যৌন নিপীড়নের 'ফাঁদ' আফগানি সরকারি অফিস, নারী যেন শুধুই পণ্য

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০১৯     আপডেট: ১১ জুলাই ২০১৯      

হাফিজ মোল্লা

আফগানিস্তানের একটি এলাকায় হেঁটে যাচ্ছেন নারীরা- বিবিসি

আফগানিস্তানের একেকটা সরকারি অফিস যৌন নিপীড়নের একেকটা ফাঁদ! যৌন নিপীড়নের ভয়াবহতা সেখানে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেন এটিও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকারি অফিসগুলোতে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ নিয়ে সম্প্রতি তুলকালাম কাণ্ড ঘটেছে আফগানিস্তানে; অবশ্য কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

রাজধানী কাবুলবেষ্টিত একটি এলাকায় একজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেন বিবিসির এক সংবাদকর্মী। ওই নারীসহ আরও কয়েকজন নারীর সঙ্গে কথোপকথন এবং বিস্তারিত কিছু তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই অন্ধকার জগতের নানা ঘটনা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক ওই নারী কর্মকর্তা সাক্ষাতকারে তুলে ধরেছেন তার কর্মজীবনের দুর্বিষহ ঘটনা। তিনি চান; সারা বিশ্ব যেন এই নিপীড়ন সম্পর্কে ধারণা পায়।

নির্যাতনের শিকার নারী জানান, চাকরির সময় তাদের কার্যালয়ের প্রধান সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীর দ্বারা বারবার উত্ত্যক্তের শিকার হয়েছিলেন। একদিন অফিসে ঢুকামাত্রই তাকে যৌন নিপীড়নের চেষ্টা করেন ওই মন্ত্রী।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ওই মন্ত্রী আমাকে সরাসরি শারীরিক সম্পর্কের প্রস্তাব দেন। আমি তাকে বললাম- আমি তো যোগ্য এবং চাকরিতে অভিজ্ঞ। আপনি আমাকে এমনটা বলবেন তা কখনও ভাবিনি।

'আমি উঠে দাঁড়ালাম; এসময় তিনি আমার হাত ধরে একটি কক্ষে নিয়ে গেলেন। তিনি আমাকে তার কক্ষে প্রবেশ করানোর জন্য জোর করলেন, বললেন- আমি কয়েক মিনিট সময় নিব; ভয় পেয়ো না, আসো।'

তিনি বলেন, যথেষ্ট হয়েছে- বলেই আমি তাকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দেই। ওটাই তার সঙ্গে আমার শেষ দেখা। আমি খুব হতাশ ও রাগান্বিত হয়েছিলাম।

ওই দিনের ঘটনা নিয়ে কোনও অভিযোগ করেননি নিপীড়নের শিকার আফগানি নারী। তিনি বলেন, আমি এরপর চাকরি ছেড়ে দিলাম। আমি আমার সরকারকে বিশ্বাস করতে পারিনা। আপনি যদি পুলিশ বা আদালতে যান তখন দেখতে পাবেন; কতটা দুর্নীতিগ্রস্ত তারা।

ওই নারী বলেন, দেশে এমন কোনও জায়গা নেই যেটা নিরাপদ বা আপনি সেখানে গিয়ে কোনও অভিযোগ করতে পারেন। কথা বললে সবাই নারীকেই দোষ দেয়।

যৌন নিপীড়নের শিকার ওই নারী তার আরও দুই সহকর্মী একই মন্ত্রীর দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দুই নারী সহকর্মী আমাকে তাদের ধর্ষণের ঘটনা বলেছেন। অবশ্য এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে কোনও বক্তব্য জানা যায়নি।

সাবেক এই সরকারি নারী কর্মকর্তা বলেন, ওই মন্ত্রী খুব নির্লজ্জভাবেই এগুলো করে যাচ্ছেন; কারণ তিনি সরকারের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি।

নারীদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভয়াবহ দেশের তালিকায় ধারাবাহিকভাবে কয়েকবছর ধরে শীর্ষে অবস্থান করছে আফগানিস্তান। ২০১৮ সালে প্রকাশিত জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে এসব নিয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়।

জাতিংসঘের ওই প্রতিবেদনে দেখানো হয়, কীভাবে সরকারি অফিসে যৌন নিপীড়নের শিকার হন নারীরা। এসব নিয়ে অভিযোগ করলে তারা সহিংসতার শিকার হন; কোনও কোনও ক্ষেত্রে অভিযোগের জন্য উল্টো তাদেরকেই দায়ী করা হয়।

