এবার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের ব্রোকারেজ হাউস ফার্স্ট লিড সিকিউরিটিজ তার ঢাকার গ্রাহকদের (বিনিয়োগকারী) সব শেয়ার বিক্রি করে ১০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। গতকাল মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলন করে এ অভিযোগ করেছেন ব্রোকারেজ হাউসটির ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা।

গ্রাহকদের অভিযোগ, গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ব্রোকারেজ হাউসটি নকল সফটওয়্যার ব্যবহার করে তাদের হয়ে শেয়ার কেনাবেচা করেছে। ৬ ফেব্রুয়ারির পর শাখা বন্ধ করে এর কর্মকর্তারা পালিয়েছেন। এ বিষয়ে বিএসইসি ও সিএসইর কাছে শেয়ার ও নগদ জমা ফেরত পেতে অভিযোগ করেও তারা কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না।

গত বছরের মার্চে ব্রোকারেজ হাউসটির কার্যক্রম স্থগিত করে সিএসই। আর গত বছরের আগস্টে এর লাইসেন্স স্থগিত করে বিএসইসি। তবে এ প্রতিষ্ঠানটি যে অবৈধ প্রক্রিয়ায় কার্যক্রম চালাচ্ছে, তার খবর রাখেনি তারা।

রাজধানীর পল্টনে আল-রাজী টাওয়ারে সিএমজেএফ মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে গ্রাহকরা অভিযোগ করেন, ঢাকা শাখার গ্রাহকরা গত ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সশরীরে উপস্থিত হয়ে শেয়ার কেনাবেচা করতেন।

অভিযোগকারী গ্রাহক আইয়ুব খান সমকালকে বলেন, অন্য ব্রোকারেজ হাউসের গ্রাহকরা যেভাবে মনিটরের সামনে বসে শেয়ার কেনাবেচা করেন, তেমনি শেয়ার কেনাবেচা করেছেন। প্রতিদিনই পোর্টফোলিও লেজার (সর্বশেষ শেয়ার স্থিতির ডকুমেন্ট) প্রিন্ট দিয়েছে। তবে সিডিবিএল থেকে শেয়ার কেনাবেচার এসএমএস বা ই-মেইল পাননি। কেন পাচ্ছেন না, জানতে চাইলে কর্মকর্তারা কিছু সমস্যা আছে বলে জানাতেন। শিগগির ঠিক করে দেবেন। ৭ ফেব্রুয়ারি অফিস বন্ধ পাওয়ার পর সিডিবিএলে গিয়ে দেখেন ৫৫ লাখ টাকার মধ্যে মাত্র ২০ হাজার টাকার শেয়ার আছে। এ নিয়ে সিএসইতে অভিযোগ করে প্রতিকার পাননি। একই অবস্থা আরও ৩০ থেকে ৫০ জন গ্রাহকের। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত অভিযোগে গ্রাহকরা দাবি করেন, ব্রোকারেজ হাউসটির চেয়ারম্যান এটিএম শোয়েব চৌধুরী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক জুনু চৌধুরী এ টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

এ নিয়ে ফার্স্ট লীডসহ গত দুই বছরে মোট চার ব্রোকারেজ হাউসের গ্রাহকরা তাদের শেয়ার ও নগদ জমা আত্মসাতের অভিযোগ আনলেন। ২০২০ সালের জুনে ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে মোট ৬৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আসে। গত বছরের জুনে বানকো সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে ৬৮ কোটি টাকা এবং নভেম্বরে তামহা সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে ১৪০ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পায় বিএসইসি ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ।

অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে ফার্স্ট লীড সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জুনু চৌধুরী সমকালকে বলেন, সিলেটে তাদের মূল শাখা বন্ধ এক বছরের বেশি সময়। তাহলে গ্রাহকরা লেনদেন কীভাবে করবে। ঢাকা অফিস গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কীভাবে চালু ছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'শাখা ইনচার্জের হদিস পাচ্ছি না। তাকে না পেলে কিছু বলতে পারছি না।' গ্রাহকদের শেয়ার ও ঘাটতি বিষয়ে বলেন, 'কিছু সমস্যা আছে। সমাধানের চেষ্টা করছি।'

বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র রেজাউল করিম তাৎক্ষণিকভাবে কিছু জানাতে পারেননি। তবে সিএসইর চিফ রেগুলেটরি অফিসার মোহাম্মদ মাহাদি হাসান সমকালকে বলেন, 'গ্রাহকদের অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগ থাকায় গত বছরের মার্চ থেকে ব্রোকারেজ হাউসটির কার্যক্রম স্থগিত আছে। এমনকি সিডিবিএলের মাধ্যমে গ্রাহকদের সব বিও অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়েছে। ফলে এ হাউস থেকে শেয়ার লেনদেনের কোনো সুযোগ নেই।' গ্রাহকরা সিএসইর ট্রেড ওয়ার্ক স্টেশনের সামনে বসেই শেয়ার কেনাবেচা করেছে বলে জানালে তিনি বলেন, এটি সম্ভব নয়। তারপরও অভিযোগ খতিয়ে দেখবেন তারা।

সিএসইর এ কর্মকর্তা আরও জানান, ফার্স্টলিডের যেসব গ্রাহক তাদের শেয়ার থাকার প্রমাণ দিতে পেরেছেন, তাদের কয়েকজনকে লিংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অন্য ব্রোকারেজ হাউসে শেয়ার সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, পরিদর্শনে গিয়ে ২০১৭ সালে ব্রোকারেজ হাউসটির সিলেট শাখার গ্রাহকদের ৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকার ঘাটতি পেয়েছিল সিএসই। এ অর্থ ও শেয়ার ফিরিয়ে না দিলে লাইসেন্স বাতিল করবে বলে ২০১৯ সালের জুলাই মাসে সতর্ক করে বিএসইসি। এর পরও সমুদয় অর্থ পরিশোধ না করায় গত বছরের আগস্টে ব্রোকারেজ হাউসটির লাইসেন্স স্থগিত করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। একই সঙ্গে ১৫ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে অবহিত করতে সিএসইকে নির্দেশ দিয়েছিল বিএসইসি।