ভারতের দিল্লিতে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে মুসলিমদের ওপর শুরু হওয়া হামলায় হতাহত হয়েছেন বহু মানুষ। জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে মসজিদসহ মুসলমানদের বাড়িঘর, দোকানপাট। 

দিল্লি হামলার সেই দৃশ্য কতটা বর্বোরচিত ছিল তা ধীরে ধীরে প্রকাশ পাচ্ছে। সহিংসতার শিকার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শী অনেকের কাছে জানা গেছে সেই সময়ের ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা। 

২৪ ফেব্রুয়ারি দাঙ্গা চলাকালীন কাপড় বিক্রেতা ইমরান খান অন্যান্য দিনের মতো কাপড় বিক্রি করে হেঁটে বাড়িতে ফিরছিলেন। ওই সময় হামলাকারীদের কয়েকজন তাকে থামিয়ে নাম জিজ্ঞেস করে। পরে তার নাম শুনে মুসলিম বুঝতে পেরে এক ডজনেরও বেশি লোক তাকে রড, হাতুরি আর লাঠি দিয়ে পেটাতে থাকে। 

হামলাকারীরা পিটিয়ে হত্যা করে মুসলমানদের

দুই ঘণ্টা পর শিববিহারের হিন্দুপাড়ার কাছে আবর্জনা ভর্তি একটা খালে ইমরান নিজেকে আবিষ্কার করেন। 

হাসপাতালে চিকিৎসারত ইমরান জানান, হামলাকারীরা তার গলায় দড়ি বেঁধেছিল। তিনি মরে গেছেন ভেবে তাকে খালে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।

বাড়ি থেকে মাত্র আধ মাইল দূরে অন্ধকারে ইমরান রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকলেও ইমরানের পরিবার ওইসময় তার কোনো খোঁজ পায়নি। তার মা ও স্ত্রী ছোট ছোট দুই সন্তানকে নিয়ে বাড়ি থেকে জয় শ্রী রাম ধ্বনি শুনে আতঙ্কে কাঁপছিলেন।

সরকার কর্তৃক সমর্থিত দুটি মুসলিম বিরোধী নীতির ওপর মাসব্যাপী উত্তেজনা ও বিক্ষোভের পর ২৩ ফেব্রুয়ারি ভারতের দিল্লিতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ডানপন্থী হিন্দুরা নিজেদের স্বরূপ প্রকাশ করতে শুরু করেন। 

ভারতবর্ষে মুসলিম ও হিন্দুদের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা, এবং  সহিংসতার ইতিহাস আছে। তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী মনোভাবের কারণে সম্প্রতি এ বিদ্বেষ প্রকট হয়ে উঠেছে। 

ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) এক সদস্য উত্তর-পূর্ব দিল্লির একটি অঞ্চলে বিক্ষোভ বন্ধ করতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়ার পর দিল্লিতে সহিংস হামলা শুরু হয়েছিল। 

এর আগে ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন এবং জাতীয় নাগরিকদের নিবন্ধন নিয়ে হাজার হাজার মুসলমান, বেশিরভাগ নারীরা প্রতিবাদ করে আসছিলেন। 

পুলিশ বিক্ষোভ বন্ধের নির্দেশ পাওয়ার আধঘণ্টার মধ্যেই দিল্লিতে হামলা শুরু হয়। হিন্দু উগ্রবাদীরা শিববিহারসহ আশপাশের রাস্তায় আক্রমণ চালায়। পরের চারদিন মুখোশ পরে, মাথায় হেলমেট লাগিয়ে তারা মুসলমানদের পিটিয়ে মারে। সেই সঙ্গে ঘর, দোকান, স্কুল, মসজিদ জ্বালিয়ে দেয়। অনেকে নিজেদের বাঁচাতে হামলাকারীদের প্রতিহত করতেও চেষ্টা করেন। 

দিল্লির সহিংসহতায় হিন্দু ধর্মালম্বীসহ চারদিনে মারা গেছেন ৫২ জন।এ ছাড়া এতে আহত হয়েছেন ৩৫০ জনেরও বেশি। 

ইমরান খান ২৪ ফ্রেবুয়ারি হামলার শিকার হলেও তার পরিবার তাকে হাসপাতালে নিতে পারছিলেন না। কারণ হামলাকারীরা হামলার পরও আশেপাশের এলাকায় ঘরবাড়ি পুড়িয়ে, মানুষজনকে ভয় দেখিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করে রেখেছিল। 

ইমরান বলেন, ‘ দুইদিন আমি ঘরেই ছিলাম। আমার চিকিৎসা করার কেউ ছিল না। মা আমার মাথায় কাপড় বেঁধে রেখেছিলেন।’

তিনি জানান, বাইরে বের হতে না পেরে শিশুদের পানি দিয়ে এক ধরনের চাপাতি তৈরি করে খাইয়েছেন। 

ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ায় অনেকেই হয়েছেন ঘরহারা 

ইমরান জানান, সারাক্ষণ তাদের মনে হচ্ছিল হামলাকারীরা তাদের মেরে ফেরবে। এ কারণে শিশুরা যাতে না কাঁদে বা শব্দ না করে এজন্য কাপড় দিয়ে দোলনা তৈরি করে তাদের সঙ্গে খেলা করে শিশুদের ব্যস্ত রেখেছেন। 

ইমরান বলেন, ‘ সব কিছু শান্ত হওয়ার পর বের হয়ে দেখলাম সবকিছু জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

