রোহিঙ্গা সংকট

গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করতে পারে আন্তর্জাতিক আদালত

প্রকাশ: ১০ ডিসেম্বর ২০১৯     আপডেট: ১০ ডিসেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল ডেস্ক

রোহিঙ্গাদের পালিয়ে আসার ফাইল ছবি: সমকাল

রোহিঙ্গাদের পালিয়ে আসার ফাইল ছবি: সমকাল

রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার দাবি ও মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চির আগমনকে ঘিরে উত্তাল হয়ে উঠছে নেদারল্যান্ডসের হেগ শহর। সু চির উপস্থিতিতে হেগের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মঙ্গলবার শুরু হচ্ছে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যা মামলার শুনানি। শুনানি শেষে আদালত মিয়ানমারের অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করতে পারেন। এদিকে, হেগে শুনানির প্রাক্কালে মিয়ানমারকে সর্বতোভাবে বয়কট করার আহ্বান জানিয়েছে ৩০টি সংগঠন।

জাতিসংঘ আদালতে শুনানি উপলক্ষে হেগে টানা তিন দিন বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে রোহিঙ্গা সংগঠনগুলো। মিয়ানমার সরকার সমর্থকরাও সেখানে সমাবেশ করবে। শুনানিতে ওআইসির পক্ষে মামলা দায়ের করা গাম্বিয়ার আইনজীবীরা ১৬ সদস্যবিশিষ্ট আদালতে পূর্ণাঙ্গ শুনানির আগেই সাময়িক পদক্ষেপ নেওয়ার আবেদন জানাবেন।

এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের যেকোনো রায়ই চূড়ান্ত, বাধ্যতামূলকভাবে পালনীয়। চূড়ান্ত রায়ের পর আপিলের সুযোগ নেই। গত অক্টোবরে ইউএন নিউজের কনর লেননকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ কথা জানিয়েছেন জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আইসিজের রেজিস্ট্রার ফিলিপ গটিয়ার। 

রোববার ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তিন দিনব্যাপী শুনানি চলাকালে জাতিসংঘের এই সর্বোচ্চ আদালতের নিরাপত্তা জোরদার করা হবে। জল্পনা-কল্পনা চলছে, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অংশ হিসেবে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হতে পারে। তবে মিয়ানমার সরকারের প্রধান হিসেবে সু চিকে দায়মুক্তি দেওয়া হতে পারে।

মিয়ানমারের 'জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য' সু চি এখন হেগে অবস্থান করছেন। শুনানিতে উপস্থিত থাকছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব মাসুদ বিন মোমেনের নেতৃত্বে একটি  প্রতিনিধি দল। প্রয়োজনে বাদীপক্ষকে সহায়তা দেবেন তারা।

শুনানিতে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অব্যাহত গণহত্যা বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আদালতের প্রতি আহ্বান জানাবে পশ্চিম আফ্রিকার ক্ষুদ্র দেশ গাম্বিয়া। আদালত সিদ্ধান্ত নেবেন, এ মামলার বিচারের এখতিয়ার তাদের আছে কি-না। তবে প্রাথমিক শুনানিতে নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের কারও বক্তব্য শোনা হবে না। 'ওয়ার্ল্ড কোর্ট' বা বিশ্ব আদালত হিসেবে পরিচিত আইসিজেতে গত মাসে মামলা করে গাম্বিয়া। এতে কূটনৈতিক ও আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে ওআইসি। শুনানি শুরুর আগের দিন গাম্বিয়ার উদ্যোগকে সমর্থন দিয়েছে কানাডা এবং নেদারল্যান্ডস। 

সোমবার এক যৌথ বিবৃতিতে দেশ দুটি বলেছে, জবাবদিহি নিশ্চিত এবং দায়মুক্তি রোধ করতে তারা গাম্বিয়াকে সর্বতোভাবে সহায়তা করবে। বিবৃতিতে বলা হয়, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর দায়িত্ব ছিল রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দেওয়া। অথচ নিরাপত্তা বাহিনীই হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। জানা গেছে, তৎপরতার অংশ হিসেবে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত বব রে ইতোমধ্যে হেগে পৌঁছেছেন।

প্রথম দিনই শুনানি শুরু করবেন গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী আবুবকর ম্যারি তাম্বাদু। তিনি আইন শাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েছেন ব্রিটেন থেকে। রুয়ান্ডা গণহত্যা ট্রাইব্যুনালেরও প্রসিকিউটর ছিলেন তিনি। কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের দুর্দশা দেখে যাওয়ার পর তিনি মামলা করেছেন। শুনানি সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। বিপুলসংখ্যক আন্তর্জাতিক দর্শক শুনানি দেখবেন বলে আশা করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার শুনানি শেষ হলেও রায় অপেক্ষমাণ রাখা হতে পারে।

হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতেও (আইসিসি) রোহিঙ্গাদের গণহত্যা নিয়ে আরেকটি মামলা চলছে। আদালত এ বিষয়ে বিস্তারিত তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়া আর্জেন্টিনার একটি আদালতেও রোহিঙ্গা গণহত্যায় সু চির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

এদিকে সু চি যখন রোহিঙ্গা গণহত্যার পক্ষে সাফাই গাইতে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালতে গেছেন, ঠিক তখনই মিয়ানমারকে বয়কটের ডাক দিয়েছে ১০টি দেশের ৩০টি সংগঠন। শুনানি সামনে রেখে নেপিদোর ওপর চাপ জোরালো করতেই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

রয়টার্স জানায়, জার্মানিভিত্তিক ফ্রি রোহিঙ্গা কোয়ালিশনস নামের প্ল্যাটফর্ম থেকে 'বয়কট মিয়ানমার ক্যাম্পেইন' শুরু করা হয়েছে। সংগঠনটির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গণহত্যা মামলার শুনানিকে সামনে রেখে ৩০টি সংগঠন মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ফরাসি ডট কো, রেস্টলেস বিংস, ডেস্টিনেশন জাস্টিস, রোহিঙ্গা হিউম্যান রাইটস নেটওয়ার্ক অব কানাডা, রোহিঙ্গা হিউম্যান রাইটস ইনিশিয়েটিভ অব ইন্ডিয়া ও এশিয়া সেন্টারের মতো সংগঠনগুলো।

ফি রোহিঙ্গা কোয়ালিশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা নাই সান লুইন বয়কট কর্মসূচি প্রসঙ্গে বলেছেন, 'জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধান মিশন স্পষ্ট করেছে যে, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জাতিকে নির্মূল করে দেওয়ার একটি নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী হিসেবে আমরা মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অধীনে ১৫ বছর গৃহবন্দি থাকা অং সান সু চির মুক্তির আন্দোলন করে এসেছি। তবে তিনি সেই অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর খুনি সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে চলছেন। তাই আমরা মিয়ানমারের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক সব সম্পর্ক ছিন্ন করতে সবার প্রতি আহ্বান জানাই।'

জাতিসংঘ আদালতে ন্যায়বিচার চান রোহিঙ্গারা: হেগের আদালতে শুনানির প্রাক্কালে গণহত্যার বিচার চেয়েছেন নিপীড়িত রোহিঙ্গারা। কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শিক্ষক মোহাম্মদ জোবায়ের রয়টার্সকে বলেন, 'আমরা হত্যা, নির্যাতন ও ধর্ষণ দেখেছি। আমাদের চোখের সামনেই অনেককে হত্যা করা হয়েছে। আমাদের ঘরবাড়ি যখন জ্বলছে, তখন প্রাণ বাঁচাতে আমাদের পালাতে হয়েছে। এখন মিয়ানমারকে তাদের ভয়াবহ অপরাধের জন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য করার দায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার জন্য তাদের বিচার হতে হবে।'

তিনি বলেন, 'ক্ষমতায় আসার আগে সু চি বলেছিলেন, সেনাবাহিনী ধর্ষণকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। আর এখন তিনি সেনাদের রক্ষাকারী। কী লজ্জা! আমরা শুনানির অপেক্ষায়। তবে দুর্বল গতির ইন্টারনেটের কারণে শুনানি দেখতে পাব কি-না জানি না।'

রশিদ আহমেদের পরিবারের ১২ সদস্যকে খুন করেছে মিয়ানমার বাহিনী। তিনি বলেন, 'শুধু ন্যায়বিচার পেলেই আমাদের ক্ষত সারবে। আমি জানি তাদের আর ফেরত পাব না। তবে খুনিরা শাস্তি পেলে তাদের আত্মা শান্তি পাবে।' কোলে তিন বছর বয়সী সন্তানকে নিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে মমতাজ বেগম বলেন, সেনারা আমার স্বামীকে হত্যা করেছে। তাকে ধর্ষণ করেছে। তার ছয় বছর বয়সী সন্তানকে মাথায় ছুরিকাঘাত করেছে। তিনি ন্যায়বিচার চান।

এদিকে গত অক্টোবরে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আইসিজের নবনিযুক্ত রেজিস্ট্রার ফিলিপ গটিয়ার জানিয়েছিলেন, গণহত্যার মামলার বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের যে কোনো রায়ই চূড়ান্ত, বাধ্যবাধকতাপূর্ণ ও অবশ্যপালনীয়। চূড়ান্ত রায়ের পর আপিলের কোনো সুযোগ নেই।