করোনার সংক্রমণ রোধে লকডাউন কিংবা অন্য স্বাস্থ্যবিধি জারির বিষয়ে আরও বিচক্ষণতার প্রয়োজন রয়েছে। এ ধরনের যে কোনো পদক্ষেপে জনগণের আস্থা থাকতে হবে। তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জীবন ও জীবিকার মাঝে একটা কার্যকর সমন্বয় থাকতে হবে। সবার জন্য করোনার টিকা নিশ্চিত করতে সরকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

গতকাল রোববার বাংলাদেশ উন্নয়ন অধ্যয়ন প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) আয়োজিত এক সংলাপে এসব কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞরা। 'কভিড-১৯ :অর্থনীতি এবং স্বাস্থ্যের উদ্বেগের মধ্যে সংযোগ স্থাপন' শিরোনামের এ আলোচনা অনলাইনে অনুষ্ঠিত হয়। পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান। সঞ্চালনা করেন বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেন।

পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, লকডাউনে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবেই। তবে কিছু কার্যকর কৌশল নেওয়ার মাধ্যমে তা কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বরাদ্দ নিয়ে সমালোচনা আছে। তবে বেশি বরাদ্দ দিলেও তা বাস্তবায়ন করার সক্ষমতা নেই। টিকা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, এ নিয়ে কালো মেঘ আছে আকাশে। এ মেঘ যেন সরছেই না। জনগণের মাঝে এ নিয়ে শঙ্কা আছে। বিষয়টিতে দ্রুত এবং কার্যকরভাবে দেখতে হবে। বিভিন্ন দেশ থেকে টিকা সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। দেশেও উৎপাদনের কথা ভাবা হচ্ছে। এ নিয়ে উদ্যোগ নিলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সরকার সব ধরনের সহযোগিতা দেবে।

ড. মসিউর রহমান বলেন, বিভিন্ন খাতে প্রণোদনা দেওয়ার কারণে ব্যাংক খাতে একটা সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। প্রণোদনা এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির অর্থের অপব্যবহারের সমালোচনা প্রসঙ্গে ড. মসিউর রহমান বলেন, এ ক্ষেত্রে কেন্দ্র থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। কে সহযোগিতা পাওয়ার উপযুক্ত আর কে নয়, তা জানা মুশকিল। স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবার খুলে দেওয়ার সুপারিশ করেন তিনি।

সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, করোনায় সব ক্ষেত্রে বৈষম্য বেড়েছে। ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে বড় শিল্প এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের মাঝে বৈষম্য প্রকট আকার নিয়েছে। তিনি বলেন, প্রণোদনা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে অনেক হস্তক্ষেপ রয়েছে এবং বিভিন্ন পক্ষ থেকে দাবি তোলা হচ্ছে। এ কারণে ব্যাংক ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। ঋণ আদায় এবং খেলাপি ঋণ নিয়ে ব্যাংকগুলো সমস্যায় ভুগছে। নগদ অর্থ ও শুল্ক্ক ছাড়ের দাবি আসছে বিভিন্ন পক্ষ থেকে। এতে রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। শেষ পর্যন্ত অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হবে। লকডাউন প্রসঙ্গে অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, লকডাউনে ঈদে গ্রামমুখী মানুষ কী রকম ভোগান্তি এবং বিশৃঙ্খলার মাঝে কর্মস্থল ত্যাগ করেছে, তা সবাই দেখেছে। সরকারের এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট জবাবদিহি থাকা দরকার।

আলোচনার বিষয়ের ওপর মূল বক্তব্যে অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, জীবন ও জীবিকার মধ্যে সমন্বয় দরকার। কোন বিষয়কে কতটুকু গুরুত্ব দিতে হবে, তা পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। লকডাউনে গণপরিবহন বন্ধ রাখা অবাস্তব সিদ্ধান্ত। লকডাউন একটা চরম ব্যবস্থা। পরিস্থিতি বুঝে মাঝে মাঝে যা আরোপ করা উচিত। সংক্রমণের মাত্রা বুঝে অঞ্চলভিত্তিক লকডাউন হতে পারে। শিক্ষায় প্রকট বৈষম্য তৈরি হচ্ছে উল্লেখ করে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, গ্রামে সংক্রমণ প্রায় নেই। লকডাউন নেই। সেখানে সতর্কতার সঙ্গে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া যেতে পারে। তিনি বলেন, ব্যাংক খাত স্বাস্থ্য খাতের মতোই দুর্বল। ঋণ পরিশোধে বিভিন্ন ছাড় দেওয়ার কারণে শেষ পর্যন্ত খেলাপি ঋণ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে এবং সেই বোঝা কে নেবে, তা এখনই ভাবতে হবে।

স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, জীবন বাঁচাতে না পারলে জীবিকাও আক্রান্ত হবে। মাস্ক পরা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মানতে জনগণকে সম্পৃক্ত করার বিষয়টি বড় চ্যালেঞ্জ। টিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, টিকা সংগ্রহ নিয়ে সংকট চলছে। প্রথম ডোজ যারা পেয়েছেন, তারা যে কোনো প্রতিষ্ঠানের দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণে কোনো অসুবিধা নেই। এমনকি দ্বিতীয় ডোজ পাওয়া না গেলেও প্রথম ডোজই অনেকটা সুরক্ষা দিতে সক্ষম।

অ্যাক্সেজ টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রকল্পের নীতি উপদেষ্টা অনির চৌধুরী বলেন, সংক্রমণ এবং লকডাউনের মধ্যেও জীবনের চাইতেও জীবিকাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। এ প্রবণতা ঝুঁকি তৈরি করছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন তিনি। করোনা এবং লকডাউনের মাঝে কীভাবে পোশাক খাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে উৎপাদন কার্যক্রম চলছে, তার ওপর একটি উপস্থাপনা দেন বিজিএমইএর পরিচালক আসিফ আশরাফ। তিনি জানান, বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে পোশাক শ্রমিকদের ১ শতাংশেরও কম আক্রান্ত হয়েছে।

বিনায়ক সেন বলেন, স্বাস্থ্য খাতের সামর্থ্যের অভাব বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। করোনায় জীবন ও জীবিকার সমন্বয়ে যে নীতি-কৌশল নেওয়া হয়েছে, তা পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে। করোনা যদি আরও বাড়ে, তা মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে হবে। আবার দুই থেকে তিন মাসের লকডাউন দিতে হলে পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, তা এখনই ঠিক করতে হবে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে পোশাক শ্রমিকসহ অন্তত তিন কোটি মানুষকে টিকা দিতে হবে।