বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংগঠন ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই) ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে ২০ শতাংশ হারে করপোরেট কর সুবিধা পাওয়ার জন্য যেসব শর্ত প্রস্তাব করা হয়েছে, অর্থ বিল পাসের সময় সেগুলো সংশোধনের সুপারিশ করেছে। সংগঠনটি বলেছে, করপোরেট কর কমানো হলেও শর্তযুক্ত থাকায় গুটিকয়েক কোম্পানি এ সুবিধা পাবে।
গতকাল বুধবার রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনে এক সংবাদ সম্মেলনে বাজেটের ওপর সংগঠনের অবস্থান তুলে ধরেন এফআইসিসিআই সভাপতি ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, বাংলাদেশের সিইও নাসের এজাজ বিজয়। তিনি বলেন, হ্রাসকৃত করপোরেট করের সুবিধা নিতে আইপিওর মাধ্যমে ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার পুঁজিবাজারে থাকার শর্ত সংশোধন করে কমপক্ষে ১০ শতাংশ শেয়ার জনগণের হাতে রাখার শর্ত দেওয়া যেতে পারে। সব লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলে করার শর্ত তুলে দিয়ে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ লেনদেনের শর্ত দেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া ১২ লাখ টাকার বেশি খরচ ব্যাংকিং চ্যানেলে করার বাধ্যবাধকতার প্রস্তাব প্রত্যাহার করে করপোরেট খরচের নূ্যনতম ১০ শতাংশ খরচ ব্যাংকবহির্ভূত চ্যানেলে করার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।
ভ্যাট কর্মকর্তাদের যে স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তা সংশোধন করার সুপারিশ এসেছে এফআইসিসিআইর পক্ষ থেকে। সংগঠনটি বলেছে, দেশে কর দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কর কর্মকর্তাদের এ ক্ষমতা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এসএমই খাতের সম্প্রসারণে উদ্যোগ নেওয়ারও সুপারিশ এসেছে।
নাসের এজাজ বিজয় বলেন, সামগ্রিকভাবে বাজেট ব্যবসাবান্ধব হয়েছে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে এমন সব বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে, যেগুলো কার্যকর হলে বহুজাতিক কোম্পানির প্রবৃদ্ধির গতি ধীর হয়ে যেতে পারে। এতে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে। করপোরেট কর ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমানো হলেও নানা শর্তের কারণে কার্যকর কর ২১ থেকে ২৬ দশমিক ২৬ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে যাবে।
বিদেশে থাকা অর্থ দেশে আনা বা আয়কর রিটার্নে প্রদর্শনে দায়মুক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনোভাবেই এ প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয়। এতে নিয়মিত করদাতাদের নিরুৎসাহিত করে কর ফাঁকিবাজ বা অর্থ পাচারকারীরা উৎসাহিত হবে। পদ্মা সেতুর সুফল বিষয়ে তিনি বলেন, এতে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে। কর্মসংস্থান বাড়বে। দেশের অর্থনীতিকে পাল্টে দেবে এ সেতু।
এফআইসিসিআইর সাবেক সভাপতি রূপালী হক চৌধূরী বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে কমপ্লায়েন্স কোম্পানির কর দেওয়া জটিল করে তোলা হয়েছে। ফলে নতুন সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে না। অর্থনৈতিক অঞ্চলেও বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে না। কিন্তু কর্মসংস্থানের জন্য বিনিয়োগ দরকার। ফিকি সব সময়ই নীতির ধারাবাহিকতা চেয়ে আসছে।
এফআইসিসিআইর আরেক সাবেক সভাপতি শেহজাদ মুনিম বলেন, দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে রয়েছে। মহাসড়কে গতি দরকার। কিন্তু কিছু উদ্যোগ মহাসড়কে স্পিড ব্রেকারের মতো হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তিনি করপোরেট করের শর্ত এবং শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে অর্থ দেওয়ার নিয়ম পরিবর্তনের সুপারিশ করেন।
স্নেহাশীষ মাহমুদ অ্যান্ড কোম্পানির পার্টনার স্নেহাশীষ বড়ূয়া অনুষ্ঠানে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ডের (ডব্লিউপিপিএফ) ব্যয়ের ওপর কর দিতে হবে। বাজেটে বলা হয়েছে, কর-পরবর্তী মুনাফা থেকে ডব্লিউপিপিএফে টাকা দিতে হবে। এতে কোম্পানির কার্যকর কর হার বাড়িয়ে দেবে। তিনি কর-পূর্ববর্তী মুনাফা থেকে এ টাকা নেওয়ার সুপারিশ করেন। একই সঙ্গে ভ্যাট কর্মকর্তাদের ৫০ লাখ টাকার জরিমানা করার ক্ষমতা এবং মোবাইল ফোনের বিক্রি পর্যায়ে ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেন।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে এফআইসিসিআইর কর কমিটির চেয়ারম্যান দীপাল আভায়বিক্রমা এবং কমিটির সমন্বয়ক সাজ্জাদ রহিম বক্তব্য দেন। দীপাল আভায়বিক্রমা বলেন, বাজেটে কর খাতে কিছু ইতিবাচক সংস্কার থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে এমন সব নিয়ম চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে, যা কার্যকর হলে কমপ্লায়েন্স প্রতিষ্ঠানে জটিলতা সৃষ্টি করবে।