ঢাকা শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪

ইউক্রেন সংকট

পরমাণু যুদ্ধ কি আসন্ন

পরমাণু যুদ্ধ কি আসন্ন

ইলিয়াস হোসেন

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ১৩ অক্টোবর ২০২২ | ১৪:০৩

যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট কয়েক দশক ধরে পরমাণু অস্ত্রের কোড বহনকারী ব্রিফকেস সার্বক্ষণিক সঙ্গে রাখলেও কখনও তা ব্যবহার করেননি। ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে এবার কি সভ্যতাবিনাশী এই মারণাস্ত্রের ব্যবহার হতে যাচ্ছে?
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিনের কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের হুমকির পর এ প্রশ্ন এখন সবার মনে উঁকি দিচ্ছে। এর নিশ্চিত উত্তর জানা নেই কারোরই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউক্রেনে প্রচলিত অস্ত্র ব্যবহার করে রাশিয়া রণাঙ্গনে বিপর্যয়ের মুখোমুখি হওয়ায় পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি নিতে পারে। যেমন কয়েক দিন ধরে ইউক্রেনের বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে রাশিয়া।

অবশ্য পশ্চিমা ঊর্ধ্বতন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা বলেছেন, রাশিয়ার পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের কোনো লক্ষণ তাঁরা দেখছেন না। এখন পর্যন্ত রুশ পরমাণু অস্ত্র স্থানান্তরের কোনো আলামতও তাঁরা পাননি। একই কথা বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং ন্যাটো মহাসচিব জেনস স্টলটেনবার্গ।

রাশিয়া এ নিয়ে পরস্পরবিরোধী কথা বলছে। পুতিনের হুমকির পর ক্রেমলিনের মুখপাত্র পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা কার্যত নাকচ করে দিলেও সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার দেশটির একজন শীর্ষস্থানীয় জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেছেন, ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে।

এসব হুমকি সত্ত্বেও বিশেষজ্ঞরা পরমাণু যুদ্ধ এড়ানোর ব্যাপারে আশাবাদী। তাঁরা বলছেন, স্নায়ুযুদ্ধের প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত দুই দেশই সংযত হতে পারে। তাঁরা এ ক্ষেত্রে প্রায় ৬০ বছর আগে কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের কথা উল্লেখ করেছেন। কিউবাকে ঘিরে তখন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পরমাণু যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছলেও শেষ পর্যন্ত উভয় দেশই স্বাভাবিক পরিস্থিতির দিকে ফিরে আসে।
রাশিয়া কী চায় :এটা স্পষ্ট নয়- ইউক্রেনে কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করে রাশিয়ার কী লাভ হবে। যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ অধ্যয়ন ইনস্টিটিউট (আইএসডব্লিউ) বলেছে, ইউক্রেনকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করা কিংবা পশ্চিমা সহায়তা বন্ধের জন্য চাপ দিতে পুতিন কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুতিন শুরুতে বালটিক অথবা কৃষ্ণ সাগরে হামলা চালিয়ে সামরিক সক্ষমতার জানান দিতে পারেন। অথবা তিনি ইউক্রেনীয় সামরিক ঘাঁটিতেও হামলার নির্দেশ দিতে পারেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিউজউইককে বলেছেন, রাশিয়া সব উপায়ে যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে। পশ্চিমা অস্ত্রের সাহায্যে ইউক্রেন সাফল্য পাচ্ছে। ফলে কিয়েভ তার অবস্থানে কঠোর হয়েছে- রাশিয়াকে অবশ্যই সমস্ত ইউক্রেনীয় অঞ্চল ছেড়ে দিতে হবে। এতে পুতিনের জন্য আলোচনার দরজা সংকুচিত হচ্ছে। ইউক্রেনের সাফল্য এবং রাশিয়ার ভেতরে পুতিনের বিরোধিতা দেশটির জাতীয় সংহতিকে বিপন্ন এবং রুশ নেতাকে আরও কোণঠাসা করে ফেলেছে। ফলে পুতিন দেশের এবং নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এ ছাড়া ইউক্রেন ক্রিমিয়া দখলের চেষ্টা করলেও রাশিয়া এ অস্ত্র প্রয়োগ করতে পারে। কারণ ক্রিমিয়া রাশিয়ার কাছে কৌশলগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব লয়েড অস্টিন বলেছেন, পেন্টাগন এখনও প্রমাণ পায়নি- পুতিন পারমাণবিক অস্ত্র প্রয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে এটি করার সিদ্ধান্ত শুধু রুশ নেতার। অস্টিন বলেন, পুতিনের ওপর কারও নিয়ন্ত্রণ নেই। তিনি যেভাবে ইউক্রেনে হামলা করার দায়িত্বজ্ঞানহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, একইভাবে তিনি আরেকটি সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

