক্ত সরকারি-বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী ও কর্মকর্তারা। গত ৩ এপ্রিল ২০২১ দৈনিক সমকালের নকল পণ্যবিরোধী প্রচারাভিযানের দ্বিতীয় পর্বের উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত অনলাইন আলোচনায় অংশ নিয়ে তারা এসব কথা বলেন। গত বছরের ১২ মার্চ 'নকল পণ্য কিনবো না, নকল পণ্য বেচবো না' শিরোনামে সমকাল এ প্রচারাভিযান শুরু করে। সমকালের এ উদ্যোগের সহযোগী অংশীদার বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব), কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব), ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) ও জেসিআই বাংলাদেশ। টেলিভিশন পার্টনার চ্যানেল টোয়েন্টিফোর ও রেডিও পার্টনার ঢাকা এফএম।
ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী
নকল পণ্যের বিরুদ্ধে দল-মত নির্বিশেষে ঐকমত্য রয়েছে। এ ব্যাপারে সবার প্রতিশ্রুতি ও আন্তরিকতা কাজ করছে। সবাই মিলে কাজ করলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন হবে। যদিও বিভিন্ন সংস্থা নকল পণ্য প্রতিরোধে কাজ করছে। এরপরও এর বিক্রি ঠেকানো যাচ্ছে না। এ প্রবণতা সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থা থেকে বের হতে সামাজিক সচেতনতার জায়গায় শক্তভাবে দাঁড়াতে হবে। সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে বিএসটিআই, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, ক্যাব, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, র‌্যাবসহ যেসব সংস্থা নকল পণ্যবিরোধী কার্যক্রম করছে, তাদের কাজ গুরুত্বের সঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। সরকারি সংস্থা ও ব্যবসায়ী মহলের মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টি করতে হবে।
নকল পণ্যের কারণে সরকারের রাজস্ব হারাতে হয়। এ আর্থিক ঝুঁকির চেয়ে বড় বিষয় স্বাস্থ্যের ক্ষতি। এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। সামগ্রিক বিষয়টি শুধু নেতিবাচক প্রভাবেরই জন্ম দেয়। এর কোনো ভালো দিক বা ইতিবাচক বিষয় নেই। নকল প্রতিরোধে শুধু উৎপাদক কোম্পানি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রতিরোধ অভিযানের পাশাপাশি কমিউনিটিকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সাধারণ মানুষের কাছে নকলবিরোধী আন্দোলন পৌঁছে দিতে হবে। যারা এর ক্ষতির শিকার হচ্ছেন, তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। তাহলে সামাজিক আন্দোলন অনেকটা সফল হবে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে আরও জোরালো ভূমিকা নিতে হবে। এ ছাড়া শীর্ষস্থানীয় উৎপাদক কোম্পানিগুলোর এমন কোনো অভিনব সিল, চিহ্ন বা বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করতে হবে, যা দেখে ক্রেতা সহজেই আসল পণ্য চিনতে পারে। বার কোড বা কিউআর কোডসহ যে কোনো ডিজিটাল কৌশল গ্রহণ করা যেতে পারে। ভোক্তাদের মনে রাখতে হবে- মানসম্পন্ন পণ্যের জন্য সঠিক দাম দিতে হবে। কম দামে কিনতে গিয়ে নকল পণ্য কিনছেন কিনা, সে বিষয়ে সচেতন হতে হবে। সস্তা পণ্য কিনলে ভ্রান্তির শিকার হওয়ার আশঙ্কা বেশি। আরেকটি বিষয় মনে রাখতে হবে, নকল পণ্য দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করে। আমরা ক্রমাগত বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করছি। নকল পণ্যের বাজার বৈদেশিক বিনিয়োগকে অনুৎসাহিত করবে।
এ আলোচনার সুপারিশের ভিত্তিতে একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে তার বাস্তবায়ন করতে হবে। সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনার ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হবে। সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারেন। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন
