আজ ফল প্রকাশ

মোদি না রাহুলের 'আচ্ছে দিন'

প্রকাশ: ২৩ মে ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সমকাল ডেস্ক

বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে মোদিঝড় এখনও কি আগের মতোই শক্তিশালী? নাকি অলৌকিকভাবে আবার ক্ষমতায় ফিরবে দেশটির প্রাচীনতম দল কংগ্রেস ও তার মিত্ররা? এ প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে ভূ-ভারতের শতকোটি মানুষের অন্তরে। আজ বৃহস্পতিবারই অবসান হতে যাচ্ছে এ নিয়ে সব জল্পনা-কল্পনার। আজ ভোট গণনা শেষে লোকসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণা করবে দেশটির নির্বাচন কমিশন। জানা যাবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বপদেই বহাল থাকছেন নাকি দিল্লির মসনদে বসছেন অন্য কোনো নেতা।

ভারতবাসীকে স্বপ্ন দেখাতে মোদি একসময় স্লোগান তুলেছিলেন 'আচ্ছে দিনের' (সুদিন সমাগত)। আজ কি মোদির সেই আচ্ছে দিন? নাকি সুদিন আসবে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীর?

সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে ৯০ কোটি ভোটারের মধ্যে প্রায় ৬০ কোটি ভোটার ভোট দিয়েছেন। সব ভোট গণনা শেষে আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশে সময় লাগতে পারে বলে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে। বিশেষ করে এবার ইভিএমের সঙ্গে ভিভিপ্যাটের হিসাব মেলানো হবে বলে ফল প্রকাশে বিলম্ব হতে পারে। গত নির্বাচনে দিনের মধ্যভাগেই ফলাফলের স্পষ্ট চিত্র পাওয়া গিয়েছিল।

সাত দফায় এই নির্বাচন শুরু হয় ১১ এপ্রিল, শেষ হয় গত রোববার। সেদিনই প্রকাশ করা হয় ১৪টি বুথফেরত সমীক্ষা। এর ১২টিতেই বলা হয়, মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। জরিপের গড় হিসেবে দেখা যায়, বিজেপি জোট লোকসভার ৫৪৩ আসনের মধ্যে ৩০২টি আসন পেতে পারে। আর কংগ্রেস জোট পেতে পারে ১২২ আসন। সরকার গঠনে প্রয়োজন ২৭২ আসন।

কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী এবং তার বোন ও কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বুথফেরত সমীক্ষাকে ভুয়া বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাদের কথার ভিত্তিও আছে। যেমন- ২০০৪ সালের নির্বাচনেই বুথফেরত সমীক্ষা মিথ্যা প্রমাণ করে ক্ষমতায় এসেছিল কংগ্রেস।

তবে বিশ্নেষকরা বলছেন, এবারের নির্বাচনে কংগ্রেস ২০১৪ সালের তুলনায় ভালো ফল করলেও বিজেপির তুলনায় বেশ পিছিয়ে থাকবে। কংগ্রেসের ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা ক্ষীণ। শিগগিরই কংগ্রেসের এই দুর্দিন কাটার সম্ভাবনা দেখছেন না রাজনৈতিক পণ্ডিতরা। খবর বিবিসি, এনডিটিভি, নিউইয়র্ক টাইমস, এএফপি ও আনন্দবাজার পত্রিকার।

মনে করা হয়েছিল দেশটির অর্থনীতি, কৃষকদের সংকট ও বেকার সমস্যা মোদির জয়রথ থামিয়ে দিতে পারে। তবে বুথফেরত সমীক্ষা বলছে, মোদিঝড়ে সেসব দুমড়েমুচড়ে গেছে। কংগ্রেস পার্টি ভারতে সংখ্যালঘু মুসলিম, খ্রিষ্টানসহ নানা ধর্ম-বর্ণের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে বলে দাবি করে থাকে। বিপরীতে বিজেপি হিন্দু জাতীয়তাবাদকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়।

দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক জয়া হাসান বলেন, কংগ্রেস আবার ঘুরে দাঁড়ানোর আশা করেছিল। তবে ২০০৯ সালের মতো ভালো করতে কংগ্রেসের বেশ সময় লেগে যেতে পারে। সে বার সংসদের ৩৮ শতাংশ আসন পেয়েছিল দলটি। আর গত নির্বাচনে পায় মাত্র ৮ শতাংশ (মাত্র ৪৪) আসন। বিজেপি পেয়েছিল ২৮২ আসন। অধ্যাপক হাসান বলেন, 'আমি বলছি না যে কংগ্রেস ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। তবে সেটা এ নির্বাচনে হচ্ছে না।'