ইউএস আর্মি ওয়ার কলেজের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের গবেষক অধ্যাপক জন আর. ডেনি ফরেন পলিসিতে লিখেছেন, পুতিন এমনকি শুধু প্রদর্শনমূলক উদ্দেশ্যে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করলেও তিনি সম্ভবত ন্যাটোকে আরও ঐক্যবদ্ধ করবেন এবং ইউরোপে তাঁর অবশিষ্ট বন্ধুদের হারাবেন। তিনি সম্ভবত চীন, ভারত এবং বিশ্বের অন্যান্য অংশেরও বিরাগভাজন হবেন।

অবশ্য পুতিনের সাম্প্রতিক হুমকি সত্ত্বেও রাশিয়া বলেছে, তারা পারমাণবিক যুদ্ধ এড়াতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা গত ৬ অক্টোবর সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেন, 'মস্কো সম্পূর্ণ মাত্রায় পারমাণবিক যুদ্ধের সুযোগ না দেওয়ার নীতিতে অটল। আমরা এটা বহুবার বলেছি এবং নিশ্চিত করেছি। এ ধরনের যুদ্ধে কেউ বিজয়ী হবে না।'

তবে গতকাল রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের ডেপুটি সেক্রেটারি আলেকজান্ডার ভেনেডিক্টভ বলেছেন, ইউক্রেন মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো সামরিক জোটে যোগ দিলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে :প্রেসিডেন্ট বাইডেন মঙ্গলবার সিএনএনকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন না যে রুশ নেতা ইউক্রেন যুদ্ধে কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেবেন। ন্যাটো মহাসচিব জেনস স্টলটেনবার্গ বলেছেন, পুতিনের হুমকির পর এ সামরিক জোট রাশিয়ার পারমাণবিক অবস্থানে কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করেনি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে কী জবাব দেবে জানতে চাইলে বাইডেন বলেন, সে ক্ষেত্রে চূড়ান্ত যুদ্ধের (আরমাগেডন) আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, রাশিয়া পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করলে দেশটি বিশ্বে আরও বেশি একঘরে হয়ে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান গত মাসে বলেছিলেন, বাইডেন প্রশাসন রাশিয়াকে বিপর্যয়কর পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছে।

এদিকে ইউক্রেনের যুদ্ধ নিয়ে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে ন্যাটো আগামী সপ্তাহে দীর্ঘপরিকল্পিত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের মহড়া করতে যাচ্ছে। এতে পারমাণবিক ওয়ারহেড বহনে সক্ষম ফাইটার জেট অংশ নেবে। ৩০টি ন্যাটো সদস্য দেশের মধ্যে ১৪টি এ মহড়ায় অংশ নেবে।

কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র কী :কৌশলগত পরমাণু অস্ত্রকে কখনও কখনও ছোট পরমাণু হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। এগুলোও প্রাণহানি এবং ধ্বংসের কারণ হয়ে থাকে। এ অস্ত্র দূর থেকে শহরকে ধ্বংস করার পরিবর্তে কমান্ড পোস্টের মতো অপেক্ষাকৃত কাছাকাছি নির্দিষ্ট লক্ষ্যগুলোর বিরুদ্ধে সীমিত হামলার জন্য তৈরি করা হয়েছে।

কৌশলগত পরমাণু অস্ত্রে এক কিলো টন থেকে প্রায় ১০০ কিলো টন পর্যন্ত বিস্ম্ফোরক থাকতে পারে। অন্যদিকে প্রচলিত পারমাণবিক অস্ত্রে এক হাজার কিলোটন পর্যন্ত বিস্ম্ফোরক থাকে। ১৯৪৫ সালে হিরোশিমা এবং নাগাসাকি ধ্বংসকারী বোমায় ১২ থেকে ২১ কিলো টনের মতো বিস্ম্ফোরক ছিল। হিরোশিমায় ফেলা বোমাটির ওজন ছিল ৯,৭০০ পাউন্ড এবং নাগাসাকিকে ধ্বংস করেছিল ১০ হাজার ৮০০ পাউন্ড ওজনের বোমা।

