রমজানের আগেই অস্থির হয়ে উঠেছে দেশের ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ। বেড়েই চলেছে চাল, ডাল, তেল, ছোলা, চিনি, পেঁয়াজ, চিড়া, নারকেলসহ রোজার প্রধান অনুষঙ্গ আরও বেশকিছু পণ্যের দাম। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ভোগ্যপণ্যের মজুদ ভালো থাকায় দাম না বাড়ার কথা বললেও উল্টো চিত্র খাতুনগঞ্জে। সরকার দাম নির্ধারণ করে দিলেও সেই দামে সয়াবিন তেল মিলছে না বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ১৯ হাজার ২১৮ টন ছোলা খালাস হলেও এরই মধ্যে প্রতি কেজিতে ছোলার দাম বেড়েছে ২ থেকে ৫ টাকা। রমজানকে টার্গেট করে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

ক্যাবের দাবি, পণ্য মজুদ করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও আমদানিকারক। এ জন্য মনিটরিং জোরদারের তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। এখন থেকে জড়িতদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে বলে মত তাদের। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি- আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটে প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারে।

এপ্রিলের মাঝামাঝি শুরু হচ্ছে পবিত্র রমজান। এ সময়ে ছোলার চাহিদা থাকে সবচেয়ে বেশি। অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানি করা ভালো মানের ছোলা খাতুনগঞ্জে প্রতি কেজি বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৬৪ থেকে ৬৬ টাকায়। যা আগে বিক্রি হয়েছে ৫৮ থেকে ৬১ টাকায়। মাঝারি মানের যেসব ছোলা কিছুদিন আগেও প্রতি কেজি ৬০ থেকে ৬১ টাকায় বিক্রি হয়েছে, একই মানের ছোলা বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৬৩ থেকে ৬৫ টাকায়। অথচ চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্রের তথ্যমতে, চলতি বছরের গত ফেব্রুয়ারিতেই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ১৯ হাজার ২১৮ টন ছোলা আমদানি হয়েছে। যা গত বছরের তুলনায় ২ হাজার ৫২৬ টন বেশি। ফেব্রুয়ারিতে আসা ছোলার মধ্যে শুধু অস্ট্রেলিয়া থেকেই এসেছে প্রায় ১৮ হাজার ৯৭৯ টন।

একইভাবে চিড়ার দামও বেড়েছে কেজিতে ৪ থেকে ৬ টাকা। কিছুদিন আগেও খাতুনগঞ্জে যেসব চিড়া প্রতি কেজি ৪২ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে, এখন বিক্রি হচ্ছে ৪৮ থেকে ৫২ টাকায়। খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৬২ টাকায়। মসুর ডালের দাম কেজিতে বেড়েছে ২ থেকে ৩ টাকা। বর্তমানে ভালো মানের প্রতি কেজি মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে ৯৮ থেকে ১০২ টাকা, মাঝারি মানের ৬৮ থেকে ৭২ টাকা এবং মোটা মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে ৬৩ থেকে ৬৫ টাকা। সাদা মটর ডালের দামও প্রতি কেজিতে বেড়েছে ২ থেকে ৩ টাকা। খাতুনগঞ্জে আগে যেসব আমদানি করা শুকনো মরিচ প্রতি কেজি ১৮০ থেকে ১৮২ টাকায় বিক্রি হয়েছে, তা এখন বিক্রি হচ্ছে ১৯০ থেকে ১৯২ টাকা।

কিছুদিন আগেও ভারত থেকে আমদানি করা প্রতি কেজি হলুদ ৯৬ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে একই মানের হলুদ বিক্রি হচ্ছে ১১২ থেকে ১২০ টাকায়। অস্থির চালের বাজারও। প্রায় সকল মানের চালের দাম বেড়েছে প্রতিবস্তায় (৫০ কেজি) ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা। অর্থাৎ কেজিতে বেড়েছে ২ থেকে ৬ টাকা পর্যন্ত। প্রতি লিটার সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১২৮ থেকে ১৩০ টাকা। পেঁয়াজের দাম বেড়েছে কেজিতে মানভেদে ৫ থেকে ১০ টাকা। খাতুনগঞ্জে বর্তমানে ভারতের নাসিক অঞ্চলের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। খুচরা বাজারে একই পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪৮ থেকে ৫০ টাকা। কিছুদিন আগেও প্রতিটি নারকেল ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা। গত সাত মাসে ৬০ হাজার ৩৩১ টন চিনি আমদানি হলেও বাজারে প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ৬৭ থেকে ৬৮ টাকা।

খাতুনগঞ্জের হামিদুল্লাহ মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন, 'বাজারে চাহিদার তুলনায় কাঁচাপণ্যের সরবরাহ কম। এ কারণে আমদানি করা পেঁয়াজ, রসুন ও আদার দাম বেড়েছে।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, 'রমজানকে ঘিরে এরই মধ্যে চাহিদার অর্ধেকের বেশি পণ্য চলে এসেছে। মার্চ ও এপ্রিলে আরও পণ্য আমদানি হবে। রমজানে পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে মনিটরিং সেল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সতর্ক থাকতে শীর্ষ ব্যবসায়ীদের অনুরোধ করা হয়েছে। তারপরও মনিটরিং জোরদার করতে হবে।'

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উমর ফারুক বলেন, 'রমজানের আগেই কারসাজি করে খাতুনগঞ্জে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পেয়েছি। যার প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে। রোডম্যাপ করে শিগগির বাজার মনিটরিং শুরু হবে। চিহ্নিত করা হবে কারসাজির সঙ্গে জড়িতদেরও।'

ক্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, 'পাইকারি বাজারে রোজার প্রধান অনুষঙ্গ ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ানোর প্রবণতা শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে চাল, ডাল, ছোলা, চিনি, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম। কারসাজি ও বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেই দাম বাড়ানো হচ্ছে। বড় ব্যবসায়ীদের গুদামে হানা দিলেই আসল চিত্র বেরিয়ে আসবে।'

মন্তব্য করুন