নির্বাচনের ফল প্রকাশের আগে বিজেপিকে জয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত বলেই মনে হচ্ছে। ফল প্রকাশের মাত্র দু'দিন আগে আত্মবিশ্বাসী বিজেপি জোট আগামী দিনের সরকারের পরিকল্পনাও প্রকাশ করেছে। দেশের অর্থনীতিতে জোয়ার আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা। পুনর্নির্বাচিত হলে আগামী পাঁচ বছরে দেশে প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানো, কৃষকের আয় বাড়ানো এবং অবকাঠামো ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিজেপি জোট। বিজেপি জোট জয়ের ব্যাপারে একরকম নিশ্চিত হয়েই মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে বৈঠক করেছে। সেখানে মোদিও উপস্থিত ছিলেন।

তবে এখনও হাল ছাড়েনি কংগ্রেস। বুথফেরত সমীক্ষাকে 'ভুয়া' আখ্যা দিয়ে রাহুল গান্ধী গতকাল বুধবার টুইটারে দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে বিশেষ বার্তা দেন। তিনি বলেন, 'ভুয়া সমীক্ষা দেখে নিরাশ হবেন না। বরং কংগ্রেসের ওপর ভরসা রাখুন। আপনাদের পরিশ্রম বৃথা যাবে না।'

ভারতের নির্বাচনে এবার সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যাপক ব্যবহার হয়েছে। আর এতে এগিয়ে ছিলেন মোদি। সোশ্যাল মিডিয়ার কতটা দখল কার হাতে থাকছে, সেদিকে বিশেষ নজর রেখেছিল প্রায় সব রাজনৈতিক দলই। সাত দফার নির্বাচনে শুধু ভোটগ্রহণের দিনগুলোকে নিয়ে একটি সমীক্ষা করে নয়াদিল্লি ইন্দ্রপ্রস্থ ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি। এতে দেখা যায়, শুধু ভোটের দিনগুলোতেই মোট ১৭ লাখ ৪০ হাজার করা হয়েছে টুইটারে। সেখান থেকেই বেছে নেওয়া হয়েছিল মোট ৮৬১টি হ্যাশট্যাগকে। দেখা যাচ্ছে সেই হ্যাশট্যাগের লড়াইতে সবার আগে মোদি।

সহিংসতার আশঙ্কা :এবার লোকসভা নির্বাচন তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ হলেও রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি ছিল নজিরবিহীন পর্যায়ে। বিশেষ করে নির্বাচনে কমিশনের কাজে চরম অসন্তোষ ছিল কংগ্রেসসহ সব বিরোধী দলের। ইভিএম নিয়েও ছিল বিস্তর অভিযোগ। নির্বাচন কমিশনের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে বিরোধীদলগুলো ভোটগণনা কেন্দ্রে পাহারার ব্যবস্থা করেছে। ফলে আজ বিভিন্ন রাজ্যে সহিংসতা আশঙ্কা করছে সরকার। গতকাল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সহিংসতার আশঙ্কা প্রকাশ করে রাজ্য সরকারগুলোকে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

এদিকে শেষ মুহূর্তেও নির্বাচন কমিশনে ধাক্কা খেলো বিজেপি বিরোধী ২২টি রাজনৈতিক দলের জোট। গতকাল ভিভিপ্যাট নিয়ে তাদের দাবি খারিজ করে নির্বাচন কমিশন জানিয়ে দিল- আজকের ভোট গণনায় কোনো পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। প্রতি কেন্দ্রের পাঁচটি বুথের ভিভিপ্যাটের স্লিপ গোনা হবে। এই গণনা হবে ইভিএমে ভোট গণনার পর। মঙ্গলবারই নির্বাচন কমিশনে গিয়ে ভিভিপ্যাট নিয়ে নিজেদের দাবির কথা জানিয়ে এসেছিলেন বিজেপিবিরোধী ২২টি রাজনৈতিক দলের নেতারা।

ফল প্রকাশে বিলম্ব হতে পারে :ভারতের লোকসভা নির্বাচনের ফল জানতে এবার অনেক দেরি হতে পারে বলে মনে করছে নির্বাচন কমিশন। কর্মকর্তারা মনে করছেন, আজ সকাল ৮টা থেকে গণনা শুরু হলেও অনেক রাতে হয়তো ফল জানা যাবে। তবে প্রতি রাউন্ডের শেষে অন্যান্য বারের মতোই ফল জানানো হবে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে।

