করোনার দিনলিপি

সব জানালায় আতঙ্কিত মানুষের মুখ

অসচেতনতার কারণেই বাঙালিরা বেশি আক্রান্ত

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ইন্দ্রজিৎ সরকার

'প্রথম প্রথম অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ পেলে প্রতিবেশীরা জানালা খুলে চেয়ে দেখত। কিন্তু পরের দিকে এই শব্দ শুনতে পেলেই সবাই দ্রুত জানালা বন্ধ করে দেওয়ার ব্যবস্থা করত।' নোবেলজয়ী ফরাসি সাহিত্যিক আলবেয়ার কামু 'দি প্লেগ' উপন্যাসে আলজেরিয়ার সমুদ্র-উপকূলবর্তী শহর ওরাওয়ে মহামারিকালের এমন বর্ণনা দিয়েছেন। একই বর্ণনা যেন এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সেখানকার বাসিন্দা বাংলাদেশি নারী উদ্যোক্তা সুবর্ণা কাজল সমকালকে বললেন, 'আশপাশে তো বটেই, আমার বিল্ডিংয়েও করোনা আক্রান্ত আছে। বলতে গেলে প্রতি মুহূর্তেই পরিচিত বা অপরিচিত কারও আক্রান্ত হওয়ার খবর শুনছি। আগে অন্যদের খবর শুনে বেদনাহত হয়ে পড়তাম, এখন নিজে কতক্ষণ সুস্থ থাকতে পারব, সেই দুশ্চিন্তা থেকে বের হতে পারছি না।'
নয় বছরের বেশি সময় ধরে নিউইয়র্কে আছেন সুবর্ণা। সেখানে তিনি একটি ভিআইপি সেলুন পরিচালনা করেন। করোনার কারণে তিন সপ্তাহ ধরে বন্ধ তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। স্বেচ্ছায় ঘরবন্দি হয়ে আছেন। তিনি বলেন, 'বাইরে বের হওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। তাই মাঝেমধ্যে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকি। যতটুকু দেখা যায়, বিভিন্ন বিল্ডিংয়ের জানালা দিয়ে নানা বয়সের মানুষ রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছেন। তাদের চেহারায় স্পষ্ট আতঙ্কের ছাপ। নিউইয়র্কবাসীর মধ্যে করোনা কেমন প্রভাব ফেলেছে, এটা থেকেই বোঝা যায়। আমার ছয় মাস বয়সী একটা বেবি আছে। বাসায় ৭০ বছর বয়সী মা আছেন। সব মিলিয়ে এমন একটা পরিস্থিতি যে, ভয়ে ঘুম আসে না!'
করোনায় আক্রান্তের হার এখন সবচেয়ে বেশি যুক্তরাষ্ট্রে। এর মধ্যে নিউইয়র্কের অবস্থা বেশি খারাপ। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত এক লাখ ২৩ হাজারের বেশি মানুষ সেখানে আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন চার হাজার ১৫৯ জন, যা চীনের চেয়েও বেশি।
নিউইয়র্কের বিভিন্ন স্থানে প্রচুর বাংলাদেশি থাকেন। কুষ্টিয়ার মেয়ে সুবর্ণা থাকেন ব্রঙ্কস এলাকায়। তার স্বামী নাসির উদ্দিন নিউইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টে কর্মরত। সুবর্ণা জানান, নিউইয়র্কে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের বড় অংশই এখন খুব বিপদে আছে। অনেকেই হয়তো ভাবেন, উন্নত দেশে বাস করেন বলে সবার আর্থিক অবস্থা খুবই ভালো, বাস্তবতা তা নয়। সেখানে বেশিরভাগ মানুষ সাপ্তাহিক ভিত্তিতে চাকরি করেন, সপ্তাহ শেষে বেতন পান। এখন সপ্তাহের পর সপ্তাহ কাজ বন্ধ থাকায় তারা বেতনও পাচ্ছেন না। অনেকের চাকরিও আর নেই। যারা ব্যবসা করতেন, তাদের দোকানপাট বন্ধ। এতে অনেকের পরিস্থিতি বেশ খারাপ হয়ে পড়েছে। সেখানকার সামর্থ্যবান ও পরোপকারী মানুষরা তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। তারা সুবর্ণাকেও ফোন দিয়ে অনুরোধ করেছেন, যেন তিনি কয়েকজনের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনে দেন। তিনি সাধ্যমতো সহায়তা করার চেষ্টা করছেন।
সুবর্ণা বলেন, বাংলাদেশিদের বেশিরভাগ থাকেন জ্যাকসন হাইটসে। সেখানে বাঙালিদের অনেক দোকানপাটও রয়েছে। করোনায় বেশি আক্রান্তও হয়েছেন সেখানকার বাসিন্দারা। তবে এজন্য তাদের অসচেতনতাও দায়ী। দেশে তারা যেমন অসতর্ক, এখানেও তার খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও তারা অবাধে বাজারে গেছেন, দলবেঁধে কেনাকাটা করেছেন। এতে সংক্রমণ ছড়িয়েছে। তাদের অনেকে এখনও জানেন না যে, কোথায় কভিড-১৯ টেস্ট করতে হবে, কী কী সচেতনতা অবলম্বন করা দরকার। অনেকে রোগের লক্ষণ থাকলেও গোপন করেন, কারণ এটা জানতে পারলে অন্যরা তার সঙ্গে মিশবে না! আবার অনেকে ভালো করে ইংরেজি বলতে পারেন না বলে ডাক্তারের কাছে যেতে ভয় পান। কারণ তিনি সমস্যার ব্যাপারে বুঝিয়ে বলতে পারবেন না। আমার ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি আইটি টিচার ছিলেন। এখানে এসে প্রথম তার বাসাতেই উঠেছিলাম। সেই ভদ্রলোক কয়েকদিন আগে জ্বর-জ্বর ফিল করেন। কী হয়েছে ভালো করে বুঝেই উঠতে পারেননি। হাসপাতালে নেওয়ার পর ডাক্তার বলেছেন, করোনার লাস্ট স্টেজ, আর কিছুই করার নেই।
তিনি জানান, কুইন্সে এখন এত মানুষ আক্রান্ত যে সবাই নিজেকে, নিজের পরিবার নিয়ে ব্যস্ত। কে কাকে সাহায্য করবে! ফলে অন্য এলাকা থেকে বাঙালিরা গিয়ে তাদের হেল্প করার চেষ্টা করছে। আগে ৯১১ নম্বরে কল করলে ২ মিনিটের মধ্যে পুলিশ চলে আসত। এখন এমন পরিস্থিতি যে, দুই ঘণ্টায়ও আসে না। ১০-১৫ জন বাঙালি মারা গেছেন, যাদের বয়স চল্লিশের কম। তাদের আবার এক-দুই বছর বয়সের সন্তান আছে।
জ্যাকসন হাইটসে বসবাসকারী এক বাঙালি জানান, তার পরিবারের দুই সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তারা এখন সুস্থ হওয়ার পথে। তবে তাদের সংস্পর্শে আসা আরও একাধিক ব্যক্তি ঝুঁকিতে রয়েছেন। ঠান্ডা আবহাওয়ায় এই ভাইরাস বেশি ছড়ায় বলে শুনেছেন। এখানে জুন পর্যন্ত ঠান্ডা থাকবে। কখনও তো মাইনাস ৭ ডিগ্রিতে নেমে যায়। ফলে কতদিন যে তিনি ভালো থাকতে পারবেন, বুঝতে পারছেন না।



বিষয় : করোনা