মাদ্রিদের দিনলিপি

এ দৃশ্য দেখতে হবে কল্পনা করেনি কেউ

প্রকাশ: ২৩ মার্চ ২০২০     আপডেট: ২৩ মার্চ ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

রাশেদ মেহেদী

মাদ্রিদের একটি হাসপাতালে মেঝেতে রোগী- সংগৃহীত

মাদ্রিদের একটি হাসপাতালে মেঝেতে রোগী- সংগৃহীত

যে ছবিটি দেখা যাচ্ছে, সেটি স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের একটি বড় হাসপাতালের।

এখানে মানুষ শুয়ে আছে এখন মেঝেতে। কারণ হাসপাতালে কোনো বেড খালি নেই। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। চিকিৎসার পর্যাপ্ত উপকরণও নেই হাসপাতালে। তীব্র জ্বর নিয়ে আসা রোগীকে দ্রুত পরীক্ষা কিংবা অক্সিজেন সুবিধাও দেওয়া যাচ্ছে না। করোনাভাইরাস স্পেনের মতো উন্নত দেশের জনজীবন শুধু নয়, চিকিৎসা ব্যবস্থাকেও প্রায় তছনছ করে দিয়েছে। সরকার পালাক্রমে সব চিকিৎসককে প্রায় ২৪ ঘণ্টা ব্যস্ত রাখছে। তারপরও হাসপাতালগুলোর এ করুণ চিত্র। ছবিটি পাঠিয়েছেন স্পেনপ্রবাসী রিজভী আলম। তিনি স্পেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। ইউরোপের পর্যটনের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র স্পেনে আছেন প্রায় ১৬ বছর। যখন তার সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কথা হচ্ছিল, তখন প্রায় কেঁদে ফেলেন তিনি, 'ভাই, এত বছর ধরে এ দেশে আছি। এত ভয়ংকর অবস্থা কখনও দেখিনি। মাদ্রিদ দূষণমুক্ত একটি শহর। এ দেশের মানুষও খুবই স্বাস্থ্যসচেতন। এখানে সবসময় সতেজ এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খায় সবাই। সুখী মানুষের শহর বলতে যা বোঝায়, এ শহর তাই। এখানে স্বাস্থ্যসেবাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। কেউ আহত হলে, গুরুতর অসুস্থ হলে, যে কোনো হাসপাতালে গেলে দ্রুত চিকিৎসা দিতে হয় তাকে। চিকিৎসার ব্যয় বহনের সামর্থ্য না থাকলে তার দায়িত্ব সরকার নেয়। অথচ আজ সেই মাদ্রিদ শহরের হাসপাতালে অসহায় মানুষ শুয়ে আছে মেঝেতে। দু'মাস আগেও কেউ কল্পনা করতে পারেনি, মাদ্রিদের এ চিত্র দেখতে হবে।'

'মাদ্রিদ শহরে কীভাবে জীবন কাটছে এখন?'

রিজভী আলম বলেন, 'গত ১২ মার্চ থেকে পুরো মাদ্রিদ শহর লকডাউন করা হয়েছে। সেই থেকে ঘরের ভেতরে। দু-একবার বাইরে গেছি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার-দাবার কেনার জন্য। প্রথমে কথা ছিল ২৮ মার্চ পর্যন্ত লকডাউন থাকবে। এখন সেটা বাড়িয়ে করা হয়েছে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত। আগে সুপারস্টোরগুলো ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার কথা ছিল। আজ (২২ মার্চ) সকালেই ঘোষণা আসে, সুপারস্টোর দিনের নির্দিষ্ট তিন ঘণ্টা খোলা থাকবে। ফার্মেসিগুলো পুরোপুরি বন্ধ থাকবে। ওষুধের প্রয়োজন হলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সেটা সরবরাহ করবে; কিন্তু ঘরের বাইরে যাওয়া যাবে না। জরুরি সেবা দেওয়ার সরকারি প্রতিষ্ঠান ছাড়া বাকি সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।'

'প্রবাসী বাংলাদেশিরা কেমন আছে এখন?'