করোনার সময়ে সমকাল দ্বিতীয়বারের মতো নকলবিরোধী প্রচারাভিযানের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা অত্যন্ত জরুরি ছিল। সামনে রমজান মাস। সারাদেশে মহামারি চলছে। এ সময়ে খাদ্যসামগ্রী থেকে শুরু করে অনেক নকল পণ্য তৈরি হচ্ছে। রাস্তা থেকে শপিংমল পর্যন্ত নকল পণ্য বিক্রি হচ্ছে। নকলের দৌরাত্ম্য কমানোর বিকল্প নেই। বিভিন্ন সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান পরিচালনা করছে। এর পাশাপাশি জনসচেতনতাও দরকার। সবাই সচেতন হলে নকল প্রতিরোধ সম্ভব। সচেতনতা বাড়াতে বড় ক্যাম্পেইন দরকার হবে। খাদ্যদ্রব্য নকলের বিরুদ্ধে বেশি করে নজর নিতে হবে। অবশ্য রাতারাতি নকল বন্ধ করা সম্ভব হবে না। আইন প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে। রমজানে ফুটপাতসহ অন্যান্য জায়গায় যাতে মানহীন ও ভেজাল খাদ্য বেচাকেনা না হয়, সে জন্য শিল্প মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নেবে।
মুস্তাফিজ শফি
করোনায় জীবন থেমে থাকেনি। নকলও থেমে থাকেনি। আমরা এমন এক বাস্তবতায় আছি, যেখানে করোনার সুরক্ষা সামগ্রীও নকল হচ্ছে। আমরা মনে করি, গত এক বছরে নকল পণ্য প্রতিরোধে সমকালের উদ্যোগে নেওয়া বিভিন্ন কার্যক্রমে মানুষের মধ্যে কিছুটা হলেও সচেতনতা এসেছে। তবে এখনও অনেক পথ বাকি আছে। এ জন্য দ্বিতীয় পর্বে নকলবিরোধী প্রচারাভিযান শুরু করতে যাচ্ছি। এখনও চারদিকে নকল ও অবৈধ পণ্যের ছড়াছড়ি। ফুটপাত থেকে শুরু করে বড় শপিংমলে সেগুলো বিক্রি হচ্ছে। এমন কায়দায় নকল পণ্য তৈরি করা হচ্ছে যে, ক্রেতার পক্ষে ধরা কঠিন। নকল পণ্যের কারণে সরকার প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রকৃত ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে, স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যেও পড়ছেন ক্রেতারা। পরিবেশেরও মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। যেসব পণ্য বেশি নকল হয়, তার মধ্যে অন্যতম হলো প্রসাধনী। জীবন রক্ষাকারী ওষুধও নকল হচ্ছে। মোবাইল হ্যান্ডসেট, অন্যান্য ইলেকট্রনিকস পণ্য ও বৈদ্যুতিক তারের মতো পণ্য হরহামেশাই নকল হচ্ছে। নকল হচ্ছে সরকারের রেভিনিউ স্ট্যাম্প। সিগারেটের ট্যাক্স স্ট্যাম্প ও ব্যান্ডরোল নকল এবং পুনর্ব্যবহার করে সরকারকে বড় অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। নকল ঠেকানো না গেলে দেশের অর্থনীতির বড় ক্ষতি হবে। তেমনি জনস্বাস্থ্যও ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। নকল পণ্য প্রতিরোধ কার্যক্রমকে সরকারের অগ্রাধিকার দিতে হবে। আইন ও বিচারের মাধ্যমে দোষীদের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করাও জরুরি। করোনার কারণে আমাদের কর্মসূচি কিছুটা বাধাগ্রস্ত হলেও ফেসবুক, ইউটিউবসহ অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে সমকাল নকল পণ্যের বিরুদ্ধে জোরদার প্রচার চালাবে।
ড. বেনজীর আহমেদ
নকলের বিরুদ্ধে সবাইকে সচেতন করে তুলতে হবে। হৃদরোগসহ নানা ধরনের অসুস্থতার বড় কারণ খাদ্যে ভেজাল ও নকল। পণ্য ও খাদ্যে নকল বা ভেজাল প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করে যাচ্ছে। এর কিছুটা ইতিবাচক প্রভাবও আছে। এখন সাধারণত ফল পচে যায় বা মাছে মাছি দেখা যায়। এর মানে খাদ্যে ভেজাল কমছে। তবে এতে আত্মতৃপ্তির কিছু নেই। বাজারে এখনও নকল আছে এবং তা নির্মূলে কাজ করে যেতে হবে। একই সঙ্গে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সতর্ক হতে হবে। নকলের বিরুদ্ধে সমকালের প্রচারাভিযান সময়োপযোগী উদ্যোগ।