ইমরানের পরিবার তাকে হাসপাতালে নেয় ২৭ ফেব্রুয়ারি। চিকিৎসকরা তার মাথায় ও শরীরে গভীর ক্ষত হয়েছে বলে জানিয়েছেন। 

সংকটময় এ সময়ে প্রাইভেট হাসপাতালগুলো কোনো টাকা দাবি করেনি। কিন্তু সুস্থ হতে ইমরানের কত টাকা খরচ হবে তা তার জানা নেই। ভষ্যিতে তিনি আর কাজ করতে পারবেন কিনা সেটাও জানেন না। এদিকে পরিবারসহ বাড়ি ফিরতেও তারা ভয় পাচ্ছেন।

চিকিৎসারত ইমরান প্রসঙ্গে এক চিকিৎসক জানান, তার ক্ষত সারছে না। তাকে আরও বেশি সুযোগ-সুবিধাসহ অন্য হাসপাতালে পাঠানো দরকার।

 ‘আল হিন্দু’ নামের যে হাসপাতালে ইমরান চিকিৎসাধীন সেখানে মাত্র ১৫ টি বেড আর ৩ জন চিকিৎসক রয়েছেন। কিন্তু হামলার শিকার বহু মানুষের চিকিৎসার একমাত্র ঠিকানা হয়েছে এ ছোট হাসপাতালটি।

হাসপাতালটির প্রতিষ্ঠাতা ডা. আহতেশাম আনোয়ার জানান, দিল্লির সহিংসতায় চারদিনে আহত অন্তত ৬০০ মানুষ এখানে চিকিৎসা নিতে এসেছেন। এর মধ্যে গুলিতে ও ছুরিকাঘাতে নিহত দুই ব্যক্তিও ছিলেন। 

ডা. আনোয়ার বলেন, ‘ হাসপাতালে মানুষের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। কারও হাত বা আঙ্গুলগুলি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। সব জায়গায় রক্ত ছিল, আমার নিজের পোশাক রক্তে ভিজে গেছিল।’

ডা. আনোয়ার জানান, আল হিন্দ-এ যারা এসেছিলেন তাদের মধ্যে অনেকেই গুরুতর আহত ছিলেন। তাদের  আরও উন্নত হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। 

তিনি বলেন, ‘কিন্তু ওই সময় সরকারের পক্ষ থেকে সাড়া না থাকায় তখন তা অসম্ভব ছিল। এতে আহতদের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। তা না হলে অনেক সম্ভাব্য মৃত্যু এড়ানো যেত।’ 

ডা. আনোয়ার আরও বলেন, ‘হামলা শুরুর দুই দিন পর হাসপাতাল রোগীতে ভরে গেছিল। কিন্তু পুলিশ সব জায়গায় পাহারায় থেকে অ্যাম্বুলেন্স ভেতরে আসতে বাঁধা দিচ্ছিল ।’

তিনি জানান, ওই সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিচিত অনেককেই তিনি ফোন করেছেন, কিন্তু কোনো সাহায্য পাননি। তবে স্থানীয় চিকিৎসক, প্যারামেডিকস এবং ওষুধ স্টোর মালিকরাও স্বেচ্ছাসেবী হয়ে আল হিন্দ গিয়েছিলেন। হামলার দু'দিন পর আল হিন্দ হাসপাতালে ১৫ জন চিকিৎসক আহতদের সেবা দিয়েছেন। স্থানীয় ওষুধের দোকান থেকে তাদের জন্য ওষুধও আনা হয়েছিল।

২৭ ফেব্রুয়ারি সহিংসতা শেষ হওয়ার পর কমপক্ষে এক ডজন পরিবারকে আল হিন্দ থেকে পাঁচ মাইল দূরে ২ হাজার ৫০০  শয্যাবিশিষ্ট গুরু তেগ বাহাদুর হাসপাতালের বাইরে নিজেদের স্বজনের মৃতদেহের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। 

এর মধ্যে একটি পরিবার হচ্ছে দাঙ্গায় নিহত ৫৮ বছর বয়সী আনোয়ার কাউসারের। কাউসারের মেয়ে, অন্ধ জামাই, ভাই সালিম হাসপাতালে বাইরে তার জন্য কাঁদছিলেন আর একে অন্যকে সান্ত্বনা দ্চ্ছিলেন। 

সালিম জানান, দাঙ্গার সময় তিনি ও তার পরিবার হিন্দু এলাকায় লুকিয়ে ছিলেন। ওই সময় হামলাকারীরা সালিমদের বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। আর সালিমের ভাই কাউসারকে গুলি করে হত্যা করে। তারপর তাকে আগুনের মধ্যে ফেলে দেয়। 

সালিম বলেন, ‘আমরা শুধু ভাইয়ের পা খুঁজে পেয়েছি। তার মৃতদেহটি পাওয়ার জন্য এখন অপেক্ষা করছি।’ 

ডা. আনোয়ারের মতে, আহত অনেকের ক্ষত হয়তো একদিন সেরে যাবে। কিন্তু তাদের ট্রমা অনেকদিন থাকবে। 

তিনি বলেন, মুসলমানরা এতটাই ভয়ের মধ্যে আছেন যে হিন্দু জাতীয়তাবাদের কোনও ইঙ্গিত, ইউনিফর্ম, জয় শ্রী রামের মতো স্লোগান, এমনকি কারও কপালে সিঁদুর দেখলেও তারা ভয় পাচ্ছেন।

ডা. আনোয়ারের ভাষায়, সন্ত্রাসবাদের এমন ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো মানবতার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলছে।