আবাসন ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, মানুষ তার সারা জীবনের আয় দিয়ে বাসস্থান নিশ্চিত করতে চায়। ফ্ল্যাট-প্লটের জন্য টাকা-পয়সা দিয়ে যেন কোনো ক্রেতা প্রতারণার শিকার না হন, সেদিকে সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ মাঝেমধ্যে এ ধরনের অভিযোগের কথা শোনা যায়। প্রতারণার শিকার হলে গ্রাহকের দীর্ঘশ্বাস বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে।  তিনি আরও বলেন, ঢাকায় মানুষের চাপ বাড়ছে। ঢাকার বাইরের এলাকা নিয়ে এখন ভাবতে হবে। ব্যবসায়ীদের সেদিকটাও বিবেচনা করতে হবে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে পাঁচ দিনব্যাপী রিহ্যাব ফেয়ারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এই কথা বলেন। প্রস্তাবিত ডিটেইল এরিয়া প্লান (ড্যাপ) প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ড্যাপ বাস্তবায়ন হলে আবাসন খাতে ক্ষতি হতে পারে। আর তাতে মূলত সমস্যায় পড়বে সেসব সাধারণ মানুষ, যারা নিজেদের থাকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার অপেক্ষায় রয়েছেন। সবার সহযোগিতা হয়, এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে।

অনুষ্ঠানে প্রস্তাবিত ড্যাপের খসড়া প্রস্তুত করার আগে শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে আলোচনা না করায় রাজউকের উপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন। তিনি বলেন, স্বল্প আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পর কয়েকটি চ্যালেঞ্জ আসতে পারে। সবার সহযোগিতায় সেগুলোকে অতিক্রম করতে হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় ড্যাপ বাস্তবায়ন হচ্ছে অথচ এ বিষয়ে আলোচনার জন্য এফবিসিসিআইকে ডাকা হয়নি। অথচ  এফবিসিসিআই সারা দেশের ব্যবসায়ীদের নেতৃত্বে দিচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, প্রস্তাবিত যেই ড্যাপ তৈরি করা হয়েছে সেটা এফবিসিসিআইকে দেওয়া উচিত ছিল। এই সংগঠন থেকে ড্যাপের বিষয়ে ভাল পরামর্শ দেওয়া যেত। মনে রাখতে হবে, সরকার ব্যবসায়ীদের এগিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ করছে। তাই ব্যবসায়ীদের অগোচরে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে তা বাস্তবায়ন করা কঠিন।

জসিম উদ্দিন বলেন, ঢাকায় মানুষের চাপ বেড়ে যাওয়ায় মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে রাজউক। কিন্তু কোথায় নেওয়া হবে, সে বিষয়ে কোনো দিক নির্দেশনা নাই। কৃষি জমি বাঁচাতে হবে। সেজন্য ভবনের উচ্চতা নিয়ে ভাবতে হবে। একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে আবাসন ব্যবসায়ীদের জন্য একটা জোন রাখা উচিত। সেসব জোনে থাকবে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ আবাসনেরও সব সুযোগ-সুবিধা।

রিহ্যাবের সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন কাজল বলেন, প্রস্তাবিত ড্যাপ বাস্তবায়ন নিয়ে ব্যবসায়ীরা চরম আতংকে রয়েছে। তবে রাজউক বলেছে, একটি সময়োপযোগী ড্যাপ বাস্তবায়ন করবে। ব্যবসায়ী ও জনসাধারণের কথা বিবেচনা করে ড্যাপ বাস্তবায়ন করা হবে।

কামাল মাহমুদ বলেন, গত এক বছরে ৩০ শতাংশ দাম বেড়েছে রড সিমেন্টের। প্রস্তাবিত ড্যাপ বাস্তবায়ন হলে অনেক ছোট জমি অকেজো হয়ে পড়বে। অনেক ডেভেলপার প্লান বাস্তবায়নের জন্য রাজউকে আবেদন জমা দিয়ে রেখেছে। সেগুলোর অনুমোদন দীর্ঘদিন হয়ে গেলেও সেগুলোর অনুমোদন পাওয়া যাচ্ছে না। দ্রুত প্লানগুলোর অনুমোদন দেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি। এছাড়া বাসস্থান নিশ্চিত করতে ক্রেতারা যাতে সহজে ঋণ সহায়তা পান সেজন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনুরোধ জানান ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীদের এসব দাবির পরিপ্রেক্ষিতে রাজউকের চেয়ারম্যান এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী বলেন, আবাসন ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হবে এমন কোনো সিদ্ধান্ত সরকার নেবে না। কারণ উন্নয়নের বড় একটি অংশ আবাসন খাতের সাথে জড়িত। ড্যাপের বাস্তবায়ন নিয়ে ধাপে ধাপে প্রায় ৩০০ টি সভা ও সেমিনার হয়েছে। সবার পরামর্শ নিয়ে ভাল কিছু পাবে আবাসন খাত।

রাজউক চেয়ারম্যান আরও বলেন, ড্যাপ নিয়ে আতঙ্ককের কিছু নাই। তবে বিদ্যমান আইনগুলো ব্যবসায়ীদের মানতে। সুপরিকল্পিত নগরায়ন চায় রাজউক। অপরিকল্পিত ভাবে কিছু নির্মাণ করা যাবে না। এমন যেন না হয় যে, ভুমিকম্পে অর্ধেক ভবন ভেঙ্গে পড়েছে। যেকোনো ব্যবসায়ীদের যৌক্তিক আবেদন বিবেচনা করা হবে। অযৌক্তিক কিছু বিবেচনায় নেওয়া হবে না।

অনুষ্ঠানে গণপূর্ত সচিব শহিদ উল্লাহ খন্দকার বলেন, যেকোনো দেশের ৯৮ শতাংশ আবাসনই সরকারের সহায়তায় এবং ব্যক্তি উদ্যোগে করা হয়। সরকার নিজ উদ্যোগে করে দুই শতাংশ। ফ্ল্যাটের নিবন্ধন ফি কমানো, অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ এবং কম সুদে সরকারি চাকরিজীবীদের ঋণ সহায়তায় আবাসন খাতকে ভাল অবস্থানে নিয়ে গেছে। তবে বিভিন্ন সময় গ্রাহকেরা নানা অভিযোগ করে থাকেন। সব ব্যবসায়ীদের দায়িত্ব গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখা। তাদের ক্রয়কৃত আবাসনসহ অন্যান্য বিষয়ে নিশ্চয়তা দেওয়া।

ড্যাপ নিয়ে ভীতি বা ভয়ের কোনো কারণ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার এমন কোনো পদক্ষেপ নেবে না, যা আবাসন খাতে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। উইন উইন সিচুয়েশনে ড্যাপ বাস্তবায়ন করা হবে। ড্যাপ নিয়ে আলোচনার আরও অনেক সুযোগ আছে। এখনি আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।

তিনি বলেন, বস্তিবাসীদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে রাজউক কাজ করছে। তাদের উচ্ছেদ নয়, বরং দেশের উন্নয়েনে তাদের সম্পৃক্ত করা হবে।