মো. আলমগীর হোসেন
নকলের বিস্তৃতি অনেক ক্ষেত্রে। সার, বীজ, খাদ্য, সফটওয়্যার, দলিল, টাকা সবই নকল হচ্ছে- যা সত্যিই আতঙ্কজনক। এতে শুধু রাজস্ব হারানো ও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে তা নয়, জাতীয়ভাবে আমাদের ব্র্যান্ডিং নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। জাতির সার্বিক সুনাম ও সুখ্যাতির ক্ষতি হচ্ছে। নকলের ব্যাপ্তি যেমন বড়, ক্ষতির দিকটাও বড়। নকল প্রতিরোধে শুধু সচেতনতা নয়, আরও তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ দরকার। তা না হলে মানুষের স্বাস্থ্য অনেক বড় ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। নকল প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলাসহ অন্যান্য সংস্থার অভিযান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে দায়িত্ব নিয়ে প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে। ভোক্তাদের অজ্ঞতা দূর করতে হবে। সস্তা পণ্য কিনে অতি লাভের চিন্তা করলে হবে না। মানসম্মত পণ্য কিনতে যৌক্তিক দাম দিতে হবে। অভিযানে এক জায়গায় নকল প্রতিষ্ঠান ধরা পড়লে তারা অবস্থান পরিবর্তন করে অন্যত্র আবার শুরু করে দেয়। এটি চোর-পুলিশ খেলার মতো। সিগারেটের নকল ব্যান্ডরোল বন্ধে এনবিআরের উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। নকল বন্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। নকলের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রচারাভিযানের সঙ্গে থাকবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। চেম্বারগুলোর এ ক্ষেত্রে নৈতিক দায়িত্ব আছে। বাণিজ্য সংগঠনগুলো আলাদা একটি টাস্কফোর্স করতে পারে। এর মাধ্যমে কারা নকল পণ্য তৈরি করছে, তাদের চিহ্নিত করতে পারে।
আবদুল কাইয়ুম সরকার
দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। এখন দরকার গুণগত মানসম্পন্ন খাদ্য। ২০১৩ সালে নিরাপদ খাদ্য আইন প্রণীত হয় এবং ২০১৫ সালে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠনের পর থেকে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে কাজ করছে। বাজার থেকে নমুনা পণ্য সংগ্রহ করে ক্ষতিকর উপাদান চিহ্নিত করে খাদ্য প্রত্যাহারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। নিয়মিত অভিযান জোরদার করা হচ্ছে এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে। এখন সারাদেশে জেলা ও উপজেলায় কার্যক্রম চলমান রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললে এ বিষয়ে শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো হবে। ক্রেতাদের সচেতন করার মাধ্যমে নকল প্রতিরোধের বিকল্প নেই।
কৃষ্ণপদ রায়
এমন উদ্যোগের সঙ্গে সব সময় আছে পুলিশ। এ ধরনের প্রচারাভিযান অগ্রাধিকার পাওয়ার দাবি রাখে। পুলিশের কাজের অগ্রাধিকার বিভিন্ন সময় পরিবর্তন হয়। তারপরও নকল প্রতিরোধ সব সময়ই অগ্রাধিকারে আছে ও থাকবে। কিছুদিন আগে দেখা গেল, নকল মদ পান করে কয়েকজন তরুণ মারা গেছেন। এ থেকে অনুধাবন করা যায়, নকলের প্রবণতা ভয়াবহ অবস্থায় গেছে। এখান থেকে দৃষ্টি সরানোর সুযোগ নেই। নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় নকলের কারখানা বেশি পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিরোধে রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতারা সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে এলে শুধু ঢাকা নয়, সারাদেশ থেকে নকল পণ্যের কারখানা নির্মূল করা যাবে।

