জলবায়ু চুক্তির রূপরেখা অনুমোদন

প্রকাশ: ০৬ ডিসেম্বর ২০১৫      

আলতাব হোসেন

জলবায়ু নিয়ে আলোচনায় একধাপ অগ্রগতি হয়েছে। প্যারিস সম্মেলনে ১৯৫টি দেশের প্রতিনিধিরা বিশ্বকে রক্ষায় একটি চূড়ান্ত চুক্তির লক্ষ্যে আলোচনার রূপরেখা অনুমোদন করেছেন। গতকাল এই খসড়া দলিল বিতরণ করা হয়েছে। আগামীকাল শুরু হতে যাওয়া মন্ত্রিপর্যায়ের বৈঠকে এটি নিয়ে আলোচনা হবে একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির লক্ষ্যে। ৪৮ পাতার দলিলে কার্বন নিঃসরণ কমানো, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহায়তা দেওয়াসহ বিভিন্ন বিষয় রয়েছে। এই দলিল নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সম্মেলনের সভাপতি ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লঁরা ফেবিয়াস রূপরেখা অনুমোদনের জন্য শনিবার দুপুর পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। তবে এ সম্মেলনের সাফল্য নির্ভর করছে শিল্পোন্নত দেশগুলো দরকষাকষিতে কতটুকু ছাড় দেয় তার ওপর।

প্যারিস সম্মেলনে এ পর্যন্ত আলোচনায় গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের একশ' বিলিয়ন ডলার ঋণ, না ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া হবে তা নিয়ে ধনী ও গরিব দেশগুলোর মধ্যে রশি টানাটানি চলছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়, একশ বিলিয়ন ডলার ঋণ হিসেবে দেওয়া হলে তা অনুদান হবে না, বরং তা হবে বিনিয়োগ। উন্নত দেশগুলো চাইছে এ অর্থ স্বল্পসুদে ঋণ হিসেবে গছিয়ে দিতে। শিল্পোন্নত দেশগুলোর এমন হঠকারী প্রস্তাবে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিরা। তাদের মতে, যেহেতু শিল্পোন্নত দেশগুলোর দূষণের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনে বিরূপ প্রভাব পড়েছে, সেহেতু এ অর্থ তাদের অনুদান হিসেবে দিতে হবে। কার্বন নিঃসরণ কমানো নিয়েও গড়িমসি করছে শিল্পোন্বত দেশগুলো।

স্বল্পোন্নত দেশগুলো বলেছে, গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের অর্থ ঋণ হিসেবে দেওয়া হলে তা অনুন্নত ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য বিশাল বোঝা হবে। অথচ এ দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য মোটেও দায়ী নয়। গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডে (জিসিএফ) ফ্রান্স, রাশিয়া, কানাডা, ব্রাজিল, চীন, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ ৩৭টি দেশ অর্থ প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে। তহবিলে ইতিমধ্যে ১০ বিলিয়ন ডলার জমা পড়েছে। এ অর্থের ৫২ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা হয়েছে। এ অর্থকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখছে এসব প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে জার্মানি ও রাশিয়া সবুজ জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বলছে। পরিবেশবাদীরা বলছেন, এসব দেশ তাদের পুরনো প্রযুক্তি উন্নয়নশীল দেশে স্থানান্তর ও প্রযুক্তি বিক্রির ফন্দি করছে। এ নিয়ে বাণিজ্য শুরু করেছে কয়েকটি শিল্পোন্নত দেশ। লস অ্যান্ড ড্যামেজ ও জিসিএফ নিয়ে ষড়যন্ত্র বন্ধ করতে বিভিন্ন এনজিও গতকালও সম্মেলন কেন্দ্রের সামনে বিক্ষোভ করেছে।

অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) গতকাল এক প্রতিবেদনে বলেছে, জিসিএফ-এ ১০০ বিলিয়ন ডলার দিতে দাতারা ঐকমত্যে পেঁৗছালেও এ অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হবে সে বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি তারা। এ নিয়ে শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট অ্যানেক্স-১, উদীয়মান অর্থনীতির জোট বেসিক ও স্বল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলোর জোট এলডিসি, ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জোট এওসিস ও আফ্রিকান ইউনিয়নের সম্মিলিত জোট তর্কে জড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক বিশেষ দূত টওড স্ট্রোন বলেছেন, একশ বিলিয়ন ডলার অর্থ সংগ্রহের ব্যাপারে দাতা দেশগুলোর সাড়া ইতিবাচক। তবে কোন দেশ কোন বিবেচনায় এ তহবিল থেকে কী পরিমাণ অর্থ পাবে তা স্পষ্ট করা হয়নি।

