মায়ের খুনিকে কি শেষ পর্যন্ত ক্ষমা করেছিল তারা

প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০     আপডেট: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০   

অনলাইন ডেস্ক

মায়ের সঙ্গে সারাহ

মায়ের সঙ্গে সারাহ

২০০২ সাল। ইওয়ান সেতিয়াওয়ান নামের ইন্দোনেশিয়ান এক ব্যক্তি মোটরসাইকেলে তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষার জন্য ছুটছিলেন চিকিৎসকের আছে। তাদের দ্বিতীয় সন্তান আসতে তখন আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি ছিল। তাদের বহনকারী মোটরসাইকেলটি জাকার্তার অস্ট্রেলীয় দূতাবাস পার হওয়ার সময় কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিকট এক শব্দ হয়। ইওয়ান ও তার স্ত্রী মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে পড়ে যান। 

নিজের পঞ্চম জন্মদিনে মাকে হারায় সারাহ

কিছুক্ষণের মধ্যে ইওয়ান তার চারপাশে রক্তের বন্যা বয়ে যেতে দেখেন। ধাতব কিছু এসে পড়ে তার চোখে। ইওয়ানের স্ত্রী পড়ে ছিলেন কয়েক মিটার দূরে। ইওয়ান বুঝতে পারেন তারা বোমা হামলার শিকার হয়েছেন। 

এরপর দ্রুত তাদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। মারাত্মকভাবে আহত ইওয়ানের স্ত্রী হালিলা সেরোজাদৌলাকে নেওয়া হয় লেবার রুমে (সন্তান প্রসব কক্ষ)। 

ইওয়ান জানান, গুরুতর অবস্থার পরেও তার স্ত্রী অলৌকভাবে ওই রাতে স্বাভাবিকভাবে এক পুত্র সন্তান প্রসব করেন। যার নাম পরে তারা রিজকি বা আশীর্বাদ রাখেন। 

কিন্তু বোমা হামলার কারণে হালিলা এতটাই আহত হয়েছিলেন যে আর কোনোদিন তিনি স্বাভাবিক হতে পারেননি। ২ বছর ভুগে ২০০৪ সালে তিনি মারা যান। হালিলা যেদিন মারা যান সেদিন ছিল তার বড় সন্তান সারাহর পঞ্চম জন্মদিন।  

ইওয়ান ও তার স্ত্রী যেদিন বোমা হামলার শিকার হন ইওয়ান তখন জানতেন না ওটা ছিল আত্মঘাতী বোমা হামলা। পরে জানতে পারেন ওইদিন ইন্দোনেশিয়ার বালিসহ দেশটির বিভিন্ন স্থানে সিরিজ বোমা হামলা করে আল-কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় জঙ্গি গোষ্ঠী জেমাহ ইসলামিয়াহ। ওই বছর বিশ্বজুড়ে তারা ২০২ জনকে হত্যা করে।

বোমা হামলার ঘটনায় পরে দুই জনকে আটক করা হয়। বিচারে তাদের মৃতুদণ্ডও হয়। 

ইওয়ান ও তার দুই ছেলেমেয়ে কিছুদিন আগে দেখা করেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ওই দুই জঙ্গির সঙ্গে। বিবিসির প্রতিবেদনে জানা গেছে, মায়ের খুনিদের সঙ্গে দেখা করার ওই মুহূর্তের কথা।

জঙ্গি হামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে দেখা করার সূত্র ধরে ইওয়ান একবার এক জঙ্গির সঙ্গে দেখা করেন। পরে সন্তানদের আগ্রহে যান সাজাপ্রাপ্ত ওই দুই জঙ্গির সঙ্গে দেখা করতে। মায়ের মৃত্যুর ১৩ বছর পর ২০১৯ সালে অক্টোবরে হালিলার সন্তানরা জাভা উপকূলে নুসাকামবাঙ্গান দ্বীপে ইন্দোনেশিয়ার সর্বোচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত কারাগারে তাদের মায়ের খুনিদের সঙ্গে দেখা করেন।

ইওয়ান বলেন, ‘মায়ের খুনি দেখতে কেমন, কেনোই বা তারা এমন কাজ করেছে সন্তানরা সবসময়ই তা জানতে চেয়েছে। এ কারণে আমি সুযোগটি নিয়েছি।’

মায়ের খুনিদের সঙ্গে দেখা করার কারণ সম্পর্কে ইওয়ানের বড় সন্তান ১৭ বছরের সারাহ বলেন, ‘আমি জানতে চাই, তারা কেন এমন কাজ করল। আমি আশা করি, এই বৈঠক সন্ত্রাসীদের চিন্তাভাবনা পরিবর্তন করবে এবং তারা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যদি তারা সত্যিই তাদের কাজের জন্য অনুশোচনা করে, তবে এটা অন্যকে প্রভাবিত করবে। এ ধরনের ঘটনা আর হবে না।’ 

আসামি হাসানের সঙ্গে ইওয়ান ও তার  ছেলেমেয়ে

ইওয়ান তার সন্তানদের নিয়ে কারাগারে প্রথম দেখা করেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ইভান দারমওয়ান মন্টু, ওরফে রইসের সঙ্গে। বিচার চলাকালীন একবার স্ট্রোক হয়েছিল রইসের। ওইদিন কমলা পোশাক পরে, হুইলচেয়ারে বসে, হাতকড়া পরা অবস্থায় তিনি দেখা করেন ইওয়ান ও তার সন্তানদের সঙ্গে।