এমন পরিস্থিতিতে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিপীড়ন নিয়ে মুখ খোলার ব্যাপারটি মোটেও সহজ নয় বলে বিবিসি বলছে। যে কয়জন নারী এ বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন তাদের কেউ নাম প্রকাশ করতে চাননি।


ভুক্তভোগী নারীদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা যায়, যৌন নিপীড়নের এই ঘটনা শুধুমাত্র একটি মন্ত্রণালয় বা একজন মন্ত্রীর দ্বারাই ঘটছে তা নয়; অধিকাংশ মন্ত্রণালয়েই এমনটি খুঁজে পাওয়া যাবে।

যৌন নিপীড়নের শিকার আরেক নারী কথা বলেন বিষয়টি নিয়ে। নাম না প্রকাশ করার শর্তে তিনি তার ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, আমি একটি সরকারি চাকরির আবেদন করেছিলাম, সবই ঠিক হয়ে গিয়েছিল। তবে প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানির এক সহযোগীর সঙ্গে দেখা করার কথা হলে সেখানে বিপত্তি ঘটে।

ওই নারী বলেন, যিনি আমাকে দেখা করতে বলেন, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার ছবি ছিল। তিনি আমাকে তার ব্যক্তিগত অফিসে যেতে বলেন। তিনি বললেন- আসো, তোমার কাগজপত্রগুলো দেখব। অফিসে গেলে ওই ব্যক্তি আমাকে তার কাছে গিয়ে বসার এবং শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের কথা বলেন।

তিনি বলেন, আমার হাতে তখন দুটি পথ ছিল। তার প্রস্তাব গ্রহণ করা অথবা তখনই অফিস ত্যাগ করা। বুঝেছিলাম এটা আসলে থামবে না; তিনি শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের পর আরও কয়েকজন আমার সঙ্গে একই কাজ করবে। আমি খুব বেদনা নিয়ে ফিরে এলাম। খুব ভীত হয়ে পড়েছিলাম।

প্রতারণার শিকার এই নারী বলেন, আপনি যদি বিচারক, পুলিশ বা আইনজীবীদের কারো কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ করতে যান তারাও আপনার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করার প্রস্তাব দেবে।

'সবাই যদি এভাবে করে; তাহলে কী হবে? নারীকে যৌন নিপীড়নের ব্যাপারটা এখন আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। চারপাশোর সবাই যেন আমাদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করতে চায়।'

আফগানিস্তানে অনেক বছর ধরে পুরুষ সহকর্মীর দ্বারা নারী সহকর্মীদের এমন যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার ব্যাপারটি অনেকটা অগোচড়েই রয়ে গিয়েছিল; তবে তা প্রকাশ্যে আসে গত মে মাসে।

ওই সময় আফগানিস্তানের এক টেলিভিশনে সাক্ষাৎকারে সরকারের মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রীদের যৌন নিপীড়নের কথা বলেন প্রেসিডেন্টের সাবেক উপদেষ্টা জেনারেল হাবিবুল্লাহ আহমেদাজী। তিনি সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে 'পতিতালয়ের প্রতি সমর্থন' দেওয়ার অভিযোগ আনেন।

হাবিবুল্লাহর অভিযোগের ব্যাপারে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি সরকারের দায়িত্বশীল কোনও ব্যক্তি। এ ব্যাপারে ওই সময় অভিযোগ অস্বীকার করে দেওয়া এক বিবৃতির বরাত দেয় কর্তৃপক্ষ।

নারগিস নেহান নামে সরকারের একজন মন্ত্রী এক টুইটার বার্তায় বলেন, সংসদে একজন নারী সদস্য আমি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি এই ধরনের অভিযোগ ভিত্তিহীন।

তবে দেশটির বিখ্যাত মানবাধিকারকর্মী ও সংসদ সদস্য ফৌজিয়া কফি জানান, সরকারের অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নারীদের যৌন হয়রানি অভিযোগ পেয়েছেন তিনি।

নারীদের যৌন হেনস্তার অভিযোগ নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় তদন্ত শুরু করেছে; প্রেসিডেন্টের নির্দেশে এই তদন্ত কার্যের প্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে একজন ব্যক্তিকে।

অভিযোগ প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেলের মুখপাত্র জমসিদ রাসোলি বলেন, তদন্ত চলছে। যারা অভিযোগের তদন্তের ব্যাপারে তথ্য দিয়ে সহায়তা করবে তাদের আমরা নিরাপত্তা দিব। তাদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হবে না। সার্বিক বিষয়ে সতর্কতা অবলম্ববন করা হবে।