মাসিক (পিরিয়ড) একটি স্বাভাবিক শারীরিক ক্রিয়া। তবে সামাজিক কুসংস্কারের কারণে এ ঘটনাকে অনেকেই গোপন বিষয় ভাবেন, যা নারীর জন্য ভয়াবহ স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করে। মাসিক নিয়ে সমাজের কুসংস্কার ভাঙতে হবে। মাসিক বা ঋতুস্রাব সম্পর্কে আলোচনায় লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। পুরুষ-নারী সবাইকে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। মাসিকের কারণে মেয়েরা যাতে আরও পিছিয়ে না পড়ে, এ জন্য স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটারি পণ্য সুলভ ও সহজলভ্য করতে হবে। প্রয়োজনে স্যানিটারি প্যাডের ওপর সব ধরনের ভ্যাট-ট্যাক্স তুলে নিতে হবে। গত ২৮ মে ২০২১ বিশ্ব মাসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে আয়োজিত 'মাসিক স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যবিধি :পদক্ষেপ ও বিনিয়োগের এখনই সময়' শীর্ষক এক ওয়েবিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। মেনস্ট্রুয়াল হেলথ অ্যান্ড হাইজিন ম্যানেজমেন্ট প্ল্যাটফর্ম (এমএইচএম প্ল্যাটফর্ম) এ ওয়েবিনারের আয়োজন করে। ভালো মাসিক স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনার (এমএইচএম) গুরুত্ব তুলে ধরার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে দিবসটি পালন করা হয়। এ প্রচারের উদ্দেশ্য পুরুষ-নারী উভয়কেই ঋতুস্রাব বিষয়ে সচেতন করে তোলা। ২০১৩ সালে জার্মানিতে প্রথম এর প্রচার শুরু হয়। ২০১৪ সালের ২৮ মে বিশ্বের অনেক দেশেই প্রথমবারের মতো শোভাযাত্রা, প্রদর্শনী, সভা-সেমিনারের মাধ্যমে দিবসটি পালন শুরু হয়। এবারের প্রতিপাদ্য- 'এখন সময় পদক্ষেপ গ্রহণের'।
হাসিন জাহান

এমনিতেই দেশে মাসিক বিষয়ে সচেতনতা কম। সামাজিক কুসংস্কারের কারণে এখনও লুকিয়ে মাসিকের জন্য পুরোনো কাপড় ব্যবহার করে মেয়েরা। তবে নানা ধরনের প্রচারের কারণে দিন দিন এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ছে। অনেকেই স্বাস্থ্যসম্মত প্যাড ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। তবে করোনা মহামারির কারণে পরিস্থিতি আবার খারাপ হয়েছে। আর্থিক সক্ষমতা কমে যাওয়ায় অনেক নারীই প্যাড ছেড়ে আবার কাপড় ব্যবহারের দিকে ফিরছে। এ বিষয়ে বিশেষ উদ্যোগ জরুরি। মহামারির জন্য যে ত্রাণ দেওয়া হয়, তাতে প্যাড অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে এমনিতেই স্যানিটারি পণ্যের ব্যবহার কম। ঘূর্ণিঝড়ের পর তা আরও দুর্গম হয়ে পড়ে। বাজেটে মাসিক স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনা খাতে বিশেষ বরাদ্দ দিতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাসিক নিয়ে খোলামেলা কথা বলার প্রচলন করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মস্থলে মেয়েরা যাতে মাসিকের সময় প্যাড পাল্টানো ও ব্যবহূত প্যাড ফেলার সুষ্ঠু পরিবেশ পায় সেদিকে নজর দিতে হবে।
অলক কুমার মজুমদার

একজন নারীর জীবনে ৩০ বছর মাসিক ক্রিয়া চলে। প্রতিদিন দেশে ৮০ লাখ মেয়ের মাসিক হয়। দেশের ৬৮ শতাংশ নারী মাসিক চলাকালে ময়লা কাপড় ব্যবহার করেন। তাদের মধ্যে ৬৭ শতাংশ নারী ব্যবহূত কাপড় গোপনে শুকান। ৩৬ শতাংশ কিশোরী ও ৩০ শতাংশ নারী মাসিক স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে অবহিত নন। ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী মাসিকের কারণে প্রতি মাসে গড়ে আড়াই দিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকে। দেশের মাত্র ১৩ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেয়েরা মাসিক চলাকালে পানি ও ব্যবহূত কাপড় বা প্যাড পাল্টানোর সুযোগ পায়। প্যাড বা কাপড় ব্যবহারকারী ৭৪ শতাংশ ছাত্রী বিদ্যালয়ে কাপড় বা প্যাড পাল্টায় না। করোনাকালীন নারীদের প্যাড ব্যবহারের সক্ষমতা কমেছে। স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটারি পণ্যের সহজলভ্যতার জন্য এ খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। গত বাজেটে হাইজিন ও এনভায়রনমেন্ট খাতে মাত্র ৫৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। এর পরিমাণ বাড়াতে হবে।
শফিকুল আলম