'যারা বৈধভাবে বসবাস করছেন, তাদের ততটা সমস্যা নেই। সরকার থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ অন্য সব সেবা ঘরে থাকলেও পাবেন তারা। অফিস, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও বেতনের ৮০ শতাংশ পাবেন। এ সময়ের জন্য আয়করও কাটা হবে না। ফলে বৈধদের সমস্যা নেই। কিন্তু অনেকে এখানে দীর্ঘদিন ধরে আছেন, যাদের বৈধ কাগজপত্র নেই। তারাই সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন। কারণ তারা কাজ করতেন মূলত রেস্টুরেন্ট, বার, পাব কিংবা ছোটখাটো কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে। বেতন পেতেন দৈনিক কিংবা সাপ্তাহিক কাজের হিসাবে। সবকিছু এখন বন্ধ। এ অবস্থায় তারা বেকার হয়ে পড়েছেন। তারা সরকারি কোনো সাহায্য-সহায়তার আওতায় পড়বেন না। এখন সুপারস্টোরে কিছু কিনতে গেলেও তারা পুলিশের হাতে ধরা পড়তে পারেন। কারণ এখন পুলিশি নজরদারি খুব বেশি। ফলে তাদের জন্য এখন জীবন-মরণ সমস্যা।'

তিনি আরও জানালেন, এ অবস্থায় স্পেন আওয়ামী লীগ পাশে দাঁড়িয়েছে এ প্রবাসীদের। স্পেন আওয়ামী লীগের একটি সহায়তা তহবিল গঠন করা হয়েছে। যোগাযোগ রক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে সবার সঙ্গে। তাদের সহায়তা হিসেবে অন্তত প্রত্যেককে পাঁচ কেজি চাল, ডাল, আলু, তেল সরবরাহের একটা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। লকডাউনের মধ্যে তাদের কাছে এসব সরবরাহ করাটাও বেশ কষ্টকর। তার পরও যারা যোগাযোগ করবে, তাদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে। কারণ এ অবস্থায় বাংলাদেশ দূতাবাসেরও কিছু করার নেই তাদের জন্য। সাংগঠনিক উদ্যোগই এখন ভরসা।

'স্পেনের মতো একটা সচেতন দেশে এ রোগ ছড়াল কীভাবে?'

জবাবে রিজভী বলেন, 'প্রকৃতপক্ষে সরকার প্রথমদিকে করোনাভাইরাস সংক্রমণের বিষয়টিকে গুরুত্বই দেয়নি। স্পেন এমনিতেই ইউরোপের অন্যতম প্রধান পর্যটনের দেশ। এখানে প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসে বেড়াতে। গ্রীষ্ফ্মকালে পর্যটকের ভিড় থাকে প্রায় উপচেপড়া। কোনো হোটেলেই রুম খালি পাওয়া যায় না। সামনে গ্রীষ্ফ্মকাল, পর্যটনের মৌসুম সামনে রেখেই হয়তো মাসখানেক আগে যখন দু-একজনের করোনাভাইরাস সংক্রমণের কথা শোনা যায়, তখন বিষয়টিতে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে চায়নি সরকার। সে সময় ইতালিতে সংক্রমণ বাড়ছিল। চীন প্রায় বিপর্যন্ত ছিল। সে সময়ও চীন কিংবা ইতালির সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করেনি সরকার। এ থেকেই বোঝা যায়, প্রথমদিকে গুরুত্ব কম দেওয়া হয়েছে। এ গুরুত্ব কম দেওয়ার কারণেই এখন স্পেনে করোনা এক অর্থে ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে। আমি, আমার পরিবারও প্রবল শঙ্কার মধ্যে আছি। ফ্ল্যাটের বাইরে আমি ছাড়া পরিবারের কেউ যায় না। এমনকি নিচের বাগানেও বসতে যায় না কেউ। ১২ এপ্রিল পর্যন্ত এভাবেই চলবে। এর পরও কী হবে কেউ জানে না। অদৃশ্য শত্রু করোনাভাইরাস শেষ পর্যন্ত কোন পরিণতিতে ঠেলে দেবে, সে দুশ্চিন্তায় কাটছে প্রতিটি মুহূর্ত!'