সিনিয়র উপনির্বাচন কমিশনার উমেশ মিশ্র জানিয়েছেন, ইভিএমের ভোট গণনার পরে ভিভিপ্যাট যন্ত্রের কাগজের স্লিপ গোনা শুরু হবে। তার পর দুটি যন্ত্রের ভোটের সংখ্যা মিলিয়ে দেখা হবে।

ভারতের ভোট নেওয়ার জন্য বৈদ্যুতিন ভোটযন্ত্র বা ইভিএম ব্যবহার শুরু হওয়ার পর থেকে গণনার দিন দুপুরের মধ্যেই মোটামুটিভাবে স্পষ্ট হয়ে যায় ফলাফল। কিন্তু এবারের ভোটে সব কেন্দ্রেই ইভিএমের সঙ্গে যুক্ত ভিভিপ্যাট যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি একটি একটি করে গুনতে হবে। ইভিএমের ভোটের সঙ্গে ভিভিপ্যাট যন্ত্রের ফলাফল না মিললে আবারও গুনতে হবে ভোট। তার পরেই ফল প্রকাশ করা হবে। একেকটি ভিভিপ্যাট যন্ত্রের ভোট গুনতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগবে। যদি একবারেই মিলে যায় ফল, তাহলেও একেকটি কেন্দ্রে ফল ঘোষণা হতে অন্তত পাঁচ ঘণ্টা বেশি সময় লাগবে।

রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক সব্যসাচী বসু রায় চৌধুরী কয়েক দশক ধরে নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ করেন। তিনি বলেন, প্রতিটি ভিভিপ্যাট যন্ত্রের স্লিপ একটা একটা করে গুনতে হবে। যদি ইভিএমের সংখ্যার সঙ্গে সেটা না মেলে, তাহলে আবারও গুনতে হবে। তাই ব্যালটের যুগে যেমন গণনা শেষ হতে প্রায় ৭২ ঘণ্টা সময় লাগত, আমার ধারণা এবার প্রক্রিয়াটা শেষ হতে অন্তত ত্রিশ ঘণ্টা সময় লাগবে। তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, যদি একটি ইভিএমে কোনো প্রার্থী ৭২৩টি ভোট পান আর ভিভিপ্যাটের স্লিপ গুনে দেখা গেল ৭২২ হচ্ছে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আবারও গুনতে হবে।

ভিভিপ্যাট যন্ত্রটি আদতে একটি প্রিন্টার। ইভিএমে ভোট দেওয়ার পরে ভোটার নিজেই ওই প্রিন্টার থেকে ছাপা হয়ে বের হওয়া কাগজের স্লিপে দেখতে পারেন যে, তিনি যেখানে ভোট দিয়েছেন, সেখানেই ভোট পড়ছে কি-না। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠত যে, ইভিএমে এক প্রার্থীকে ভোট দেওয়া হলেও অন্য প্রার্থীর প্রতীকে সেই ভোট চলে যাচ্ছে। ভোট পরিচালনায় আরও স্বচ্ছতা আনতেই ভিভিপ্যাট যন্ত্র ব্যবহার শুরু করে নির্বাচন কমিশন।

পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক নিরাপত্তা :কলকাতা প্রতিনিধি জানান, ভোট গণনাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গসহ কলকাতায় ব্যাপক নিরাপত্তা গ্রহণ করেছে ইসি। রাজ্যে গণনাকেন্দ্র ঘিরে ত্রিস্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্ট্রংরুম (ইভিএম রাখার কক্ষ) ও গণনা হলে থাকবে কেন্দ্রীয় বাহিনী। বাইরে অর্থাৎ মূল গেটে থাকবে সশস্ত্র রাজ্য পুলিশ। সব মিলে রাজ্যে মোতায়েন করা হবে আধা সামরিক বাহিনীর ২০ হাজার সদস্য। গণনাকেন্দ্রের ১০০ মিটার পর্যন্ত ১৪৪ ধারা জারি থাকবে। মোবাইল ফোন নিয়ে কেউ গণনা হলে ঢুকতে পারবে না। কলকাতায় ১০টি স্ট্রংরুমে কড়া নিরাপত্তায় রয়েছে ইভিএম মেশিন।