আগের তুলনায় মাসিক স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে সচেতনতা বেড়েছে। তবে আরও বহুদূর যেতে হবে। বাজেটে এ খাতে বিশেষ বরাদ্দ দিতে হবে। ২০১৪ সালে ৬ শতাংশ শিক্ষার্থী মাসিক নিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারত। ২০১৮ সালে এ হার ৩৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। মাসিকবান্ধব স্যানিটেশন ব্যবস্থা-সমৃদ্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ছে। কভিডের কারণে প্যাডের ব্যবহার কমছে। দেখা গেছে, একজন নারীর প্যাড ব্যবহারে মাসে গড় খরচ ৬৩ টাকা। গ্রামের অনেক বালিকা প্যাড ব্যবহার করতে চায়, কিন্তু সক্ষমতা না থাকায় তা থেকে বঞ্চিত। মাসিক স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে। গণমাধ্যম এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এখনও ৯৩ শতাংশ শিক্ষার্থী স্কুলে স্যানিটারি প্যাড বদলানোর বিষয়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। এ পরিবেশ পাল্টাতে হবে। সবাইকে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে।
সেলিনা আহমেদ
দুর্যোগকালীন প্রান্তিক নারীদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কথা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে সচেতনমূলক কর্মসূচি বেশি বেশি পালন করতে হবে। করোনা মহামারির কারণে মেয়েদের স্বাস্থ্যসেবা করুণ আকার নিয়েছে। আর্থিক সক্ষমতা কমে যাওয়ায় নারীরা সঠিক চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে না। অনেক নারী প্যাড ব্যবহার ছেড়ে আবার কাপড় ব্যবহারের দিকে ফিরছে। এ বিষয়ে বিশেষ উদ্যোগ জরুরি। মহামারির জন্য যে ত্রাণ দেওয়া হয় তাতে প্যাড অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে এমনিতেই স্যানিটারি পণ্যের ব্যবহার কম। ঘূর্ণিঝড়ের পর তা আরও দুর্গম হয়ে পড়ে। আগামী বাজেটে মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা খাতে বিশেষ বরাদ্দ দিতে হবে।

মুশফিকা জামান সাটিয়ার
নেদারল্যান্ডস বাংলাদেশের আর্থসামজিক খাতে দীর্ঘ দিন থেকে ভূমিকা রেখে আসছে। আগামীতেও তা বজায় রাখবে। মাসিক সম্পর্কে সচেতন না হওয়া এবং স্যানিটারি প্যাড সহজলভ্য না হওয়ায় মেয়েরা ঠিকমতো স্কুলে যেতে পারে না। ফলে তারা শিক্ষায় পিছিয়ে পড়ে। মাসিক স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে সচেতন না হলে নিরাপদ মাতৃত্বের দেখা মিলবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে মেয়েরা যাতে এই বিশেষ সময়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, সে বিষয়ে পুরুষ সহকর্মীদের সচেতন হতে হবে। কিশোরীরা বন্ধু বা পরিবারের বড়দের কাছে এই শরীরবৃত্তীয় ক্রিয়া সম্পর্কে জানতে পারে। তবে সঠিক শিক্ষা না থাকায় তারা নিরাপদ মাসিক স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে জানে না। লজ্জা বা কুসংস্কারের কারণে পরিবারও সেভাবে সহযোগিতা করে না। এ জন্য সামাজিক কুসংস্কার ভাঙতে হবে। পরিবারের সদস্যদের সচেতন হতে হবে। ছেলে সন্তানদেরও মাসিক সম্পর্কে সঠিক ধারণা দিতে হবে।
অধ্যাপক মোহাম্মদ বেলাল হোসেন
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটা মেয়ে ১২ বছরের আগে পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে মাসিক সম্পর্কে কিছু জানতে পারে না। কিন্তু এ বয়সের আগেই অনেক কিশোরী এই শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়ার অভিজ্ঞতা লাভ করে। শিক্ষা না থাকায় তারা নিরাপদ মাসিক স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে জানে না। লজ্জা বা কুসংস্কারের কারণে পরিবারও সেভাবে সহযোগিতা করে না। এ জন্য সামাজিক কুসংস্কার ভাঙতে হবে। পরিবারের সদস্যদের সচেতন হতে হবে। সন্তানদের ছোটবেলাতেই মাসিক সম্পর্কে সঠিক ধারণা দিতে হবে। ঋতুস্রাব সম্পর্কে আলোচনায় লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। পুরুষ-নারী সবাইকে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। মাসিকের কারণে মেয়েরা যাতে আরও পিছিয়ে না পড়ে এ জন্য স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটারি পণ্য সুলভ করতে হবে। প্রয়োজনে স্যানিটারি প্যাডের ওপর সব ধরনের ভ্যাট-ট্যাক্স তুলে নিতে হবে।

