যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি প্রায় ছয় বছর ধরে নিষিদ্ধ। কিন্তু ইউরোপের মোহে দালালের মাধ্যমে পর্যটন ভিসায় দুবাই কিংবা জর্ডান থেকে মিসর, সুদান হয়ে অবৈধভাবে লিবিয়া যাচ্ছেন হাজারো বাংলাদেশি। তাদের লক্ষ্য ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশ। এ যাত্রায় যুদ্ধ ও দালালের হামলা-নির্যাতনে প্রাণ হারাচ্ছেন অনেকে। কিংবা ডুবে মারা যাচ্ছেন ভূমধ্যসাগরে। তবে এত মৃত্যুতেও বন্ধ হচ্ছে না তরুণদের এই যাত্রা। তাদের ঠেকাতে লিবিয়ায় জনশক্তি রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি ছাড়া তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি সরকার।
গত বৃহস্পতিবার লিবিয়ার মিজদাহতে পাচারকারীদের গুলিতে নিহত হন ২৬ বাংলাদেশি। আহত হন ১১ জন। হতাহতদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ছেড়েছিলেন। প্রত্যেকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দেশ ছাড়েন। লিবিয়ার ভিসা ছিল না তাদের; ছিল না বিদেশে চাকরির অনুমতি।
গত বছর মে মাসে ভূমধ্যসাগরে ডুবে মারা যাওয়া ৩৯ বাংলাদেশি একইভাবে দেশ ছেড়েছিলেন। এর পর পুলিশ-র‌্যাবের হাতে কয়েকজন দালাল ধরা পড়ার পর কিছুদিন এটি কমলেও পরে আবার শুরু হয়।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সমকালকে বলেন, লিবিয়ায় গিয়ে নিহতদের কেউই বৈধভাবে দেশ ছাড়েননি। জনশক্তি খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালক শামসুল আলম বলেন, অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়া বন্ধে গণসচেতনতা তৈরি ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। বিএমইটির সচেতনতা কার্যক্রম চলছে। লিবিয়ার ঘটনার কারণে তা আরও জোরদার করতে হবে। বিমানবন্দরে নজরদারি বাড়াতে হবে।
তিনি আরও বলেন, দালালদের প্রলোভনে বিদেশে যেতে মরিয়া গ্রামের তরুণরা। একজন অবৈধভাবে বিদেশ গেলে তাকে দেখে ১০ জন উৎসাহিত হন। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, অবৈধভাবে বিদেশ যেতে বাবা-মা টাকা তুলে দেন ছেলের হাতে। যতদিন বাবা-মায়েরা সচেতন না হবেন, ততদিন এ পথ বন্ধ হবে না।
জনশক্তি খাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা জানান, গ্রামের তরুণদের বিদেশের স্বপ্ন দেখিয়ে মগজ ধোলাই করে ঢাকায় আনা, বিমানবন্দর পার করা, মিসর বা সুদান থেকে হেঁটে সীমানা পেরিয়ে লিবিয়ায় নেওয়া, সেখান থেকে নৌকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে ঢোকানো- পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করে আন্তঃদেশীয় দালাল চক্র। গ্রাম, ঢাকা, দুবাই, সুদান, মিসর, লিবিয়া থেকে ইতালি- প্রতিটি স্তরে রয়েছে দালাল, যাদের কাজ 'আদম' পার করা।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, যারা লিবিয়া যান তাদের দুবাই কিংবা জর্ডানের ভিসা থাকে। বৈধ ভিসা থাকায় সন্দেহ হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে কিছু করার থাকে না। তাদের আটক করলে ট্রাভেল এজেন্সিগুলো উল্টো চাপ দেয়। আবার বিমানবন্দর পার করতেও রয়েছে দালালদের চক্র।
তবে বিমানবন্দরে আটক করলেও খুব একটা লাভ হয় না। মানব পাচার নিয়ে কাজ করা এসবির সহকারী পুলিশ সুপার (হিউম্যান ট্রাফিকিং) শেখ মো. আবু জাহিদ সমকালকে বলেন, কিছুদিন আগে তারা আশকোনা থেকে সাতজনকে উদ্ধার করেন। তাদেরকে দুবাই হয়ে লিবিয়া পাঠাচ্ছিল দালালরা। তাদের দুবাইয়ের ভিসা ছিল। তবে উদ্ধারের পরও তাদের ঠেকানো যায়নি। লিবিয়ায় পাচার বিষয়ে তারা আদালতে জবানবন্দিও দিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুদিন পর ঠিকই লিবিয়ায় পাড়ি জমান।