রায়ের পর রইস আদালতে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘মৃত্যুদণ্ড দেওয়ায় আমি কৃতজ্ঞ। কারণ শহীদ হিসেবে আমি মারা যাব।’ 

ধারণা করা হয়, ইরাক যুদ্ধে আমেরিকার সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ায় ওই দিন ইন্দোনেশিয়ায় অস্ট্রেলিয়া দূতাবাসকে হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। 

রইসের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর ইওয়ান তাদের দেখা করার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেন। সেই সঙ্গে ছেলে রিজকিকে দেখিয়ে জানান, মৃত্যুর আগে তার স্ত্রীর সন্তান প্রসবের কথা। তার কথা শুনে রইস বলেন, ‘আমারও একটি সন্তান রয়েছে। আমি বহু বছর আমার স্ত্রী-সন্তানকে দেখিনি I আমি তাদের সত্যিই মিস করছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আপনি এখনও সন্তানদের সঙ্গে রয়েছেন। কিন্ত আমার সন্তান আমাকে চেনেও না।’

রইস কথা বলার সময় সারাহ ও রিজকির দিকে তাকালে তারা ইচ্ছাকৃত দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। সারাহ একসময় রইসের কাছে জানতে চায়, কেন তিনি এমন ঘটনা ঘটিয়েছেন। উত্তরে রইস বলেন, 'বড় হলে তোমরা এর কারণ হয়তো বুঝতে পারবে।' সেই সঙ্গে তিনি আরও বলেন, 'মুসলিমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এমন কোনো হামলার সঙ্গে আমি একমত নই। এটি ঠিক নয়।’

ইওয়ানরা চলে আসার আগে, রইস তার জন্য প্রার্থনা করার অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, ‘সব মানুষ ভুল করে। আমি যদি কোনোভাবে তোমাদের প্রতি অন্যায় করে থাকি, তবে ক্ষমা চাই। আমি সত্যিই কষ্ট অনুভব করছি।’

ছেলে মেয়ের সঙ্গে ইওয়ান

পরে ইওয়ান তার সন্তানদের নিয়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আরেক আসামি আহমাদ হাসানের সঙ্গে দেখা করতে যান। 

এখানেও ইওয়ান তার সঙ্গে দেখা করার কারণ ব্যাখ্যা করেন। আহমাদ হাসান জানান, তিনি কখনই সারাহর বাবা-মাকে আঘাত করতে চাননি। তারা ওই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় বোমা বহনকারীদের একজন সেটির বিস্ফোরণ ঘটায়।  ইওয়ান ও তার সন্তানদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, 'আশা করি আপনারা আমাকে ক্ষমা করতে পারবেন।’ আহমাদ হাসান আরও বলেন, ‘আমি ত্রুটিযুক্ত মানুষ। আমি অনেক ভুল করেছি।’

সারাহ এ সময় তার জীবনের গল্প জানায় হাসানকে। সে বলে, তার পঞ্চম জন্মদিনে চারটার সময় যখন পার্টি হওয়ার কথা ছিল তখন কীভাবে তা হতাশায় পরিণত হয়েছিল সেসব কথা। 

সারাহ আরও জানায়, ছোট থাকতে বাবার কাছে সে বারবার জানতে চাইত মা কোথায়। বাবা বলতেন, মা আল্লাহর ঘরে আছেন। সারাহ জানতে চাইতো সেটা কোথায়? বাবা বলতেন, একটি মসজিদে। একবার তাই পালিয়ে সারাহ মসজিদে চলে গিয়েছিল। সেখানে সে মায়ের জন্য অপেক্ষা করে। কিন্তু মা আসেনি। সারাহ জঙ্গি হাসানের কাছে জানতে চায়, কেন তিনি এমন ঘটনা ঘটিয়েছেন? 

উত্তরে হাসান বলেন, ‘আমার বন্ধু ও আমাকে ভুল শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল।’ কথা বলার এক পর্যায়ে হাসান কেঁদে ফেলেন। বলেন, ‘আমি চোখের পানি ধরে রাখতে পারছি না। সারাহকে আমার সন্তান হিসেবে গ্রহণ করে বলছি, দয়া করে আমাকে ক্ষমা করো।’

এরপর সবাই একসঙ্গে কাঁদতে থাকে। ইওয়ান বলেন, ‘আমি যখন হাসানকে কাঁদতে দেখি- তখনই বুঝেছি তিনি একজন ভালো মানুষ। তিনি অন্যের কষ্ট ও বেদনা অনুভব করতে পারেন।’  ইওয়ান আরও বলেন, 'হাসান আসলে ভুল ধারণা থেকে ভুল লোক দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন।’

আসামিদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ শেষ হওয়ার পর ইওয়ান ও তার দুই সন্তান আহমাদ হাসানের সঙ্গে হাত ধরে ছবি তোলেন। 

সারাহ বলে, ‘হাসান তার কৃতকর্মের জন্য আফসোস করেছেন, ক্ষমা চেয়েছেন। আমি শিখেছি, এত ভয়াবহ ঘটনার পরও একজনের পরিবর্তন হতে পারে। আমি তাকে ক্ষমা করে দিয়েছি।’

সারাহ জানায়, খুনিদের কাছে তার যা জানার ছিল তা সে জেনেছে। এ কারণে সে এখন স্বস্তি অনুভব করে।