দেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি গড়ে দিয়ে গেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সংক্ষিপ্ত শাসনকালে অর্থনীতির প্রতি খাতের জন্যই সুস্পষ্ট এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন তিনি। মজবুত সেই ভিত্তির ওপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে উন্নয়নের রোল মডেলের মর্যাদায় উন্নীত হয়েছে আজকের বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক দর্শন: শিল্প ও বাণিজ্য উন্নয়নে বাংলাদেশ' শীর্ষক ভার্চুয়াল সেমিনারে এমন মূল্যায়ন করেছেন রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা। তারা বলেছেন, অসময়ে বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকান্ড না হলে এতদিনে উন্নত দেশের কাতারে যেতো বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধুর ৪৬তম শাহাদাৎ বার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস সামনে রেখে বুধবার এ আলোচনার আয়োজন করে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে সংযুক্ত হন বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ও আওয়ামীলীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য তোফায়েল আহমেদ। তিনি বলেন, আজকের বাংলাদেশ যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, তার মূল ভিত্তি গড়েছেন বঙ্গবন্ধু। কৃষি, ব্যাংক-বিমা, বিদ্যুৎ- যোগাযোগসহ সব বিষয়ে সুদুরপ্রসারী পরিকল্পনা করে গেছেন তিনি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি জাতির জনকের সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় নাম লিখিয়েছে বাংলাদেশ।

সেমিনারে বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, বেসরকারি খাতে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। আরো সহযোগিতা দেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে সরকার। এটা ঠিক যে, এখনও লাল ফিতার দৌরাত্ন্য রয়ে গেছে। এটা হয়তো সারা জীবনই থাকবে। তবে কিছুটা হয়তো কমিয়ে আনা যাবে। মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি এবং মানব সম্পদ উন্নয়নে আরও বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে বলে মত দেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেস্টা সালমান এফ রহমান বলেন, স্বাধীনার পর আমদানি রপ্তানিতে বার্টার ট্রেড ব্যব্যস্থা ছিল। এক দেশের সরকারের সঙ্গে আরেক দেশের সরকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল বাণিজ্য। বঙ্গবন্ধু প্রথমবারের মত এতে ব্যাক্তি খাতকে সংযুক্ত করেন। তবে তার শর্ত ছিল রপ্তানির ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য পণ্য থাকতে হবে। চা, মধু, বৈদ্যুতিক কেবলের মত পণ্য অর্ন্তভুক্ত করার শর্ত দেন বঙ্গবন্ধু। মূলত এভাবেই বেসরকারি খাত বৈচিত্র্যপূর্ণ রপ্তানিতে বাজারে প্রবেশ করে। অর্থনীতির পথনকশা বঙ্গবন্ধুই ঠিক করে গেছেন। সেই পথ নকশা বাস্তবায়ন করছেন আজকের প্রধানমন্ত্রী। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে আরো আগেই বাংলাদেশ আজকের অবস্থানে আসতে পারতো। উন্নত দেশের কাতারে থাকতো। সরকারি- বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে একটি ভারসাম্যমূলক অর্থনীতি গঠন করাই ছিলো বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক দর্শন।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব এবং বাংলাদেশ ব্যাকের সাবেক গভর্নর ড. ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। তিনি বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন দর্শন এবং সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরেন। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত জাতীয় অগ্রগতি হিসেবে মাথাপিছু আয়, জিডিপি প্রবৃদ্ধি, দারিদ্যের হারসহ বিভিন্ন সূচকের উন্নয়ন চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পাকিস্তানি শাসকদের শোষণ বঞ্চনার কারণে ১৯৪৭ সাল থেকেই স্বাধীনতার বীজ বুনেছিলেন বঙ্গবন্ধু। নানা ঘাত প্রতিঘাত পার হয়ে দেশকে স্বাধীন করার পর জাতির পিতা একটি শোষণ বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তাঁর অর্থনৈতিক দর্শনের মূল কথা ছিল সাধারণ মানুষের মুক্তি।

প্যানেল আলোচনায় এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি এ. কে. আজাদ বলেন, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য- এই পাঁচ মৌলিক অধিকারের বাস্তবায়ন চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। স্বাধীনতার আগেই তিনি বলেছিলেন, জাল যার জলা তার। তার স্বপ্ন ছিল, ছাত্ররা শিক্ষা পাবে। যোগ্য হয়ে চাকরি পাবে। সেই স্বপ্ন পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয় নি। এখনও শিল্প পরিচালনায় দক্ষ মানব সম্পদের প্রয়োজনে বছরে ৫ থেকে ৬ বিলিয়ন ডলার চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। অথচ দেশে শিক্ষিতরা বেকার বসে আছেন। এ. কে. আজাদ বলেন, সরকারি-বেসরকারি সব পক্ষ থেকেই বিদেশি বিনিয়োগ চাওয়া হচ্ছে। তবে দেশি উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার বিষয়টিও ভাবতে হবে। লাল ফিতার দৌরাত্ন্য এখনও রয়ে গেছে। তিতাসের সংযোগ পেতে অনেক জায়গায় যেতে হয়। সরবরাহ বাড়লেও মানসম্পন্ন বিদ্যুতের ব্যবস্থা হয়নি। বিনিয়োগ আকর্ষণে এসব সমস্যার সমাধান চান উদ্যোক্তারা।

এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু যখন দেশ পুনর্গঠনে মনযোগ দেন, ঠিক তখনই অপশক্তির ঘাতকের বুলেট কেড়ে নেয় বাঙালীর মুক্তির কান্ডারি শেখ মুজিবুর রহমানকে। যুদ্ধবিধস্ত দেশ, ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং বিপর্যস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে বঙ্গবন্ধু সময় পেয়েছিলেন মাত্র সাড়ে তিন বছর। কিন্তু এ সময়ের মধ্যেই মাথাপিছু আয় ৯৩ ডলার থেকে ২৭১ ডলারে উন্নীত হয়।

এফবিসিআইর সাবেক সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ বলেন, কৃষক এবং শ্রমিক সমাজের প্রতি বঙ্গবন্ধুর ছিল নিখাদ ভালোবাসা। তার সঙ্গে দেখা হলে পারিবারিক জমিতে ধান লাগানোর পরামর্শ দিতেন তিনি। আরেক সাবেক সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, স্বাধীনতার পর পরই কিছু অপশক্তি বিপ্লবের নামে দেশ এবং অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর তৎপরতা শুরু করে। এমসিসিআই সভাপতি ব্যারিস্টার নিহাদ কবির বলেন, চা বোর্ডের সদস্য হিসেবে এ শিল্পের উন্নয়নে গুরুত্বপুর্ন দিকনির্দেশনা দেন বঙ্গবন্ধু। চায়ের উন্নয়নে আজও সেই নির্দেশনা অবদান রাখছে।

সেমিনারে সমাপনী বক্তব্য দেন এফবিসিসিআই'র সিনিয়র সহ-সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু। সংগঠনের অন্যান্য সহ-সভাপতি এবং পরিচালকরা এতে অংশ নেন।