প্যারিস সম্মেলনের জন্য বাংলাদেশ যে অবস্থানপত্র জমা দিয়েছে তাতে বাংলাদেশ ঋণ নয়, অনুদান হিসেবে এ অর্থ দেওয়ার দাবি করছে। এ বিষয়ে পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, 'এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশ দায়ী নয়। উন্নত বিশ্বের ভোগ-বিলাসিতার জন্য আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। তাই এ খাতে আমরা ঋণ চাই না, উন্নত বিশ্বকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে সবুজ তহবিলের অর্থ দিতে হবে।' তিনি বলেন, জলবায়ু সম্মেলনে এবার বাংলাদেশ অর্থায়ন ইস্যুতে জোরালো দাবি তুলেছে। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু গতকাল যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সমন্বয়ক ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ সমকালকে বলেন, প্যারিসে আলোচনার ধরন দেখে মনে হচ্ছে, এখানে কিছু হবে না। সবুজ জলবায়ু তহবিল নিয়ে শিল্পোন্নত দেশগুলো টালবাহানা করছে। অথচ কানকুন ফ্রেমওয়ার্ক ও ডারবান প্ল্যাটফর্ম অনুযায়ী বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার কথা থাকলেও তারা এ পর্যন্ত ১০ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে। তাও এ অর্থ কীভাবে ব্যয় হবে, তার কোনো নির্দেশনা দিচ্ছে না। তারা এ অর্থকে ঋণ হিসেবে গছানোর চেষ্টা করছে।

জাম্বিয়ার পরিবেশমন্ত্রী ওসমান জারজু বলেন, উন্নত বিশ্ব জলবায়ু তহবিলের অর্থ ঋণ হিসেবে গছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এ অর্থ ঋণ হিসেবে নিতে হলে তা গরিব দেশগুলোর জন্য বোঝা হবে। উন্নত বিশ্বকে এ অর্থ অনুদান হিসেবে দিতে হবে। জাতিসংঘের মাধ্যমে এ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হোক।

শিল্পোন্নত দেশগুলোর পক্ষে বলা হচ্ছে- এ অর্থ ব্যয়ের প্রক্রিয়া যদি উন্নত দেশগুলোর হাতে ছেড়ে দেওয়া হয় তাহলে তা হবে আত্মঘাতী। এ বিষয়ে বেসরকারি সংস্থা অক্সফামের পরামর্শক জান কাওয়াজলিক বলেছেন, স্বল্পোন্নত দেশগুলো এ অর্থ কীভাবে ব্যয় করবে তা নজরদারির প্রয়োজন আছে।

গতকাল ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের পক্ষ থেকে শিল্পোন্নত দেশগুলোর আর্থিক প্রতিশ্রুতি ও ব্যয়ের ত্রুটি তুলে ধরা হয়েছে। টিআই দাবি করেছে, প্রতিশ্রুত অর্থ ব্যয়ে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা না থাকলে এ নিয়ে বড় ধরনের দুর্নীতি ঘটবে। অনুষ্ঠানে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের সুমাইয়া খায়ের ও জাকির হোসেন খানও বক্তব্য রাখেন।

গতকাল সম্মেলন কেন্দ্রের একটি কক্ষে 'জলবায়ু উদ্বাস্তু :অধিকার ও দায়িত্ব' শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কারণে বাস্তুচ্যুতদের মানবাধিকার রক্ষার দাবি তুলেছেন। কোস্ট ট্রাস্টের প্রধান রেজাউল করিম চৌধুরীর সঞ্চালনায় সেমিনারে ড. হাছান মাহমুদ এমপি, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ দূত এনটুনিও গ্রেরার্ড, মালিয়ান টারর্ড, অধ্যাপক ওয়ালটার ক্যালিং প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে আলোচনায় গতি আনতে আজ বিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আগামীকাল মন্ত্রীপর্যায়ের বৈঠক শুরু হবে। গতকাল পর্যন্ত ১২৯ দেশের মন্ত্রী সম্মেলনে পেঁৗছেছেন।