কর্মজীবী নারীর স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বেশি

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯     আপডেট: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

ডা. আনিসুর রহমান

প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশে ইদানীংকালে ব্রেস্ট ক্যান্সার বা স্তন ক্যান্সার অধিকহারে ধরা পড়ছে। অন্যান্য ক্যান্সারের মতো ব্রেস্ট ক্যান্সার সম্পর্কে জ্ঞান ও সচেতনতা গত এক দশকে অনেক বেড়েছে।

যদিও এখনও অনেক চিকিৎসক ব্রেস্ট ক্যান্সারের সঠিক কারণ সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত নন। তবে বিশ্বব্যাপী অনেক জরিপে ব্রেস্ট ক্যান্সারের সঙ্গে জড়িত বেশ কিছু ঝুঁকির কারণ আলাদা করা গেছে। এর মধ্যে বেশ কিছু কারণ আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেমন, নারীদের নারী হওয়ার কারণেই ব্রেস্ট ক্যান্সার হওয়া, ক্রমবর্ধমান বয়স, পরিবারের অন্য কারও ব্রেস্ট ক্যান্সার হওয়ার ইতিহাস, তুলনামূলক অল্প বয়সে মাসিক শুরু হওয়া, দেরিতে রজঃনিবৃত্তি বা মেনোপজ হওয়া ইত্যাদি। অন্যান্য যেসব কারণ ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়, সেগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবন প্রক্রিয়া বা লাইফ স্টাইলের সঙ্গে জড়িত।

দেশের কর্মস্থলে অধিকহারে নারীরা এগিয়ে আসছেন। উচ্চশিক্ষা, সামাজিক পরিবেশ সহায়ক পরিবর্তন, পারিপার্শ্বিক চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন এবং সর্বোপরি দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের কারণে বাংলাদেশের করপোরেটজগতে ইদানীং অধিকহারে অগ্রগণ্য নারীদের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। কর্মক্ষেত্রে কাজের চাপ, দৈনন্দিন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হওয়ায় বাড়তি দুশ্চিন্তা ও সাফল্যে পৌঁছার ক্রমবর্ধমান উচ্চাভিলাষ, কর্মজীবী নারীদের চিন্তা-চেতনা ও জীবনযাত্রায় ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে, যা দুর্ভাগ্যজনকভাবে ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকির পরিপূরক।

যদিও আর্থ-সামাজিক এ অবস্থানগুলো সরাসরি ব্রেস্ট ক্যান্সারের কারণ নয়, তবু বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সমীক্ষায় বারবার এ পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে ব্রেস্ট ক্যান্সারের সম্পৃক্ততা দেখা গেছে। নিঃসন্তান বা বেশি বয়সে প্রথম সন্তান জন্মদান, সন্তানকে ব্রেস্ট ফিড না করানো বা কোনো কারণে মায়ের বুকের দুধ পান করাতে না পারা, কায়িক পরিশ্রম কম হয় এমন জীবন যাপন, স্থূলতা, চর্বিযুক্ত খাবার ও ফাস্টফুড বেশি খাওয়া, ধূমপান বা মদ্যপান, হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি ইত্যাদি ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। কর্মক্ষেত্রে অধিক চাপ ও যোগ্যতার মাপকাঠিতে একজন পুরুষ সহকর্মীর সঙ্গে সমান গতিতে এগিয়ে যাওয়ার তাগিদে নারীরা ইদানীং দেরিতে বিয়ে করছেন এবং দেরিতে সন্তান নিচ্ছেন বা একইভাবে কর্মস্থলের কঠিন সময়ের বেড়াজালে পড়ে অনেক কর্মজীবী মা সন্তানকে ব্রেস্ট ফিড করাতে পারছেন না।

এ ছাড়া আজকাল করপোরেটজগতে কর্মক্ষেত্রে নারীরা ডেস্কে বসেই প্রচুর কাজ করছেন এবং সময় বাঁচাতে ফাস্টফুড দিয়েই দুপুরের খাবার সেরে নিচ্ছেন। ফলে শরীরে প্রচুর চর্বি জমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের মতোই বাংলাদেশেরও নারীরা করপোরেটজগতে সমানতালে কাজ করায় স্বাভাবিকভাবেই যে কোনো মিটিং বা অনুষ্ঠানে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ধূমপান বা মদ্যপানের ঝুঁকি তাদের থেকেই যায়। এ বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে সর্বোত্তম পন্থা হচ্ছে সচেতন হওয়া।

আমাদের মেনে নিতে হবে, সব নারীই ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকিতে থাকেন এবং বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকি বাড়ে। নারীদের অধিকহারে কর্মক্ষেত্রে আসার কারণে এবং এ সংক্রান্ত জীবনযাত্রার পরিবর্তনের ফলে কর্মজীবী নারীদেরও ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে। কাজেই সচেতনতা ও ঝুঁকি নিরূপণে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষাই এর একমাত্র প্রতিকার। ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সের নারীদের নিয়মিত প্রতি মাসে অন্তত একবার ব্রেস্ট সেল্ফ এক্সামিনেশন বা নিজে নিজে ব্রেস্ট পরীক্ষা করা উচিত। একজন জেনারেল সার্জনের কাছে গেলে তিনি এ ব্যাপারে শিখিয়ে দেবেন। ব্রেস্টে কোনো অস্বাভাবিকতা যেমন ত্বকের রঙ পরিবর্তন বা চাকা বা কুঁচকানো ইত্যাদি পাওয়া গেলে দেরি না করে একজন জেনারেল সার্জনের শরণাপন্ন হতে হবে। যদি বয়স ৪০ বা তার ওপরে হয়, তবে প্রতি মাসে সেল্ফ এক্সামিনেশনের পাশাপাশি বছরে একবার ম্যামোগ্রাম করা উচিত। ম্যামোগ্রাম এক ধরনের বিশেষ এক্স-রে পদ্ধতি, যার মাধ্যমে খুব আগেই ব্রেস্ট ক্যান্সার শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

এগুলোর পাশাপাশি স্বাস্থ্যসচেতন জীবনযাপন করা বাঞ্ছনীয়, যেমন- সুষম খাদ্য গ্রহণ, চর্বিজাতীয় খাবার এবং গরু বা খাসির মাংস পরিহার ও সবুজ শাকসবজি খাওয়া। প্রতিদিন ব্যায়াম, সপ্তাহের পাঁচ দিন অন্তত ৪৫ মিনিট ছোট ছোট পায়ে দ্রুত হাঁটার অভ্যাস করা ভালো। ধূমপান বা মদ্যপান অবশ্যই পরিহারযোগ্য।

ত্রিশোর্ধ্ব বয়সী নারীদের ১০ শতাংশের স্তনের চাকাই শুধু ক্যান্সারের রূপ নেয়। স্তনে চাকা অনুভব করলে দেরি না করে একজন জেনারেল সার্জনের শরণাপন্ন হোন; কারণ শুধু জেনারেল সার্জনরাই স্তনের চিকিৎসা প্রদানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। অন্য চিকিৎসকের কাছে গিয়ে সময় নষ্ট করবেন না। ব্রেস্ট ক্যান্সার যদি শুরুতেই ধরা পড়ে, তবে তা নিরাময় সহজতর হয়।


লেখক: কনসালট্যান্ট, জেনারেল অ্যান্ড ল্যাপারোস্কপিক সার্জারি, ইউনাইটেড হসপিটাল লিমিটেড, ঢাকা