কর দেওয়ার মতো আয় না থাকলেও ব্যাংক থেকে ৫ লাখ টাকার বেশি ঋণ বা ক্রেডিট কার্ড নিতে আয়কর রিটার্ন দাখিলের ডকুমেন্ট জমার বাধ্যবাধকতা আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে এবারের বাজেটে। এ প্রস্তাব কার্যকর হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। এর ফলে ডিজিটাল লেনদেনও বাধাগ্রস্ত হবে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন নতুন উদ্যোক্তারা। তাঁরা ব্যাংক থেকে ঋণ না নিয়ে উচ্চ সুদের এনজিও কিংবা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের দিকে ঝুঁকবেন। আবার ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্রঋণ দিতে এজেন্ট ব্যাংকিং, উপশাখার মতো যে নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে, তাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করেন সংশ্নিষ্টরা।
ব্যাংকাররা জানান, ব্যাংকগুলো এখন ক্ষুদ্রসহ যে কোনো ঋণে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদ নিতে পারে। আর এনজিওগুলো নিতে পারে ২৭ শতাংশ পর্যন্ত। এক সময় প্রান্তিক পর্যায়ে ছোট ঋণের বেশিরভাগই আসত বিভিন্ন এনজিও থেকে। মূলত শাখা খোলার খরচ বিবেচনায় ব্যাংকগুলো আগে প্রান্তিক পর্যায়ে যেত না। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় এখন কম লোকবল ও যেনতেন সাজসজ্জায় উপশাখা, এজেন্ট ব্যাংকিং খুলে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিচ্ছে। যে কারণে ক্ষুদ্র পর্যায়ের উৎপাদক, স্টার্টআপ, দোকানিসহ বেশিরভাগই এখন ব্যাংকমুখী। এখন করযোগ্য আয় না থাকলেও ৫ লাখ টাকার বেশি ঋণের জন্য আয়কর বিবরণী দাখিলের বাধ্যবাধকতা আরোপের ফলে অনেকে ব্যাংকে যেতে নিরুৎসাহিত হবেন। উদ্যোক্তা হওয়ার পরিবর্তে সবাই চাকরির দিকে ঝুঁকবেন। ফলে বেকারত্ব সমস্যা বাড়বে।
ব্যাংক এশিয়ার প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরফান আলী সমকালকে বলেন, আয়কর বিবরণী বা রিটার্ন দাখিলের বিষয়টি মানুষের আয়ের সঙ্গে নির্ধারিত। কার কত আয়, তা না দেখে ৫ লাখ টাকার বেশি ঋণ নিতে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করলে ক্ষুদ্র পর্যায়ের গ্রাহকরা ব্যাংক থেকে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে চলে যাবেন। কম পুঁজি বিনিয়োগ করে ঋণের মাধ্যমে যেসব স্টার্টআপ গড়ে উঠছে, তারা বাধাগ্রস্ত হবে।
ব্যাংকাররা জানান, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের ৬০ শতাংশ ঋণই বিতরণ করা হয় গ্রামীণ এলাকায়। এতে করে প্রান্তিক পর্যায়ের পিছিয়ে পড়াদের মধ্যে ব্যাপক আর্থিক অন্তর্ভুক্তি হচ্ছে। ঘরের কাছে শাখা, উপশাখা বা এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ফলে আগে কখনও ব্যাংকে আসতেন না- এমন অনেকে ব্যাংকে যাচ্ছেন। জাতীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কৌশল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০২৬ সালের মধ্যে সবার অন্তত একটি অ্যাকাউন্ট খোলার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হবে।
সংশ্নিষ্টরা জানান, কোনো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কিংবা করযোগ্য আয়সীমার নিচে থাকা কোনো ব্যক্তির হয়তো হঠাৎ করে ৫ লাখ টাকার বেশি ঋণের প্রয়োজন হলে ঋণ আবেদনের পাশাপাশি টিআইএন সংগ্রহ, রিটার্ন দাখিল সম্পন্ন করা সময়সাপেক্ষ হবে। এত ঝামেলায় না গিয়ে তখন কম আয়ের লোকজন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে যাবে। আর্থিক খাতের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের যে উদ্যোগ সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে তা বাধার মুখে পড়বে। আবার ডকুমেন্টের ঘাটতির কারণে কেউ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে গেলে সরকার আবগারি শুল্ক্ক থেকে বঞ্চিত হবে। এ ছাড়া অনলাইনে ইটিআইএনের সঠিকতা যাচাইয়ের সুযোগ থাকলেও রিটার্ন যাচাইয়ের সুযোগ নেই। যে কারণে কেউ ভুয়া ডকুমেন্ট দিলেও ধরার উপায় থাকবে না। আর চিঠি দিয়ে যাচাই করা অনেক সময়সাপেক্ষ।
ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে কেনাকাটা
ও বিল পরিশোধে ব্যাংকগুলো নানা ছাড় দিয়ে আসছে। নানা
প্রোমোশান অফারের মাধ্যমে গ্রাহক আকর্ষণ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে একদিকে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে লেনদেন বাড়ছে। আবার সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে
অনেক ব্যাংক মাসিক আয় ১৮ হাজার টাকা হলেই ক্রেডিট কার্ড
দিচ্ছে। তবে ট্যাক্স রিটার্ন ডকুমেন্টের বাধ্যবাধকতা কার্যকর হলে অনেক গ্রাহক ক্রেডিট কার্ড নিতে পারবেন না। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার আলোকে ফ্রিল্যান্সারদের ক্রেডিট কার্ড দেয় অনেক
ব্য্যাংক। এ ধরনের বাধ্যবাধকতার ফলে তাঁদের আর ক্রেডিট কার্ড দিতে পারবে না। সামগ্রিকভাবে নগদ লেনদেন কমাতে সরকারের চলমান উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হবে।