এখন পর্যন্ত যুদ্ধে কেউ কখনও কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করেনি। যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন স্নায়ুযুদ্ধের প্রথম দিকে এগুলো তৈরি করেছিল।
একটি কৌশলগত ছোট পরমাণু অস্ত্র ওয়াশিংটন ডিসির আশপাশে নিক্ষেপ করা হলে ৩,২৭০ জন নিহত এবং ৩,৬২০ জন আহত হতে পারেন বলে একজন বিশেষজ্ঞ হিসাব করে দেখিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী রাশিয়ার কাছে ২,০০০ কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র রয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের আছে ২০০-এর কিছু বেশি।

রহস্যময় ব্রিফকেস :প্রেসিডেন্ট বাইডেন যেখানেই যান, তাঁর সঙ্গে একটি রহস্যময় ব্রিফকেস থাকে। এই কালো ব্রিফকেসটির সভ্যতাকে ধ্বংস করার ক্ষমতা রয়েছে। 'স্যাচেল' নামে পরিচিত চামড়ার এ পাত্রটি 'পারমাণবিক ফুটবল' নামে বেশি পরিচিত। প্রেসিডেন্ট পুতিনেরও এ রকম ব্রিফকেস রয়েছে।

পর্যায়ক্রমে ছয়জন সহযোগীর একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের ব্রিফকেসটি বহন করেন। এটি কৌশলগত মোবাইল প্রতিরক্ষা হাব হিসেবে কাজ করে। প্রেসিডেন্ট হোয়াইট হাউসের কমান্ড সেন্টার থেকে দূরে থাকাকালে পারমাণবিক হামলার অনুমোদন দিলে ব্রিফকেসটি কাজে লাগবে। প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ারের পর থেকে প্রত্যেক মার্কিন নেতাই ব্রিফকেসটি নিয়ে ভ্রমণ করেন।

ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয়, মার্কিন পরমাণু ফুটবলের ভেতরে পরমাণু উৎক্ষেপণের জন্য বোতাম রয়েছে। বাস্তবে তেমনটা নেই।

রাশিয়ার পোর্টেবল নিউক্লিয়ার ব্রিফকেসটি 'চেগেট' নামে পরিচিত। রাশিয়ার ককেশাস অঞ্চলের একটি পর্বতের নামে এর নামকরণ করা হয়েছে। চেগেটও সব সময় পুতিনের পাশে থাকে। এই ব্রিফকেসটি প্রথম ১৯৮৩ সালে ব্যবহার করা হয়।
কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সংকট থেকে শিক্ষা :কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন বিপজ্জনকভাবে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল।

১৯৬২ সালের ১৪ অক্টোবর একটি মার্কিন গুপ্তচর বিমান কিউবায় নির্মাণাধীন সোভিয়েত ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের সাইটের ছবি ধারণ করে। কিউবা থেকে উৎক্ষেপণ করা ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখে আঘাত হানতে সক্ষম। জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি কিউবার বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ আরোপ করেন। এতে সোভিয়েত পারমাণবিক অস্ত্র ক্যারিবীয় দ্বীপে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। কেনেডি দাবি করেন, সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী (পরে প্রেসিডেন্ট) নিকিতা ক্রুশ্চেভকে কিউবা থেকে পরমাণু অস্ত্রগুলো সরিয়ে ফেলতে হবে। ক্রুশ্চেভ এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেন।

এ নিয়ে উত্তেজনা বাড়তে থাকলে ২৬ অক্টোবর কিউবার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী (পরে প্রেসিডেন্ট) ফিদেল কাস্ত্রো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হামলার করার জন্য ক্রুশ্চেভকে চিঠি লিখেছিলেন। ২৭ অক্টোবর সোভিয়েত বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র কিউবার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া একটি মার্কিন গুপ্তচর বিমানকে গুলি করে।

যুদ্ধ আসন্ন বুঝতে পেরে কেনেডি এবং ক্রুশ্চেভ সমঝোতার পথ বেছে নেন। কেনেডি তুরস্ক থেকে মার্কিন মাঝারিপাল্লার পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র অপসারণ করতে সম্মত হন। এগুলো সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূখণ্ডে আঘাত হানতে সক্ষম ছিল। বিনিময়ে ক্রুশ্চেভও কিউবা থেকে মিসাইল অপসারণে সম্মত হন।

এবারও ইউক্রেনকে ঘিরেও উভয়পক্ষ সংযত হয়ে শান্তির পথে ফিরবে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ আশাবাদী।





আরও পড়ুন

×