তাদের সূত্রে জানা গেল, বাংলাদেশ থেকে ইতালি, গ্রিস বা ইউরোপের কোনো দেশে 'আদম পাচারে' জনপ্রতি আট থেকে ১২ লাখ টাকা নেওয়া হয়। মাদারীপুর, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জ, সিলেট, নরসিংদীসহ ঘুরেফিরে সাত-আটটি জেলার বাসিন্দরাই এ পথে পা বাড়ান। কারণ, এসব জেলার অনেক বাসিন্দা অতীতে অবৈধভাবে ইউরোপ যেতে 'সফল' হয়েছেন। দালালরা এটিকে বিজ্ঞাপন হিসেবে ব্যবহার করে। অন্য তরুণদের মাসে লাখ টাকা উপার্জনের স্বপ্ন দেখিয়ে ইউরোপ পাড়ি দিতে রাজি করায়।
দালালরা ভরসা অর্জনে শুরুতেই পুরো টাকা দাবি করে না। প্রথমে কিছু টাকা নিয়ে লিবিয়া পর্যন্ত নেওয়া হয়। এর পর পুরো টাকার জন্য চাপ দেওয়া হয়। কখনও কখনও প্রতিশ্রুতির চাইতে বেশি টাকা দাবি করে মারধর করা হয়। বিপত্তি বাধে যখন এক মানব পাচারকারীর 'আদম' অন্য মানব পাচারকারী দল জিম্মি করে। তারা মুক্তিপণের জন্য নির্যাতন, এমনকি হত্যা পর্যন্ত করে। গত বৃহস্পতিবার ২৬ বাংলাদেশিকে একই কারণে প্রাণ দিতে হয়েছে। যে পাচারকারীরা তাদের লিবিয়ায় নিয়েছিল, তাদের কব্জা থেকে বাংলাদেশিসহ বাকি 'আদম'দের ছিনিয়ে নেয় আরেক মাফিয়া গ্রুপ। শুরু করে মুক্তিপণের জন্য নির্যাতন।
গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের কামাল শেখের ছেলে ওমর শেখ বৃহস্পতিবারের ঘটনায় দুই পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তার ভাই জামাল শেখ জানান, স্থানীয় দালাল রবিউলের প্ররোচনায় তার ভাই এবং পাশের গ্রামের দুই যুবক সুমন ও কামরুল লিবিয়ায় যেতে রাজি হন। দালাল জনপ্রতি চার লাখ পাঁচ হাজার টাকা নেয়। লিবিয়ায় যাওয়ার পর আরও আট লাখ টাকা করে দিলে ইতালি পৌঁছে দেওয়ার কথা বলা হয়। ওমর, সুমন ও কামরুলের বাড়িতে টাকার জন্য ফোন করা হয়। এর মধ্যে এই তিন যুবক মরুভূমিতে মাফিয়াদের হাতে পড়েন। জনপ্রতি ১২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে মাফিয়ারা। টাকার জন্য প্রায় ১৫ দিন ধরে অত্যাচার, নির্যাতন চলে। বৃহস্পতিবার খবর পান, ওমর আহত হয়েছেন। নিহত হয়েছেন সুমন ও কামরুল। এর পর থেকে দালাল রবিউল নিখোঁজ।
ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান সমকালকে বলেন, বিদেশের দালালরা মুক্তিপণের জন্য নির্যাতন করলে টাকা কিন্তু দেশেই দেওয়া হয়। জিম্মিকারীরাই বলে দেয় দেশে কার কাছে টাকা দিতে হবে। এ টাকা দেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে লিবিয়ায় যায়। তার মানে, একটি আন্তঃদেশীয় চক্র বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া হয়ে ইউরোপে মানব পাচারে জড়িত। বাংলাদেশের গ্রাম পর্যন্ত তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ২০ লাখ মানুষ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়েছেন। এতে ১৯ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। যার মধ্যে অনেক বাংলাদেশি রয়েছেন। ভূমধ্যসাগর দিয়ে যত মানুষ ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করে, সেই তালিকার শীর্ষ দশে রয়েছে বাংলাদেশ। শুধু চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ৬৯৩ জন বাংলাদেশি সাগর পেরিয়ে ইউরোপে প্রবেশের সময় ধরা পড়েন।


বিষয় : লিবিয়ায় মরণযাত্রা

মন্তব্য করুন