শেহ্‌জাদ মুনীম
দেশে রাজস্ববহির্ভূত সিগারেট বাজারজাত হচ্ছে প্রায় ৭ শতাংশ। বিশ্বের ১৮০টি দেশে বিএটির ব্যবসা আছে। এর মধ্যে শীর্ষ ১০ দেশে অবৈধ সিগারেট বিক্রি ১০ শতাংশের নিচে রাখা সম্ভব হয়েছে। এ হার অস্ট্রেলিয়ায় ২৫ শতাংশ। বাংলাদেশে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া নকল সিগারেট বিক্রি কমানো সম্ভব হয়েছে এনবিআর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্যোগের ফলে। তবে ২০১৮ সালে সিগারেটের দাম অনেক বেশি বাড়ানো হয়েছে। ফলে ওই বছর রাজস্ব কমেছে। এ জন্য মূল্যস্ম্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম বাড়াতে হবে। কারণ, সিগারেটের দাম একসঙ্গে অনেক বাড়ালে ক্রেতারা রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া নকল বা নিম্নমানের সিগারেটে চলে যাবে। সস্তা সিগারেটের চাহিদা বাড়লে কোথাও না কোথাও থেকে সরবরাহ চলে আসবে। বর্তমানে যে মূসক ও সম্পূরক শুল্ক্ক আইন-২০১২ রয়েছে, সেই আইনে ট্যাক্স স্ট্যাম্প/ব্যান্ডরোল নকল করার জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা প্রয়োজন। শাস্তি কঠোর হলেই অপরাধ কমে আসবে। সেই সঙ্গে দরকার মাঠপর্যায়ে ক্রমাগত অভিযান। আরেকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। সেটি হলো- সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়। নকল প্রতিরোধে সংশ্নিষ্ট প্রতিটি বিভাগকেই একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি।
রিজওয়ান রাহমান
এখানে দেশের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি ইউনিলিভার, ম্যারিকো ও বিএটির প্রতিনিধিরা আছেন। তাদের অনেক ব্র্যান্ড রয়েছে। কোম্পানিগুলো সরকারকে বড় অঙ্কের রাজস্ব দেয়। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী তাদের ব্যক্তিগত লাভের জন্য এসব ব্র্যান্ডের পণ্য নকল করে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বড় কোম্পানিগুলো ব্যবসা করতে কিছুটা নিরুৎসাহিত হয়। কারণ, সরকারকে রাজস্ব দিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে তারা ব্র্যান্ড তৈরি করছেন। তাদের পণ্য নকল করে বাজারে ছাড়া হচ্ছে। ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের সুযোগ নিয়েও সারাদেশে নকল পণ্য বিক্রি হচ্ছে। নকলের অভিযোগ রয়েছে- এমন ব্যবসায়ীরাও বাণিজ্য সংগঠনে এসে জানান, পুলিশ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড তাদের হয়রানি করে। কিন্তু কখনোই বলে না, কী কারণে হয়রানি করছে, গভীর রাতে কারখানায় কেন অভিযান চালায় এবং সেখানে কী পাওয়া যায়। নকলের কারণে সব ধরনের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নকল পণ্য প্রতিরোধে ব্যবসায়ী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, মান নিয়ন্ত্রক সংস্থাসহ সংশ্নিষ্ট সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।
রাশেদুল কাইয়ুম
ইউনিলিভার অনেক প্রসাধনী তৈরি করে। এসব প্রসাধনীর জনপ্রিয়তা থাকায় নকল হচ্ছে। নকল প্রসাধনী ব্যবহারে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে ক্যান্সারসহ বহুবিধ রোগ এ কারণে হচ্ছে। হরলিকস ইউনিলিভারের পণ্য। এটি যখন নকল হয়, তখন শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। ইউনিলিভার বাংলাদেশের ৪০ শতাংশ মালিকানা সরকারের। বড় ব্র্যান্ডের পণ্য নকল হওয়ায় মানুষ আস্থা হারাচ্ছে। সরকার মুনাফাও কম পাচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা যথাযথ মুনাফা পাচ্ছেন না। প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ড নকল হলে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হবেন দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা। কারণ, কোটি কোটি টাকা খরচ করে একটি ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা হয়। একজন ক্রেতা যখন একটি নকল পণ্য ব্যবহার করে খারাপ ধারণা পান, তখন ওই ব্র্যান্ড থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। ফলে ওই ব্র্যান্ডের আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। নকল পণ্যের মূল কারণ অতিমুনাফা। আরেকটি কারণ, নতুন প্রযুক্তির কারণে সহজেই প্যাকেট নকল করতে পারছে। উল্লেখযোগ্য শাস্তি না হওয়ায় ধরা পড়ার পরও একই ব্যক্তি বারবার নকল করছেন। করোনাকালীন গত এক বছরে ইউনিলিভার ব্র্যান্ডের দেড়শ কোটি টাকার নকল পণ্য ধরা পড়েছে। নকল যারা করেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
ক্রিস্টাবেল রান্ডলফ
বিএসটিআই, পুলিশ, র‌্যাবসহ সংশ্নিষ্ট সব সংস্থা করোনাকালেও নকল প্রতিরোধে ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। শুধু দেশেই যে নকল পণ্য তৈরি হয়, এমন নয়। নকল পণ্য ও তৈরির নানা সামগ্রী বিভিন্ন দেশ থেকে প্রচুর আমদানি হচ্ছে। এ জন্য সীমান্তে এবং কাস্টমসে আরও সক্রিয় ভূমিকা দরকার। নকল পণ্যের সামগ্রী আসছে চীনসহ নানা দেশ থেকে। আমদানি করা নকল পণ্য এত সূক্ষ্ণভাবে তৈরি হয় যে, প্রকৃত পণ্যের উৎপাদকরাই অনেক সময় বুঝতে পারেন না। সেখানে ভোক্তা সচেতন হলেও বুঝতে পারবেন না। আগামী দিনে বড় চ্যালেঞ্জ নকল পণ্য রোধ করা।

