ধারণা করা হচ্ছে, কভিড-১৯ পৃথিবীজুড়ে ক্ষুদ্র ব্যবসাকে লাইফ সাপোর্টে নিয়ে যাবে! জীবন যেখানে মৃত্যুর মুখোমুখি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সেখানে অস্তিত্ব সংকটে ভুগবে- এটাই সাধারণ সমীকরণ। কিন্তু প্রত্যেক সংকটের একটা মাত্রা থাকে, উত্তরণের পথ থাকে। জেনেশুনে সেই পথে হাঁটাটাই বুদ্ধিমত্তার পরিচয়।
'ফিনটেক, স্মল বিজনেস অ্যান্ড অ্যামেরিকান ড্রিম' বইয়ের লেখক ক্যারেন জি মিলস সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসীয় এবং ব্যবসায়ী নেতাদের সম্ভাব্য সহায়তা পদ্ধতির বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন। মিলস ২০০৯ সালের শুরুর দিকে ওবামা প্রশাসনের জাতীয় অর্থনৈতিক সংস্থায় যোগ দিয়েছিলেন এবং ২০০৭-০৮ সালের মন্দার পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুনরুদ্ধারে কাজ করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি মনে করেন- করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এমন আর্থিক আঘাতের মুখোমুখি হবে, যা মহামন্দার সময়ের অভিজ্ঞতার চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে। তার মতে, অর্থনীতিকে এগিয়ে রাখতে এক নম্বর কাজ হবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ে সহায়তা করা।
কভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের পর যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকদের ওপর একটি জরিপ হয়। এতে দেখা যাচ্ছে, ৭৭ শতাংশ করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের অর্থনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে খুব চিন্তিত। ৫৪ শতাংশ ব্যবসায়ী মনে করছেন, আগামী ১২ মাসের মধ্যে মার্কিন অর্থনীতি মন্দার মধ্যে পড়বে। আর ৪৯ শতাংশ স্বীকার করছেন, গ্রাহকের চাহিদা কমছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
মিলস মনে করেন, 'অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসা এক মাসের বেশি টিকতে পারবে না। এটি আর্থিক সংকটের চেয়েও অধিকতর মন্দাবস্থা হতে যাচ্ছে। দোকানগুলোকে কর্মী ছাঁটাই করতে হবে অথবা ভালোর জন্য বন্ধ করতে হবে।' স্কুল বন্ধ ও শহরজুড়ে ঘরবন্দির এই সময়ে তাদের কর্মচারীদের বেতন দিতে এবং স্টোরফ্রন্টগুলো রাখার জন্য তাদের সুদমুক্ত ঋণ ও অন্যান্য নগদ প্রবাহের প্রয়োজন হবে।
করোনাকালের সংকট কাটিয়ে পুনরায় ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোকে চাঙ্গা করতে বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন মিলস। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে এই সংকটকালে টিকিয়ে রাখতে সেগুলো অনুসরণ করা যেতে পারে।
প্রথমত, ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থপ্রবাহ বাড়িয়ে দিতে সহায়তা করা। কারণ নগদ প্রবাহ হলে তাদের জীবনপ্রবাহ স্বাভাবিক থাকবে। বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বছরে প্রায় দুই মিলিয়ন নেট নতুন কাজ সরবরাহ করে এবং ৪৭ শতাংশ কর্মী নিয়োগ করে। ছোট ব্যবসায়গুলো মার্কিন মোট দেশজ উৎপাদনের ৪৪ শতাংশ অবদান রাখে। বাংলাদেশে ৭৮ লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা নিজেদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি উৎপাদন ও রপ্তানিতে কাজ করছে।
দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের মতো নির্দিষ্ট 'ঋণ প্যাকেজ' থাকতে পারে। যেখান থেকে একটি নির্ধারিত পরিমাণ পর্যন্ত স্বল্প সুদে উদ্যোক্তারা ধার নিতে পারবেন। যদিও গার্মেন্টস শিল্পের সহায়তার জন্য ৫ হাজার কোটি তহবিল ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এর সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ থাকলে সহায়ক হতে পারে।
একই সঙ্গে বকেয়া বা ঋণের বিষয়গুলো পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে আরও সহনীয় ও সহজ করা। যেমন মালিকদের উচিত বাড়িওয়ালাদের কাছে ভাড়া পরিশোধের সময় বৃদ্ধির জন্য অনুরোধ করা। এনজিও বা ব্যাংকগুলোকে তাদের বকেয়া ঋণের বিপরীতে সুদের অর্থ প্রদান যেন সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার নির্দেশনা প্রভৃতি। তাছাড়া সংশ্লিষ্ট গ্রাহকরা তাদের স্থানীয় ব্যবসায়ের কাছ থেকে উপহার কার্ড কিনে সহায়তা করতে পারেন, যা মেইন স্ট্রিটের দোকানগুলোকে চালু রাখতে সহায়তা করবে।
মিলস মনে করেন, 'ছোট ব্যবসা দেশের সম্প্রদায়ের মধ্যে খুব ভালো আর্থিক ভিত্তি তৈরি করে, যদি আমরা এই ছোট ব্যবসাগুলো হারাই তবে আমাদের খুব আলাদা দেখাবে এবং আমরা যে ব্যবসাগুলো হারাব, তা ফিরিয়ে আনতে অনেক সময় লাগবে।' তাই এই কঠিন সময়ে দিনগুলোকে মোকাবিলা করতে পারলেই টিকে যেতে পারে ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো, যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে দেশের বৃহৎ স্বার্থ, সামষ্টিক অর্থনীতি।
  উন্নয়ন গবেষক; উপপরিচালক বাংলাদেশ ব্যাংক

বিষয় : ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী

মন্তব্য করুন