জঙ্গির কাছে বেহেশতের কর্মপরিকল্পনা, ৭২ স্ত্রী নিয়ে ভাবনা

প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০     আপডেট: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০   

অনলাইন ডেস্ক

মহিউসুন্নাথ চৌধুরী

মহিউসুন্নাথ চৌধুরী

দু'বছর আগে যুক্তরাজ্যের বাকিংহাম প্যালেসের বাইরে সন্ত্রাসী হামলার অভিযোগে খালাস পায় মুরগির দোকানের এক কর্মী। যদিও কয়েক মাস পর কয়েকটি জঙ্গি হামলার পরিকল্পনার জন্য তাকে দোষী সাব্যস্ত করে আদালত।

মহিউসুন্নাত চৌধুরী নামের ওই ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত কীভাবে ধরা পড়েছিলেন সেটাই জানা গেছে বিবিসির এক প্রতিবেদনে। 

পুলিশি তদন্তে জানা যায়, শহীদ হওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন মহিউসুন্নাত চৌধুরী। এ লক্ষ্যে সন্ত্রাসী হামলার জন্য ছুরি সংগ্রহ করেছিলেন, আগ্নেয়াস্ত্র প্রশিক্ষণের দিকে নজর রেখেছিলেন এবং বেহেশতে গিয়ে তিনি কী করতে যাচ্ছেন তার একটা তালিকাও প্রস্তুত করেছিলেন। 

এমনভাবে তালিকাটি তিনি করেছিলেন যাতে তিনি ধরেই রেখেছিলেন এ গুলো তাকে দেওয়া হবে। 

অবিবাহিত ওই জঙ্গি তার লেখা তালিকার ২ নম্বরে বেহেশতে গিয়ে ৭২ জন স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক রজায় রাখার বিষয়টি লিখে রেখেছিলেন। তালিকার সাত নম্বরে তিনি স্রষ্টার সঙ্গে দেখা করার বিষয়টি উল্লেখ করেন। 

যেসব কাজকর্ম করে সৃষ্টিকর্তার পথে শহীদ হওয়া যায় সে ব্যাপারে খোঁজ করতে ব্যস্ত ছিলেন মহিউসুন্নাত বা মূসা চৌধুরী।

মহিউসুন্নাত চৌধুরী ওই তালিকার শিরোনাম দিয়েছেন- 'জান্নাতের পরিকল্পনা'। সেখানে একে একে তুলে ধরেছেন তার অনেকগুলো পরিকল্পনার কথা। এর মধ্যে রয়েছে- ১) বেহেশতের সব সম্পদ ঘুরে দেখা এবং প্রধান প্রাসাদ নির্বাচন করা, ২) সব স্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা; তাদের নাম দেওয়া এবং প্রধান দুজনকে নির্বাচন করা, ৩) প্রধান প্রাসাদ সুসজ্জিত করা, ৪) পরিবারের সব সদস্যদের সঙ্গে দেখা করে খাবার খাওয়া, ৫) সব বন্ধুর সঙ্গে দেখা করে খাবার খাওয়া, ৬) সব নবী-রাসূল ও তাদের সাহাবীদের সঙ্গে দেখা করা, ) আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা, ৮) বেহেশতের বাজার ঘুরে দেখা, ৯) স্ত্রীদের সঙ্গে সময় কাটানো, ১০) নতুন নতুন বিনোদন নেওয়া ইত্যাদি।

আগস্ট ২০১৭ সালে, মহিউসুন্নাথ চৌধুরী বাকিংহাম প্যালেসে সামুরাই ধাঁচের তরবারি নিয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে লড়াইয়ে জড়িয়েছিলেন। ওই ঘটনায় পুলিশ সদস্যরা সামান্য আহত হলেও তাকে থামাতে পেরেছিলেন। 

এ ঘটনার দুটি বিচার হয়েছিল। প্রথম জুরি কোনও রায়ে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলেও দ্বিতীয় জুরি ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে তাকে খালাস দেয়। 

ওই সময় মহিউসুন্নাত দাবি করেছিলেন, ২০১৭ সালের ওই হামলায় কারও ক্ষতি করার কোনো উদ্দেশ্য তার ছিল না। তিনি পুলিশকে আক্রমণ করেছিলেন তাদের হাতে শহীদ হওয়ার জন্য। 

ওই মামলার খালাস পর থেকে পুলিশ তার ওজর নজর রাখতে থাকে। এ সময় সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া মহিউসুন্নাথের সব পোস্ট দেখে পুলিশের সন্দেহ বাড়ে। সেই সঙ্গে নতুন করে তদন্তও শুরু হয় তাকে নিয়ে। 

পোস্টগুলিতে জিহাদি প্রচারণা, যুদ্ধক্ষেত্রের মৃত্যু আশাসহ এমন সব পোস্ট দেওয়া হতো। মহিউসুন্নআতের পরিকল্পনা জানতে ২০১৯ সালের প্রথম ছয় মাস মিকায়েল, হামজা এবং জুলফ নামে তিন পুলিশ অফিসার জঙ্গি ছদ্মবেশে মহিউসুন্নাতের সঙ্গে কথা বলতে থাকেন। 

ধীরে ধীরে তাদের সঙ্গে মহিউসুন্নাতের যোগাযোগ বাড়তে থাকে। ছদ্মবেশে থেকে পুলিশ অফিসাররা তাকে কোনো আক্রমনে জন্য উস্কে না দিয়ে তিনি কী করতে চান সে বিষয়ে জানার চেষ্টা করতে থাকেন এবং প্রমাণ সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়ে যান। 

এক সময় মহিউসুন্নাত নিজেকে বাকিংহাম প্যালেসের ঘটনায় খালাস ব্যক্তি বলে প্রকাশ করেন। সেই সঙ্গে কর্মকর্তাদের জানান ওই হামলার আগে তিনি কেমন শান্তি অনুভব করেছিলেন। 

একজন অফিসারকে তিনি জানান বাকিংহাম প্যালেসের একজন সৈনিককে তিনি হত্যা করতে চেয়েছিলেন। 

ছদ্মবেশে থাকা এক অফিসার জানান, কথাবার্তার সময় মহিউসুন্নাত চৌধুরী ‘অনেক, অনেক অনুষ্ঠানে’ সন্ত্রাসের ঘটনাটি চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছিলেন, তবে তার পরিকল্পনা কী তা স্পষ্ট করে কখনও জানাননি।

গত বছরের ১৭ জুন, মহিউসুন্নাত একটি যুদ্ধের দৃশ্যের একটি কার্টুন পোস্ট করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘আমার কাছে প্রশ্নগুলি ভাবার সময় নেই, এখন হরতাল ও হত্যার সময়।’

পুলিশ কর্মকর্তারা ছদ্মবেশে থেকে মহিউসুন্নাতের কথাবার্তা, পরিকল্পনার কথা জেনে সে গুলো আদালতে সেগুলো প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেন। তবে মহিউসুন্নাতের আইনজীবী বলেন, তার মক্কেল মনোযোগ আকৃষ্ট করতেই এ ধরনের কথাবার্তা বলেছেন। কারণ সে শুধু কথাই বলেছে, কখনও কিছু করেনি। 

তিনি আরও বলেন, খালাস পাওয়ার পর কোনও সন্ত্রাসী পুরো বিশ্ব দেখানোর জন্য এমন সব পোস্ট করতে পারে? শুধুমাত্রা মনোযোগ পাওয়ার জন্যই কেউ এমন শিশুসুলভ আচরণ করতে পারে। 

তবে মেট্রোপলিটন পুলিশের সন্ত্রাসবিরোধী প্রধান কমান্ডার রিচার্ড স্মিথ বলেছেন, ‘মহিউসুন্নাত চৌধুরী একজন ব্যতিক্রমী বিপজ্জনক ব্যক্তি। তিনি হত্যাচেষ্টা করেছেন সেটা বিচারে প্রমাণিত হয়েছে। এটা শুধু কথার কথা হতে পারে না।’

মহিউসুন্নাত চৌধুরীর বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে সে গুলো হচ্ছে-

১. লড়াই করার প্রশিক্ষণ গ্রহন এবং বোনের সাহায্যে তরোয়াল কেনা

২. গবেষণা এবং একটি শ্যুটিং কোর্সে যোগদানের পরিকল্পনা। পিস্তল পাওয়া এবং একটি সত্যিকারের বন্দুক চাওয়া্

৩. লন্ডনকে লক্ষ্যবস্তু করে গবেষণা

৪. শোওয়ার ঘরে ছুরি চালানোর অনুশীলন করা 

২৮ বছর বয়সী মহিউসুন্নাতচৌধুরী সন্ত্রাসবাদের ষড়যন্ত্রের দায়ে এ পর্যন্ত তিনবার বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডও হতে পারে।