করোনাভাইরাসের কারণে তীব্র সংকটে পড়েছে বিশ্ব। অর্থনৈতিক থেকে মানসিক- সবদিক দিয়েই ক্ষতির মুখোমুখি সাধারণ মানুষ। তবে ইউরোপের কয়েকজন শাসক এই নজিরবিহীন স্বাস্থ্য সংকটকে ভিন্নমত দমন এবং নিজেদের ক্ষমতার ভীত শক্ত করার কাজে লাগাচ্ছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করোনাভাইরাস নিয়ে পোস্ট দেওয়ার কারণে তুরস্কে এরই মধ্যে কয়েকশ’ মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দেশটিতে ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব সংক্রান্ত তথ্য কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। চিকিৎসকেরা এ নিয়ে কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না। দেশটির মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের আলি সেরকেজোগলু বলেন, চিকিৎিসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা গত ২০ বছরে এমন পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন।

অন্যদিকে আইনজীবী হুরেম সোনমেজ মনে করেন, প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের জন্য এ মহামারি এক সুযোগ নিয়ে এসেছে। কারণ মহামরির কারণে ইতিমধ্যে সমাজ ও বিরোধী দল দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে তুরস্কের মানবাধিকার আন্দোলনকারীরা মনে করেন, এরদোগানের হাতে এখনই এতো ক্ষমতা আছে যে, তার আরও ক্ষমতার জন্য করোনাভাইরাস সংকট ব্যবহারের দরকার নেই।

তুরস্কের মতোই করোনাভাইরাস নিয়ে অবাধ তথ্য প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করেছে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া। দেশটির পার্লামেন্টে এরই মধ্যে আইন পাস করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ভাইরাস নিয়ে ‘মিথ্যা তথ্য ছড়ালে’ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা ২৫ হাজার ডলার জরিমানা হতে পারে। আবার লকডাউন কার্যকর করতে যে নজরদারির ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সমালোচকেরা একে পুতিনের ক্ষমতার স্তম্ভ হিসেবে দেখছেন।

আর পুতিনের সমর্থকরা মনে করছেন, মহামারির এই সময় তার মতোই একজন শক্তিধর নেতার প্রয়োজন। করোনার আগে এসব তর্ক-বিতর্ক রাশিয়ায় ছিল না বললেই চলে। সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। সংবিধান পরিবর্তন করে ক্ষমতা আরও পোক্ত করার ব্যবস্থা করেছিলেন পুতিন। সামনে নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও অদৃশ্য এক ভাইরাস তা আটকে দিয়েছে। তবে ভোট যখন হবে তখন নতুন সংবিধান অনুমোদনের ব্যাপারে রুশরা কতটা আগ্রহী হবেন? তা ছাড়া করোনার কারণে অর্থনৈতিক মন্দা, লাখ লাখ মানুষের কর্মহীন হয়ে যাওয়ার ব্যাপারগুলো তো রয়েছেই। রুশরা অবশ্য এসব ব্যর্থতার জন্য কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে প্রশ্ন না করে দোষারোপ করে আমলা বা স্থানীয় সরকারকে। এ জন্যই হয়তো পুতিন আঞ্চলিক গভর্নরদের ওপর করোনাভাইরাস মোকাবিলার দায়িত্ব দিয়েছেন।

হাঙ্গেরিতে গণতন্ত্র বলে এখন আর কিছু অবশিষ্ট নেই বললেই চলে। দেশটির ক্ষমতাধর প্রধামন্ত্রী ভিক্টর অরবান ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট সংকটকে ব্যবহার করছেন। গত ১১ মার্চ তার সরকার দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে ভাইরাস মোকাবিলার জন্য। কিন্তু তারপরই প্রধানমন্ত্রী অরবান তার সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্যবহার করে অনির্দিষ্টকালের জন্য এর মেয়াদ বাড়িয়ে দেন। ফলে অরবান এখন যতদিন খুশি এই ডিক্রির মাধ্যমে দেশ শাসন করতে পারবেন। এতে হাঙ্গেরির গণতন্ত্র শেষ হয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন বিরোধীরা।

পোল্যান্ডে আর গণতন্ত্র টিকবে কিনা তা নিয়ে রীতিমতো সংকট সৃষ্টি হয়েছে। মে মাসে দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেই দুদা করোনার প্রাদুর্ভাবের মধ্যেও নির্বাচন থেকে পিছু হটবেন না। কারণ জনমত জরিপ অনুযায়ী তিনিই সে নির্বাচনে নিশ্চিতভাবে জিতবেন। তবে বিরোধী দল ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন চাচ্ছে, দুর্যোগের এ মুহূর্তে নির্বাচন পেছানো হোক। এ ছাড়া নির্বাচন কতখানি সুষ্ঠু হবে তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। তবে সরকার বলেছে, যদি নির্বাচন নাই হয় তাহলে সংবিধান পরিবর্তন করে দুদাকে আরও দুই বছর প্রেসিডেন্ট রাখা হবে।