রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার

মিয়ানমার প্রতারক

আইসিজের চূড়ান্ত শুনানিতে আইনজ্ঞদের অভিমত

প্রকাশ: ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল ডেস্ক

রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ, গণধর্ষণ ও নিপীড়ন সত্ত্বেও নীরব থেকে বিশ্বব্যাপী নিন্দা কুড়িয়েছিলেন দেশটির নেত্রী অং সান সু চি। নেদারল্যান্ডসের হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার শুনানিতে তিনি আবারও সমালোচিত হলেন এসব ইস্যুকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার জন্য। শুনানিতে বলা হয়, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমার ধাপ্পাবাজি বা প্রতারণা (ফ্রড) করছে। এ সময় রাখাইনে বিপন্ন রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় ছয়টি জরুরি পদক্ষেপ নিতে মিয়ানমারকে নির্দেশ দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের শীর্ষ এ আদালতের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে।

আদালতে গাম্বিয়ার এক আইনজীবী সু চিকে উদ্দেশ করে বলেন, 'সন্ত্রাস দমনের কথা বলে রোহিঙ্গাদের ওপর চরম নির্যাতন করেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। ৩৯২টি গ্রাম নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে। রোহিঙ্গা শিশুরা কি সন্ত্রাসী ছিল? অথচ তাদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে। রোহিঙ্গা নারীদের গণধর্ষণ করা হয়েছে। এমনকি অন্তঃসত্ত্বা নারীদেরও ধর্ষণ করা হয়েছে। এগুলোকে কি সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান বলে?'

গাম্বিয়ার আইনজীবী অধ্যাপক ফিলিপ স্যান্ডস কিউসি বলেন, 'নারীর ওপর এ ধরনের নিষ্ঠুর নিপীড়ন নিয়ে একটি কথাও বলেননি (সু চি)। ম্যাডাম এজেন্ট (সু চি), আপনার এই নীরবতা আপনার বক্তব্যের চেয়েও বেশি কিছু বলে দিচ্ছে।'

গতকাল বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সকালে ঐতিহাসিক এ মামলায় শুনানির শেষ দিনে গাম্বিয়ার পক্ষে আদালতে তিনজন আইন বিশেষজ্ঞ মিয়ানমারের দাবিগুলো খ ন করে বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তারা বলেন, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের প্রতি অন্যায়-অবিচারের কথা অস্বীকার করেনি। ওই সব আচরণ বা কার্যক্রমে গণহত্যার উদ্দেশ্য ছিল না বলে মিয়ানমার যে দাবি করেছে তা বিভ্রান্তিকর এবং আন্তর্জাতিক আইনের অপব্যাখ্যা।

বিরতির পর বিকেলে মিয়ানমার সমাপনী বক্তব্য তুলে ধরে। এ সময় সু চি বলেন, আইসিজে মামলাটি গ্রহণ করলে আবার ২০১৬-১৭-এর মতো আন্তঃজাতিগত সংঘাত শুরু হতে পারে। তারা এমন কিছু চান না। সু চি তার চূড়ান্ত আবেদনে বলেন, গাম্বিয়ার মামলাটি খারিজ করে দেওয়া হোক এবং অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদনও খারিজ করা হোক। অন্যান্য দিনের মতো গতকালও তিনি আদালতে প্রবেশ ও ত্যাগকালে বিক্ষোভের মুখে পড়েন।

সু চির বক্তব্যের পর আইসিজের প্রেসিডেন্ট আবদুলকাওই আহমেদ ইউসুফ জানান, যত দ্রুত সম্ভব আদালত তার সিদ্ধান্ত উভয়পক্ষকে জানিয়ে দেবে। তার এ ঘোষণার মাধ্যমে শুনানি শেষ হয়েছে। খবর এএফপি, বিবিসি, রয়টার্স ও দ্য গার্ডিয়ানের।

এর আগে গাম্বিয়ার আইনজীবী অধ্যাপক স্যান্ডস মিয়ানমারকে গণহত্যায় দোষী সাব্যস্ত করে বলেন, 'বিচারবহির্র্ভূত হত্যা, যৌন নিপীড়ন, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া এবং গবাদিপশু হত্যা তো রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে পুরোপুরি কিংবা আংশিকভাবে ধ্বংস করার জন্যই পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে।'

গণহত্যা নিয়ে বিতর্ক :গাম্বিয়ার আইনজীবী পল রাইখলার বলেন, মিয়ানমার অপরাধের কথা অস্বীকার করেনি। দেশটির আইনজীবীরা জাতিসংঘ তদন্তকারীদের প্রতিবেদনের উপসংহারগুলো নাকচ করেননি। এমনকি দেশটির প্রতিনিধি সু চি বলেছেন, সামরিক বাহিনীর কেউ কেউ অপরাধ করে থাকতে পারেন, সে জন্য তাদের বিচার হবে। মিয়ানমারের আপত্তি প্রধানত দুটো। তারা রোহিঙ্গাদের প্রতি আচরণে গণহত্যার উদ্দেশ্য অস্বীকার করেছেন। দ্বিতীয়ত তারা দাবি করেছেন, গণহত্যার উদ্দেশ্য অনুমান করা হলেও তার ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী আদেশ দেওয়া যায় না।

অধ্যাপক স্যান্ডস বলেন, মিয়ানমারের আইনজীবী অধ্যাপক উইলিয়াম স্ক্যাবাস নিজেই ২০১৩ সালে আলজাজিরাকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, মিয়ানমারের ঘটনাপ্রবাহ গণহত্যার দিকে ধাবিত হচ্ছে। তিনি বলেছিলেন, রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে গণহত্যা শব্দটি ব্যবহার করা যায়।

অধ্যাপক স্যান্ডস বলেন, 'গণহত্যা শুধু সংখ্যার খেলা নয়। (অপরাধ প্রমাণের জন্য) একটি সম্প্রদায়ের একাংশকে ধ্বংস করার অভিপ্রায়ই যথেষ্ট। রোহিঙ্গাদের অনেক গ্রাম পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট এলাকার কোনো জাতিগোষ্ঠী বা পুরো ধর্মীয় সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করাকে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।'

আমেরিকার আইনজীবী পল রাইখলার বলেন, মিয়ানমারের আইনজীবী অধ্যাপক স্ক্যাবাস গণহত্যার উদ্দেশ্য প্রমাণের জন্য সাতটি সূচক থাকা আবশ্যক বলে দাবি করেছেন। সেই সাতটি নির্দেশকের কথা গাম্বিয়ার আবেদনে রয়েছে এবং মিয়ানমার সেগুলো অস্বীকার করেনি। তারপরও বলা হচ্ছে নৃশংসতায় গণহত্যার উদ্দেশ্য ছিল না।

তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানোর নীতি অনুসরণের বিভিন্ন নজির তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আদালত নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন সু চি আদালতে রোহিঙ্গা শব্দটিই ব্যবহার করেননি। শুধু বিচ্ছিন্নতাবাদী আরসা গোষ্ঠীর কথা বলার সময় ছাড়া তিনি তাদের মুসলিম হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

রাইখলার বলেন, জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধান মিশন মিয়ানমারের শীর্ষ ছয় জেনারেলের বিরুদ্ধে গণহত্যার দায়ে বিচারের সুপারিশ করেছে। তিনি এ সময় ১৭ বিচারকের সামনে দুটি ছবি তুলে ধরেন। এর একটিতে দেখা যায় ১০ রোহিঙ্গা মুসলিমকে হাত পেছনে বেঁধে মাটিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে। পরের ছবিতে তাদের রক্তাক্ত মরদেহ দেখানো হয়। তিনি বলেন, নিরীহ এই ১০ রোহিঙ্গাকে হত্যার কাহিনী ফাঁস করে দিলে রয়টার্সের সাংবাদিকদের দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে ৫০০ দিন (সাড়ে ১৬ মাস) জেল খেটে তারা মুক্তি পান। আর হত্যাকারী সেনারা জেলে ছিল মাত্র ৭ মাস।

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন বিষয়ে মিয়ানমারের বক্তব্যকে প্রতারণা অভিহিত করে রাইখলার বলেন, মিয়ানমার নিজেই স্বীকার করেছে যে খুব সামান্যসংখ্যক রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফিরেছে (বাস্তবে কেউ ফেরেনি)। তিনি গত নভেম্বরে বাংলাদেশের দেওয়া বিবৃতি উদ্ধৃত করে বলেন, মিয়ানমার নিরাপদ ও মর্যাদার সঙ্গে ফেরার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে কিছুই করেনি।

মিয়ানমার বলেছে, সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা এ হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে জড়িত ও তাদের বিচার হচ্ছে। তবে মিয়ানমারের ২০০৮ সালের সংবিধান অনুযায়ী সেনাবাহিনীর কারও অপরাধের বিচার করার এখতিয়ার কেবল সামরিক আদালতেরই রয়েছে। সেনাবাহিনী যে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিচার করবে না সেটি প্রমাণ হয় সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের বক্তব্যে। ফেসবুক কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর অভিযোগে তার পেজ বন্ধ করেছে। সেনাপ্রধান বলেছেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা বলতে কোনো জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব নেই।

গাম্বিয়া কেন মামলা করল :গাম্বিয়া ওআইসির প্রক্সি বা ছায়া হিসেবে মামলা করেছে বলে মিয়ানমারের দাবি প্রত্যাখ্যান করেন দেশটির বিচারমন্ত্রী আবুবকর তাম্বাদু। তিনি বলেন, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে তারা এককভাবে মামলা করেছেন এবং ওআইসি তাদের অনুরোধে শুধু সহায়তা দিচ্ছে।

গাম্বিয়ার আইনজীবী পিঁয়ের দ্য আর্জেন বলেন, গাম্বিয়া ওআইসির সাহায্য চাইতেই পারে। অন্যদেরও সাহায্য চাইতে পারে। সুতরাং, গাম্বিয়া ওআইসির সহায়তা নেওয়ায় বলা যাবে না যে ওআইসি এ মামলার আবেদনকারী।

অন্তর্বর্তী আদেশের যৌক্তিকতা :অধ্যাপক ফিলিপ স্যান্ডস বলেন, মিয়ানমার ১৯৪৮-এর গণহত্যা সনদের বাধ্যবাধকতা পূরণ করছে কি-না সে প্রশ্ন তোলার অধিকার গাম্বিয়ার অবশ্যই রয়েছে। এ বিষয়ে তিনি অতীতের রায়ের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক সনদের অংশীদার হিসেবে অন্তর্বর্তী আদেশের আবেদন করার অধিকার গাম্বিয়ার রয়েছে।

অধ্যাপক স্যান্ডস বলেন, অন্তর্বর্তী আদেশ ইতিবাচক হবে না বলে মিয়ানমারের দাবি সঠিক নয়। বসনিয়া নিয়ে আদেশ দেওয়ার পরও সেব্রেনিৎসায় যে গণহত্যা হয়েছিল সেই দৃষ্টান্ত দিয়েই আমরা বলেছি সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা কেন প্রয়োজন এবং তার বাস্তবায়নের সময় বেঁধে দেওয়াও জরুরি।

গাম্বিয়ার পক্ষে শুনানিতে সর্বশেষ বক্তব্য দেন আবুবকর তাম্বাদু। তিনি বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের জীবন হুমকির মুখে। গাম্বিয়া প্রতিবেশী না হতে পারে, কিন্তু গণহত্যা সনদের স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে গণহত্যা বন্ধ এবং তা প্রতিরোধে তাদের দায়িত্ব রয়েছে। তিনি আইসিজেকে ছয়টি অন্তর্বর্তী নির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন।

যা বললেন মিয়ানমারের আইনজীবীরা :রাখাইনে মংডু শহরে একটি ফুটবল ম্যাচে হাজির দর্শকদের ছবি দেখিয়ে সু চি বলেন, সরকার সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে এবং তারা তা চালিয়ে যেতে চান। আদালতের কাছে তারা সেই সুযোগ চান। তিনি বলেন, সামরিক বিচার ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানোর সুযোগ না দিয়ে তাকে দেশের বাইরে নিয়ে আসা (আন্তর্জাতিকীকরণ) উচিত নয়।

অধ্যাপক স্ক্যাবাস বলেন, ২০১৭ সালের ঘটনাবলির পরও লাখ লাখ রোহিঙ্গা এখনও মিয়ানমারে রয়েছে। তাদের গোষ্ঠীগতভাবে ধ্বংসসাধনের চেষ্টা হয়নি। ক্রিস্টোফার স্টকার বলেন, গণহত্যা সনদের ৯ ধারায় বাংলাদেশ আপত্তি জানানোর কারণে গণহত্যার অভিযোগে মামলা করতে না পারলেও অন্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ দেশটির রয়েছে। সনদের ৮ ধারার আওতায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে বাংলাদেশ মামলা করার অধিকার রাখে। কিন্তু বাংলাদেশ মামলা করেনি। সনদের ৯ ধারার আওতায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়েও সনদে স্বাক্ষরকারী হিসেবে গাম্বিয়ার মামলা করার অধিকার এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক নয়। সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত দেশ ছাড়া অন্য কেউ এ মামলা করতে পারে না। আইসিজে সে কারণে এ মামলা নিষ্পত্তির এখতিয়ার রাখে না।

তিন দিনের এ শুনানিতে অংশ নিতে বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল হেগে গেছে। অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকারের একটি প্রতিনিধি দলও। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন সু চি নিজেই।

পশ্চিম আফ্রিকার ক্ষুদ্র দেশ গাম্বিয়া গত মাসে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যা প্রতিরোধ ও এর শাস্তির বিধানে ১৯৪৮ সালে স্বাক্ষরিত 'জেনোসাইড কনভেনশন' লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে এ মামলা করে। আইসিজে এ মামলা গ্রহণ করলে পূর্ণাঙ্গ রায় হতে কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে। তবে আদালত কোনো অন্তর্বর্তী আদেশ দিলে তা মানা মিয়ানমারের জন্য বাধ্যতামূলক। এক্ষেত্রে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাও জারি হতে পারে। বিশ্নেষকরা বলছেন, আদালত মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রায় না দিলেও এ মামলায় দেশটির বিপুল আর্থিক ও রাজনৈতিক ক্ষতি হবে।