ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্রের পর এবার ভারত-বাংলাদেশের ওপর করোনাভাইরাসের দায় চাপানোর চেষ্টায় মেতে উঠেছে চীন। দেশটির একদল গবেষক দাবি করেছেন, করোনাভাইরাস উহান থেকে নয়, ভারত-বাংলাদেশ থেকেই ছড়িয়েছে। তারা বলেছেন, ২০১৯ সালের গ্রীষ্মেই সম্ভবত করোনার জীবাণু ছড়িয়েছে। আর সেটা ছড়িয়ে থাকতে পারে ভারত অথবা বাংলাদেশ থেকে। এখান থেকে এ জীবাণু উহানে বাহিত হয়েছে। আর উহানেই এটা প্রথম শনাক্ত হয়। যদিও তাদের এমন অযৌক্তিক দাবিকে সন্দেহের চোখেই দেখছেন পশ্চিমা বিজ্ঞানীরা।

চীনের একাডেমি অব সায়েন্সের একদল গবেষকের গবেষণার ফলাফলে বিস্ফোরক এ দাবি করা হয়েছে। জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেটের প্রাক-প্রকাশনা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে গত ১৭ নভেম্বর চীনা বিজ্ঞানীদের গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করা হয়। ওই প্রবন্ধ উদ্ধৃত করে গত শুক্রবার ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য সান বলেছে, উহানের দোষ এখন বাংলাদেশ বা ভারতের ওপর চাপানোর চেষ্টা হচ্ছে। চীনা বিজ্ঞানীরা আচমকা এমন অযৌক্তিক দাবি তোলায় পশ্চিমা বিজ্ঞানীরা আগাম সতর্ক করে দিয়েছেন। তাদের মতে, এই গবেষণা 'বড় ধরনের' দাবি তুলছে, আর এ কারণে সতর্কতা ও সন্দেহপ্রবণ চোখে এটি ভালো করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

শুক্রবার ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর আগেও চীনের একাধিক গবেষণায় কভিড-১৯ মহামারির দায় দেশটির সীমান্তের বাইরে কারও ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করা হয়েছে। একাধিক গবেষণায় ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্রকে এই জীবাণুর উৎস দেশ হিসেবে শনাক্তের চেষ্টা করা হয়েছে।

গত বছর চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহর থেকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয়। গত বছর ৩১ ডিসেম্বর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার চীনের কার্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন ভাইরাসের তথ্য প্রকাশ করে। শুরুতে এই ভাইরাস চীনের প্রতিবেশী দেশগুলোতে ছড়ায়। একপর্যায়ে তা মহামারি আকারে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে প্রথম রোগী শনাক্তের ঘোষণা আসে এ বছরের ৮ মার্চ।

এরই মধ্যে চীনের বিজ্ঞানীদের দাবিকে পুরোপুরি অনুমাননির্ভর বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। গত শুক্রবার সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক মাইক রায়ান এক ভার্চুয়াল ব্রিফিংয়ে বলেন, চীন থেকে করোনাভাইরাসের উৎপত্তি হয়নি, এমন কথা বলা আমাদের জন্য একেবারে অনুমাননির্ভর হবে।

গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, ২০১৯ সালের মে থেকে জুন মাসে উত্তর-মধ্য ভারত ও পাকিস্তানে রেকর্ড দ্বিতীয় দীর্ঘতম দাবদাহ তাণ্ডব চালিয়েছিল। ফলে ওই অঞ্চলে ভয়াবহ পানির সংকট সৃষ্টি হয়। পানির অভাবে বানরের মতো বন্যপ্রাণী একে অপরের সঙ্গে ভয়াবহ লড়াইয়ে লিপ্ত হয়েছিল এবং অবশ্যই এটি মানুষ ও বন্যপ্রাণী সংস্পর্শের আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছিল। এই দাবদাহকেই প্রাণী থেকে মানবদেহে করোনা সংক্রমণের কারণ বলে মনে করছেন গবেষকরা।

চীনা গবেষক দলটি করোনাভাইরাসের উৎস খুঁজতে ফাইলোজেনেটিক বিশ্নেষণ পদ্ধতি ব্যবহার করেন। তাদের মতে, সবচেয়ে কম রূপান্তরিত রূপটাই ভাইরাসের আসল রূপ হতে পারে। এ ধারণার ভিত্তিতেই তারা দাবি করেছেন, নভেল করোনাভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ উহানে হয়নি। এর বদলে ভারত ও বাংলাদেশের মতো জায়গাগুলো, যেখানে কম রূপান্তরিত ভাইরাসের নমুনা পাওয়া গেছে, সেখানেই হতে পারে এর আসল উৎস। এ ছাড়া ভারত-বাংলাদেশের পাশাপাশি করোনার সম্ভাব্য উৎস হিসেবে অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া, সার্বিয়া, ইতালি, গ্রিস, যুক্তরাষ্ট্র ও চেক রিপাবলিকের নাম বলেছেন চীনের ওই গবেষকরা।

গবেষকরা আরও বলেছেন, যেহেতু বাংলাদেশ ও ভারতের নমুনায় এ ভাইরাসে কম মাত্রায় মিউটেশন পাওয়া গেছে, তাই এ দুই প্রতিবেশী দেশ থেকেই এটি ছড়ানোর আশঙ্কা আছে।

তবে চীনাদের এ দাবির সঙ্গে একমত নন অনেক বিশেষজ্ঞ। চীনা বিজ্ঞানীদের গবেষণাপত্রকে 'খুবই ত্রুটিপূর্ণ' বলে উল্লেখ করেছেন গ্লাসগো ইউনিভার্সিটির ভাইরাল জিনোমিপ অ্যান্ড বায়োইনফরমেটিকস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডেভিড রবার্টসন। তিনি বলেন, ন্যূনতম রূপান্তরিত ভাইরাস সিকোয়েন্স শনাক্তকরণে লেখকদের দৃষ্টিভঙ্গি সহজাতভাবেই পক্ষপাতদুষ্ট। লেখকরা মহামারির বিস্তৃতি-সংক্রান্ত উপাত্তগুলো এড়িয়ে গেছেন, যাতে চীনে ভাইরাসের উত্থান এবং সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়া স্পষ্ট দেখা যায়। এই বিশেষজ্ঞের মতে, চীনা বিজ্ঞানীদের গবেষণাপত্রটি সার্স-কভ-২ সম্পর্কে বোঝার বিষয়ে নতুন কিছুই যোগ করেনি।

বিষয় : করোনাভাইরাস বাংলাদেশ

মন্তব্য করুন