মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে দলমত নির্বিশেষে যুক্তরাষ্ট্রের সব প্রেসিডেন্ট প্রায় একই ধরনের নীতি নিয়ে এগিয়েছেন। তবে গত চার বছরে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কিছু সিদ্ধান্ত বদলে দেয় মধ্যপ্রাচ্যের চিত্র। এখন প্রশ্ন উঠেছে, নবনির্বাচিত ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মধ্যপ্রাচ্য নীতি কী হবে? আগামী চার বছরে কি মধ্যপ্রাচ্যে আসবে নতুন বাঁকবদল? যদিও আরব দেশগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ বাইডেনের সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান। আর মধ্যপ্রাচ্যে বাইডেনের পরবর্তী পদক্ষেপগুলোও খুব বেশ জটিল।

মোটাদাগে বলতে গেলে, ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তিতে ফিরে যাবেন বাইডেন। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু প্রচলিত কূটনৈতিক তৎপরতা রয়েছে। যেমন, যাই হোক না কেন, সব সময় ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়ে যাওয়া। তবে ইরানের সঙ্গে করা পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে গিয়ে দেশটির শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করে এবং ইসরায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তর করে যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি ট্রাম্প সৃষ্টি করেছেন, তার আপাত অবসান চাইবেন বাইডেন। কারণ আগামীতে তাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ দুটি ফ্রন্টে স্নায়ুযুদ্ধে লড়তে হবে। নিঃসন্দেহে একটি ফ্রন্ট চীন এবং কিছুটা অপ্রত্যাশিতভাবে অপর দেশটি তুরস্ক।

বাইডেন নির্বাচিত হওয়ায় আরব দেশগুলোর মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং তাদের কাছে অস্ত্র বিক্রির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারেন বাইডেন। তার প্রাথমিক লক্ষ্যবস্তু হতে পারে অন্যতম মিত্র দেশ সৌদি আরব। এই দেশটির অঘোষিত শাসক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতা সর্বজন বিদিত। বাইডেনের বিজয়ে বেজায় চিন্তায় পড়েছে সৌদির শাসকগোষ্ঠী। সে চিন্তা এতটাই যে, বাইডেনকে বিজয়ী হওয়ার পর অভিনন্দন বার্তা পাঠাতেই ভুলে গেছে তারা। ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের পররাষ্ট্র নীতি-সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিস্কারভাবে বাইডেন ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তিতে ফিরবেন এবং দেশটিকে দেওয়া নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেবেন।

ইরানের এমন 'স্বাধীনতা' মানতে নারাজ ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইনের মতো দেশগুলো। সৌদি ও তার মিত্ররা চাচ্ছিল, ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফা জয়। উল্টো বাইডেনের জয়ে সৌদির শাসকদের মতোই কিছুটা বিপাকে পড়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেছিলেন, 'ট্রাম্পের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে।' জয়ী হওয়ার পরই বাইডেনকে 'ইসরায়েলের মহান বন্ধু' অভিহিত করে তাকে অভিনন্দন জানাতে ভোলেননি নেতানিয়াহু। দু'জনের ৪০ বছরের বন্ধুত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী। তিনি আরও মনে করিয়ে দিয়েছেন, ইহুদিবাদী রাষ্ট্র ইসরায়েলের পক্ষে বাইডেনের দীর্ঘদিনের সমর্থনের কথা। ২০১৫ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকার সময় বাইডেন বলেছিলেন, ইসরায়েলকে রক্ষার পবিত্র প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র।

দখলকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপন এবং সিরিয়ার কাছ থেকে দখল করা গোলান মালভূমির ওপর ইসরায়েলের বৈধতার পক্ষে ট্রাম্প। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বাইডেন মনে করেন, দখলকৃত ফিলিস্তিনি জমিতে ইহুদি বসতি স্থাপন ওই অঞ্চলে শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য বড় বাধা। ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ইসরায়েলের সাবেক দূত মাইকেল ওরেন বলেন, ইরানের সঙ্গে বাইডেন পরমাণু চুক্তিতে ফেরা মাত্রই ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। ইসরায়েলের বার-ইলান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক এইতান গিলবোয়া মনে করেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে ফিরলে ইসরায়েলের পাশাপাশি সৌদি আরব, আরব আমিরাতের মতো আরব দেশগুলোর সঙ্গেও উত্তেজনা তৈরি হবে যুক্তরাষ্ট্রের।

ইয়েমেনে চলা সৌদি আরব নেতৃত্বাধীন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন বন্ধ করবেন বাইডেন। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যকার বামপন্থি অংশ এবং কংগ্রেসের বেশ কয়েকজন আইনপ্রণেতা ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের ঘোর বিরোধী। সৌদি যদিও যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতিবিষয়ক বিশ্নেষক ড্যানিয়েল প্লেটকা বলেন, 'বাইডেনের নীতি হবে ইরানঘেঁষা। তিনি সৌদি নীতি থেকে সরে আসবেন।' তবে অধ্যাপক গিলবোয়া মনে করেন, ইসরায়েলের দিকে ঝুঁকে থাকা যুক্তরাষ্ট্রকে কখনোই বিশ্বাস করবে না ইরান। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বাইডেনকে পদক্ষেপ নিতে হবে বুঝেশুনে।

ইরানের মতোই ফিলিস্তিনের সঙ্গেও সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করবেন জো বাইডেন। পূর্ব জেরুজালেমে তিনি ফিলিস্তিনিদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেট খুলবেন। ট্রাম্প ফিলিস্তিনিদের জন্য সহায়তা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তবে ফিলিস্তিনিদের সরাসরি সহায়তা দেওয়া এবং জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কও পুনঃস্থাপন করবেন বাইডেন। অর্থাৎ, ট্রাম্পের আমলে ফিলিস্তিনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের যে অবনতি হয়েছিল, তা ঠিকঠাক করে নেবেন বাইডেন। ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসও সে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

লিবিয়া, ইরাক, সিরিয়া এবং আফগানিস্তান থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়ায় কিংবা সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর ওই সব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব নেই বললেই চলে। এ দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের স্থান দখল করে নিয়েছে তুরস্ক, রাশিয়া কিংবা চীন। বাইডেন সে হারানো প্রভাব ফের হাতে পেতে চান। সব মিলিয়ে ফিলিস্তিন থেকে লিবিয়া, ইয়েমেন হয়ে আফগানিস্তান পর্যন্ত পুরো মধ্যপ্রাচ্যে এক জটিল বৈদেশিক নীতি-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে নবনির্বাচিত ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে। সূত্র :এএফপি ও রয়টার্স।