জেসমিন জামান
নকল পণ্যের কারণে জনসাধারণ, সরকার সবাই ক্ষতির মুখে পড়ছে। আইনের কঠোর প্রয়োগ ও সচেতনতার মাধ্যমে নকল পণ্য থেকে সরে আসা সম্ভব হবে। নকল পণ্য শুধু ক্রেতার ক্ষতি করছে এমন নয়; সরকারেরও ক্ষতি করছে। দেশের অর্থনীতির বড় ক্ষতি হচ্ছে। একটি ব্র্যান্ড তৈরির জন্য অনেক খরচ করতে হয়। নকল যারা করে, তাদের সেটা লাগে না। যারা ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছেন, তাদের জন্য এটা খুবই ক্ষতিকর একটা বিষয়। ব্যবসায়ীরা আশাবাদী, কারণ সরকারের সব সংস্থা সম্মিলিতভাবে নকল পণ্য প্রতিহত করার চেষ্টা করছে। এই উদ্যোগ সবাই মিলে চালিয়ে যেতে থাকি, হঠাৎ যেন বন্ধ করে না দেওয়া হয়। তাহলে শুধু প্রসাধনী বা ওষুধ নয়, সব পণ্যের নকল রোধে সামগ্রিকভাবে সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে পারব। এ জন্য সচেতনতা সৃষ্টির কার্যক্রমকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে পারলে তা ফলপ্রসূ করা সম্ভব হবে।
এস এম নাজের হোসেইন
নকলের বিরুদ্ধে অনেক দিন ধরে কাজ করছে ক্যাব। নকল এখন অনেক বেড়েছে। করোনাকালে অক্সিজেনও নকল হয়েছে। নকল এমন পর্যায়ে গেছে যে, ভোক্তারা নৈরাশ্যবাদী হয়ে পড়েছেন। ভোক্তাদের একটি অংশ অনেক অসচেতন এবং অনেকেই এগুলো সহনীয় মনে করছেন। এ জন্য সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। ভোক্তাদের আসল পণ্য চিনতে ব্যবসায়ীদের এগিয়ে আসতে হবে। অসাধু ব্যবসায়ীরা হরেক রকম চটকদার বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। নকল পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে দোকানিদের সুবিধা বেশি দিচ্ছে। নকল বন্ধে ব্যবসায়ীদের বেশি ভূমিকা রাখতে হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর অভিযান আরও জোরদার করা প্রয়োজন। মানুষ যেন সহজেই আইনের সুবিধা পেতে পারে। ভোক্তা সহজেই অভিযোগ করে যাতে প্রতিকার পায়। সরকারের উদ্যোগ আরও বাড়ানো দরকার।
তাহের জামিল
বিভিন্ন বড় ব্র্যান্ডের পণ্য নকল হওয়ার প্রবণতা বেশি। কিছু এলাকায় বেশি নকল হয়। আবার রমজান এলেই ভোগ্যপণ্য নকল হয় বেশি। নিম্নমানের পণ্যও আমদানি হচ্ছে। এলাকা চিহ্নিত করে বিএসটিআই নকল, নিম্নমান ও ভেজাল প্রতিরোধে অভিযান পরিচালনাসহ অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। তবে এ ক্ষেত্রে জনসচেতনতা ও ব্যবসায়ীদের কার্যকর উদ্যোগ দরকার। গত কয়েক মাসে ৫৯৪টি খাদ্যপণ্যের নমুনা জব্দ করা হয়েছে। এগুলো পরীক্ষার পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গত কয়েক মাসে ৪৭৬টি মোবাইল কোর্টে ৬১৬টি মামলা হয়েছে। এ সময়ে চার কোটি টাকার মতো জরিমানা হয়েছে। শুধু প্রসাধনী নয়, খাদ্যপণ্যও নকল আসছে। বিএসটিআই, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সম্মিলিতভাবে নকলের বিরুদ্ধে কাজ করছে।
রিয়াজুল হক
নকল প্রতিরোধে ক্রেতাদের সহজে অভিযোগ করার জন্য হটলাইন চালু করেছে বিএসটিআই। অভিযোগের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বেশির ভাগ অভিযোগ প্রসাধনী, বৈদ্যুতিক তার, মশার কয়েল ও ঘি নকল করার বিরুদ্ধে। সম্প্রতি মিল্ক্ক ভিটা ও আড়ংয়ের মতো ব্র্যান্ডের ঘি নকল করার প্রমাণ হাতেনাতে ধরা সম্ভব হয়েছে। নকল পণ্য উৎপাদন পর্যায় ছাড়া ধরা কঠিন। কারণ, নকল করার পর লেবেল দেখে জানা কঠিন। আবার নকলকারীরা কৌশল পরিবর্তন করছে, স্থান পরিবর্তন করছে। তারা রাতে কাজ করে। রাতে যেহেতু ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করার সুযোগ নেই, নকলকারীরা সে সুযোগ নিচ্ছে। এরপরও বিশেষভাবে ২৬টি অভিযানে বহু কারখানায় শত শত কোটি টাকার নকল পণ্য জব্দ করে ধ্বংস করা হয়েছে। যেসব বাড়ির মালিক ভাড়াটিয়াদের কারখানা করতে দেবেন, তাদের দায় নিতে হবে। যারা কারখানার জন্য ভাড়া নেবে, তাদের যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি আছে কিনা, যাচাই করতে হবে। বিশেষ করে পণ্য উৎপাদন কারখানায় বিএসটিআইর লাইসেন্স আছে কিনা, তা যাচাই করতে হবে।
মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার
অধিদপ্তরের বিভিন্ন অভিযানে দেখা যাচ্ছে, প্রসাধনী নকল বেশি হচ্ছে। আগে নকল কারখানা শুধু ঢাকার মধ্যে দেখা যেত। এখন নকলকারীরা ঢাকার উপকণ্ঠসহ দেশের অন্যান্য জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ছে। নকল প্রতিরোধে ব্যবসায়ীদের মধ্যে নৈতিকতা বাড়ানো ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। অনলাইনের মাধ্যমে নকল পণ্য বিক্রিতে প্রতারণা বেড়ে গেছে। নকল রোধে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনায় জোর দেওয়া হচ্ছে। অভিযানেও পথসভার মাধ্যমে সচেতন করা হচ্ছে। বর্তমানে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে নকল লেবেল বানিয়ে আনছে। এতে সাধারণ ভোক্তাদের নকল পণ্য দেখে বোঝার উপায় নেই। ভোক্তাদের জানতে হবে যে, মোড়কে উৎপাদন ও মেয়াদসহ বিএসটিআইর মানচিহ্ন থাকতে হবে। ভোক্তা অধিদপ্তরের জেলা পর্যায়েও কার্যক্রম আছে। এ কার্যক্রম উপজেলা পর্যায়ে চালু হলে আরও ভালো ফল পাওয়া যাবে।