অরুসা ইকবাল রহিম
প্রান্তিক নারীদের কাছে স্যানিটারি পণ্য সহজে পৌঁছে না। এ বিষয়ে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশে পরিবর্তন আনতে হবে। শ্রেণিকক্ষেই মাসিক নিয়ে আলোচনা করতে হবে। প্রয়োজনে এ বিষয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সামাজিক কুসংস্কার ভাঙতে হবে। যেখানে সেখানে প্যাড ফেলা যাবে না। এ বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। ব্যবহূত প্যাড সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। এসব সামগ্রীতে সব ধরনের ভ্যাট-ট্যাক্স তুলে দিতে হবে। প্রান্তিক পর্যায়ে সুলভে প্যাড পৌঁছাতে সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ জরুরি। পরিবারে ছেলেদেরও পিরিয়ড সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে।



মো. এমদাদুল হক চৌধুরী

নারীদের মাসিক সচেতনতা নিয়ে নানা পর্যায়ে বিভিন্ন কার্যক্রম বিচ্ছিন্নভাবে হচ্ছে। একে এক ছাতার নিচে আনতে হবে। এ জন্য জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নে কাজ প্রায় শেষের পথে। প্রান্তিক পর্যায়ে এনজিও বা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যেসব উঠান বৈঠক কর্মসূচি পালন করে তাতে মাসিক স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনাকে যুক্ত করতে পারলে সচেতনতা তৃণমূলে ছড়িয়ে পড়বে। এমএইচএম কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের ওপর জোর দিতে হবে। সামাজিক কুসংস্কারের কারণে এ ঘটনাকে অনেকেই গোপন বিষয় ভাবে, যা নারীদের জন্য ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। মাসিক নিয়ে সমাজের ট্যাবু বা কুসংস্কার ভাঙতে হবে। ঋতুস্রাব সম্পর্কে আলোচনায় লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। পুরুষ-নারী সবাইকে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। মাসিকের কারণে মেয়েরা যাতে আরও পিছিয়ে না পড়ে, এ জন্য স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটারি পণ্য সহজলভ্য করতে হবে।

সঞ্চালক
ফারহানা সুলতানা
সহকারী বৈজ্ঞানিক, আইসিডিডিআর,বি

মোহাম্মদ যোবায়ের হাসান
পরিচালক, রিসার্চ, প্ল্যানিং অ্যান্ড মনিটরিং, ডরপ

স্বাগত বক্তব্য

হাসিন জাহান
চেয়ারপারসন, এমএইচএম প্ল্যাটফর্ম এবং কান্ট্রি ডিরেক্টর, ওয়াটারএইড বাংলাদেশ

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন

অলক কুমার মজুমদার
কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর, ডব্লিউএআই

অরুসা ইকবাল রহিম
কমিউনিকেশন অফিসার, ওয়াটারএইড বাংলাদেশ

আলোচকবৃন্দ

শফিকুল আলম
ওয়াশ স্পেশালিস্ট, ইউনিসেফ

ড. মোহাম্মদ বেলাল হোসেন
অধ্যাপক, পপুলেশন সায়েন্স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মুশফিকা জামান সাটিয়ার
জেন্ডার বিষয়ক সিনিয়র পলিসি অ্যাডভাইজার
ঢাকাস্থ নেদারল্যান্ডস দূতাবাস

মো. এমদাদুল হক চৌধুরী
যুগ্ম সচিব (পলিসি সাপোর্ট অধিশাখা)
স্থানীয় সরকার বিভাগ

সমাপনী বক্তব্য

সেলিনা আহমেদ
প্রোগ্রাম হেড, জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড
ডাইভার্সিটি, ব্র্যাক
অনুলিখন
হাসনাইন ইমতিয়াজ
স্টাফ রিপোর্টার, সমকাল

মন্তব্য করুন