ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের জিএসপি প্লাস সুবিধা পেতে চাইলে দেশের বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও সংসদকে শক্তিশালী করাসহ উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতি আমলে নিতে হবে। এটি পেতে বাংলাদেশকে জাতিসংঘের ৩০টিরও বেশি সনদে সই করতে হবে। এর মধ্যে দুর্নীতিবিরোধী সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এসব কথা বলেছেন বাংলাদেশ সফররত ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বাণিজ্যবিষয়ক প্রতিনিধি দলের প্রধান হেইদি হাওতালা।

মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে কূটনৈতিক সংবাদদাতাদের সংগঠন ডিক্যাবের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।  ‘ডিক্যাব টক’-এ হেইদি হাওতালা ছাড়াও রেপোর্টিয়ার ম্যাপিমিলিয়ান ক্রাহ সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। এ সময় ঢাকার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াটলি উপস্থিত ছিলেন।  ডিক্যাব টক পরিচালনা করেন সংগঠনের সভাপতি রেজাউল করিম লোটাস।

হেইদি হাওতালা বলেন, বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, নাগরিক সমাজের মতামত প্রকাশের সুযোগ সংকুচিত করাসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে ইইউর উদ্বেগ রয়েছে। 

জিএসপি প্লাস পেতে কোন প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন- এ প্রশ্নের উত্তরে হেইদি হাওতালা বলেন, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে হবে। বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও সংসদকে শক্তিশালী করা ছাড়া দেশের মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। ইইউ এ বিষয়ে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছে। বাংলাদেশই একমাত্র দেশ নয়, যাদের এসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ইইউভুক্ত দেশেও এ ধরনের সমস্যা রয়েছে। হাঙ্গেরি, পোল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশ তাদের বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে। জিএসপি প্লাস পেতে বাংলাদেশকে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। এ জন্য বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত ইইউ। 

জিএসপি পর্যালোচনা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে হেইদি হাওতালা বলেন, বর্তমানে আমরা এটি পর্যালোচনার মধ্যেই রয়েছি। এবারের পর্যালোচনার পর ২০২৯ সাল পর্যন্ত জিএসপির পর্যালোচনা আর হবে না।

প্রারম্ভিক বক্তব্যে প্রতিনিধি দলের প্রধান বলেন, শ্রম আইনের পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশে স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রয়োজন। শ্রম আদালত সেই পদক্ষেপের একটি অংশ। শ্রম আইনের বাস্তবায়নের জন্য সত্যিকারের স্বাধীন ও কার্যকরী বিচার ব্যবস্থা গড়ে তোলার অর্থ হচ্ছে বিচারকদের স্বাধীনতা ও দীর্ঘ মেয়াদে দেশের মানুষের সমৃদ্ধির জন্য একটি পদক্ষেপ।

বাংলাদেশের কর্মপরিবেশ মূল্যায়ন সম্পর্কে জানতে চাইলে হেইদি হাওতালা বলেন, রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর কর্মপরিবেশের যথেষ্ট উন্নয়ন হয়নি। ভবন ও অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি সংশোধন করা হয়েছে। তবে কর্মপরিবেশের নিরাপত্তার বিষয়টিতে ক্রমাগত গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। 

বাংলাদেশে শ্রম আইনের পূর্ণ বাস্তবায়নে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ আছে- মন্তব্য করে তিনি বলেন, মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা গেলেই শ্রম অধিকারের পর্যাপ্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করা যাবে। জিএসপি প্লাসের মৌলিক শর্তের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মানবাধিকার নিশ্চিত করা।

হেইদি হাওতালা বলেন, সুশীল সমাজের মতপ্রকাশের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ থাকতে হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে তাদের উদ্বেগ রয়েছে। এর সঙ্গে সাংবাদিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা জড়িত। আইনমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় জানা গেছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধনের প্রক্রিয়া চলছে।

রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইইউ বাংলাদেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে কোনো প্রস্তাব করেনি। রাশিয়া ইস্যুতে যে পরিস্থিতি বিশ্বে সৃষ্টি হয়েছে, তার জন্য পশ্চিমাদের দোষ দেওয়া হয়, এটি ভুল ধারণা। এ পরিস্থিতির মূল কারণ হচ্ছে, আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক বিষয়গুলো রক্ষা করা। একটি শান্তিপূর্ণ সার্বভৌম দেশে আগ্রাসন চালানো হয়েছে। দিন শেষে নিষেধাজ্ঞা একটি মাধ্যম, যা দিয়ে সংঘাত বন্ধ করা সম্ভব। হয়তো দখলকারী তার স্থান থেকে সরে আসবে।

গত ১৭ জুলাই ঢাকা আসে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ৬ সদস্যের বাণিজ্যবিষয়ক প্রতিনিধি দল। তৈরি পোশাক শিল্পের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ, শ্রম সংগঠন, সুশীল সমাজ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, শ্রম মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি এবং জাতীয় সংসদের স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন তারা। বুধবার টেপটাইল ও ওষুধ প্রস্তুতকারী কারখানা পরিদর্শন শেষে সন্ধ্যায় প্রতিনিধি দলের ঢাকা ত্যাগ করার কথা।