আমরাও মিয়ানমারের নাগরিক: ইয়াঙ্গুনের মুসলিমরা

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০১৯     আপডেট: ২৩ আগস্ট ২০১৯      

অনলাইন ডেস্ক

'২০১৬ সালে হঠাৎ আমাকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা শুরু হলো। ফেসবুকে মানুষ কিছু না বুঝেই, না জেনেই আমার বিরুদ্ধে ঘৃণা উগরে দিতে শুরু করলো।’

কথাগুলো বলছিলেন মিয়ানমারের সাবেক রাজধানী ইয়াঙ্গুনের ফটো সাংবাদিক অং নাইং সো। 

পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠে, যখন ভিন্ন একটি ঘটনায় অং নাইংকে পুলিশ আটক করে।

টানা ১১ দিন ধরে তাকে জেরা করা হয়। তারপর পুলিশ ২০১৬ সালে ফেসবুকে পোস্ট করা এক সন্ত্রাসী ভিডিও দেখিয়ে বলে,  অং নাইং সেই সন্ত্রাসী।

ইয়াঙ্গনের মুসলিমরা বিবিসির কাছে তাদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন।

মিয়ানমার বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি দেশে হলেও যুগ যুগ ধরেই নানা ধর্ম-বর্ণ-জাতি-গোষ্ঠীর মানুষ এখানে বসবাস করেন। কিন্তু বছর দশেক আগে রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর নির্যাতন শুরুর পর থেকে মিয়ানমারের মুসলমান নাগরিকদের পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে। রাষ্ট্র এবং সমাজে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ-বৈষম্য, ঘৃণা বাড়ছে। ঠিক এমনই ঘৃণার বৈষম্যের শিকার ফটো সাংবাদিক অং নাইং। 

অং নাইং বলেন, এই ঘৃণার কারণ আমি ঠিক বুঝতে পারি না। সরকারি কর্মকর্তাদের মনের ভেতর যেন মুসলিমদের জন্য চরম এক ঘৃণা জমে রয়েছে। তারা যেন মুসলিমদের সহ্যই করতে পারে না।

মাত্র কয়েক বছর আগ পর্যন্ত মিয়ানমার কার্যত একটি বিচ্ছিন্ন দেশ ছিল। পাঁচ দশক ধরে সামরিক শাসনের সময়ে জেনারেলরা তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার কৌশল হিসেবে বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদকে উস্কানি দিয়ে গেছেন। ফলে ধীরে ধীরে দেশের অন্য সংখ্যালঘুরা অবজ্ঞার শিকার হয়েছে।

রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উস্কানি দেওয়ার জন্য দায়ী করা হয় কট্টর বৌদ্ধ ধর্মীয় কিছু নেতাকে।

এখন সেই ঘৃণার টার্গেট হচ্ছে মিয়ানমারের যে কোনো মুসলিম। আর এই ঘৃণা ছড়ানোর পেছনে পরোক্ষ ভূমিকা রাখছে সোশ্যাল মিডিয়া। এমনকি ইয়াঙ্গুনের মতো শহরেও মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্য, হেনস্থা বাড়ছে।

অং নাইংয়ের মতো বৈষম্যের শিকার হয়েছেন ইয়াঙ্গুনের মুসলিম অধিকার কর্মী টিন অং মিন্ট।

মিন্ট বলেন, প্রতিদিন আপনি সোশ্যাল মিডিয়াতে মুসলিমদের নিয়ে মনগড়া সব খবর দেখবেন। ফটোশপ করে ছবি পোস্ট করতে দেখবেন। কিন্তু এগুলোর বিরুদ্ধে কিছু করার কোনো উদ্যোগ কারো মধ্যেই নেই।

‘এ ধরনের কোনো একটি বিষয় পোস্ট করা হলেই তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আমি তখন বুঝতে পারি, এ নিয়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে।’

আর এ কারণেই মিন্ট ফেসবুকে একটি পর্যবেক্ষণ গ্রুপে নাম লিখিয়েছেন। এই গ্রুপের সদস্য সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। সোশ্যাল মিডিয়াতে মুসলিম বিদ্বেষী বিভিন্ন পোস্টের দিকে তারা নজর রাখেন।

আক্ষেপ নিয়ে মিন্ট বলেন, আমরা নিজেদের এদেশের নাগরিক মনে করি, কিন্তু তারা আমাদের ভিন্ন কিছু ভাবে। এরকম বৈষম্য চলতে থাকলে মুসলমানরা আরো বেশি করে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।

যদিও মিয়ানমারের সরকার দাবি করে যে দেশের সব ধর্ম-বর্ণের নাগরিক সমান মর্যাদা ভোগ করে। কট্টরপন্থী বৌদ্ধ নেতাদের ওপরও তারা চড়াও হচ্ছেন। কিন্তু সরকারের কথা সেদেশের মুসলিম নাগরিকরা বিশ্বাস করেন না। 

খিন সান্ডার নামে এক মানবাধিকার মানবাধিকার কর্মী জানান, চাকরির জন্য আবেদন করলে শুধু মুসলিম পরিচয়ের কারণে মিলছে না চাকরি। পরিচয়পত্র বা নাগরিক কার্ড নবায়ন করা এখন মুসলমানদের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

খিন সান্ডার নিজেও এ নিয়ে ভোগান্তির শিকার হয়েছেন বলে জানান।

সান্ডার বলেন, পরিচয়পত্র নবায়ন করতে গিয়ে আমার দু'বছর লেগেছে। অথচ বৌদ্ধরা দু'সপ্তাহ বা বড়জোর ২৮ দিনের ভেতরে তা পেয়ে যায়।

রোহিঙ্গা সঙ্কট শুরুর পর থেকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্য অনেক বেড়ে গেছে, আর মানুষও যেন তাদের ধর্মীয় পরিচয়কে বড় করে দেখতে শুরু করেছে-যোগ করেন সান্ডার।

সান্ডার বলেন, নেতাদের উচ্চ নৈতিক মূল্যবোধ লালন করতে হবে, যাতে মানুষ বুঝতে পারে যে সমাজে বৈচিত্র্য গ্রহণযোগ্য, সুন্দর।