সঞ্চালক
মুস্তাফিজ শফি
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
সমকাল

প্রধান অতিথি
ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী
স্পিকার, জাতীয় সংসদ

বিশেষ অতিথি
নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন
শিল্পমন্ত্রী

ভিডিও বার্তা
ড. বেনজীর আহমেদ
মহাপরিদর্শক
বাংলাদেশ পুলিশ

আলোচকবৃন্দ

মো. আলমগীর হোসেন
সদস্য (আয়কর নীতি)
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড

রিজওয়ান রাহমান
সভাপতি
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি

আবদুল কাইয়ুম সরকার
চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ

কৃষ্ণপদ রায়
অতিরিক্ত কমিশনার
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ

শেহ্‌জাদ মুনীম
ব্যবস্থাপনা পরিচালক
বিএটি বাংলাদেশ

রাশেদুল কাইয়ুম
পরিচালক
ইউনিলিভার বাংলাদেশ

ক্রিস্টাবেল রান্ডলফ
পরিচালক
ম্যারিকো বাংলাদেশ

জেসমিন জামান
বিপণনপ্রধান
স্কয়ার টয়লেট্রিজ

এস এম নাজের হোসেইন
সহসভাপতি, কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন
অব বাংলাদেশ (ক্যাব)

তাহের জামিল
পরিচালক
বিএসটিআই

রিয়াজুল হক
উপপরিচালক
বিএসটিআই

মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার
উপপরিচালক
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর

অনুলিখন
মিরাজ শামস
স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক সমকাল

বিষয় : নকলের বিরুদ্ধে চাই সামাজিক আন্দোলন

মন্তব্য করুন